“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১৯.
আজাদ বিশ্বাস যখন প্লেন থেকে নামলেন তখন তার মুখে কোনো অনুভূতি নেই। চোখ দুটো কেমন শূন্য হয়ে আছে। সুস্থতার আনন্দ তাকে ছুঁতে না ছুঁতেই তিনি মুখোমুখি হলেন কঠিন সব সত্যের।
নিজেদের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। এই পর্যন্ত আসতে যে ঠিক কতটাকা খরচ করতে হয়েছে সেটা আন্দাজ করতে পারেন। তবে শাহরিয়ার যখন বলল সে দোকান বিক্রি করে দিয়েছে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। এতটাই করুন অবস্থা হয়েছিল তার! আয়নার সামনে দাঁড়ালে প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই পাওয়া যায়। তবু তিনি ভেতর থেকে ভেঙে গেছেন। যখন হিসেব করে বুঝলেন সহায় সম্পদ কিছুই আর তার হাতে নেই তখন প্রকৃতপক্ষেই তার মনে গেঁথে থাকা অহংকারের খুঁটি দশ ফুট জলোচ্ছাসের ধাক্কায় সমূলে উপড়ে গেলো। তিনি অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়লেন। আগমনী জরা এবং অস্ত্রোপচার পরবর্তী দুর্বলতা তাকে একসাথে জেঁকে ধরলো। প্লেন থেকে নয় আজাদ বিশ্বাস মূলত নেমে গেলেন তার অহংকার দিয়ে বানানো ইমারত থেকে।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে তারা খাওয়া দাওয়া করলো। শাহরিয়ার অনেকক্ষণ ধরেই একটা কথা বলার জন্য উশখুশ করছিল। কিন্তু আজাদ বিশ্বাসের স্তব্ধ রূপ দেখে ঠিক সায় পাচ্ছিল না। আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষমেষ বলেই ফেলল।
“বাবা!” আজাদ বিপরীত পাশে বসে ছিলেন। আরমান বসেছেন শাহরিয়ারের পাশে।
আজাদ বিশ্বাস এক ধ্যানে শূণ্য প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছেন। আরেকটু জোরে ডাকলো শাহরিয়ার।
“বাবা!”
“হুঁ?” আজাদ মুখ তুলে তাকালেন। ঠিক তখনই খেয়াল করলেন আরমানের কপাল আর শাহরিয়ারের কপালে দেখতে একদম এক। মায়ের মতো।
“একটা কথা বলবো।”
“বল।”
“ইয়ে..আমাদের ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়েছি। ভাড়া দেয়াটা টাফ হয়ে যাচ্ছিল। তাই..”
“আচ্ছা।”
শাহরিয়ার অবাক হলো। এমন শান্ত জবাব সে বাবার কাছে আশা করেনি।
“তুমি চাইলে আমরা আপাতত একটা হোটেলে উঠবো। তারপর কাল নাহয় ঝিনাইদহ রওনা দিলাম।” ঘড়ির দিকে দেখলো শাহরিয়ার। দুপুর তিনটা বেজে গেছে।
আজাদ মাথা নাড়লেন, “এখনই যাবো।”
“যেতে পারবে?”
“ইনশাআল্লাহ্।”
পুরোটা সময় আরমান চুপ রইলেন। ভাইকে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। মা মারা যাওয়ার পর আজাদ এরকম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। কি চলছে তার মনে?
●● ●● ●●
পর্বত সিনেমাহলের সামনে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। সেখান ঘন্টাখানেক দেরি হলো। দেরি হলো ফেরিতে উঠতেও। পাটুরিয়া দৌলতদিয়া ঘাটে যখন তারা পৌঁছুলো তখন সাতটা বেজে গেছে। এদিকে আর জ্যাম না থাকলেও বিশাল ফরিদপুর পেরোতেই সময় চলে গেলো। বাড়িতে যখন তারা ঢুকলো তখন রাত সাড়ে দশটা।
আতিয়া বেগম অস্থির হয়ে ছুটছেন। আজকের রান্না তিনি উৎসাহী হয়ে করেছেন। শেলী নিষেধ করেননি। তবে আতিয়ার রান্নার পর তিনিও আরমানের জন্য তার পছন্দের খাবার রান্না করেছেন। মেহরিমা দু চারবার চুলার আশপাশে ঘুরলেও লজ্জায় চুলা পর্যন্ত যেতে পারেনি। তাকে দেখে মেহজাবিন মুখ বাঁকিয়ে বলেছে, “তোর ঢং দেখে বাঁচি না! সেদিন তো রাত্রে বেলা ঠিকই রান্না করে খাওয়ালি। রেজিস্ট্রি ফেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। এখন কার জন্য লজ্জা পাচ্ছিস?”
