“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
৮.
শাহরিয়ার এসব কিছুর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে ভেবেছিল বাবার সাথে কথা বলবে। সেই সুযোগটাই সে পেল না।
আশপাশের সবাই অভিনন্দন জানাতে শুরু করলো। শাহরিয়ারের নিজেকে জড় বস্তুর মতো মনে হলো। তাকে ঘিরেই সব হচ্ছে অথচ তার প্রতিই কারো কোনো খেয়াল নেই।
আজাদ বিশ্বাস একটু একটা হতেই তাকে প্রশ্ন করলো শাহরিয়ার।
“এসব কি বাবা?”
“কি মানে?”
“এখানে এমন অ্যানাউন্সমেন্ট করার কি মানে?”
“না বোঝার মতো তো কিছু দেখছি না। তোমার বিয়ে হবে। মেয়ে ঠিক করেছি।”
“আর আমিই জানি না?”
“এখন তো জানলে। নাসিরের মেয়েকে তুমি চেন না? ফোন নাম্বার নিয়ে যাও। কথা টথা বলো।”
“বলে যদি আমার ভালো না লাগে?” শক্ত কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার। আজাদ এতক্ষণে ছেলের দিকে ঘুরে তাকালেন।
“ভালো লাগবে না কেন? ভালো না লাগার মতো মেয়ে সে নয়।”
“বাবা তোমার সাথে আমার কথা আছে।”
আজাদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “এখন না। পরে শুনবো। ফোন নাম্বার নিয়ে যাও।”
শাহরিয়ার দম ছাড়লো। সে যথেষ্ট চেষ্টা করছে গলার স্বর যেন বাবার সামনে উঁচু না হয়। তার ধৈর্য খাদের কিনারায় এসে পৌঁছেছে।
শাহরিয়ার দৃঢ় কন্ঠে বলল, “নাম্বার নেবো না। অ্যানাউন্সমেন্ট যেহেতু তুমি করেছো এর দায়ভারও তোমার। এটুকু শোনো আমি এই মেয়েকে বিয়ে করছি না। এই মেয়ে কেন? অন্য কাউকেই না।”
শাহরিয়ার ঘুর দাঁড়ালো আজাদ বিশ্বাস অবাক কণ্ঠে বললেন, “দাঁড়াও! বিয়ে করবে না মানে! তাহলে কাকে করবে?”
শাহরিয়ার বাবার কথাটাই তাকে ফিরিয়ে দিলো, “এখন না। পরে বলব।” ঠোঁট টিপে হাসি আটকে চলে গেলো শাহরিয়ার। আজাদ বিশ্বাস খালি ঘরে গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। রাতে যখন শুনলেন শাহরিয়ার আর রুমি ঐ বাড়িতে গেছে এক চোট চেঁচামেচি করলেন। আতিয়া অতিষ্ঠ হয়ে বললেন, “আমাকে বকছেন কেন? ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। তাদের উপর নিজের মত চাপিয়ে দিতে পারবেন আপনি? নিজের ভিটায় ওরা যাবে না?”
রাশেদা শাহরিয়ারের কাজে খুশি হলেন। ছেলেটা বাপের সামনে দাঁড়ালেই তিনি তার পাশে যেয়ে দাঁড়াবেন। যেভাবেই হোক আজাদকে রাজি করাবেন।
●● ●● ●●
খবরটা উড়ে এলো মেহরিমার কানে। সে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। গতকাল সন্ধ্যায় শাহরিয়ারের আচরণে তার মনে হয়েছিল সে বিয়ের কথাটা ভোলেনি। যেভাবে নিজের অধিকার দেখিয়েছিল মেহরিমার এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল তার অহর্নিশি দেখা স্বপ্ন এবার পূরণ হবে। কাঠ পুতুলের মতো উঠে রুমের দরজা বন্ধ করলো মেহরিমা। পরপরই ডুকরে কেঁদে উঠলো। শাহরিয়ার বিয়ে করবে করুক তবে কেন এই মিথ্যে আশা দেখানো? সে তো ঢাকাতেই বিয়ে করতে পারে। এখানে এসে এসব করার কি মানে?
প্রায় বিশ মিনিট কান্নার পর মেহরিমা চোখ মুছলো। শাহরিয়ার তার সাথে মজা করছে? তাকে দেখিয়ে বিয়ে করতে এখানে এসেছে? বেশ। মেহরিমাও পিছিয়ে থাকবে না। কার জন্যই বা পিছিয়ে থাকবে?
কালকের পর শাহরিয়ারের মনে হয়েছিল মেহেরিমা আর এমন পালিয়ে পালিয়ে থাকবে না। কথা না বলুক অন্তত সামনে আসবে। তবে এবার যেন মেয়েটা গুহায় ঢুকে গেল। তার টিকিটির দেখাও মিলল না। না পেরে রুমিকে পাঠালো শাহরিয়ার। রুমি গম্ভীর মুখে মেহরিমার ঘর থেকে ফিরে এলো।
“কি হয়েছে?”
“কি আর হবে? আপা তোমার বিয়ের খবর জেনে গেছে।”
শাহরিয়ার বিরক্ত হলো।
“বিয়ে বিয়ে করছিস কেন? বলেছে এক আংটি বদলের কথা। সেটাও তো হয়নি।”
“শোনো ভাইয়া! মুখ পাল্টালে কথা পাল্টে যায়। তুমি কি মনে কর খালামনির বাড়ির খবর এখানে এসেছে কি অবিকৃত হয়ে? আরো অনেক দাঁড়ি কমা যোগ হয়েছে। মেহু আপা কতটুকু কি শুনেছে আল্লাহই জানে। তুমি কিছু করতে পারছ না?”
