“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৫.
এরপর আর কোনো অভিমান জমিয়ে রাখা যায় না। শাহরিয়ার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলো। বেখেয়ালে ফোন রেখে এলো বন্ধুর মেসেই।
আজাদ বিশ্বাস বড় ধরনের অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। সিএনজিতে করে বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথে প্রাইভেট কারের সাথে একেবারে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। কোনো রকমে আটকে রাখা দরজা থেকে ছিটকে যেয়ে রাস্তায় পড়েছেন আজাদ। মাথায় গভীর চোট পেয়েছেন। ড্রাইভার লোকটা আঘাত পেয়েছে মূলত পায়ে। তবে তার অবস্থা ততটা আশঙ্কাজনক নয়।
শাহরিয়ার এসে জানতে পারল আজাদ বিশ্বাসের ইমার্জেন্সী অপারেশন দরকার। কোনো চিন্তা ভাবনা না করেই অপারেশন শুরু করার তাগিদ দিল। টাকার প্রশ্ন এলে আজাদ বিশ্বাসের সেভিংসে হাত দিতে হলো।
আতিয়ার অবস্থা মৃতপ্রায়। শাহরিয়ার মায়ের কাছে এগিয়ে যেতেই তিনি ছোট্ট বাচ্চার মতো তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলেন। শাহরিয়ার মায়ের মাথায় হাত রাখলো।
“কেঁদো না মা।” স্বান্তনার আর কোনো বাক্য পেলো না শাহরিয়ার। ডাক্তার তাকে বলেছে বাবার অবস্থা যথেষ্ট নাজুক। যেকোনো কিছুই হতে পারে। মাকেও কি এসব কথা বলেছে?
আতিয়া কাঁদতে কাঁদতেই কিছু একটা বললেন। শাহরিয়ার বুঝতে না পারলেও মন দিয়ে শুনলো। বাবার উপরে মায়ের একটা চাপা রাগ আছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা একদম পছন্দ করেন না আতিয়া। কিন্তু আজাদ বেছে বেছে এই কাজটাই করেছেন। আতিয়া অনেক বোঝালেও কাজ হয়নি। সেই থেকেই আজাদের উপরে একটা ক্ষোভ জমেছে তার। সেসব ক্ষোভ, রাগ সবকিছুই আতিয়ার কান্নার জলে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে।
“মা?”
আতিয়া তাকালেন। চোখ মুছলেন। আবার ভিজে গেলো।
“আল্লাহ তোর বাবাকে শাস্তি দিচ্ছে শাহরিয়ার। নিজের ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তার শাস্তি পাচ্ছে।” হাউমাউ করে কাঁদলেন আতিয়া। রাশেদা কিছুতেই থামাতে পারলেন না।
শাহরিয়ার জানে না আজাদ কীসের শাস্তি পাচ্ছেন। সে শুধু দোয়া করলো তার বাবার সুস্থতার। আজাদ বিশ্বাস ভালো হয়ে উঠুক।
তবে ঘটনা অন্য রকম ঘটলো। অপারেশন ফলপ্রসূ হলো না। ডাক্তার বললেন অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে। এখানে এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব না। শাহরিয়ার চোখে অন্ধকার দেখলো। মামাকে ফোন দেয়ার কথা মনে হলে বুঝলো ফোন আনেনি। মায়ের ফোন ব্যবহার করল। মামা এলেন বটে। শাহরিয়ার কিছু বলার আগেই বললেন, “শাহরিয়ার আমার হাতের অবস্থা তো খুবই খারাপ! জমানো এমন কিছুই নেই যা দিয়ে তোকে সাহায্য করতে পারব।”
শাহরিয়ার এমন কিছুই বলতো না। সে শুধু মাথার উপরে একটা হাত চেয়েছিল। মামা জানালেন তার হাতের অবস্থা খুবই খারাপ। ফলে তিনি শাহরিয়ারের লাঠি হতে পারলেন না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাঠ হিসেবে রয়ে গেলেন।
হাসপাতাল পাল্টে ভর্তি প্রক্রিয়া সারতে আরো কিছু টাকা খরচ হয়ে গেলো। তখনও আজাদের জ্ঞান ফেরেনি। কখন ফিরবে এই নিয়েও কোনো আশ্বাস দেননি কোনো ডাক্তার। শাহরিয়ারের মনে হলো ধু ধু মরুভূমিতে সে মা আর বোনকে নিয়ে ছুটছে এক মরীচিকা থেকে আরেক মরীচিকার দিকে।
ডাক্তাররা আবার অপারেশনের ডেট দিলেন। প্রায় লাখখানেক টাকা ওখানেই চলে গেলো। দীর্ঘ সতের ঘণ্টার অপারেশন শেষ করেও তারা আজাদ বিশ্বাসের জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে পারলেন না। আতিয়া মেয়ের বুকে লুটিয়ে পড়লেন। চারদিনের ঝড়ে শাহরিয়ারের মনে হলো তার জীবনীশক্তি অর্ধেক নিঃশেষ হয়ে গেছে।
●● ●● ●●
চারদিন ধরে শাহরিয়ারের কোনো খোঁজ নেই। প্রথমদিন পার হলে মেহরিমা অভিমান করেছে। দ্বিতীয় দিনের সূর্য অস্ত যাওয়ার পর জমে থাকা অভিমান রাগে রূপ নিয়েছে। কিন্তু তৃতীয় দিনের তারাদের সাথে শাহরিয়ার যখন নিখোঁজ হয়ে রইলো তখন মেহরিমা অস্থির হয়ে গেলো। অভিমান, অভিযোগ সবটা ভুলে শাহরিয়ারের কাছে ফোন দিলো। বেজে বেজে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর আবার, আবার। একসময় ফোনটা বন্ধ হয়ে গেলো। স্থির হয়ে বসে রইলো মেহরিমা। রুমির কাছে ফোন দিলো। সেটাও কেউ ধরলো না। মেহরিমার মনে আশঙ্কা পাথরের মতো চেপে বসলো। কি হয়েছে ওদের?