মেহরিমা উত্তর দিতে পারেনি। সেই রাতে কেউ তো তাকে দেখেনি। আজকে সবাই আশপাশে আছে। সে লজ্জা পেলে এটা কি খুব অস্বাভাবিক হবে?
শাহরিয়ার গোসল করে এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে শুয়ে পড়েছে। আতিয়া হাজার ডেকেও ওঠাতে পারেননি। প্রথমে প্লেন তারপর বাস। তার পুরো শরীরে মনে হচ্ছে জেট ল্যাগ ছড়িয়ে গেছে। না ঘুমালে সে নিশ্চিত পাগল হয়ে যাবে।
মেহরিমা বারোটা পর্যন্ত বসে রইলো। সে আজকে শাহরিয়ারের আনা থ্রি পিসটা পরেছিল। ঢাকা থেকে এনেছিল শাহরিয়ার। মেহজাবিন আর তারটা একই ডিজাইনের। শুধু রং আলাদা।
লজ্জা লজ্জা করে হালকা লিপস্টিকও দিয়েছিল সে। ন্যুড কালার হওয়ায় কেউ তেমন বুঝতে পারেনি। তবে রুমি চোখ রগড়ে বলেছে, “হু হু ভাবিইইই!”
সবাইই তাকে দেখেছে। কিন্তু যেই মানুষটার জন্য তৈরি হয়ে অতো রাত পর্যন্ত বসে রইলো সে একটা কথা পর্যন্ত বলল না। দেখা তো দূরের বিষয়।
অসভ্য লোকটাকে দেখতে একবার উকি দিয়েছিল সে। তাকে তো পায়ই নি। উলটো আজাদ চাচার সামনে পড়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে ফিরে আসতে যেয়ে বারান্দার সিঁড়ির সাথে হোঁচট খেয়েছে। ডান পায়ের কোনার আঙুলটা মনে হয় এবার মরেই যাবে।
আজাদ ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন। আরমানের দরজার বাইরে সিঁড়িতে একটা মেয়ে বসে আছে। মেহরিমা? তিনি তো মেয়েটাকে চেনেন না। ছোটবেলার মুখটাও মনে নেই। মনে রাখার কোনো চেষ্টাই করেননি। কি মনে করে একবার ডাকলেন তিনি।
“মেহরিমা?”
মেহরিমা চমকে তাকালো। একবার ভাবলো উঠে ঘরে চলেই যায়। চাচার সাথে শেষ কবে কথা বলেছে? ওহ সেই ফোন কলে। বিশ্রী ভাষার অপমানগুলো এখনও কানে তরতাজা হয়ে ভাসছে। পরক্ষণেই মনে হলো চলে গেলে সেটা বেয়াদবি হবে। একবার যেয়েই দেখা যাক কি বলেন। নানান চিন্তা করতে করতে এগিয়ে গেলো মেহরিমা।
ঘরের ভেতর থেকে আলো আসছে। এনার্জি বাল্বের সাদা আলো। সেই আলোতে মেহরিমার মুখশ্রী দৃশ্যমান হলো। আজাদ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন মেহরিমার মুখে প্রতিটা কোনা ঠিক তার মায়ের মতো। যেন মা-ই দাঁড়িয়ে আছেন। তার যৌবনকালে।
আজাদ না চাইতেও ডেকে ফেললেন, “মা!”
