অচিনরেখা” বিনতে ফিরোজ ১৪.

0
2

“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৪.

বাড়ির অবস্থা থমথমে। নিশ্বাস নিলেও মনে হচ্ছে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। শাহরিয়ার জানে কেন এই অবস্থা। সে তো ভেবেছিল বাড়িতে ঢুকতেই পারবে না। আজাদ বিশ্বাস গেট থেকেই বিদায় করে দেবেন। এই আশঙ্কায় এক বন্ধুর সাথে কথাও বলে রেখেছে। তার মেসে কয়েকদিন থাকার জন্য
আজাদ বিশ্বাস তেমন কিছুই করেননি। এসে থেকে শাহরিয়ারের সাথে দেখাও করেননি। শাহরিয়ার বুঝতে পারছে এসব ঝড়ের পূর্বাভাস।
রুমি এসে ফিসফিস করে বলল, “ভাইয়া অবস্থা তো জটিল।”
“কেন?”
“বাবা টাইট হয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে কনস্টিপেশন হয়েছে।”
“খিক খিক করে হাসিস না তো! এমনিতেই মন মেজাজ ভালো নেই।”
“তা কি আর আমি জানি না? বিয়ে টিয়ে করে বউ রেখে এসেছো। আহারে বেচারা! চু চু চু!”
“একদম মজা করবি না!” শাহরিয়ার রুমির দিকে তেড়ে গেলো।
রুমি বলল, “মজা করছি না। ভাইয়া বাসা আশপাশেই নিও। বেশি দূরে যেও না। আমি যেন রাত বারোটায়ও চাইলে যেতে পারি। বুঝেছ?”
শাহরিয়ারের উবে যাওয়া চিন্তারা আবার ফিরে এলো। আলাদা বাড়িতে সংসার শুরু করার কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না। এভাবে তো কখনোই না।

দুপুরে দেখা গেলো আতিয়ার ফোলা চোখমুখ। শাহরিয়ার জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে তোমার?”
আতিয়া নাক টানলেন।
“এতো বছর সংসার করার ফল পাচ্ছি। কি আর হবে?”
শাহরিয়ারের নিজেকে অপরাধী মনে হলো।
আতিয়া বললেন, “নিজেকে দোষ দিস না। এমনই একটা মানুষকে বিয়ে করেছি যে নিজেকে ছাড়া সারা দুনিয়ার সবাইকে ভুল মনে করে। তোকে কিছু বললে আবার নিজের জায়গা থেকে টলে যাস না। লোকটার বোঝা দরকার সে সবসময় ঠিক নাও হতে পারে।”
শঙ্কার মাঝেও মায়ের কথায় ভরসা পেলো শাহরিয়ার।
খেতে বসলে আজাদ বিশ্বাসের সাথে দেখা হলো। তিনি কঠিন কণ্ঠে বললেন, “তুমি এখানে কি করছ?”
শাহরিয়ার উত্তর দিলো না।
আজাদ বিশ্বাস চিৎকার করলেন, “তোমাকে বলেছি না আমার বাড়িতে ঢুকতে পারবে না? বলেছি না!”
রুমি কেঁপে উঠলো। আতিয়া কঠিন মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। শাহরিয়ারের লজ্জা লাগলো মা, বোনের সামনে এমনভাবে অপমানিত হওয়ায়।
সে ধীর কণ্ঠে বলল, “বাবা আমরা ঠান্ডা মাথায় আলোচন করতে পারি।”
“বেয়াদব! চূড়ান্ত অসভ্য হয়েছ তুমি। কি মনে কর নিজেকে? একটা চাকরি পেয়ে কি দুনিয়ার সব ক্ষমতা পেয়ে গেছো? এখন আর আমার কোনো দাম নেই!”
“আমি একবারও এমন কিছু বলেছি বাবা?”
“খবরদার আমাকে বাবা বলবে না! বলতে হবে কেন? আমার চোখ নেই? আমি কি অন্ধ হয়ে গেছি! বারবার নিষেধ করার পরও তুমি আরমানের মেয়েকে বিয়ে করেছ!”
“বিয়েটা আগেই হয়েছে।” সংশোধনের সুরে বলল শাহরিয়ার।
আজাদ বিশ্বাস টেবিলে চাপড় দিলেন, “একদম আমাকে ঠিক ভুল শেখাতে আসবে না। এসব ওদের কারসাজি। তোমার মতো ইডিয়েটকে ফাঁসানোর জন্য যথেষ্ট। ঐ মেয়েকে নিয়ে সংসার করার ইচ্ছে থাকলে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। আর এখানে থাকতে হলে ওকে ডিভোর্স দিতে হবে।”
শাহরিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ডিভোর্স শব্দটা বিষের মতো লাগলো। এতক্ষণ নমনীয় কণ্ঠে কথা বললেও এবার সেখানে দৃঢ়তা জায়গা করে নিলো।
“মেহুর কোনো দোষ এখানে আছে? কীসের শাস্তি স্বরূপ তুমি এই আদেশটা দিচ্ছ?”
“আমি ওর সম্পর্কে জানতেই চাইছি না। আমার ডিসিশান শুনেছ না? এবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।”
ভাত মাখানো হাত নিয়েই উঠে পড়ল শাহরিয়ার। একটা দানাও মুখে তুলল না। হাত ধুয়ে সোজা বেরিয়ে গেলো। আতিয়া একটাবার বলতে পারলেন না শাহরিয়ার তুই খেয়ে যা। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন আজাদ বিশ্বাসের তৃপ্তির খাওয়া।