“করার সময়টা পাচ্ছি কই?”
“তোমার বুড়ো বাবা তোমার চেয়ে এতো এগিয়ে যায় কিভাবে? মেয়ে দেখে পছন্দ করে একেবারে এনগেজমেন্টের তারিখ বলে দিয়েছে। তুমি আর কি করবে? আঙুল চোষো বসে বসে। তারপর বাবা বিয়ে করতে বললে চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো বিয়ে করে নিও। আর এদিকে মেহু আপার বিয়ে হয়ে যাক।”
প্রথমটুকু শুনে বিরক্ত লাগলেও রুমির শেষের কথায় ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না শাহরিয়ার।
“মানে?”
“মানে আবার কি? ঐ ইউনূস লোকটার সাথেই মনে হয় আপার বিয়ে হবে। চাচী তো তেমনই বলছিল।”
রুমি নিশ্বাস ছাড়ল, “ভাইয়া তুমি একটা কথা জানো না। বাবা কি ঢাকায় তোমার বিয়ে দিতে পারত না? পারতো। ইচ্ছে করেই এখানে দিচ্ছে। চাচাকে নাকি এটাও বলেছে এমনভাবে তোমার বিয়ে দেবে যে সারা পাড়ার লোকে দেখবে। চাচা তো সেভাবে মেহু আপার বিয়ে দিতে পারবে না। আর চাচা চাচী চ্যালেঞ্জ পুরো করার জন্য আমর থাকতে থাকতেই মেহু আপার বিয়ে দিয়ে দিতে চাচ্ছে। উপরে তো সবই ঠিকঠাক মনে হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে জল কতদূর গড়িয়েছে তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।”
শাহরিয়ার মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। বাবার সাথে এক্ষুণি সরাসরি কথা বলা ছাড়া তার আর কোন উপায় নেই।
●● ●● ●●
একজন জমি দেখতে এসেছিল। তাকে সরাসরি না করে দিয়েছে শাহরিয়ার। অথচ তার কথাই আবার আজাদ বিশ্বাসকে ফোন করে বলেছে।
“একজন জমি দেখতে এসেছে।”
“তো তুমি দেখাও।”
“তুমি আসো। আমি কি দরদাম করতে পারব?”
“এখনই দামের কথা বলছে নাকি?” আজাদ বিশ্বাসকে চিন্তিত মনে হলো।
শাহরিয়ার বলল, “তাহলে আমি ফোন করলাম কেন? আসো তো!” তাড়া দেখিয়ে ফোন কেটে দিল শাহরিয়ার।
আজাদ বিশ্বাস এসে বাড়ির বাইরে কাউকে পেলেন না। ভেতরে যেতে ইচ্ছে হলো না। ছেলেকে ফোন দিয়ে বললেন, “তুমি কি বাড়ির ভেতরে?”
“হ্যাঁ।”
“লোকটাকে নিয়ে বাইরে এসো। পাশে চায়ের দোকানে বসি। বাড়িতে ঢুকবো না।”
শাহরিয়ার না করলো না। সে বেরিয়ে এলেও তার আশেপাশে কাউকে না দেখে আযাদ বিশ্বাস বললেন, “কোথায়? কে?”
“চলো।” শান্ত ভঙ্গিতে বলল শাহরিয়ার। আজাদ বিভ্রান্ত বোধ করলেন।
শাহরিয়ার চায়ের দোকানে গেল না। বাড়ির পেছনে পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে বসে বলল, “এখানে বসো।”
“তুমি যে বললে একজন জমি দেখতে এসেছে। কই?”
“চলে গেছে।” শাহরিয়ারের কণ্ঠে কোনো দ্রুততা নেই। তার শান্ত ভঙ্গি দেখে রেগে গেলেন আজাদ।
“তাহলে আমাকে ডেকে নিয়ে এলে কেনো? এই বাড়িতে আমি আসতে চাই না।”
“সব পাল্টালেও কিন্তু রক্ত পাল্টাতে পারবে না বাবা।” হেসে বলল শাহরিয়ার।
আজাদ র-ক্তচক্ষু নিয়ে তাকালেন, “কি বলতে চাও সেটা বলো। তোমার ইয়ার্কি শুনতে চাই না আমি।”
“ধন্যবাদ বলার সুযোগ দেয়ার জন্য। আজকাল তোমার সাথে কথা বলতেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে।”
আজাদ কিছু বললেন না। শাহরিয়ার খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “এঙ্গেজমেন্ট ভেঙে দিয়েছ না?”
“ভাঙবো কেন আশ্চর্য! আমি নাসিরকে বিয়ের কথা দিয়েছি।” শক্ত কণ্ঠে বললেন আজাদ।
“তাহলে কষ্ট করে একটা পাত্রও খুঁজে দাও।”
আজাদ রুষ্ট চোখে তাকালেন।
“এভাবে তাকিও না বাবা। আমি তোমাকে আগেই বলেছি। বিয়ে করব না।”
“কেন করবে না? একঘর মানুষের সামনে আমি বড়মুখ করে বলেছি। নাসিরকে কথা দিয়েছি। কেন বিয়ে করবে না তুমি!” আজাদ প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।
শাহরিয়ার কিছুটা সময় নিলো। আস্তে ধীরে বো-মা-টা ফাঁটালো, “কারণ আমি অলরেডি বিবাহিত।”
~চলমান~
(“কৌমুদী” কিনছেন না কেন?)

