“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১০.
মেহজাবিন জানালায় এসে চাপা কণ্ঠে শাহরিয়ারকে ডাকলো, “বাড়ির পেছনে যান! আপা ওখানে আছে।”
“থ্যাংকিউ!” বলেই শাহরিয়ার ঝড়ের গতিতে ওদিকে চলে গেলো। মেহজাবিনের কপালে ভাঁজ পড়ল। কেসটা কি? মেহরিমা আর শাহরিয়ারের মাঝে কোনো কেস হবেই বা কেন! সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ এলে মেহরিমাকে সিগন্যাল দেবে।
শাহরিয়ার দেখলো বেগুনি রঙের শাড়ি পরে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে মেহরিমা। পরনে শাড়ি দেখে মুগ্ধতার বদলে একরাশ ক্রোধ এসে জায়গা করে নিলো।
“কাকে খুঁজছিস! এদিকে তাকা। শাড়ি পরেছিস কেন?”
মেহরিমা তাকালো। শাহরিয়ারের এলোমেলো চেহারা দেখে সব কথা মাথায়ই জট পাকিয়ে গেলো। কি বলতে এসেছিল সে?
থমথমে কণ্ঠে বলল, “ইচ্ছে হয়েছে পরেছি।”
“একদম ত্যাড়া কথা বার্তা বলবি না! মেজাজটা এমনিতেই গরম হয়ে আছে।”
“আপনার গরম মেজাজে আপনি ডিম ভেজে খান। আমার সাথে তেজ দেখাতে আসবেন না!” মেহরিমাও কণ্ঠ উঁচু করলো।
শাহরিয়ার ভুরু উঁচু করে বলল, “আরিব্বাস! বিয়ের কথাবার্তা চলছে আর এখনই আমি আপনি হয়ে গেলাম!”
“হ্যাঁ। আমাকেও তুই করে বলবেন না। তুমি বলবেন। আপনি বললে বেশি ভালো হয়।”
“তুইই বলবো। লাইনে একশ বার বলবো। কি করবি তুই?” মেহরিমার হাত ধরলো শাহরিয়ার।
মেহরিমা হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টায় বিরক্ত হলো, “সবসময় গায়ের জোর দেখান কেন? বুঝলাম আপনার শরীরে পালোয়ানের শক্তি। তো যেয়ে কুস্তি করলেই তো পারেন।”
“কুস্তিই তো করে আসলাম। তোর শ্বশুরের সাথে।”
“মানে?”
শাহরিয়ার হাত ছেড়ে দিল। হতাশ কণ্ঠে বলল, “বাবার সাথে তৃতীয় বিশ্ব যু-দ্ধ করে এলাম তোকে নিয়ে। আমাকে থ্রেট দিয়েছে বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। আর এদিকে তুই আরেকজনের সাথে বিয়ের কথাবার্তা পাকা করছিস। মার্ভেলাস!”
মেহরিমার কপালের ভাঁজ মুছে গেলো।
“কি বলেছেন চাচাকে?”
“বললাম আমার বউ আমি বাড়ি নিয়ে যেতে চাই। তের বছর ধরে ফেলে রেখেছি। আর কতো!”
“আমার বউ” শুনে মেহরিমার গাল রাঙা হয়ে এলো। শাহরিয়ার মুগ্ধ চোখে দেখলো পরিণত মেহরিমাকে। হেসে বলল, “কিরে গালে কি ব্লাশন দিয়েছিস নাকি? লাল হয়েছে কেন এত?”
মেহরিমা অন্যদিকে তাকালো। চূড়ান্ত ফাজিল একটা মানুষের পাল্লায় পড়েছে। অথচ সে বুঝতে পারছে তার বুকে রঙিন প্রজাপতি উড়তে শুরু করেছে। শাহরিয়ার তার কথা চাচার কাছে বলেছে! বিশ্বাসই হতে চায় না।
ঝট করে শাহরিয়ারের দিকে তাকালো মেহরিমা। তার চোখ মুখের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে শাহরিয়ার থতমত খেল।
“কি হলো?”
মেহরিমা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “তাহলে আপনার বিয়ে? সেদিন যে আপনার খালার বাড়িতে এঙ্গেজমেন্টের কথা বলেছে চাচা। তার কি হবে?”
শাহরিয়ার এক পা পিছিয়ে গেলো। মেহরিমার চোখ মুখ ভ-য়ান-ক দেখাচ্ছে। তখন তো আজাদের মাথা ফাটেনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মেহরিমার মাথা ফাটবে। শিওর!
“বিবাহিত পুরুষমানুষের আবার কীসের এঙ্গেজমেন্ট? তুই তো নিজে থেকে আমাকে একটা আংটি ফাংটি দিয়ে সিল মেরে দিতে পারতি। খালি হাত দেখে মানুষ শুধু আংটি পরাতে চায়।”
মেহরিমা চেঁচিয়ে উঠলো, “একদম ইয়ার্কি করবে না!”
