“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৬.
ডাক্তারদের নির্দিষ্ট হিসেবী সময় শেষ হয়েছে। তারা জানালেন এখনও আজাদ বিশ্বাসের কোনো রেসপন্স নেই। এভাবে তাকে ফেলে রাখা স্রেফ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা হবে। শাহরিয়ার বলল, “তাহলে এখন কি করব? কোথায় নিয়ে যাবো?”
শক্তপোক্ত ছেলেটার ভঙ্গুর রূপ দেখে ডাক্তার লোকটার মায়াই লাগলো। তিনি বললেন, “দেশে আর কোনো চিকিৎসা নেই। তোমাকে দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“সিঙ্গাপুরে ভালো ব্যবস্থা আছে।”
শাহরিয়ার ক্ষণিকের জন্য অপ্রকৃতস্থের মতো হয়ে গেলো। আশপাশে দূর দূরান্ত পর্যন্ত কাউকে দেখছে না সে। একটা মানুষ তার পাশে নেই?
আতিয়ার সাথে কথা বলে ইমার্জেন্সী নোটিশে দোকান বিক্রির কথা বলে দিলো। মাসখানেক সময় হাতে থাকলে ভালো দাম পেতো। দোকান ভরতি মাল। একদম মেইন রাস্তার সাথেই। কিন্তু তার হাতে একটা দিনও বেশি। ফলে দাম একটা পেলেও সেটা দোকানের মূল্য চোকাতে পারলো না।
সব বন্দোবস্ত হলেও পাশে কাউকে পেলো না শাহরিয়ার। তার ভয় হলো। এমন একটা রোগীকে নিয়ে সে কি যেতে পারবে?
তার ফ্লাইটের আগের দিন আরমান বিশ্বাস এসে উপস্থিত হলেন। শাহরিয়ারকে ধমক দিয়ে বললেন, “খুব পোদ্দার হয়েছিস! সিঙ্গাপুর যাচ্ছিস আর একবার বলার প্রয়োজন মনে করলি না!”
শাহরিয়ারের চোখ ভরে এলো। মনে হলো এই ধমকটুকুর জন্যই সে কতকাল ধরে অপেক্ষা করছিল।
“তুমি যাবে?”
“না যেয়ে উপায় আছে? গায়ের র-ক্ত পাল্টে ফেললে অস্বীকার করতে পারতাম। সেটা তো পারছি না।”
শাহরিয়ার দুহাতে মুখ ঢাকলো। আরমান বিশ্বাস বললেন, “রুমি আর ভাবিকে ঝিনাইদা পাঠিয়ে দে। দুজন মহিলা মানুষ একা একা তো চিন্তায় মরেই যাবে।”
শাহরিয়ারের এবার যেন খেয়াল হলো। বাবাকে নিয়ে ভাবতে যেয়ে ওদের কথা ভুলেই বসেছিল। সত্যিই তো। মায়ের অবস্থা করুন। তাকে নিয়ে রুমি থাকতে পারবে না।
“কার সাথে পাঠাবো?”
“কেন তোর মামা আছে না?” কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন আরমান। শাহরিয়ার কিছু বলল না। আরমান বোধহয় বুঝতে পারলেন।
“যাওয়া আসার ভাড়া দিয়ে দে। ভাই হয়েছে বোনের কর্তব্য পালন করতেই হবে।”
“ফুপুদের কিছু বলতে পারলাম না।”
“আমি বলেছি। তুই দেখ আমার টিকিট কাটা যায় কি না।”
“ভিসা আছে তোমার?”
“আছে।”
টিকিট পাওয়া গেলো। সেদিনের সব কাজ সেরে শাহরিয়ার যখন হাঁফ ছাড়লো তখন আরমান তার দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিলেন। শাহরিয়ার দেখলো বেনামী খাম। মুখ খোলা। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো গুটি গুটি হাতের লেখার একটা চিঠি।
“শাহরিয়ার,
বাবা কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় গেছে। আমি একটুও জোর করিনি। সেদিন পুরোটা রাত কিভাবে ছটফট করেছে তুমি যদি দেখতে!
