অচিনরেখা” বিনতে ফিরোজ ৭.

0
1

“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
৭.

শুক্রবার হওয়ায় মেহরিমা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খেলেছে। সকালে আফজাল বিশ্বাসের সাথে পুরো পাড়া টইটই করে ঘুরে এসেছে। তারপর থেকে সেই যে খেলা শুরু করেছে সেই খেলা থেমেছে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ শুনে। শেলী দুই বছরের মেহজাবিনকে নিয়ে হিমশিম খান বলে মেহরিমা সুযোগ পেয়েছে। নয়তো বারোটার আগেই তাকে গোসল সেরে বসে থাকতে হয়।
আফজাল বিশ্বাস নাতির সাথে মসজিদের পথ ধরলেন। উঠানে মেহরিমাকে দেখে নরম কণ্ঠে বললেন, “দাদা এদিকে আসো তো!”
মেহরিমা এগিয়ে এলে বললেন, “আজকে তোমার ঈদের জামাটা পরবা ঠিকাছে?”
“কেন দাদা?”
“বিকালে এক জায়গায় ঘুরতে যাবো।”
“আমি একাই?”
“না। এইযে আমার নাতিও যাবে।”
মেহরিমা বা শাহরিয়ার কেউই জানে না কোথায় যাবে। তবে দাদার কথা মেনে নিলো তারা।
রাশেদার কাছে মেহরিমাকে রেখে শেলী ঘুমাতে গেলেন। জানতে চাইলেন না শ্বশুর মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবে। প্রায় প্রায়ই যান। শোনার মতো বিশেষ কিছু মনে হয়নি। একই ভাবনা আতিয়ারও।
জুমুআর নামাজের পরে আফজাল বিশ্বাস বাড়িতে এলেন না। বিকেলে যেন রাশেদা মেহরিমাকে সঙ্গে নিয়ে যায় সেই নির্দেশ দিয়ে ঠিকানা বলে দিলেন। রাশেদার মনে খটকা লাগলো যখন জমাট বাঁধা মেঘ এবং বাতাসে বৃষ্টির পূর্বাভাসের মাঝেও দাওয়াত জারি থাকলো। দুটো ডাল ভাত খাওয়া আফজাল বিশ্বাসের কাছে কখনোই এতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। মনের চিন্তা মনে রেখেই তিনি মেহরিমাকে নিয়ে ছুটলেন।
যত্ন করেই সবাইকে খাওয়ানো হলো। আফজাল বিশ্বাসের চারজন বন্ধু ছিলেন। যার বাসায় দাওয়াত তার এক ছেলে। সে বাইরে থাকে। ফলে বুড়ো বুড়ি দুজনার ছোট্ট সংসার। সেখানেই আড্ডা বসিয়েছিলেন আফজাল।
সময় গড়াতেই রাশেদা বুঝলেন ওটা আসলে আড্ডা ছিল না। কাজীকে আসতে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। আফজাল বিশ্বাসকে কিছু বলতে চাইলে তিনি শুনলেনই না। মেহরিমা বা শাহরিয়ার কেউই বুঝলো না তাদের বেঁধে দেয়া হয়েছে। এক বৃষ্টিমুখর বিকেলে।
আফজাল সবটার দায়িত্ব নিজের উপরে নিলেন। রাশেদা অবাক হয়ে বলল, “চাচা আপনি এই কাজটা কেন করলেন? বিয়ে দেয়ার ইচ্ছা থাকলে আর ছয় সাত বছর পরেই দিতেন। ছেলে মেয়ে দুইটা কি কিছু বুঝলো?”
“ওদের বোঝা লাগবে না। কেন জানিনা রাশেদা আমার শুধু মনে হয় আমি ম-রে গেলে ছেলে দুইটার দ্বন্দ্ব লাগবে। তাই একটা সুতা রেখে গেলাম। এটার জের ধরেও যদি আমার বংশের ভাঙন ঠেকানো যায়।”
রাশেদা সেদিন কিছু বলেননি। তার কাছে মনে হয়েছে এ কেবলই পুতুল খেলা। বিয়ের মর্ম বোঝার বয়স হয়েছে ওদের? কবুল বলেই মেহরিমা শাহরিয়ারের পাশ ঘেষে বসে থাকলো। তার নাকি এতো মানুষ দেখে ভয় লাগছে।
আফজাল শেখ শাহরিয়ারকে একটা আংটি দিলেন মেহরিমাকে পরিয়ে দেয়ার জন্য। তার স্ত্রীর আংটি। ছোট্ট সোনার টুকরোটা তাকে আবেগ আপ্লুত করে দিলো। পরবর্তী ফল চিন্তা করলেন না।
মেয়ের হাতে আংটি দেখে দাদার উপহার শুনে শেলী খুশি হলেও আতিয়ার মনে ঘা হলো। আজাদ বিশ্বাস জিজ্ঞে করলেন কেন তার ছেলেকে কিছু দেয়া হলো না। আফজাল বিশ্বাস বলতে পারেননি মেহরিমা আর শাহরিয়ার তো আর আলাদা নেই, এক হয়ে গেছে। এদিক সেদিক বলে কাটিয়ে দিলেন। সেই আংটির রেশ পরবর্তীতেও কাটলো না। আজাদ সুযোগ পেলেই সেটা ধরে আরমানকে খোটা দিতে ভোলেন না।

