“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
৬.
“মেহুর বিয়ে?”
আতিয়া বেগম ঘুরে তাকালেন। প্রশ্নটা শাহরিয়ার তাকেই করেছে বুঝতে পেরে বললেন, “হতেই পারে। বয়স হয়েছে।”
“কতই বা বয়স হয়েছে! এতো তাড়াহুড়া করার কি আছে?”
“ওদের মেয়ে ওরা বিয়ে দিলে দিক যা খুশি করুক। আমাদের কি?” তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন আতিয়া। শাহরিয়ার দমে গেল।
রাশেদা শাহরিয়ারের সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজছিলেন। আতিয়া বেগম বের হলে তিনি ঢুকলেন। শাহরিয়ার চিন্তিত মুখে বসে ছিল। তিনি বললেন, “কি চিন্তা করলা আব্বা?”
“কি বিষয়ে?”
“তোমার বিয়ের বিষয়ে?” চাপা কণ্ঠে বললেন রাশেদা।
“কি বলব খালা? মেহুর বিয়ের কথা চলছে। সেখানে আমি..” অসহায় শোনালো শাহরিয়ারের কণ্ঠ।
“বিয়েধারী মেয়ের আবার কীসের বিয়ে? তুমি কেমন ব্যাটা মানুষ হ্যাঁ! নিজের বউ এইটা পাঁচটা মানুষের সামনে বলতে পারো না। তাহলে মেহু তোমার কাছে আসবে কেন?” রেগে গেলেন রাশেদা। তার কন্ঠ উঁচু হলো। শাহরিয়ার চুপ করে রইলো। রাশেদার রাগ কমলে সে বলল, “খালা আমি পাঁচটা মানুষের ভয় পাই না। আমি মেহুর চিন্তার ভয় পাই। ও তো কিছু বলছে না। মনে হয় এসব ওর মনেও নেই। বিয়ে করে নিতে চাচ্ছে।”
“কান বরাবর দিতে মন চায়! এই ছেলে! একটা মেয়ে কি সারা দুনিয়ার সামনে এসব কথা বলতে পারে? তার উপরে যখন তার সাথে কোনো গার্জিয়ান নাই। তুমি এতো চিন্তাভাবনা না করে মেহুর সাথে কথা বলো না কেন? আর ও যদি না করে তাহলে তো শেষ। মরীচিকার পেছনে ছুটবা না। তোমার জীবনের দাম আছে। সেইটা মিটাবা।”
রাশেদা চলে যেতে চেয়েও কি মনে করে থামলেন, “মেহুর জন্যে কি আনছিলা। দিছ?”
“জি।”
“ও নিলো?”
“হুঁ।”
“তাইলে ভয় পাও কীসের মিয়া?”
শাহরিয়ার মনে মনে বলল, “মেহুর নীরবতার।”
●● ●● ●●
বিকেলে আতিয়া বোনের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলে শাহরিয়ার দেখলো মেহরিমা উঠানে। অবশ্য একা নয়। পাশে মেহজাবিন আর সামনে ইউনূস। তৎক্ষণাৎ পরিকল্পনা পাল্টালো শাহরিয়ার। রুমির হাত ধরে বলল, “মা তুমি যাও আমরা একটু পরে আসছি।”
রুমি হকচকিয়ে গেল। আতিয়া বললেন, “পরে যাবি কেন?”
“একটু কাজ আছে। তোমাকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে আসি চলো।”
“তো রুমিকে আটকালি কেন?”
“ওরও কাজ আছে। চলো চলো।”
আতিয়া আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। শাহরিয়ার ফিরে এলে রুমি বলল, “হুদাই আটকে রাখলে। আমার কি কাজ?”
“মেহুর পাশে যেয়ে দাঁড়িয়ে থাক। ঐ ছেলের সাথে কি গল্প করে শুনবি।”
“কেন?” রুমির কপালে ভাঁজ পড়ল।
“আমাদের বংশের বড় মেয়ে। কার সাথে বিয়ে করতে যাচ্ছে খোঁজ খবর নেয়া উচিত না? যা।”
“আরে আমি যাবো কেন? তুমি যাও।”
“যা তো!”
রুমিকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো শাহরিয়ার। নিজে যেয়ে বারান্দায় বসলো।
●● ●● ●●
নিজের ছেলে চাকরি পেলেও বোধহয় মানুষ এত খুশি হয় না যতটা ইউনূস চাকরি পাওয়ায় শেলী হয়েছেন। মেহরিমা ঘরে যেয়ে একবার মাকে বলে এসেছে এই লোককে বিদায় করতে। বদলে ঝাড়ি খেয়ে এসেছে। সে বুঝতে পারছে ইউনূসের অবস্থান শক্ত হচ্ছে। তার অযৌক্তিক যুক্তি আর বেশিদিন টিকবে না। এসব ভাবনা মাথায় এসে মাথাটা ভারী করে দিচ্ছিল। তক্ষুণি শাহরিয়ারকে দেখে ঘুরে দাঁড়ালো ইউনূসের দিকে। কথা বলতে শুরু করলো সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে।
শাহরিয়ার দাঁত কটমট করলো। ওর দিকে পেছন ফিরে ঐ ছেলের সাথে গল্প করছে। কত্ত বড় সাহস!
“পুরো দুনিয়ায় যে যু/দ্ধ চলছে আপনি জানেন?”
ইউনূস চা খাচ্ছিল। মেহজাবিনের সাথে কিছু একটা নিয়ে আলাপ করছিল। মেহরিমার কথায় তার কথা বন্ধ হয়ে গেলো।
“কোথায় যু+দ্ধ হচ্ছে?”
“পুরো দুনিয়ায়। আপনি জানেন না?”
“আমি আসলে খবর টবর সেভাবে দেখি না তো।”
“ওও। কি দেখেন তাহলে?” আগ্রহী কণ্ঠে বলল মেহরিমা। মেহজাবিনের কপালে ভাঁজ পড়ল। হঠাৎ করেই আপা এত আগ্রহ দেখাচ্ছে কেন?
“আমাকে ছাড়াই কি গল্প হচ্ছে!” মেহরিমার হাত ধরলো রুমি। মেহজাবিন বিরক্ত হলো। এই মেয়েটাকে তার সহ্যই হয় না। ওদের কাউকেই সহ্য হয় না।
“কিছুই না। পরিচয় করিয়ে দিই। ও রুমি, আমার চাচাতো বোন। আর রুমি ইনি মেহজাবিনের টিউটর।”
ইউনূসের আশান্বিত চেহারায় এক মুঠো ছাই পড়ল যেন। গলা খাঁকারি দিয়ে সে বলল, “আমি শাহরিয়ার হোসেন ইউনূস।”
“আরে আমার ভাইয়ার নামও তো শাহরিয়ার!” উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল রুমি। ইউনূস হাসলো।
মেহরিমার কানে কানে রুমি ফিসফিস করে বলল, “এই লোকের সাথেই তোমার বিয়ের কথা চলছিল না?”
মেহরিমা অবাক হয়ে তাকালো, “কোত্থেকে শুনলি?”
“তার মানে ঘটনা সত্যি!”
“বল কে বলল?”
“আরে চাচী দুপুরে যেভাবে বলছিল সারা পাড়ার মানুষ শুনেছে মনে হয়।”
লজ্জায় মেহরিমার মাথা নিচু হয়ে এলো।
“শাহরিয়ার ভাই জানে?”
“হ্যাঁ আমিই তো বললাম।” নির্বিকার কণ্ঠে বলল রুমি। মেহরিমার মন চাইলো নিজের মাথাটা দেয়ালে ঠুকতে। পরক্ষনেই আগ্রহ হলো তার, “কি বলল?”
“কে?”
“শাহরিয়ার ভাই?”
“আমাকে এখানে পাঠালো ছেলে কেমন দেখতে। বংশের বড় মেয়ে তাই। আর তুই ব্যাটা মানুষ তুই না যাবি! বলো তো আপা?”
মেহরিমার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। বিড়বিড় করে বলল, “বংশের বড় মেয়ে! ছেলের খোঁজ নিতে পাঠিয়েছে! খবিশ কোথাকার!”
রুমি শেষটুকু শুনলো।
“খবিশ কে আপা?”
