“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৭.
দুটো সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। আজাদ বিশ্বাসের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। ডাক্তাররা বলেছেন চিকিৎসা পুরো করতে আরো সময় লাগবে। তাই সবাই আশা নিয়ে আছেন। একদিন আজাদ চোখ খুলবেন।
আরমান বিশ্বাসের ফার্নিচারের দোকান আপাতত দোকানে থাকা ছেলেটার হাতে। সে দিনে দিনে এসে হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে যায়। এদিক দিয়ে শেলী স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়েন। নয়তো ছেলেটা চুরি বাটপারি করলে তারা কেউ কি ধরতে পারতেন?
দুদিন পরপরই বাজার করতে হচ্ছে। সবসময় মেহরিমা বাড়িতে থাকে না। সে ভার্সিটিতে থাকলে দোকানের ছেলেটা বাজার নিয়ে আসে। তিনদিন আগে বাজার করা হয়েছিল। সেটাও ফুরিয়েছে। শেলী মেহরিমার কাছে এসে বললেন, “আজকে তো একবার বাজারে যেতে হবে।”
গোছগাছ করছিল মেহরিমা। আর আধা ঘণ্টা পর ভার্সিটির বাস আসবে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরেকটু আগে বলবে না? এখন বাজারে গেলে আমার বাস মিস হবে।”
শেলী ইতুউতি করে বললেন, “আর কয়েকদিন গেলে মাস পুরো হবে। এতো খরচ..”
মায়ের ইঙ্গিত বুঝতে মেহরিমার কষ্ট হলো না। সে শীতল কণ্ঠে বলল, “চাচার দোকান বেঁচে দিয়েছে। জানো এটা?”
শেলী বি-স্ফো-রিত দৃষ্টিতে তাকালেন।
“ভাবি যে বলল দোকানে আরেকজন বসছে!”
“চাচী জানেন না। উনি জানেন উনার ভাই টাকা পয়সা দিয়েছে। আর কিছু জায়গায় ধার দেনা করে চাচাকে নিয়ে গেছে। প্রথমে এমনই ভেবেছিল। কিন্তু আমার মামা শ্বশুরের হাতের অবস্থা নাকি ভালো না। তাই দোকান বিক্রি ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।”
শেলী নিজের মনেই বললেন, “তাহলে ওদের আর কি থাকলো?”
“কিছুই না। এই বাড়িটাই যা। ভাড়া বাড়িটাও রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। কেউ থাকছে না। তাছাড়া পনের ষোল হাজার টাকা প্রতিমাসে দেয়ার মতো অবস্থাও ওদের নেই।”
শেলী কিছু বললেন না। টেবিলের উপরে টাকা রেখে চলে গেলেন। মেহরিমা শুনতে পেলো মা বিড়বিড় করছে, “এমন দিন আল্লাহ কাউকে না দেখাক।”
নিজের ব্যাংক বের করলো মেহরিমা। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার থেকেই সে টুকটাক টিউশনি করছে। সেই টাকা বাবা মা কোনদিন চায়নি। বলেছে তোর টাকা তুই যা ইচ্ছা কর। নষ্ট না করলেই হলো। মেহরিমার কোনো দরকার হয়নি সেসব খরচ করার। বাবা প্রতি মাসে যা টাকা দিত তাতেই হয়ে যেত। ফলে জমতে জমতে ভালোই টাকা হয়েছে। এক পলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সেখান থেকে দশ হাজার টাকা বের করলো। শেলীর কাছে যেয়ে বলল, “এটা রাখো।”
“কোথায় পেলি? তোর দেন মোহরের না কি?”