সব শুনে কতক্ষন হা করে রইলো রুমি। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না শাহরিয়ার বিবাহিত। তার উপরে বউ আর কেউ নয়, স্বয়ং মেহরিমা। সে মাথায় হাত দিয়ে বলল, “কাজটা কি করছো ভাই!”
শাহরিয়ার সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। মাথার নিচে দুহাত রেখে বলল, “আমি কিছু করিনি। তোর দাদা করেছে।”
“দাদা কাজটা কি করলো!”
“ভোলাভালা বার বছরের একটা ছেলেকে ধরে বিয়ে করিয়ে দিলো। জীবনে মেয়েদের দিকে চোখ উঠিয়েই দেখতে পারলাম না!”
“কেন?”
“ঘরে বউ রেখে আমি রাস্তার মেয়ে দেখে বেড়াবো? তোর ভাইকে তুই এমন মনে করিস?”
“সেদিক দিয়ে কাজটা তাহলে ভালোই হয়েছে। নজরের হেফাজত করেছ। তুমি তো তাহলে মেনেই নিয়েছ। কিন্তু মেহু আপা?”
পকেট থেকে আংটিটা বের করলো শাহরিয়ার। হেসে বলল, “ও আরো আগে মেনে নিয়েছে।”
“তাহলে দেরি কীসের?” উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলল রুমি। পরক্ষণেই তার উচ্ছ্বাস মোমবাতির আগুনের মতো ধপ করে নিভে গেল।
“বাবা চাচা কেউ তো মানবে না!”
শাহরিয়ার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, “এখানেই তো সমস্যা।”
“যদি না মানে ভাইয়া? চাচা মানলেও বাবা তো মানবেই না। বলবে সম্পত্তির জন্য এসব করেছে। তখন তুমি কি করবে?”
শাহরিয়ার উঠে বসলো, “তোর কি মনে হয়?”
“মনে হওয়া হওয়ির কি আছে? বিয়ে করেছ তা সেই বউকে ঘরে তুলবে না?”
“মেহুর অপিনিয়ন নিয়ে আমি দ্বিধায় ছিলাম। মাঝখানে সাত বছর ওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। এর ভেতরে ওর মন মেজাজ কেমন হয়েছে, সেদিনের ঘটনাটা কিভাবে নিয়েছে এসব তো আমি জানতাম না। তাই থেমে ছিলাম।”
“তোমাকে তো জেলে দেয়া উচিৎ! সাত বছর ধরে বউয়ের সাথে যোগাযোগ করনি আবার গর্ব করে সেটা বলছ! যদি আপার বিয়ে হয়ে যেত?”
শাহরিয়ার হাসলো, “আসলেই ভুল হয়ে গেছে।”
“আপা ভালো মানুষ তাই তোমাকে শুধু ধাক্কা দিয়েছে। আমি হলে গণপিটুনি খাওয়াতাম। উড়ে এসে জুড়ে বসে বলে আমি তোর হাজবেন্ড!” ব্যাঙ্গ করে বলল রুমি।
“তুই এসব দেখেছিস কেন? ভাই ভাবিকে প্রাইভেসি দিতে শিখিস নি?” শাহরিয়ার চোখ গরম করল।
“না শিখিনি। অফিশিয়াল ভাবি যেদিন হবে সেদিন শিখবো। এহ! এসেছে ভাবি বলাতে। মেহু আপার সামনে বলে দেখো তো! আপা নিশ্চিত তোমার মুখে ঘুষি মা-রবে।”
শাহরিয়ার হাসলো। কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, “এই বিয়ের কাহিনী কি বল তো? মেহু আমার বিয়ের কথা কি বলছিল এসব?”
তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো রুমি।
“আয় হায়! এটা তো ভুলেই গেছিলাম!”
“কি?”
“বাবা যে তোমার জন্যে মেয়ে দেখেছে। এইট্টি পার্সেন্ট ফাইনাল!”
“কি! আমি কিছু জানি না আর ফাইনাল?”
“বাবাকে চেন না তুমি?”
শাহরিয়ারের মুখ গম্ভীর হয়ে এলো।
রুমি ভয়ে ভয়ে বলল, “বাবাকে বলবে কিভাবে? দাদার ঐ বন্ধুদের এনে দাঁড় করিয়ে দাও।”
“বেঁচে থাকলে তো দাঁড় করাবো! একজনও আর আমার সংসার বসানোর জন্য নেই। কবুল বলিয়েই উনারা দায় সেরেছেন।”
“তাহলে? কিভাবে এসব বলবে?”
“একমাত্র রাশেদা খালাই জানেন। আর কেউ নেই যে প্রমাণ দেবে।”
“ওহ তাই তো! রাশেদা খালা নিশ্চিত সাহায্য করবে।”
“ইনশাআল্লাহ্ করবে। কিন্তু আমার আর ঐ বাড়িতে থাকা হবে না।”
“কেন?” রুমি অবাক হলো।
“বাবার পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করব না। বলব যার কথা বাবা তাকে কস্মিনকালেও মেনে নেবে না। এখন বল কি করবো?”
রুমির মনটা খারাপ হয়ে গেল, “তুমি মেহু আপাকে নিয়ে আরেক জায়গায় থাকবে? আমাদের সাথে থাকবে না?”
“বাবাকে মানাতে না পারলে। দেখা যাক কি হয়।”

