অচিনরেখা” বিনতে ফিরোজ ১৩.

0
2

“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৩.

“টেবিলের উপরে যে খাম রেখেছি দেখেছিস?”
মেহরিমা বিরক্ত ভঙ্গিতে আয়নায় তাকালো। থ্রি পিসের কাঁধের কাছে সুতোর কাজ। সেখানে চিরুনির খোঁচা লেগে সুতো উঠে যাচ্ছে। তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে।
“কীসের খাম?”
শাহরিয়ার বিছানা থেকে উঠে খামটা নিলো। মেহরিমার সামনে রাখলে সে বলল, “কি এটা?”
“খুলে দেখ।”
“ধুর! ভাল্লাগছে না। জামাটাই নষ্ট হয়ে গেলো।”
শাহরিয়ার চিরুনি টেনে নিয়ে বলল, “কার রাগ এখানে দেখাচ্ছিস? ধীরে সুস্থে কাজ করতে পারিস না?” মেহরিমার চুলের গোছা হাতে নিলো শাহরিয়ার। আনকোরা অনুভূতিগুলো বেখাপ্পা পরিবেশের চাপে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তার পুরনো বিয়ে আজ নাম পেয়েছে। বুকে পুষে রাখা মেয়েটা সদ্য বিবাহিতা রূপে তার সামনে বসে আছে। অথচ শাহরিয়ারের মনে নির্ভার আনন্দ নেই। আশঙ্কার একটা পোকা মাথায় ঢুকে বনবন করে ঘুরছে।
বাদামি রঙের চিকন খামের মুখ খোলাই ছিল। মেহরিমা ভেতরের পাতলা কাগজটা বের করলো। অবাক হয়ে বলল, “ব্ল্যাঙ্ক চেক!”
শাহরিয়ার আয়নায় মেহরিমার মুখের দিকে তাকালো। এই মুখটা তার কাছে নতুন। নতুন সব ভাব ভঙ্গি, অনুভূতি।
“এটা দিয়ে আমি কি করবো?”
“দেন মোহর কি মাফ করে দিচ্ছিস?”
মেহরিমা ঘাড় ঘোরালো, “আমাদের বিয়ের মোহর কতো ছিল?”
“তোর হাতের আংটিটাই।”
“তাহলে আবার চেক কেনো?”
“তখন আমি বাচ্চা ছিলাম তাই দাদা ওটা আমার পক্ষ থেকে দিয়েছে। এখন আমি ইনকাম করছি আলহামদুলিল্লাহ্। তোকে কিছু দেয়াটা আমার কর্তব্য।”
“তাই! যা ইচ্ছা লিখব?” ভুরু নাচিয়ে বলল মেহরিমা।
“চুল কি বেনি করবো?”
“করতে পারো?”
“পারি।”
মেহরিমা সরু চোখ তাকালো, “কে শিখিয়েছে?”
“রুমি।” হতাশ নিশ্বাস ছাড়ল শাহরিয়ার। “অবশ্য ও শেখায়নি। একবার জ্বরে এতো কাবু হয়ে গেলো চুলের যত্ন নিতে পারতো না। মা বলল কেটে ফেলতে। তখন আমিই ওইটুকুর দায়িত্ব নিলাম।” বলতে বলতে চুলগুলো তিনভাগ করে ফেললো শাহরিয়ার।
“বললে না? যা ইচ্ছা তাই লিখব?”
“আমার সামর্থ্য আপাতত আশি নব্বই পর্যন্ত। এর বেশি লিখলেও লাভ হবে না।”
মেহরিমা গুরুতর ভঙ্গিতে বলল, “কতো হলে তুমি সহজে দিতে পারবে? কষ্ট হবে না?”
শাহরিয়ার এক পলক আয়নায় তাকালো। সেখানে এক জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কষ্ট খোঁজার আশায়।
সে মজা করে বলল, “না দিলেই তো ভালো হয়।”
“তো আমি কি দিতে বলেছি তোমাকে? নিজে বলে নিজেই আবার এমন করছ মনে হচ্ছে আমি তোমাকে চেপে ধরেছি।”
“আরে মজা করলাম! এটুকুতেই এমন করিস কেন! তাহলে বাবার কথা শুনবি কিভাবে?”
মেহরিমা শান্ত হয়ে গেলো, “চাচা আমাকে অনেক অপমান করবে?”
“কি জানি! আমাকেই যেভাবে বলল..। তবে তুই টেনশন করিস না। আমি চেষ্টা করবো তোকে যেনো বাবার কটু কথার মুখোমুখি না হতে হয়।” শাহরিয়ার চিন্তিত ভঙ্গিতে বেনি করলো।
মেহরিমার মনে হলো এটুকু কথাতেই ঝড়ের পরের শীতল বাতাসটুকু তাকে ছুঁয়ে গেলো। মুছে নিয়ে গেলো বুকের সকল আশঙ্কা।
“আচ্ছা তোমার যা ইচ্ছা একটা লিখে দাও। এটা নিয়ে এমন আলাপ আলোচনার কিছু হয়নি।” চেক এগিয়ে মেহরিমা বলল।
“তুই লেখ মেহু। এই কাজটা আগে করা দরকার ছিল।”
মেহরিমা আর কিছু বলল না। মুখ নামিয়ে লিখলো। শাহরিয়ার উকি দিয়ে দেখলো ষাট হাজার লিখছে।
“বিশ হাজার টাকা আবার উড়িয়ে ফেলো না।”
“যথাজ্ঞা! আমি কালকে যাওয়ার আগে টাকা তুলে দিয়ে যাব।”
“কালকেই চলে যাবে তুমি?” আহত ভঙ্গিতে বলল মেহরিমা। শাহরিয়ার পেছন থেকে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। আয়নায় তাকালো। সোজা মেহরিমার চোখের দিকে। বলল, “যাবো না?”
মেহরিমা চোখ নামালো।
শাহরিয়ার শীতল কণ্ঠে বলল, “যাই মেহু। তোর জন্য ঘর বানাতে হবে না?”
“আমি চাচা চাচীর সাথেই থাকতে চাই।”
“চেষ্টা করবো। তবে সম্মান নিয়ে যেখানে থাকা যায় সেখানেই থাকবো। দূরে থেকে যদি সম্পর্ক ভালো থাকে তাহলে সেটাই করতে হবে। তুই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকিস।”
মেহরিমার চোখ ভরে এলো। মনে হলো তার জন্যই শাহরিয়ার ঘর ছাড়া হচ্ছে। শাহরিয়ার সেটা খেয়াল না করেই বলল, “আমার মনে হচ্ছে যা হবে ভালোই হবে। বাবার বোঝা দরকার সে কেমন আচরণ করছে নিজের ভাইয়ের সাথে। দুজনেরই বোঝা দরকার। ওঠ। যাই।”
দরজার কাছ থেকে শাহরিয়ারের হাত টেনে ধরলো মেহরিমা। শাহরিয়ার দেখলো বাম হাতের কব্জিতে শোভা পাচ্ছে নতুন একটা ঘড়ি।
“কবে কিনলি?”
“অনেক আগেই।”
“যদি না আসতাম? ইউনূসকে দিতি?”
“সবকিছুতে তোমার ঐ লোককে টানতে হয় কেন? পানিতে ফেলে দিতাম। গাড়ির নিচে চাপা দিতাম।”
শাহরিয়ার চোখে হাসলো, “সুন্দর হয়েছে।”