“না। টিউশনির জমানো টাকা।”
শেলী রাখলেন। আরমান বিশ্বাসের ইনকাম আহামরি না। তাদের চলে যায়। কিন্তু এখন তিনটে মানুষ বেশি। তাদের তো আর যেকোনো কিছু খাইয়ে দিলেই চলছে না।
●● ●● ●●
রুমি কারো সাথেই তেমন একটা কথা বলে না। টুকটাক দুই একটা যা বলার মেহরিমার সাথেই বলে। মেহজাবিন তার চারপাশে এসে ঘুরঘুর করলেও নিজে থেকে কথা বলতে তার অস্বস্তি হয়।
দুদিন ধরে রুমির জ্বর। ঠিকমতো কিছু খেতে পারছে না। মেহরিমা গতকাল সারারাত রুমির পাশে বসে থেকেছে। একটু পরপর জলপট্টি দিয়েছে। ওষুধ খাওয়ানোর পর তাপমাত্রা কমলেও জ্বর একেবারে ছেড়ে যায়নি। আজ ভার্সটিতে যাওয়ার সময় রুমিকে ঠিক সময়ে ওষুধ আর খবর খাওয়ানোর দায়িত্ব মেহজাবিনকে দিয়ে গেছে। মেহজাবিন নিজেও নিষেধ করেনি। মেহরিমা বুঝতে পেরেছে তার বোনের মনের রাগের পাহাড় অ্যাক্সিডেন্টের ধাক্কায় টলে গেছে।
রুমি সকাল থেকে শুয়েই ছিল। মেহজাবিন প্লেট হাতে পা টিপে টিপে গেলো। বিছানার কাছে চেয়ার টেনে বসে আস্তে করে ডাকলো।
“রুমি আপা!”
রুমি জেগেই ছিল। এপাশ ঘুরে মেহজাবিনকে দেখে যথেষ্ট অবাক হলো সে। এই মেয়েটা তো তাদের ছায়াই মাড়াতে চায় না।
রুগ্ন কণ্ঠে সে বলল, “কি হয়েছে?”
টেবিল থেকে প্লেট নিলো মেহজাবিন, “খেয়ে নাও।”
রুমি চোখ মুখ কুচকে বলল, “একদম তিতা লাগছে সবকিছু। এখন খাবো না।”
“এখুনি খেতে হবে।”
“রেখে যাও পরে খেয়ে নেব। শরীরে শক্তি পাচ্ছি না।”
“আমি খাইয়ে দিচ্ছি। ওঠো।” কোনরকমে বলল মেহজাবিন। রুমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। মেহজাবিন লজ্জা পেলো।
“কি বললে তুমি!”
“যেটা শুনেছ ওটাই বলেছি। ওঠো।”
রুমি বিস্মিত ভঙ্গিতে উঠে বসলো। তার বিস্ময় কাটলো তখন যখন মেহজাবিন তার মুখের সামনে অনভ্যস্ত হাতে লোকমা ধরলো।
মুখে খাবার নিয়ে কেঁদে ফেলল রুমি। মেহজাবিন স্বান্তনা দিতে পারল না। কাউকে কাঁদতে দেখলে তারও কান্না পায়। রুমিকে হেঁচকি তুলে কাঁদতে দেখে সেও কেঁদে ফেলল। ঝাপসা চোখেই রুমিকে খাইয়ে দিলো মেহজাবিন। আপা দায়িত্ব দিয়ে গেছে। সে ভালোভাবে পূরণ করবে।
●● ●● ●●
তেইশ দিন পেরিয়ে গেলেও আজাদ বিশ্বাসের কোনো রেসপন্স নেই। ডাক্তার বলেছেন আগামীকাল পর্যন্ত দেখবেন। যদি কোনো উন্নতি না হয় ধরে নিতে হবে বাকি জীবন তার এভাবেই কাটবে। কোমায়।
শাহরিয়ার ভেঙে পড়েছে। আর কিছুই করতে পারছে না সে। গতকাল নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে। সে দিতে পারেনি। যোগ্য লোক পেয়ে যাওয়ায় ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ দেরি করেনি। সে টিচার ক্যান্ডিডেট হিসেবে অগ্রাধিকার পেতো পরীক্ষা দেয়ার পর। পরীক্ষাটাই তো দিতে পারল না। ফলে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়া চাকরিটা হাত ছাড়া হয়ে গেছে। কি অদ্ভুত জীবন! সেদিনও কি ভেবেছিল আজাদ বিশ্বাস অ্যাক্সিডেন্ট করে দেশ ছাড়া হবেন? তার নিশ্চিত চাকরি ছুটে যাবে!