“তোর ভাই।”
“দুটো মানুষ সামনে রেখে তোমরা ফিসফিস করছ কেন? এত গল্প জমলে ঘরে যেয়ে গল্প করো যাও।” বিরক্ত হয়ে বলল মেহজাবিন। রুমির আর শোনা হলো না কেন তার ভাইকে মেহরিমা খবিশ বলল।
মেহরিমা কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো শাহরিয়ারের দিকে। সে এদিকেই তাকিয়ে ছিল। মেহরিমার তাকানোর ধরনে ভড়কে গেলো। চোখ সরানোর আগেই দেখলো মেহরিমা ইউনূসের পাশের চেয়ারে বসেছে। শাহরিয়ার আর ওখানে থাকলো না। বাকি দৃশ্য দেখার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনোটাই নেই তার।
রাগের বশে ইউনূসের পাশে বসলেও তার হাসিমুখ দেখে মেহরিমা বুঝলো বড়সড় একটা ভুল হয়ে গেছে। ইউনূসকে না চাইতেও একটা ইঙ্গিত দেয়া হয়ে গেছে। আফসোসের পারদ চূড়ায় উঠলো যখন মেহরিমা দেখলো রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হাসিমুখে শেলী তাকিয়ে আছেন। ঝট করে উঠে দাঁড়ালো মেহরিমা। ঘরে ঢোকার সময় শেলী মেয়ের হাত টেনে বললেন, “ইউনূসকে এখন ভালো লাগছে বল?”
মেহরিমা হাত ছাড়িয়ে চলে গেলো। সব অসহ্য লাগছে তার।
●● ●● ●●
রাতে সংবাদ এলো মেহরিমার মামাতো ভাই এক্সিডেন্ট করেছে। ক্লাস সেভেনে পড়ে। নতুন সাইকেল কিনে দুরন্ত গতিতে সেটা ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল পুরো শহরে। যা হওয়ার তাই হলো। মোটরসাইকেলের সাথে এক্সিডেন্ট করে বাম পা ভেঙে ফেলেছে। আরমান বিশ্বাস ছাড়া সকলেই তাকে দেখতে গেলো।
মা বোনের দেরি দেখে মেহরিমা চলে আসতে চাইলো। আল ফালাহ হাসপাতাল থেকে আরাপপুর বেশি একটা দূরে নয়। তবু শেলী ইউনূসকে ফোন দিয়ে আনালেন। সে আসার পর মেহরিমা জানতে পারল। সে বুঝতে পারছে মা ইউনূসকে তার গলায় ঝুলিয়ে দিতে চাচ্ছে। তাই হলো। শেলী বললেন, “মেহু তো চলে যেতে চাচ্ছে। তুমি ওকে একটু দিয়ে এসো।”
রাগে মেহরিমার শরীর কাঁপতে লাগলো। মায়ের বাড়াবাড়ি পছন্দ হলো না। হোক এই লোকের সাথেই বিয়ে তাতে কি? বিয়ে তো হয়ে যায়নি। অথচ শেলী কি নিশ্চিন্তে তার হাতে মেহরিমাকে তুলে দিলো! হাসপাতালে হাঙ্গামা করতে চায়নি বলেই মেহরিমা চুপচাপ চলে এলো। ইউনূস রিকশা নিতে চাইলে এক বাক্যে নিষেধ করল। তার প্রত্যাখান ধমকের মতো শোনালো ইউনূসের কাছে। মেহরিমার মনে হলো ইউনূসের দৃষ্টি হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে। সে নিজেই একটা অটো রিকশা ডাকলো। কড়া কণ্ঠে ইউনূসকে বলল, “ড্রাইভারের পাশে বসুন।”
ইউনূস কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে মেহরিমাকে পরোখ করলো। তারপর ড্রাইভারের পাশেই বসলো। হাঁপ ছেড়ে অটোতে উঠলো মেহরিমা।
অটো থামলে মেহরিমা ভাড়া বের করলো। হা হা করে উঠলো ইউনূস।
“আমি দিচ্ছি আমি দিচ্ছি!”
“অবশ্যই আপনি দিবেন। আপনারটা আপনি দিবেন আমারটা আমি।”
“আরে দশ বিশ টাকা নিয়ে বারগেইনিং করো না তো মেহু।”
“মেহরিমা! আমার নাম মেহরিমা! আপনার সাথে বারগেইনিং করছে কে? নিজেরটা নিজে দিন। সারা দুনিয়ার মানুষের চিন্তা করতে হবে না।”
“সারা দুনিয়ার মানুষের চিন্তা কে করছে? নিজের ওয়াইফের চিন্তা করবো না?”