তুমি সেদিন বলেছিলে না সামনে ভালো কিছু হবে? হয়তো ভালো কিছুই হবে। ইনশাআল্লাহ্। আমরা তো দূর থেকে কাটার প্রাচীর দেখি। ভেতরের ফুলের বাগান দেখতে আরো পথ পাড়ি দিতে হয়। তুমি নিশ্চিন্তে হাঁটতে থাকো।
আমাকে নিয়ে একদম টেনশন করো না। নিয়ম করে রোজ দু’বেলা ফোন দিতে হবে না। চাচার কাজ করে সময় পেলে একটু জিরিয়ে নিও। আমি আছি। তোমার জন্যই।
ইতি
মেহরিমা
চিঠিটা পড়ে শাহরিয়ারের মনে হলো তার বুকের ভার অর্ধেক নেমে গেছে। মেহরিমা ফোনেই এসব বলতে পারতো। তবে সেটা সংরক্ষিত থাকতো না। ট্রলির ভেতরে জরুরি কাগজপত্রের পাশে চিঠিটাও নিয়ে নিলো শাহরিয়ার। দূরদেশে অর্ধাঙ্গীর স্মৃতি স্বরূপ।
●● ●● ●●
বোন ভাগ্নিকে পৌঁছে দিয়ে মামা আর থাকেননি। সেদিনের ফিরতি বাসেই চলে গেছেন।
এসে থেকেই আধমরা হয়ে পড়ে আছেন আতিয়া। শেলী কাছে যেয়ে বললেন, “ভাবি উঠে একটু হাত মুখ ধুয়ে নিন। কিছু খান।”
“আমি তো শরীরে শক্তি পাই না শেলী। লোকটা এক সপ্তাহ ধরে চোখ খোলে না।” আতিয়ার বন্ধ চোখে পাতা থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। তার বাষ্প আক্রান্ত করলো শেলীকেও। তিনি ভেজা চোখে বললেন, “ইনশাআল্লাহ্ সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবি। আপনি এভাবে পড়ে থাকলে রুমি কিভাবে থাকবে?”
“ওকে মেহুর কাছে পাঠিয়ে দাও।”
মেহরিমা পাশেই ছিল। আতিয়া দেখেননি। দুর্বল রুমিকে সাথে নিয়ে গেলো মেহরিমা। জোর করতে হলো না। মেয়েটা এতো ক্ষুধার্থ ছিল নিমিষেই এক প্লেট ভাত শেষ করে ফেললো। মেহজাবিনের মায়া লাগলো অপছন্দের মানুষগুলোর মুখ দেখে। মনে হলো কবে আবার সব আগের মতো হবে, সে রুমিকে দেখিয়ে তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে।
বাড়িতে কোনো পুরুষমানুষ ছিল না। মেহরিমাকে বাজারে যেতে হলো। চাচী কিছুই খাচ্ছেন না। জোর করলে দু লোকমা খেয়ে উঠে পড়ছেন। রাশেদা হাজার বুঝিয়েও কিছু অতিয়াকে একটু খাওয়াতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে তিনিও কিছুদিনের মাঝেই বিছানায় পড়ে যাবেন বুঝতে পেরে চিন্তিত হলো মেহরিমা বড় দেখে একটা লাউ কিনে পাঁচশ টাকার নোট দিলো।
“ভাঙতি নাই।”
দোকানদারের কণ্ঠে ধ্যান ভাঙলো তার। একশ টাকা বের করতে যেয়ে পাঁচশ বের করে ফেলেছে। দাম মিটিয়ে পেছন ফিরতেই পরিচিত একটা মুখ দেখা গেলো।
“অবশেষে গুহা থেকে বেরিয়েছ! আমি ভাবলাম ওখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলে নাকি।” হেসে বলল ইউনূস।
মেহরিমা চোয়াল শক্ত করল, “বিশ্রী কৌতুক আমি পছন্দ করি না। রাস্তা ছাড়ুন।”
“আরে তা তো ছাড়বোই। রাস্তা তো আলাদাই হয়ে গেছে। ছাড়াছাড়ির আর আছে কি!”
