#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
#বিশেষ_পর্ব — ০২
কার্তিকের রৌদ্রস্নাত দুপুর। শহরের কোলাহল আর ব্যস্ততাকে ক্ষণিকের জন্য একপাশে সরিয়ে রেখে আজ বহুদিন পর নীলক্ষেতে এসেছে শিথিল, প্রয়োজনীয় বইয়ের সন্ধানে। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেলো টেরই পায়নি সে।
বই কিনে দোকান থেকে থলে হাতে বেরিয়ে কিছুদূর হেঁটে যেতেই একটি পরিচিত মুখের দেখা পেয়ে থেমে যেতে হলো তাকে। অধরে ফুটে উঠল এক চিলতে মৃদু হাসি। সবসময়কার মতো হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠল,“আরেহ, ডাক্তার ম্যাডাম যে!”
সুশ্রীর চোখ জোড়ায় প্রবল বিস্ময়। কিছু মুহূর্তের জন্য বোধহয় সময়টা থেমে গেলো। থেমে গেলো তার সকল অনুভূতি আর হৃদ স্পন্দন।নিজেকে সামলে নিতে নিতে শিথিলই পুনরায় বললো,“বহুদিন পর দেখা হলো। তা হঠাৎ এ পথে?”
এবারেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারলো না সুশ্রী। সময় বদলেছে, বদলেছে পরিস্থিতিও। এখন চাইলেই আর এই পুরুষটিকে নিজের মতো করে ভালোবাসতে পারে না সে। পারে না তাকে নিয়ে ভাবতেও। গত দুইটা মাস কতটা কষ্টের মধ্য দিয়েই না গিয়েছে সে! বুকে দুঃখ লুকিয়ে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে হাসিমুখে। সেই পুরোনো ঘা এখনো ভালো করে শুকায়নি। তার মধ্যেই আবার এই আকস্মিক দেখা? আবার সেই মুখ? উফ! এই মুহূর্ত থেকে নিস্তার পাবে কী করে মেয়েটা? চোখে অশ্রু জমলো সুশ্রীর। সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে কৃত্রিম হেসে বললো,“ক্লাস ডিসমিস হয়ে গিয়েছে। তাই এদিকে চলে এলাম। তাছাড়া কিছু বইয়েরও প্রয়োজন ছিল। তা কেমন আছেন? দিনকাল কেমন চলছে, শিথিল ভাই?”
নামটা উচ্চারণ করতে গিয়েও সুশ্রী টের পেলো তার বুক কাঁপছে। বুকে নেমে এসেছে উচাটন। সামনের মানুষটাও কী টের পেলো তা? বোধহয় না। সে সুশ্রীর কিছুই টের পায় না। পেলে তো আবৃত্তির বদলে তাকেই বেছে নিতো, তাই না? শিথিল প্রত্যুত্তর করল, “আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমার কী অবস্থা?”
“আলহামদুলিল্লাহ।” মুখে মিথ্যে হাসি। তবুও কণ্ঠে কি জোর! অথচ মেয়েটা একদম ভালো নেই। যেই ভালো না থাকার কথাটা একান্তই তার ব্যক্তিগত। যা কাউকে বলা যায় না।
“বাড়ির সবাই কেমন আছে?”
“তারাও ভালো। সকলেই নিজেদের জীবনে ভালো আছে।” থেমে বললো,“আম্মুর উপর আর রাগ করে থাকবেন না। সময় করে বাসায় আসুন একদিন। আম্মু কিন্তু আপনার উপরে রেগে নেই। কখনোই রেগে ছিল না।”
“হুম, জানি। তা তুমি আজকাল যোগাযোগ করো না যে? আমার সঙ্গে না করার কারণ থাকলেও বোনের সঙ্গে তো নেই। তার সঙ্গে অন্তত যোগাযোগ করা উচিত। কথা বলা উচিত। সম্পর্ক এড়িয়ে গেলে, অযত্ন করলে তাতে একসময় মরীচিকা আস্তানা গেড়ে বসে। জানো তো?”
মাথা নাড়ায় সুশ্রী। অজানা শঙ্কায় ভীত হয় মন। এটা কী বললো শিথিল? তার সঙ্গে যোগাযোগ না করার কারণ আছে মানে? কোন কারণ? কোনোভাবে কী তার গোপন কথাটা জেনে গেলো? না, না! এ কথাগুলো সুশ্রীর নিজের। এগুলো কাউকে জানতে দেওয়া চলবে না। মানুষের চোখে সে ছোটো হতে চায় না।হেরে যাওয়া ব্যর্থ নারী হয়ে বাঁচতে চায় না। কিন্তু তার চিন্তাকে ডাল পালা হয়ে মেলতে দেওয়া হলো না। শিথিল বললো, “এই যে না জানিয়ে আচমকা বিয়ে করে নিলাম তোমার বোনকে! সেই জন্য যে তুমি রেগে আছো আমি জানি। এই জন্যই তো যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছো, তাই না?”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সুশ্রী। জোরপূর্বক হেসে আবার মাথা নাড়াল। বললো,“তেমন কিছু না। দিনকাল ভীষণ ব্যস্ততায় কাটছে। এবার বলুন, আবৃত্তি কেমন আছে? আপনাদের সংসার কেমন চলছে?”