শাহরিয়ার হাসলো, “এই যে তুমি বলেছিস। এটাতেই থাক। আপনি শুনলে নিজেকে বয়স্ক বয়স্ক লাগে।”
মেহজাবিন দরজার পেছন থেকে মাথা বের করলো, “আপা ভলিউম কমা!”
মেহজাবিনকে উঁকি দিতে দেখে শাহরিয়ার চিন্তিত কণ্ঠে বলল, “রুমি থাকলে ভালো হতো। মেহজাবিনের একা একা পাহারা দিতে কষ্ট হচ্ছে।”
“চুপ!” আবার চিৎকার করলো মেহরিমা। মেহজাবিন বিরক্ত হলো। সবাইকে জানাতে চাচ্ছে নাকি আপা!
শাহরিয়ার বিড়বিড় করে বলল, “চাচা ভাস্তির সব ডায়লগ মিলে যাচ্ছে। ইয়ার্কি করবে না! চুপ! শালা মনে হচ্ছে বিয়ে আমি একা করেছি!”
“বিড়বিড় করছেন কেন? জোরে বলার সাহস নেই?”
“সাহস নিয়ে প্রশ্ন তুলবিই না মেহু। বাবাকে বলে এসেছি। সাহসের হাইট জানিস? তুই কাকে বলেছিস?”
মেহরিমা ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, “কাউকে বলে আহাম্মক হই তাই না? আপনি যে আমাকে মেনে নেবেন তারই তো কোনো গ্যারান্টি ছিল না।”
“এখন আছে?” শাহরিয়ার উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো। মেহরিমা নিশ্বাস ছাড়ল।
“শাহরিয়ার ভাই তুমি কি সিরিয়াস?”
“কি তুমি আপনি করছিস! একটায় থাক তো। একেক সম্বোধনে একেক রকম ফিলিংস হয়। মেয়েদের মতো আমি মিনিটে দশবার মুড পাল্টাতে পারি না।”
মেহরিমার চোয়াল শক্ত হতে দেখে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো শাহরিয়ার।
“আচ্ছা সরি সরি! যা ইচ্ছা তাই বল। তুই বলিস না তাই বলে।”
“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
“অবশ্যই সিরিয়াস। ঢাকা থেকে গাট্টি বোঁচকা বেঁধে এসেছি বউ নিয়ে যাওয়ার জন্য। মোহরানার টাকা জমিয়েছি এতো বছর ধরে। কত কষ্ট হয়েছে জানিস? রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে হেটে চলে গেছি খাবারের দিকে তাকাতে তাকাতে। তবুও খাইনি। তোর মোহরানা দেয়ার জন্য।”
শাহরিয়ারের কষ্টের কথা শুনে মেহরিমার হাসি পেলো। কিন্তু এই মুহূর্তে হাসা যাবে না। পাগল লোকটা আরও পাগলামি করার সুযোগ পাবে।
“অন্যদিকে তাকিয়ে আছিস কেন? প্লিজ মেহু! এসব বিয়ে টিয়ে বাদ দে। চাচা চাচীকে বল।”
“অসম্ভব! আমি বলতে পারব না!”
“তাহলে কে বলবে?”
“কেনো তুমি বলবে! তুমি বিয়ে করোনি!”
“হ্যাঁ আমি তো একা বিয়ে করেছি আর তুমি কিত কিত খেলেছো!”
কোমরে দু হাত দিয়ে দাঁড়ালো শাহরিয়ার।
“এখন তোর সাহস কোথায় গেলো? আমার সাথেই যত চোটপাট!”
“কি আশ্চর্য! আমি কি বলতে পারি আমার বিয়ে হয়ে গেছে!”
“কেনো বলতে পারিস না?”
“তোমার মাথায় কি ঘিলু নেই? একটা মেয়ে এই কথা বলতে পারে?”
“ধুত্তুরি একটা মেয়ে! রাশেদা খালাও এই ডায়লগ দিলো। নারী পুরুষ সমান অধিকার। আমি আমার বাপের কাছে হু-মকি খেয়েছি তুইও খাবি।”
“ঐসব সমান অধিকার ফধিকারে আমি বিশ্বাস করি না। হু-মকি ধা-মকি যা খাওয়ার তুমি খাবা। দাদা আমাকে তোমার হাতে দিয়ে গেছে না?”
“প্যাঁচটা তো এখানেই।”
“কিসের প্যাঁচ! আমাকে এখনই তোমার প্যাঁচ মনে হয়!” মেহরিমা চোখ বড় করে বলল।
“অবশেষে নিজের জাতির আসল রূপ দেখালি! এসব শোনার জন্য আমি দৌড়ায় বেড়াচ্ছি তাই না?”
মেহরিমা চুপ করলো। শাহরিয়ারকে আসলেই ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
“বাবার কোনো ভরসা নেই। উনি মেয়ে খুঁজে এনেছে আমার গলায় ঝোলানোর জন্য। মাকে একটু গলাতে হবে। তার আগে এই হনুমানকে তোর গলা থেকে নামা।”
“কাকে?”
“ইউনূসকে। কেন কয়টা গলায় ঝুলিয়েছিস?”
“ফালতু কথা বলে মেজাজ খারাপ করবে না। হনুমান আবার কি?”