“এসব বলার জন্যই আটকেছেন?”
“এক সপ্তাহ ধরে তোমাকে খুঁজছি। তোমার টিকিটারও দেখা পেলাম না। বিয়ে করে একেবারে হাইবারনেশনে চলে গেছো নাকি!”
গত এক সপ্তাহে আসলেই ঘর ছেড়ে বের হয়নি মেহরিমা। প্রথম দুদিন ভার্সিটি বন্ধ ছিল। তারপর শাহরিয়ারের চিন্তায় আর ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করেনি। শেষ যখন চাচার অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেলো তখন পুরো পরিবারের অবস্থাই বেহাল।
“গেলে গেছি। আপনার কি? ফালতু আলাপ করার সময় নেই। সরুন।”
“আমার কি! তাইতো তাইতো!” পকেটে হাত ঢোকালো ইউনূস। একটু ঝুঁকে চাপা কণ্ঠে বলল, “বিয়ে তো আগেই সেরে ফেলেছো। কেন? বেকায়দা কিছু ঘটিয়েছিলে নাকি! তোমার মা সেই ইউজড জিনিস আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছিল। কি ডেঞ্জারাস!”
মেহরিমার গা গুলিয়ে উঠলো। দৃশ্যমান চোখ জোড়া দিয়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো ইউনূসের দিকে।
“এগুলো বলার জন্য আমাকে খুঁজছিলেন!”
“আরো অনেক কিছুই বলতে চেয়েছিলাম। বিস্তারিত তো এই ভরা বাজারে বলতে পারছি না। শুধু পয়েন্টগুলো শোনো।”
মেহরিমা এক ছুটে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু ইউনূস তাকে এভাবে আটকেছে যেখান থেকে সে না সরলে মেহরিমা এক পা আগাতে পারবে না। তাছাড়া বোঝাই যাচ্ছে এই লোক তামাশা করার জন্যই এসেছে। মেহরিমা কিছু একটা করলেই বাজারের সবার দৃষ্টি এদিকে নিয়ে আসতে দুইবার ভাববে না সে। শাহরিয়ারের কথা মনে পড়লো। সে বলেছিল ইউনূস এতো সহজেই ছাড়বে না।
“চাকরি পাওয়ার পর একবাক্যে রাজি হয়ে গেলে। আমি তোমাকে ভালো ভেবেছিলাম মেহরিমা। এখন দেখি তুমিও সেই ক্যাটাগরির মানুষ। টাকার পিএইচে মানুষ মাপো। এরপর যখন তোমার পুরোনো প্রেমিক আমার চেয়ে ভালো চাকরি নিয়ে ফিরে এলো তখন তার কাছে পল্টি নিলে। গ্রেট!”
মেহরিমার ইচ্ছে করলো ইউনূসের দুই গালে দুটো চড় দিতে। কিন্তু দুই হাতেই ব্যাগ থাকার কারণে ইচ্ছেটা পূরণ হলো না।
“ভার্সিটিতে যেয়ে জুনিয়রদের থেকেও খোঁজ নিলাম। হিজাব, নিকাব করো। সবাই তো এক বাক্যে চরিত্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দিলো। তারা তো আর জানে না বোরখার নিচে কি চলে।”
মেহরিমা এক পা এগিয়ে এলো। তাকে আগাতে দেখে কথা বন্ধ করে চোখ ছোট করে তাকালো ইউনূস। কিছু ভাবার আগেই মেহরিমা ভারী বাজারের ব্যাগে দিয়ে ইউনূসের পায়ের পেছন থেকে হাঁটুতে ধাক্কা দিলো। দুই হাত পকেটে থাকায় কিছু ধরতেও পারলো না ইউনূস। হাঁটু ভেঙে মুখ থুবড়ে নিচে পড়ে গেলো। তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো মেহরিমা।
~চলমান~