মেহরিমা কাঠকাঠ কণ্ঠে বলল, “এখানে আপনার ওয়াইফ নেই। যেখানে আছে সেখানে যেয়ে চিন্তা করবেন। কথা বাড়াবেন না ইউনূস সাহেব। আমার ভাড়া আমাকে দিতে দিন।”
টাকা দিয়ে সরে এলো মেহরিমা। ইউনূস নিজের ভাড়া দিলে অটো চলে গেলো। ইউনূস বলল, “দুদিন পর তো তোমার সব ভাড়াই আমি দেব। এখন দিলে অসুবিধা কি ছিল?”
“সেই দুদিন আগে হোক।”
“তোমার এসব রুলস প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও সবসময় ভালো লাগে না মেহু। ওকে! মেহরিমা! এভাবে তাকানোর কি আছে?”
“এক কথা দুবার বলা আমি পছন্দ করি না। আমাকে প্রথম প্রথম অথবা শেষে কোনো বেলায়ই আপনার ভালো লাগাতে হবে না। এবার আসুন। বাড়িতে আপনাকে আপ্যায়ন করার মতো কেউ নেই জানেন নিশ্চয়ই?”
“তুমিই তো করতে পারো।”
মেহরিমা চমকে তাকালো। ইউনূসের থেকে এমন কথা সে কস্মিনকালেও আশা করেনি।
“ইউনূস সাহেব! এসব তরল রসিকতা আমার সাথে করতে আসবেন না। আমার বিশ্রী লাগে।”
“বুঝতেই পারছি। কাঠখোট্টা তুমি। নো প্রবলেম। আমি মানিয়ে নেব। যাও যাও। আর হ্যাঁ! এই যে লিফট দিলাম এটার পাওনা তোলা থাকলো।”
ইউনূস চলে গেলো। মেহরিমা চুপচাপ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা কণ্ঠ শোনা গেলো।
“পাওনা নিয়ে চিন্তা করছিস?”
পিছু ফিরল মেহরিমা। শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তার মুখের ভাব বোঝা যাচ্ছে না। মেহরিমা উত্তর দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো না। তাকে পাশ কাটিয়ে ঢুকতে গেলে শাহরিয়ার খপ করে হাত ধরে ফেললো। মেহরিমা হতভম্ব হয়ে বলল, “হাত ধরেছ কেন?”
“ধরলে সমস্যা?” টেনে মেহরিমাকে ভেতরে নিয়ে এলো শাহরিয়ার। দরজা আটকে দিলো সাথে সাথেই। উঠানে কেউ নেই। মেহরিমাদের পুরো ঘর অন্ধকার। শাহরিয়ারের ঘরের আলোয় উঠান দেখা যাচ্ছে।
“অবশ্যই সমস্যা। আমার হাত তুমি ধরবে কেন?” মেহরিমা তার ধৈর্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। সে জানে না ঠিক কতক্ষন নিজেকে সংযত রাখতে পারবে। প্রথমে মা, তারপর ইউনূস, এখন শাহরিয়ার। একের পর এক ঝামেলায় তার অসহ্য লাগছে।
“আমি ধরবো না তো কে ধরবে? ইউনূস?”
“মুখ সামলে কথা বলো। কাকে নিয়ে কি বলছ তুমি?”
“ইউনূসকে নিয়ে বলল এতো লাগে!” কঠিন কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার।
“কথাবার্তা ভেবেচিন্তে বলবে। ঐ লোকের সাথে কাকে জড়াচ্ছ? যা ইচ্ছা একটা বলে দিলেই হলো!”
“অবশ্যই আমি বলব! আমার অধিকার আছে।”
“কীসের অধিকার? কীসের অধিকার আছে তোমার?” মুখ থেকে নিকাব খুলল মেহরিমা। তার কথা বেঁধে যাচ্ছে। “আমাকে নিয়ে যা তা বলার কোনো রাইট তোমার নেই। কে তুমি!”
“তোর হাজবেন্ড!”