●● ●● ●●

সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে গেলো মেহরিমা। মাগরিবের নামাজে হাজার ডেকেও তাকে ওঠানো গেলো না। এশার নামাজের সময় শেলী এলেন। মেহরিমার পিঠে মোটামুটি ধরনের একটা ধাক্কা দিয়ে বললেন, “এই তোকে কি শয়তানে ধরেছে? আযান দিচ্ছে, জাবিন ডাকছে তুই শুনতে পারছিস না?”
ধাক্কায়ই হোক অথবা চিৎকারে মেহরিমা উঠে পড়ল। ঘুম ঘুম চোখে দেখলো মায়ের রাগান্বিত চেহারা।
“কি হয়েছে?”
“কি হয়েছে মানে! মাগরিব পড়িস নি। পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছিস। ছি ছি! নামাজ পড়বি না তুই?”
“না।” স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল মেহরিমা তার চোখ থেকে তখনও ঘুম দুর হয়নি।
শেলীর কপালে ভাঁজ পড়ল, “না মানে?”
“না মানে না। নামাজ নেই।”
“তাহলে বিকালে আমাকে বললি যে?”
“কি বলেছি?”
“নামাজ পড়েছিস।”
“কি আশ্চর্য! বিকেলে পড়েছি তো বলব না?”
“তাহলে বমি করলি কেনো?” শেলীর দিশেহারা লাগছে।
“তুমি উদ্ভট প্রশ্ন করছ মা! পেটের সমস্যায় মানুষ বমি করে না?” মিথ্যেটা সরাসরি স্বীকার করলো না মেহরিমা।
শেলী দাঁতে দাঁত চেপে মেহরিমার পিঠে মা’রলেন। শব্দ হওয়ার আগেই মেহরিমা চাপা কণ্ঠে চিৎকার করলো, “মা! কি করেছি আমি?”
“আমাকে ঐরকম চিন্তায় ফেললি কেনো?”
“কি চিন্তা করেছ তুমি?” মেহরিমা ভান করলো যেন কিছুই জানে না।
“আমি ভাবলাম তুই আবার..” শেষ করতে পারলেন না শেলী। তার মুখে কথা আটকে গেলো।
মেহরিমার হাসি পেলো।
“তুমি কি ভেবে কি যে বলো মা! শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে আজকে আমার সাত বছর পর দেখা হলো।”
শেলী বিব্রত ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছিলেন। মেহরিমা পেছন থেকে বলল, “অবশ্য তোমার এমন মনে না হলে আজকে আর রেজিস্ট্রি করতে হতো না।” বলেই মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল। শেলী দ্বিধায় পড়ে গেলেন। মেহরিমা কি ইচ্ছে করে এমন করেছে? নাকি তিনিই বেশি ভেবেছেন?

