“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৮.
আজাদ বিশ্বাস বাম হাত উঁচু করে আছেন। বিছানা থেকে একটু খানি উঁচু। ডান হাতে ক্যানোলা লাগানো। সেটা নড়ানোর কায়দা নেই। দুর্বল বাম হাত অল্প একটু নেড়েই নামিয়ে ফেললেন। আরমান ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকে পড়লেন। ভুলে গেলেন এই ঘরে কারো ঢোকা নিষেধ।
আজাদ বিশ্বাস কিছু বলতে পারছেন না। ঘন ঘন পলক ফেলছেন। এতো দিনের জমানো রাগ, অভিমান, অভিযোগ, আশঙ্কা, উদ্বেগ সবকিছু একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। আরমান নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলেন না। ভাইয়ের বাম হাত আঁকড়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। এই হাত, এই হাতই তো তাকে ছেলেবেলায় হাঁটতে শিখিয়েছে।
হাউমাউ করে কাঁদলেন আরমান। আজাদ বিশ্বাস অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে গেলেন। তার ভেতরে কি চলছে সেটা জানা হলো না।
অস্থির ভঙ্গিতে কেঁদে নিজেকে শান্ত করলেন আরমান। মাথা ওঠালেন। আজাদ তারই দিকে তাকিয়ে আছেন। অপলক। সেই চোখের ভাষা বুঝতে একটুও কষ্ট হলো না আরমানের। সাত বছর কেটে গেলেও তাকে আগলে রাখা ভাইয়ের চোখ জোড়া তিনি ভোলেননি। এই চোখের ভাষা বদলেছিল। পড়েছিল সম্পত্তির পর্দা। সেটা সরে গেছে। আরমান স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নিজের ভাইকে। ক্রন্দনরত কণ্ঠে তিনি বললেন, “ভাই!”
আজাদ বিশ্বাসের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। আরমান আরো কিছুক্ষণ সাধ মিটিয়ে কাঁদলেন তারপর গেলেন ভাস্তিকে জাগাতে।
শাহরিয়ার এমন হঠাৎ ধাক্কায় হকচকিয়ে উঠে বসলো। আরমান আস্তে ধীরে ডাকেননি। রীতিমত ধাক্কাতে শুরু করেছেন। সে উঠে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে রইলো।
আরমান বললেন, “ভাই তাকিয়েছে শাহরিয়ার!”
শাহরিয়ার ঘুম ঘুম চোখে তাকালো। তার দুচোখ লাল হয়ে আছে। মাথা অল্প বিস্তর ঢুলছে। সে বলল, “হু।”
“হু কি! আরে তোর বাপের জ্ঞান ফিরেছে!”
কথাটা বুঝতে কিছুক্ষণ লাগলো শাহরিয়ারের। যখনই ব্রেন কাজ করতে শুরু করলো সে ধড়মড় করে উঠে বসলো। বি-স্ফো-রিত চোখে তাকালো চাচার দিকে।
“কি!”
“ঐ দেখ। তোর বাপ তাকিয়ে আছে। যা ব্যাটা!” শাহরিয়ারকে ধাক্কা দিলেন আরমান। শাহরিয়ার ছুটেই গেলো। কিন্তু দরজার সামনে যেয়ে থমকে গেলো। কতগুলো দিন পর মানুষটার চোখ দুটো খোলা দেখলো সে?
ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো বাবার কাছে। আজাদ ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। শাহরিয়ারের মনে হলো বাবা তাকে তৃষিত নজরে দেখছে। সে আযাদের বাম হাতের বাহু আঁকড়ে ধরলো। তার চোখ ভিজে আসছে। চোখ মুছলো সে। আবার ভিজে গেলো। সেই মধ্যরাতে আজাদের হাতে মুখ ঠেকিয়ে বসে রইলো শাহরিয়ার।
অতিয়াকে সবার আগে খবরটা জানালো সে। সিঙ্গাপুরের সাথে বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য আড়াই ঘণ্টা। তখন বাংলাদেশে ঝলমলে সকাল।
খবরটা শুনেই সবার মাঝে উৎসবের ঢেউ খেলে গেলো। আতিয়া কাঁদতে শুরু করলেন। হাউমাউ করে।
রুমি বিরক্ত হয়ে বলল, “এখনও কাঁদছো কেন?”
আতিয়া কথা বলতে পারলেন না। রাশেদা বললেন, “কাঁদতে দে। মনের ভেতরে দুশ্চিন্তা যা ছিল সব বের হয়ে যাক।”
রুমি নরম চোখে মায়ের দিকে তাকালো। এগিয়ে যেয়ে জড়িয়ে ধরলো মা’কে। আতিয়া একটা সম্বল পেলেন। হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকলেন।
ডাক্তার আজাদের টেস্ট করলেন। আস্তে ধীরে সব নরমাল হয়ে আসছে। আর সপ্তাহখানেক থাকার পরামর্শ দিলে সানন্দে মেনে নিলো শাহরিয়ার।
●● ●● ●●
আরমান বিশ্বাস রুমের ভেতরে ঢোকেন। ওষুধপত্র দেখেন। যেটা নেই নিয়ে আসেন। কিন্তু আজাদ বিশ্বাসের দিকে তাকান না। বড় অস্বস্তি হয়। আজাদ বিশ্বাস নিজেও ভাইয়ের দিকে চোরা চোখে তাকান। তবে সাহস করে ডাকতে পারেন না। না পেরে ছেলেকেই ডাকলেন তিনি। শাহরিয়ার এগিয়ে গেলো।
“কেমন আছিস?” নরম কণ্ঠে বললেন আজাদ। অথবা রুগ্ন অবস্থায় কণ্ঠ এমনিতেই দুর্বল শোনালো।
শাহরিয়ার আপ্লুত হয়ে পড়ল। কতদিন পর বাবার কণ্ঠ শুনলো সে? তাও এমন স্বাভাবিক!