মেহরিমার বাম হাত শক্ত করে ধরে বাম হাত পেছনে আটকে দিল শাহরিয়ার। তবে আর শক্তি খরচের প্রয়োজন হলো না। মেহরিমা হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে পড়ল।
তবে সেটুকু ছিল ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা। মুহূর্তেই সুপ্ত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো ঝলসে উঠলো মেহরিমার দুচোখ। তার কন্ঠ উঁচু হলো।
“কীসের হাজবেন্ড? সাতটা বছর কোনো দেখা নেই। সাতটা বছর! আমি ম-রে গেছি নাকি বেঁচে আছি সেই খবর নেওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। কে হাজবেন্ড! আমার কোনো হাজবেন্ড নেই!” মেহরিমার শরীর আটকে রাখতে কষ্ট হলো শাহরিয়ারের। সমগ্র শক্তি দিয়ে সে শাহরিয়ারের বন্ধন থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। শাহরিয়ার ওর দুহাত বাম হাতে আটকে ডান হাতে গাল ধরলো। মেহরিমা মুখ সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। তার জোর নিশ্বাসের শব্দ হচ্ছে।
“তোর কোন হাজবেন্ড নেই?” শীতল কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার। মেহরিমা কিছু বলল না। কেবল মুখ সরিয়ে নেয়ার আরেকটা ব্যর্থ চেষ্টা করলো।
“বল। নেই তোর কোন হাজবেন্ড?”
“না।” মেহেরিমার গলা কেঁপে উঠল।
“তাহলে এই আংটি পরে আছিস কেন?” মেহরিমার ডান হাত চোখের সামনে এনে ধরলো। মেহরিমার মনে হলো ফ্যাকাশে রংটা দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
“বল কেন পরেছিস?”
“আমার দাদা দিয়েছে তাই পরেছি।”
শাহরিয়ার আংটিটা খোলার চেষ্টা করলে মেহরিমার বুক ছ্যাঁত করে উঠলো।
“দাদার উপহার একদিন আমার কাছে থাক।”
“না! আমার আংটি আমি কাউকে দেবো না!” মেহরিমার চেহারায় আংটির প্রতি অনুভূতি দেখে শাহরিয়ারের মনে শীতল বাতাস বয়ে গেলো।
“কেন দিয়েছে তোর দাদা? বিয়ের উপহার হিসেবে দিয়েছে। তুই যে বিবাহিত এটা তোর মাথায় গেঁথে দেয়ার জন্য দিয়েছে। তুই যে আমার এটা যেন কখনও ভুলে না যাস এজন্য দিয়েছে।”
“কীসের বিবাহিত! তোমার কাছে কোনো দাম আছে এই বিয়ের? শরীরের জোর দেখাতে এসেছো সাত বছর পর?” ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল মেহরিমা।
কঠিন মেয়েটার ক্রন্দনে শাহরিয়ার এলোমেলো হয়ে গেলো।
“শরীরের জোর!” আহত কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার। “তোর তাই মনে হয়?”
“তাহলে আর কি মনে হবে? বিয়ে করবে করো। তোমাকে আটকে রেখেছে কে? শুধু শুধু আমার সাথে এসবের মানে কি?” নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো মেহরিমা।
শাহরিয়ার অবাক কণ্ঠে বলল, “কার বিয়ে?”
“নাটক করো না। তোমার বিয়ে।”
“কি আশ্চর্য! আমার বিয়ে আর আমিই জানি না?”
“সারা পাড়ার লোকে জানে তোমার বিয়ে। তোমার বাবা রটিয়েছে বিশাল ঘরে তোমার বিয়ে দেবে। নিশ্চয়ই তোমাকে না জানিয়ে নয়!”
“আমি কিছুই জানি না। বিশ্বাস কর মেহু!”
“জানো কি না জানো তাতে আমার কোনো যায় আসে না। আমাকে ছাড়ো আর আমার আংটি দাও।”
মেহরিমার হাত থেকে আংটি খুলে নিয়েছে শাহরিয়ার। সেটা পকেটে ভরে বলল, “হাজবেন্ড নেই তাহলে আংটি পরবি কেন?”
“তোমাকে এর উত্তর দেব না। আমার আংটি দাও।”
শাহরিয়ার মেহরিমাকে ছেড়ে দিল। এক পা পিছিয়ে বলল, “দেবো না। যার আংটি তার কাছেই থাকবে।”
“এটা আমার।”
“এটা আমার বউয়ের।”
“তোমার বউ কে?”
“তুই?”
“দাও শাহরিয়ার ভাই! আমার আংটি দাও!” মেহরিমার চোখে আবার পানি এলো। তার দীর্ঘ সময়ের অনুভূতির সঙ্গী এই আংটি। এটা সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না।
“যার সাথে বিয়ে হবে তার দেয়া আংটি পরবি। এটার কোনো দরকার নেই।”
মেহরিমার কষ্ট রাগে রূপ নিলো। শাহরিয়ারের গেঞ্জির বুকের কাছের অংশ মুঠোয় নিয়ে বলল, “অসভ্য লোক! বিয়ের মানে বোঝো? বোঝো বিয়ের মানে? শুধু কবুল বললেই হয়ে গেল? কত বছর ধরে বিয়ে হয়েছে তোমার জানো?”