●● ●● ●●

পরদিন সকাল এগারোটায় টিকিট কাটলো শাহরিয়ার। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মেহরিমার হাতে দিয়ে গেলো। আরমান বিশ্বাসের সামনে। ভদ্রলোক মনে মনে তুষ্ট হলেন।
যাওয়ার আগে নির্জন আলাপের স্মৃতি গড়তে চাইলো শাহরিয়ার। মেহরিমা বলল, “চাচা চলে গেছে?”
“হু কালকেই।”
“তোমার কি হয়েছে?”
“কেন? কি হবে?”
“মুখটা কেমন গম্ভীর গম্ভীর লাগছে। মন খারাপ?”
“না।”
“আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছ কেন? মাথায় হাত দিলে আমার ঘুম আসে।”
শাহরিয়ার হাত সরিয়ে নিলো। কখন যে হাত তার অধিকার দেখাতে শুরু করেছে সে বুঝতেই পারেনি।
“কি হয়েছে? বলবে না?” নরম কণ্ঠে বলল মেহরিমা।
শাহরিয়ার তাকালো। মেহরিমার পান পাতার মতো মুখটায়। যতবারই মনে হচ্ছে মেয়েটা তার নিছক বন্ধু নয়, বাগদত্তা নয়, তার অর্ধাঙ্গিনী ততবারই আবেগের ঢেউ আছড়ে পড়তে চাইছে। মন চাইছে বুক পকেটে ভরে তাকে নিয়ে যেতে। এই শঙ্কার সাগরে মেয়েটাকে একলা ভাসিয়ে সে কিভাবে থাকবে?
“তুমি মনে হয় অনেক চিন্তা করছো। আল্লাহ ভরসা। তিনিই তো তের বছর পর আমাদের আবার মিলিয়ে দিলেন। বাকিটুকুও তিনিই দেখবেন।”
“হু।”
“আমাকে কিছু বলে যাবে না?” মেহরিমার গলা কাঁপলো।
শাহরিয়ার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তুই তো বোরখা পরিস বাইরে?”
“হু।”
“ইউনূসের সামনেও পরবি। বাইরের কোনো ছেলের সামনে যাবি না। ইউনূসের সামনে আরো আগে না।”
“তুমি ওকে নিয়ে এতো ভাবছো কেন? আমার বিয়ে হয়ে গেছে শুনলে আর কিছু বলবে নাকি!”
শাহরিয়ার উত্তর দিতে চাইলো। বলতে চাইলো ইউনূসের চোখের ভাষা মেহরিমা না বুঝলেও তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। বলল না। মেহরিমা না আবার ভয় পায়।
“হোক। তবুও।”
“আচ্ছা। আর?”
“নিজের যত্ন নিবি।”
“না নিলে?”
“আমার সবটুকু তোর কাছে রেখে যাচ্ছি মেহু। আমাকে সহি সালামতে ফিরিয়ে দিবি না?”
মেহরিমা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। অথচ তার কান্নার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। অশ্রুরা কখন মিছিল শুরু করলো সে বুঝতেই পারেনি।
“কাঁদিস না মেহু। যাওয়ার সময় তোর এই মুখটা দেখে যেতে ভালো লাগবে? দেখি আমার পাওনা দে।”
মেহরিমা অশ্রু চোখেই জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকালো। তবে শাহরিয়ার উত্তর দিলো অন্যভাবে।
সাড়ে দশটায় বিশ্বাস বাড়ির আঙিনা থেকে শাহরিয়ার বিদায় নিলো। মেহরিমা দেখলো ধীরে ধীরে শাহরিয়ারের ছায়াটুকুও মুছে গেলো। কেবল রইলো সেই আংটিটা।

~চলমান~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here