চাকরির বিষয়টা সে কাউকে বলতে পারেনি। মা দোকানে খবরই জানেন না। এর মাঝে এই খবর তিনি কিভাবে নেবেন শাহরিয়ার জানে না। তবে মেহরিমাকে বলা দরকার। সেই শক্তিটাও শাহরিয়ার পাচ্ছে না। যখনই বাবার কথা মনে পড়ছে তার বুকটা ফেটে যেতে চাইছে।
・・・・・・
রাত তখন তিনটা সতের। শাহরিয়ার ঘুমাচ্ছে। হাসপাতালটা কখনও পুরো নীরব হয় না। সকালে এক দল ডিউটি করে। সন্ধ্যা হলে মুখগুলো পাল্টে যায়। কাজ বন্ধ হয় না। ফলে চারদিকে মানুষের হালকা শোরগোল পাওয়া যাচ্ছে।
আরমান বিশ্বাস পায়চারি করছেন। শাহরিয়ারের মুখের দিকে তাকালে মায়া লাগছে। ছেলেটা জান প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছে বাবার সুস্থতার জন্য। এখন একটা কিছু হয়ে গেলেও শাহরিয়ারের মনে আফসোস থাকবে আজীবন। বাবার শেষ সময়ে তার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি সে। এজন্য যদি মেহরিমাকে কখনও দোষারোপ করে? আরমান ভয় পান। তার পিতৃহৃদয় কেঁদে ওঠার পরপরই মনে উকি দেয় ফেলে আসা শৈশবের আবছা সব স্মৃতি।
এই আজাদ বিশ্বাস তো তার নিজের ভাই। আরমান হওয়ার পর সবচেয়ে খুশি হয়েছিল শিশু আজাদ। মায়ের মুখে কতবার শুনেছেন আরমান! অচেনা কারো কোলে ভাইকে যেতে দিত না সে। কেউ কিছু খেতে দিলে পুরোটাই নিয়ে আসতো। ভাই খেয়ে কিছু বাঁচলে তবেই খেতো আজাদ।
সেই সম্পর্কটা কিভাবে এতটা বদলে গেলো? ঠিক কবে ছন্দপতন ঘটলো? কোন ঘটনার সূত্র ধরে? কেন তাদের দুনিয়া এতটা আলাদা হয়ে গেলো?
কতকিছু মনে হয় আরমানের! মধ্য রাতে উল্কার মতো ভাবনারা ধেয়ে আসে। চোখ বন্ধ করলে মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে। আজাদ দেখতে তো মায়ের মতোই। তার ভাই, আপন ভাই আজ মৃ-ত্যুপথযাত্রী। অথচ সেসময় তাদের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। আফসোস আরমানকে কুড়ে কুড়ে খায়। ভাইয়ের সাথে সাথে সে নিজেও কেন সম্পত্তির জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল? ইশ! যদি আজাদকে সজ্ঞানে একবার জড়িয়ে ধরতে পারতেন! বলতে পারতেন তিনি আজাদকে ভুলে যাননি। কখনও না।
চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এসেছিল। মুছতেই সামনে স্পষ্ট হলো চারকোনা গ্লাস। দরজার উপরের এই অংশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে আজাদকে। ভেতরে কারো ঢোকা নিষেধ। ফলে তাদের বাইরেই রাত কাটাতে হচ্ছে।
শরীর ভেঙে আসছিল। আরমান ভাবলেন একটু ঘুমিয়ে নেবেন। বেখেয়ালে এক পলক তাকালেন স্বচ্ছ কাঁচের দিকে। আর সেখানেই তার আফসোসমাখা নজর আটকে গেল।
~চলমান~