●● ●● ●●
জমানো টাকার আর কিছুই তেমন অবশিষ্ট নেই। অপারেশনের খরচ, বেড ভাড়া দিতে দিতে প্রায় ছবি শেষ হয়ে গেছে। প্রাইভেট হাসপাতাল হওয়ায় প্রত্যেক খরচের লিস্টেই মুঠো মুঠো টাকা দিতে হচ্ছে। আজাদ বিশ্বাস ব্যবসায়ী মানুষ হলেও খুব একটা টাকা জমাননি। ইদানিং যেটুকু যাচ্ছিলেন সেটা জমি কেনার জন্য। সেই টাকা দিয়েই তার চিকিৎসা করতে হলো। শাহরিয়ার জানে এরপর আর টাকা লাগলে সরাসরি আজাদ বিশ্বাসের রড সিমেন্টের দোকানে হাত দিতে হবে। আর কোনো উপায় নেই।
বারান্দায় বসে এসব কথা ভাবতে ভাবতে যখন হাঁপিয়ে উঠেছে তখন মেহরিমার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মেয়েটার সাথে পাঁচদিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। মেসে যেয়ে যে ফোন নিয়ে আসবে সেই ফুরসতটুকু সে পায়নি। বন্ধু ছেলেটাও বাড়িতে গেছে। ফলে সেও এসে দিয়ে যেতে পারছে না। রুমির ফোন বাড়িতে। বাকি রইলো শুধু আতিয়ার ফোন। সেখানে মেহরিমার নাম্বার নেই। শাহরিয়ারের নিজের উপরে রাগ হলো। ওর নাম্বারটা কি মুখস্থ করে রাখা যেত না? অবশ্য কখনও কি মনে হয়েছে জাঁদরেল আজাদ বিশ্বাস এভাবে অসহায় হয়ে পড়ে থাকবেন আর তার পেছনে ছুটতে যেয়ে সবাইকে দিন দুনিয়া ভুলে বসতে হবে!
সেইদিন রাতে আধা ঘণ্টার ভেতরে ফেরত আসার কথা বলে শাহরিয়ার বেরিয়ে সোজা চলে গেলো ফোন আনতে। মেহরিমাকে একটা কল দেয়ার জন্য। ফোন বন্ধ দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। সেটা চার্জ দিয়ে আরো প্রায় দুই ঘণ্টা ওখানে বসে থাকতে হলো। মেহরিমাকে ঝটপট ফোন দিলো শাহরিয়ার। ফোন যেন হাতে নিয়েই বসে ছিল মেহরিমা। একবার রিং হতেই ধরে ফেলল। ক্লান্ত কণ্ঠে শাহরিয়ার ডাকলো, “মেহু!”
জমানো আশঙ্কা প্রকাশ করতে না পেরে মেহরিমা কেঁদে ফেললো, “কি হয়েছে তোমার?”
“বাবা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।”
মেহরিমা প্রায় আর্তনাদ করে উঠলো, “কিভাবে!”
সংক্ষেপে সবটা বলল মেহরিমা। শাহরিয়ার কি মনে করে বলল, “চাচা আছে আশেপাশে?”
“আছে।”
“দে একটু কথা বলি।”
মেহরিমা বাবার কাছে ফোন দিলো। মেয়ের ফোলা চোখমুখ দেখে আরমান বিশ্বাসের কপালে ভাঁজ পড়ল। ফোন কানে ধরতেই শাহরিয়ারের ভগ্ন, কম্পিত কণ্ঠ কানে এলো।
“কেমন আছো চাচা?”
আরমান বিশ্বাস বললেন, “ভালো আছি। তোর কি হয়েছে?” অবচেতন মনেই পুরোনো সম্বোধনে ফিরে গেছেন আরমান। শাহরিয়ার হাসলো। এভাবেই যদি সবটা ঠিক হয়ে যেত!
“বাবা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে চাচা। মাথায় আঘাত লেগেছে। আজকে পাঁচদিন ধরে জ্ঞান নেই।” শাহরিয়ার চুপ করে গেলো। ভয়গুলো ভেতর থেকে মিছিল করে ডুকরে বের হতে চাইছে। শক্ত একটা ঢোক গিলে তাদের আবার ভেতরে পাঠিয়ে দিলো শাহরিয়ার।
“কি!” অবাক হয়ে বললেন আরমান।
শাহরিয়ার আর পারলো না। কেঁদেই ফেলল, “আমার বাবাকে মাফ করে দিও চাচা। আমার বাবা…” আর কিছু বলতে পারলো না শাহরিয়ার। তার নিশ্বাসের শব্দ শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন আরমান।
যখন শাহরিয়ার হাসপাতালে ফিরল তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিল চিন্তার বাইরের একটি খবর।
~চলমান ~

