অচিনরেখা” বিনতে ফিরোজ ১২.

0
2

“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১২.

“আমি পড়াশোনা শেষ করেছি চাচা। আল্লাহ চাইলে দুই তিন মাসের মাঝেই চাকরিতে ঢুকে পড়বো।”
“কিসের চাকরি?”
“আমি যেই ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি ওখানেই। লেকচারার পদে।”
আরমানের মুখের ভাঁজ কঠিন হয়ে এলো। শাহরিয়ার তো ভালো চাকরি করে! এক পলক স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন তিনি। শেলীর মুখেও বিস্ময়। সরকারি চাকরিজীবী জামাই হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় মনে একটা কষ্ট ছিল। তার বদলে তো তিনি এতটা আশা করেননি।
মেহরিমা অবাক হয়ে শাহরিয়ারের দিকে তাকালো। তার রেজাল্ট কখনোই তেমন একটা ভালো ছিল না। শাহরিয়ারের এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সময় সে খোঁজ নিয়েছে। জিপিএ ফাইভ পেলেও আহামরি ধরনের রেজাল্ট করেনি। সেই ছেলে লেকচারার হয়ে গেলো!
“চাকরিই তো সব না শাহরিয়ার। আমার মেয়েকে বিয়ে করে তুমি পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবে এটা আমি চাই না। একটা ভরা সংসারেই আমি মেহুকে পাঠাতে চাই।”
“বাবা জেদ ধরে আছে চাচা। কদিন পরই ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্।” শাহরিয়ারের মনে ভয়, সে যদি এখন একটা সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে আজাদ বিশ্বাস তাকে চাপে ফেলতে পারে। সে কোনো ধরনের রিস্ক নিতে চায় না।
“তোমার বাবাকে আমি তোমার চেয়ে ভালো চিনি। সে এই অবস্থায় কখনও বিয়েটা মেনে নেবে না।”
শাহরিয়ার নিজেও এটা জানে।
“দুজনেই বাস্তবিকভাবে চিন্তা করো। পরিবার যদি মুখ দেখাদেখি না করে তাহলে তোমরাও শান্তিতে থাকতে পারবে না। তার চেয়ে এই চিন্তা বাদ দাও।” শেলী চমকে আরমানের দিকে তাকালো। কি বলছে এসব!
মেহরিমার মুখে মেঘ ঘনালো। শাহরিয়ারের দিকে তাকালো একটু আলোর আশায়। শাহরিয়ার নিজেও তখন চিন্তায় মগ্ন। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো এই বোধহয় সব শেষ।
শাহরিয়ার গলা খাঁকারি দিলো, “আমি বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করবো। তার আগে যদি..”
“তার আগে?”
আরমানের দিকে তাকিয়ে শাহরিয়ার বলল, “আপনাদের সামনে আমি আমাদের বিয়েটা রেজিস্ট্রার করে নিতে চাই। এই কাজটা করলে বাবা আমাকে বেশি চাপ দিতে পারবে না। দেরি করে হলেও মেনে নেবে।”
আতিয়া বললেন, “আরমান তুমি আমার পক্ষ থেকে নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। তোমার মেয়েকে আমার সংসারে জায়গা দিতে যতোটা করা সম্ভব আমি চেষ্টা করবো। শুধু তোমার ভাই একটু নরম হলেই…”
“কিন্তু এভাবে বিয়ে দিলে আশেপাশের মানুষ কি বলবে? আমার মেয়েকে উল্টো দোষারোপ করবে। তাছাড়া বড় ভাই আমাদের আর্থিক অবস্থা নিয়েও মানুষের কাছে বাঁকা কথা বলে। কিছু মনে করবেন না ভাবি। যাদের কাছে ভাই বলে তারাই আবার আমাদের কাছে এসে বলে যায়। মানুষ তো তখন বলবে লোভে পড়ে আমরা মেয়েকে গছিয়ে দিয়েছি।”
আতিয়া হতাশ নিশ্বাস ছাড়লেন। স্বামীর এই অভ্যাসের কথা তিনি জানেন। অনেক বলেও বোঝাতে পারেননি। হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তার জের যে ছেলের উপর আজকে এভাবে পড়বে তিনি বুঝতে পারেননি।