মেহরিমা অবাক হয়ে তাকালো। আজাদ বিশ্বাস তাকে মা ডাকছে বিশ্বাস হতে চাইলো না। তাকে বিশ্বাস করাতেই বোধহয় আজাদ বারান্দা থেকে নেমে এলেন। অপলক মেহরিমার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন। মেহরিমা চোখ নামালো। একটা মাসের ব্যবধানে কেউ এভাবে পাল্টে যেতে পারে!
আজাদ বিশ্বাস কিছুই বললেন না। বলা ভালো বলতে পারলে না। বারকয়েক মেহরিমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “যাও। ঘরে যাও।”
মেহরিমা দাঁড়ালো না। চপল পায়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। আজাদ তাকিয়েই রইলেন সেদিকে।
মেহরিমার ঘুম আসছিল না। পরিণীতা বইটা হাতে নিয়ে টেবিলে বসলো। ঘরের লাইট তখন বন্ধ হয়েছে। কেবল জ্বলছে টেবিল ল্যাম্পের হলুদাভ আলো। একসময় বইয়ের উপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেলো সে।
রাত দুটোর দিকে ফোনটা চিৎকার করে উঠল। ধড়ফড় করে উঠলো মেহরিমা। সাথে সাথেই কাঁধে টান লাগলো। বেকায়দা ভঙ্গিতে মাথা রাখায় ডান পাশ নাড়াতে পারছে না। ওদিকে ফোন বাজছে বিছানার উপরে।
স্ক্রিনে শাহরিয়ারের নাম দেখতেই সেটা সাইলেন্ট করে রাখলো মেহরিমা। আবার ফোন এলো। এবার মনে হলো সে বোধহয় একটু বেশীই ছেলেমানুষী করছে। এতদূর জার্নি করে এসে মানুষটা ঘুমিয়েছে। উঠে তো ঠিকই তাকে মনে করেছে। ফোন ধরলো সে। শাহরিয়ার বলল, “ঝটপট উঠানে চলে আয় তো।” মেহরিমা কিছু বলার আগেই ফোন কেটে দিলো সে। অগত্যা তাকে উঠানে যেতে হলো।
শাহরিয়ার দুটো মোড়া নিয়ে বসেছে। মেহরিমাকে ইশারা করলো পাশেরটায় বসার জন্য। মেহরিমা কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসল।
“কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“কি করছিলি?”
র-ক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো মেহরিমা। রাত দুটোয় একটা মানুষ কি করবে বলে আশা করে সে?
“পরিণীতা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছি।”
“উউ! ললিতা হওয়ার শখ হয়েছে?”
“আশপাশে কোনো শেখর না থাকলে ললিতা হব কিভাবে?”
“আরে বাদ দে! মেহরিমা শাহরিয়ারই ভালো। তবে তুই চাইলে আমরা ওদের অনেক কিছুই রিক্রিয়েট করতে পারি।”
“যেমন?” ভুরু কুঁচকে তাকালো মেহরিমা।
শাহরিয়ার রহস্য করে বলল, “ছাদের ঐ সিনটাই ধর। আজকেও একই পরিবেশ। নায়ক, নায়িকা জোৎস্না.. আঃ!”
মেহরিমা শাহরিয়ারের হাতে চিমটি দিলো।
“ভালো হবে কবে?”
শাহরিয়ার উত্তর দিলো না। মেহরিমাকে আপাদমস্তক দেখে বলল, “দাঁড়া।”
“কেন?”
“আরে দাঁড়া!”
মেহরিমা দাঁড়ালে ফোনের টর্চ লাইট অন করল শাহরিয়ার। দেখলো মেহরিমার পরনের পোশাক। হেসে বলল, “সুন্দর দেখাচ্ছে।”
মেহরিমা মুখ কালো করলো, “সাজগোজ সব বাসি হয়ে গেছে।”
মেহরিমার হাত ধরে বসালো শাহরিয়ার, “তাও সুন্দর লাগছে।”
কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেলো। শাহরিয়ার বলল, “মেহু আমি তো চাকরি পেলাম না।”
“পরীক্ষাই তো দিলে না। আরে দেখো! হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্!”
“হুঁ।” অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে উত্তর দিলো শাহরিয়ার।
~চলমান~