“জানি। তের বছর।” হেসে বলল শাহরিয়ার। মেহরিমার চোখের ভাষা সে বুঝতে পেরেছে। তাই তার রাগ, আক্রোশ সবটাই ভালো লাগছে।
শাহরিয়ারের হাসি দেখে মেহরিমার গা জ্ব-লে গেলো। মুঠো আরো শক্ত করে বলল, “তের বছরের কথা বাদ দাও। সাত বছর? তাও বাদ। গত পাঁচ বছরে আমার একটা খোঁজ নিয়েছ তুমি? ঢাকায় গিয়ে তো লাটসাহেব হয়েছ!”
“এই যে তোর খোঁজ নিতে এসেছি!”
“খবরদার আমার সামনে হাসবে না! তোমার হাসি বিদঘুটে লাগছে। এসেছ ভালো করেছ। যা ইচ্ছা কর। আমার আংটি আমাকে ফেরত দাও।” শাহরিয়ারের পকেটে হাত ঢোকাতে চাইলো মেহরিমা। পারলো না। শাহরিয়ার তাকে আটকে দিলো।
“উহু! একদম না! এটা আমার বউয়ের।”
ধাক্কা দিয়ে শাহরিয়ারকে সরিয়ে দিলো মেহরিমা। এক বারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে সোজা নিজেদের ঘরের তালা খুলে ঢুকে পড়ল। শাহরিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো হাসিমুখে। এই অন্ধকার, কানের কাছে ভনভন করতে থাকা মশা, মেহরিমার রাগ সবটাই তার ভালো লাগছে। মেহরিমা শব্দ করে দরজা বন্ধ করলো। তার দুচোখ ছাপিয়ে অশ্রু নামলো। বিড়বিড় করলো সে, “ডাকাত!” কীভাবে তার আংটি ছিনিয়ে নিলো!
হেলেদুলে ঘরে ঢুকতে যেয়ে রুমিকে দেখলো শাহরিয়ার। সে দরজার সাথে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। মুখে দু ইঞ্চির ফাঁকা। শাহরিয়ার বোনের উপস্থিতির কথা ভুলেই গিয়েছিল। থতমত খেলেও নিজেকে সামলে নিল সে। কাঁধে টোকা দিয়ে বলল, “আছিস না গেছিস?”
“তুমি বিবাহিত?” উঠানে দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখে জিজ্ঞেস করলো রুমি। অথচ শাহরিয়ার তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
“হ্যাঁ।”
“তুমি বিয়ে করেছ!”
“হ্যাঁ।”
“কাকে?”
“মেহুকে।”
“কবে?”
“এই তো তের বছর শেষের পথে।” ভীষণ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার। রুমি নিশ্বাস আটকে যাওয়ার মতো শব্দ করলো।
“হাঅ্!”
“কি রে আছিস?”
রুমি কাত হয়ে পড়ে যেতে গেলে শাহরিয়ার তাকে ধরে ফেললো। তার হাসি পাচ্ছে। ভীষণ হাসি।
~চলমান~
জুঁইয়ের বিনীত প্রার্থনা বোধহয় ঠিক তক্ষুনি কবুল হয় গেলো। মাঝ রাত্তিরে লম্বা একটা মেসেজ এলো ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে।
“খুব বেশি ঝকঝকে হতে হবে না তোমাকে।
খুব বেশি কথা বলতে হবে না।
থাকো, একটা বিনুনির মতো সাধারণ।
একটা সাধারণ দুপুরের মতো।
শিথিল। এলোমেলো।
আমি চাই, বাতিল চিন্তা ভাবনাগুলোকে
তুমি একটু সাজিয়ে তোলো।
অন্ধ যে সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠছে,
পা রেখো না সেই সিঁড়িতে।
এদিককার লোকজন দড়ির মতো পাকিয়ে মরে যায়।
তুমি ডেকে নাও তাদের।”
—ভাস্কর চক্রবর্তী
ই-বুক “কৌমুদী”
https://link.boitoi.com.bd/qvDe
মূল্য: ৩০ টাকা (ঈদ উপলক্ষ্যে ১০% ছাড়ে ২৭ টাকা)
শুধুমাত্র বইটই থেকে