হওয়ার অনেক কিছুই বাকি ছিল। আজাদ বিশ্বাস আসলেন সেদিনই। তিনি পুরোনো বাড়ির দিকে না যেয়ে সোজা বিয়ে বাড়িতে চলে গেলেন। শাহরিয়ার বাবার আচরণে মনক্ষুন্ন হলেও কিছু বলতে পারল না। বাবা চাইলে চাচার সাথে সরাসরি একটু কথা বলতে পারতো। ফোনের কথা আর চোখে দেখার কথা কি এক? আজাদ সেসবের ধারে কাছেই গেলেন না। ছেলের কাছে জিজ্ঞেস করলেন জমি বিক্রির কাজ কতদূর। শাহরিয়ার কিছুই বলল না। সে তো এসব কিছুই করেনি। তার মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা। দেখা গেলো আজাদ তার থেকেও দু কদম এগিয়ে চিন্তা করেছেন। শাহরিয়ারের খালাতো ভাইয়ের বিয়ের পরদিনই বন্ধুকে নিয়ে সবার সাথে পরিচিত করিয়ে দিলেন। ভরা মজলিশে শাহরিয়ারকে সামনে রেখে বললেন, “এই যে আমার বেয়াই। এবার ওর মেয়ের সাথে শাহরিয়ারের আংটি বদল সেরেই ঢাকা যাবো।”

~চলমান~

বিপত্তি বাঁধলো পঞ্চাশে যেয়ে। আবার কনফিউশন। ঘড়ি দেখল জুঁই। তেত্রিশ মিনিট শেষ। আর সাতাশ মিনিট আছে। চেপে রাখা শ্বাসের গতি আবার বাড়তে শুরু করলো। চোখ বন্ধ করলো জুঁই। সাথে সাথে জেসমিন হাসানের মুখটা ভেসে উঠলো। তার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষার কথা মনে পড়লো। Do or die Do or die… আবার দাগাতে শুরু করলো জুঁই। কিন্তু এবার কনফিউশনের চেয়েও ভয়াবহ সমস্যা পড়ল সে। বুকমিনস্টার ফুলারিনের সংকেত ভুলে গেছে সে। অপশন দেখেও কোনোভাবে মনে পড়ছে না। C60 ছিল নাকি C61? কোনোভাবেই মনে করতে পারল না জুঁই। কান্না পেলো তার। এই বার্জেলিয়াসের ঘটনা যেন না ভুলে যায় সেজন্য এটাকে স্টিকি নোটে লিখে মাথার কাছে লাগিয়ে রেখেছিল। তবুও ভুলে গেলো। এটার শোকে পরবর্তী নাম্বারে নিউটনীয় বলবিদ্যার সবচেয়ে সহজ সূত্রটা মনে করতে পারল না জুঁই। হতাশায় মাথা চেপে ধরলো সাথে সাথে। শ্বাস ঘন হয়ে আসছে। বুক উঁচু নিচু হচ্ছে খুব দ্রুত। জুঁই বুঝতে পারছে তার মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হাত কাঁপতে শুরু করেছে। কলম রেখে জামায় হাত মুছলো জুঁই। হাতের তালু ঘেমে গেছে। স্যার বললেন, “তোমাদের আর বিশ মিনিট সময় আছে। Only twenty minutes!”

***

ই-বুক “কৌমুদী”

https://link.boitoi.com.bd/qvDe
মূল্য: ৩০ টাকা
শুধুমাত্র বইটই থেকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here