“আলহামদুলিল্লাহ্। ভালো।”
ইতস্তত করে আজাদ বললেন, “মেহরিমা কেমন আছে?”
শাহরিয়ার অবাক হলো। তিনি আতিয়া বা রুমির কথা শুনলেন না। সেটাই বরং স্বাভাবিক ছিল। কেন মেহরিমার কথা শুনতে চাইলেন ভাবতেই তার চোখ বড় হয়ে এলো।
“কথা বলছিস না কেন?”
“জানিনা। ওর সাথে আজ দুই তিনদিনে কথা হয়নি।”
“কেন! তোর মোবাইল নেই?” আজাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“আছে। সময় পাইনি ফোন দেয়ার। যখন ফ্রি হই তখন আবার দেশের সাথে সময় মেলে না।”
“পড়ে আছি আমি। আর তুই সময় পাস না কেন?”
শাহরিয়ার উত্তর দিলো না।
আজাদ বিশ্বাস গলা নিচু করে বললেন, “ও কই?”
“কে?” শাহরিয়ারের কপালে ভাঁজ পড়ল।
“তোর শ্বশুর। আর কেউ এসেছে এখানে?”
“না।” অবাক হলো শাহরিয়ার। বাবার মুখে এমন সম্বোধন শুনে। আসলেই তো আরমান তার শ্বশুর। কিন্তু সেভাবে ভাবতে তার ভালো লাগে না। চাচাই বরং ঠিক আছে।
“ও কি তোর সাথেই এসেছে?”
“হ্যাঁ।”
“এতো টাকা পেলি কোথায়?”
“জমির টাকা।”
আজাদ নিশ্বাস ছাড়লেন।
“তোর মা, বোন কোথায়?”
“ঝিনাইদা পাঠিয়ে দিয়েছি।”
“তোর মামা রাখলো না?”
শাহরিয়ার উত্তর দিলো না। যা বোঝার বুঝে গেলেন আজাদ। আর কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো না। চোখ বন্ধ করে বললেন, “তোর শ্বশুরকে বলবি আমার দিকে যেন চোরের মতো না তাকায়।”
“তুমিও তো তাকাও।” বিড়বিড় করে বলল শাহরিয়ার। আজাদ শুনতে পেয়ে ঝট করে চোখ খুললেন। শাহরিয়ার তড়িঘড়ি করে বলল, “আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসি।”
বাইরে এসে দেখলো আরমান চেয়ারে বসে আছেন। তার পাশে বিস গুরুতর ভঙ্গিতে শাহরিয়ার বলল, “তোমার মেয়ের শ্বশুর তোমাকে ডাকছে। দ্রুত যাও। যৌতুক টৌতুক চায় নাকি দেখ।”
বিস্মিত আরমানকে পেছনে ফেলে শাহরিয়ার হাসপাতালে থেকে বেরিয়ে গেলো। পকেটে টাকা নেই। আশপাশের কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে ভরপেট খাবে সে। তারপর শ্বশুরকে ফোন দিয়ে এখানে ডেকে বলবে বিল মিটিয়ে দিতে। তার পারিবারিক মা-ম-লার মীমাংসা করার জন্য ছোট্ট উপহার।
জড়তা নিয়ে ভেতরে গেলেন আরমান। নিঃশব্দে বিছানার পাশের চেয়ারে বসলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “ভাই ডাকছিলে?”
আজাদ চোখ খুললেন। আরমানকে সরাসরি সম্বোধন করতে দেখে অবাক হলেন বটে। সেদিন রাতে আবেগের বশে হাত ধরে কেঁদে ফেললেও তারপর আর এমুখো হয়নি আরমান।
“কই না।”
“শাহরিয়ার বলল।”
আজাদ ছেলের কারসাজি বুঝতে পারলেন। ছেলে তার মনের কথা বুঝতে পেরেছে ভেবে ভালো লাগলো। চুপ করে থাকলেন তিনি। আরমান উঠ চলে যেতে চাইলে বললেন, “বস।”
আরমান বসে পড়লেন। আজাদ কিছু বললেন না। তার চোখ ভিজে উঠলো। তাই দেখে আরমান শব্দ করে কাঁদলেন। ভাইয়ের হাত ধরে বললেন, “আমাকে মাফ করে দাও ভাই।”
লজ্জায় আজাদ বলতে পারলেন না বারুদে আগুন তিনিই প্রথম ধরিয়েছিলেন। তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। মনে হলো আরমানের পা ধরে ক্ষমা চাইলে বোধহয় একটু শান্তি লাগতো। যতোটা আক্রোশ সে সম্পত্তি দিয়ে মেটাতে চেয়েছে তার চেয়ে বেশি মিটিয়েছে লোকের কাছে কথা রটিয়ে। আরমানের নামে কতো কথাই না বলেছে সে। আজাদ চোখ বন্ধ করলেন। ম-রে না গেলেও মৃ-ত্যুর স্বাদ পেয়েছেন। এবার ম-রার আগে ভাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে যাবেন। যেভাবেই হোক।
দেশ ছাড়ার এক মাসের মাথায় আবার প্লেনে উঠলো শাহরিয়ার। সুস্থ বাবাকে নিয়ে। প্লেন ছাড়ার আগে মেহরিমার হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিলো সে।
“মিসেস মেহরিমা বিশ্বাস! I am coming!”
~চলমান~
(আজকের মতো 👋🏻)