“এই ইউনূসকে নিয়ে একটা কথা বলাই যায় না। তুই তক্ষণি ছ্যাঁত করে উঠিস। ওরে এই সিন থেকে সরা তো। আমার জাস্ট সহ্য হচ্ছে না।”
“কিসের সিন?”
“সিনেমা চলছে দেখছিস না! মনে হচ্ছে পালিয়ে বিয়ে করে এখন ঝামেলায় পড়েছি। সারাজীবন লবণ পানি মার্কা জীবন কাটায় এসে এই পঁচিশ বছরে এসে নাকানি চুবানি খাচ্ছি। শুধু এই আফজাল বিশ্বাসের জন্য।”
“আপা! তোদের শেষ হবে কখন?”
“শেষ! শালী সাহেবা শেষ!” হাত উঁচিয়ে বলল শাহরিয়ার। “কিছু তো শুরুই করতে পারলাম না ছাতা!” বিড়বিড় করে বলল শাহরিয়ার। মেহজাবিন চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। লোকটার মাথা আসলেই খারাপ হয়েছে। তাকে শালী ডাকছে কোন দুঃখে! ঝট করে আবার তাকালো মেহজাবিন। এটাই কি সেই কেস!
শাহরিয়ার মেহেরিমার কাছে এগিয়ে এলো। মেহরিমার হাত আলতো করে ধরে বলল, “ঝগড়া ঝাটি বাদ মেহু। তুই কি সত্যিই ইউনূসকে বিয়ে করতে চাস? আমি চলে যাবো?”
মেহরিমা ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। গর্দভ লোক! ইউনূসকে বিয়ে করবে বলে লুকিয়ে তার সাথে দেখা করতে এসেছে তাই না! কিছু বলল না সে।
“বল মেহু! তুই রাজি না থাকলে আমি আজকেই চলে যাবো। মায়ের সাথে তোকে দেখা করাতে চেয়েছিলাম। তার ছেলের বউ হিসেবে। সেসব বাদ দেবো। বল প্লিজ!”
“আমার আংটি ফেরত দাও।”
শাহরিয়ার ভুরু কুঁচকে নিলো, “বলেছি না ওটা আমার বউয়ের?”
“তো আমি কে?”
হেসে ফেললো শাহরিয়ার। এক পলক দরজার দিকে তাকিয়ে মেহজাবিনের সন্দেহী মুখটা দেখে ঝট করে মেহরিমাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। ঝরঝরে কণ্ঠে বলল, “আমার বউ!”
●● ●● ●●
মেহরিমার মুখে চাপা আনন্দ কাজ করছে। মেহজাবিন সেটা বুঝতে পারছে। তার মাথা ঘুরছে বনবন করে। শাহরিয়ারের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল এমন তো না। তাহলে হঠাৎ করেই এই তিনদিনে কি হয়ে গেলো!
সে সুযোগই পেলো না মেহরিমাকে জিজ্ঞেস করবে ঐ পাগল লোকটা কেন তাকে জড়িয়ে ধরলো। নিজের বোনকে চেনে মেহজাবিন। কিছু একটা প্যাঁচ তো আছেই।
শেলীর হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো মেহরিমা। তার মুখে তখন বিশ্ব জয়ের হাসি। সরকারি চাকরিজীবী ছেলে তার জামাই হতে যাচ্ছে। আজাদ বিশ্বাসের জন্য আলাদা করে কার্ড ছাপিয়ে দিয়ে আসবে শেলী। দাওয়াত দেয়ার জন্য অবশ্যই না। জানানোর জন্য। তার মেয়েরও বড় ঘরেই বিয়ে হচ্ছে।
সুখ স্বপ্নের মাঝে মেয়ের টানাটানিতে বিরক্ত হলেন তিনি।
“এমন করছিস কেন? এক ঘর মানুষের সামনে কেমন দেখা যায়? ইউনূসের বোনটা কিভাবে তাকিয়ে ছিল দেখেছিস?”
মেহরিমা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো। এমন কিছু একটা বলতে হবে যেনো এই সবকিছুতে এক্ষুনি ফুলস্টপ বসে যায়।
“মা।”
“তাড়াতাড়ি বল তো। ওরা আজকেই বিয়ের ডেট ঠিক করে যেতে চায়।”
মেহরিমা ঢোক গিললো। ভাইভা বোর্ডে বসেও তো এত ভয় লাগে না। হার্ট তো বিট করছে না মনে হচ্ছে বুকের উপরে বসে ড্রাম বাজাচ্ছে কেউ।
“ওদেরকে চলে যেতে বলো।
“মানে!”
শেলীর মাথায় যেন বাজ পড়ল। মেয়ের মতিগতি তার কখনোই ভালো লাগতো না। বিয়ের নামই শুনতে পারে না। তার ধারণা ছিল কিছু একটা তলে তলে এই মেয়ে করেছে। এজন্যই তাড়াতাড়ি করে বিয়েটা দিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন।
মেহরিমা হড়বড় করে বলল, “একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি।”
~চলমান~