⁠●⁠● ⁠●⁠● ⁠●⁠●

বিকেলে মেহরিমা ফোন দিলো। আমুদে কণ্ঠে বলল, “কি করছ?”
“রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি।”
“কেন?”
“বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।”
তড়াক করে উঠে বসলো মেহরিমা।
অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, “সত্যি!”
“হুঁ।”
“এখন কি করবে?”
“ঢাকা শহরে কি থাকার জায়গার অভাব নাকি?”
“বাজে কথা বলো না। কোথায় থাকবে? তোমার মামার বাড়ি যাও।”
“নাহ। আত্মীয়দের বাড়ি গেলে এখন সমস্যা। পকেটে তেমন টাকা পয়সা নেই।”
“তাহলে কিভাবে থাকবে!” আর্তনাদ করে বলল মেহরিমা। “ঐ ষাট হাজার টাকা পাঠিয়ে দিই?”
“আরে নাহ! এক বন্ধুর সাথে কথা বলেছি। ওর মেসে যেয়ে কয়েকদিন থাকি।”
“তারপর আর কি? তাড়াতাড়ি জয়েন করার চেষ্টা করবো। নাহলে তোকে নিয়ে আসবো কিভাবে? মেহু বাবা যদি না মানে তাহলে চাচা কি তোকে আমার সাথে আসতে দেবে না?”
“দেবে। কিন্তু কষ্ট পাবে।”
“হাহ! ওরা ঝগড়া করছে, ওরা কষ্ট পাচ্ছে আর আমরা ভুগছি।”
“আমরা কি ওদের বোঝানোর জন্য কিছু করতে পারি না”
“আমি তো করার মতো কিছু দেখছি না। শুধু দোয়া কর।”
“দুপুরে খেয়েছ?”
“হুঁ।” শাহরিয়ার বলল না এক গ্লাস পানি খেয়ে অপমান হজম করে এসেছে। অযথাই আড়াইশ মাইল দূরে বসে থাকা একটা মানুষকে চিন্তায় ফেলার মানে হয় না।
“এখন কি বন্ধুর কাছে যাচ্ছ?”
“হুঁ।”
মেহরিমা আর কিছু বলল না। শাহরিয়ারের মন খারাপ সে বুঝতে পারছে।
“টেনশন করো না। সামনে ইনশাআল্লাহ্ ভালো কিছু হবে। আমরা জানিনা জন্য মন খারাপ করছি।”
“ইনশাআল্লাহ্।”
ফোন রেখে শাহরিয়ার আকাশের দিকে তাকালো। আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে।

আজাদ বিশ্বাসের অনুপস্থিতিতে আতিয়া ফোন দেন। শাহরিয়ার বুঝতে পারে তার মা কষ্টে আছে। কিন্তু স্বান্তনা দেয়ার মতো কথা পায় না। রুমির কাছে শোনে আতিয়া ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করেন না। তার শরীর দূর্বল হয়ে পড়ছে।
শাহরিয়ার বসে থাকার সুযোগ পায় না। ভার্সিটিতে ছোটাছুটি করতে হয়। নিয়োগের ডেট এগিয়ে দিয়েছে। সামনেই পরীক্ষা। প্রস্তুতি নিতে রাতদিন কাটিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে মেহরিমার সাথে কথা বলে। বাড়ি ছাড়ার পনের দিন পেরিয়ে গেলেও যখন আজাদ বিশ্বাস একবারও ফোন দিলেন না শাহরিয়ারের মনে অভিমান জমা হলো।
তবে সেই অভিমানটুকুও চুরচুর করে ভেঙে গেলো যেদিন রুমি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ফোন দিলো।
বলল, “বাবা এক্সিডেন্ট করেছে ভাইয়া!”

~চলমান~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here