“কি আর বলব শেলী? নিজের স্বামী কিছু বলতেও তো পারি না। তবে আমি একটা প্রস্তাব রাখতে পারি।”
“বলুন ভাবি।”
“আপাতত রেজিস্ট্রারটা করে ফেলা যাক। মেহু কয়েকদিন এখানেই থাকুক। আশপাশে মিষ্টি দিয়ে বলে আসবে বউ ভাত এখনও বাকি। আর আমরাও চেষ্টা করবো শাহরিয়ারের বাবাকে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজি করানোর। তারপর এখানেই অনুষ্ঠান করে ফেলবো।”
শেলী রাজি হলেও আরমান প্রস্তাবটা পছন্দ করলেন না, “ভাই কবে মানবে আর আমার মেয়ের ঘর কবে হবে? এই আশায় আমি মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রাখবো? মানুষ তখন ছি ছি করবে ভাবি।”
শাহরিয়ার চিন্তায় পড়ে গেলো। রেজিস্ট্রার না করে সে ভরসা পাচ্ছে না।
“চাচা আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি। দুই মাসের মাথায় ইনশাআল্লাহ্ যখন আমি জয়েন করবো তখনই অনুষ্ঠান করে মেহুকে নিয়ে যাবো। বাবা আসুক বা না আসুক। যদি এখন রেজিস্ট্রার করা যায় তাহলে বাবাকে মানাতে সহজ হবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবেন চাকরি কনফার্ম হলে নিয়ে যাবে।” শাহরিয়ার উঠে যেয়ে আরমানের হাত ধরলো। আরমানকে নিমরাজি বলে মনে হলো।
আতিয়া বললেন, “তোমার ভাইকে চেনো আরমান। নয়তো আমি আমার সাথেই মেহুকে নিয়ে যেতাম।”
সকলে উপর্যুপরি অনুরোধে আরমান দ্বিধায় পড়ে গেলেন। শেলী তাকে এক কোণে টেনে নিয়ে বললেন, “রেজিস্ট্রার করে ফেলুন। এক্ষুনি।”
“কেন?”
“এখন বলতে পারছি না। পরে বলব।” শেলীর মুখের শঙ্কা দেখে আরমান টলে গেলেন। সেই মেঘমেদুর সন্ধ্যায় বর্ষা নামলো। ঝুম বর্ষায় আঁধার হয়ে এলো জগৎ। উঠানের বিশাল জাম গাছটা আফজাল বিশ্বাসের চালা ঘরকে আগলে রাখলো বৈশাখের বজ্র থেকে। শাহরিয়ার শীতল কণ্ঠে বলল, “আমার হয়েই গেলি মেহু।”
মেহরিমা জানালার ধারে বসে ছিল। বৃষ্টির ছাট এসে বিছানার চাদর ভিজিয়ে দিচ্ছে। তার চোখ ভিজে আসতে চাইছে। দমকা হাওয়ার মতো করেই শাহরিয়ার এলো। সকলকে জানিয়ে মেহরিমার নামটা তার দখলে নিয়ে নিলো।
শাহরিয়ার বিছানার বিপরীতে চেয়ারে বসে ছিল। অপলক দেখছিল মেহরিমাকে। হঠাৎ করেই তার মুগ্ধ দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়ে এলো মেহরিমার পরনের বেগুনি শাড়িটা নজরে পড়তেই।
হাতে টান পড়তেই চমকে গেলো মেহরিমা। শাহরিয়ার তাকে টেনে ওঠালো।
“কি হয়েছে?” অবাক হয়ে বলল মেহরিমা।
বৃষ্টির আবহে তৈরি হওয়া রোমাঞ্চকর আবহাওয়ার সবটা এক নিমেষে গুড়িয়ে দিয়ে শাহরিয়ার বলল, “আমার কাছে তোর দুটো থাপ্পড় পাওনা আছে। দুই গালে দুটো দিয়ে লাল করে ফেলতে হবে।” শাহরিয়ার শার্টের হাতা গুটিয়ে নিল।
মেহরিমা ভয়ে এক পা পিছিয়ে এলো। শাহরিয়ারের মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। সে মজা করছে না।
“কিসের থাপ্পড়?”
শাহরিয়ার একবার দরজার দিকে তাকালো। ছিটকিনি দেয়া নেই। চট করে ছিটকিনি দিয়ে আবার মেহরিমার হাত ধরলো। আগের চেয়ে শক্ত করে।
“কোন সাহসে তুই সেজেগুজে ইউনূসের সামনে গিয়েছিস? তুই যে আমার বউ সেটা ভুলে গিয়েছিলি?”
“ন..না ভুলবো কেন?” শাহরিয়ারকে দেখে মেহরিমার ভয় হলো।
“কোন সাহসে তুই ওর সামনে গিয়েছিস? তাও আবার পাত্রী বেশে। ওকে তোর রুমে ঢোকার একসেস কে দিয়েছে?”
“মা।”
“আমি তোর বিয়ে করা বর। আমাকে ঢুকতেই তোর বাপ মা-র হাতে পায়ে ধরতে হলো আর ঐ শালা কেউ না হয়েই ঢুকে পড়ল?”
মেহরিমা কিছু বলল না। শাহরিয়ার তার হাত ঝাঁকি দিলো। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বল ওর সামনে গিয়েছিস কেন? একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে থাকা অবস্থায় আবার বিয়ে করতে যাচ্ছিলি। কে দিয়েছে তোকে এই পারমিশন?”
“ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।” তড়িঘড়ি করে বলল মেহরিমা।
“আর হবে না মানে? আরো করার চিন্তা ছিল তোর?”
মেহরিমা জোরে মাথা নাড়ালো, “না। একদম না।”
হঠাৎ বজ্রপাতে চমকে গেলো মেহরিমা। শাহরিয়ারের দিকে এক পা এগিয়ে এলো।
“মেহু তুই খুব বোকামির একটা কাজ করেছিস। ইউনূস এতো সহজেই তোর পিছু ছাড়বে? ছাড়লে ওর জন্য আমি দোয়া করে দেবো। কিন্তু বিয়েটা তো তুই মানতি তাহলে এই ব্লান্ডারটা করলি কিভাবে?”
মেহরিমা কি ভেবে চট করে শাহরিয়ারকে জড়িয়ে ধরলো।
“একদম সরি! খুব ভুল হয়ে গেছে।”
শাহরিয়ারের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। ঢোক গিলে বলল, “এই জিনিসটা কোত্থেকে শিখেছিস?”
“কোন জিনিস?”
“এই যে, বরকে ঠান্ডা করার উপায়।”
মেহরিমা হেসে ফেললো, “কোথাও না। তোমার চেহারা তো ফুলে বেলুন হয়ে যাচ্ছিল। তাই ঝাপটে ধরলাম যেন ফেটে না যাও।”
“খুব উপকার করেছিস।”
“আমাকে আর তুই করে বলবে না।”
“কেন?”
“বউকে কেউ তুই করে বলে? কেমন গালি গালি শুনতে লাগে।”
“আমি তো গালি দিয়ে বলি না।” মেহরিমার কাঁধে হাত রাখলো শাহরিয়ার।
“তাও বলবে না। কি খুঁজছো ওখানে?”
“ঢাকায় যাই তারপর তুমির প্র্যাকটিস শুরু করবো। এখন তুই থাক।”
“আরে আঁচল তো উল্টা পাল্টা করে ফেললে। কি খুঁজছো?”
“সেফটিপিন।”
“কেন?”
“এই শাড়ি খোল। আর কক্ষনো যেন এটা পরতে না দেখি।”
“আচ্ছা আচ্ছা পরব না। একটু পরেই খুলছি।”
“না এক্ষুনি!” বিকট আওয়াজে বাজ পড়ল। সাথে সাথেই কারেন্ট চলে গেলো। তমসায় আবৃত হলো পুরো ঘর। কেবল থেকে থেকে জানালা দিয়ে ভেসে এলো আলোর ঝলকানি।
মেহরিমা ফিসফিস করে বলল, “জানালাটা বন্ধ করা দরকার।”
“কেন?”
“বৃষ্টির পানিতে সব ভেসে গেলো।”
“যাক।”
ঝড় যখন থামলো তখন প্রকৃত ক্লান্ত হয়েছে। মৃদু বাতাস বইছে তার ক্লান্তির নিশ্বাস স্বরূপ। সেই আলো আঁধারির মাঝে শাহরিয়ার মেহরিমার হাতে আংটি পরিয়ে দিলো। মেহরিমা দেখলো আফজাল বিশ্বাসের দেয়া সেই আংটিটাই। শাহরিয়ার কি এটায় কিছু করেছে? সোনার রং ফুটে উঠেছে। কি দারুন চকচক করছে!

~চলমান~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here