“আল্লাহর রহমতে আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“জানতাম। আবৃত্তি ভীষণ ভালো, মিষ্টি একটা মেয়ে। যেখানে যাবে সেখানেই নিজের মিষ্টতা ছড়িয়ে দিয়ে আশেপাশের মানুষজনকে আপন করে নেওয়ার এক অলৌকিক ক্ষমতা তার আছে।”
শিথিল মুচকি হাসলো। ঘড়িতে সময় দেখে তাড়া দেখিয়ে বললো,“ব্যস্ততা শেষ হলে ঘুরে যেও। আজ তবে আসি। সাবধানে বাড়ি যেও। আল্লাহ হাফেজ।”
“আল্লাহ হাফেজ।”
বিদায় নিয়ে নির্দ্বিধায় সোজা হেঁটে নিজ গন্তব্যে এগিয়ে গেলো শিথিল। অথচ আজও পেছনে অপেক্ষারত, তৃষ্ণার্ত ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে থাকা মেয়েটির দিকে ফিরেও চাইলো না সে। আটকে রাখা অশ্রু এবার চোখ থেকে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল সুশ্রীর। বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস।বিড়বিড় করে বিষাদ ভরা কণ্ঠে সে বললো,“এই পুরুষটা আমার হলেও তো পারতো। অথচ সে আমার নয়, সে আজ অন্যকারো।”
চোখের পানি মুছে নিজেকে শক্ত করল সে। বইয়ের দোকানে আর না গিয়ে ধরলো বাড়ির পথ। শরীর তার কাঁপছে। আজকাল হুটহাট মেয়েটার প্যানিক অ্যাটাক হয়। হাত দুটো কি বাজেভাবে যে কাঁপে! মাঝেমধ্যে নিজেকে সামলাতে পারে না। এসব দেখে মা তাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। কতবার যে ডাক্তার দেখিয়েছেন! তবুও সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেননি না। তাই শেষমেশ ভেবে নিয়েছেন, অতিরিক্ত লেখাপড়ার চাপ সহ্য করতে না পেরেই হয়তো মেয়ের আজ এই অবস্থা। তাই পরিচিত, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পত্রিকাসহ সব মাধ্যম ঘেঁটে শুধু সন্ধান চালাচ্ছেন মেয়ের জন্য সুযোগ্য পাত্র।
সুশ্রীর ধারণা, কদিন আগে মা কোনো এক হুজুরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনিই হয়তো এই পরামর্শ উনাকে দিয়েছেন। তারপর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে মায়ের বিয়ে নিয়ে বিরামহীন ঘ্যানঘ্যান। বাবা অবশ্য এতে একেবারেই রাজি নন। তিনি বলে দিয়েছেন,“মেয়ের আগে লেখাপড়া শেষ হবে, তারপর বিয়ে।”
কিন্তু মায়েরা কী আর সন্তানের ব্যাপারে সহজে কারো কথা শোনে? উনার মতে, মেয়ের জন্য এখন একজন যোগ্য জীবনসঙ্গীর প্রয়োজন। যে উনার মেয়েটাকে আগলে নিয়ে সকল সমস্যা উদ্ঘাটন করে একে একে বের করবে তার সমাধান। কিন্তু মাকে কে বোঝাবে, এমন ছেলে পাওয়া আজকাল মুশকিল। তবুও সব বায়োডাটা ঘেঁটে তিনজনকে ভীষণ মনে ধরেছে উনার। তাদের ছবি উল্টো হয়ে পড়ে রয়েছে সুশ্রীর ড্রেসিং টেবিলের উপর। সামান্য কৌতূহল নিয়েও সে তাদের মুখখানা দেখেনি। যেখানে মন কাননে অন্য কারো বাস সেখানে অযথা আরেকজনকে দেখে কী করবে? ভালোবাসা, অনুভূতি কী এত সহজে বদলায়? তাছাড়া পুরোনো মানুষটাকে ভুলতেও তো একটু সময় লাগে নাকি? ইদানিং তাদের মধ্য থেকেই এক ছেলে তাকে ভীষণ জ্বালাতন করছে। হুটহাট সময়ে অসময়ে ম্যাসেজ দিয়ে দায়ের করছে অভিযোগ। এই যেমন গতকাল রাতেই ম্যাসেজ দিয়ে বললো,“এই যে, কঠোর নারী সুশ্রী! আপনার কী মনে হচ্ছে না আপনি এই ছেলেটার উপর ভীষণ অবিচার করছেন? আপনার অবিচারের কারণে সুস্থ, সবল এক ছেলে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পরিণত হচ্ছে রোগীতে। হবু ডাক্তার হিসেবে কী রোগীদের রোগ সারানো আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?”
সুশ্রী রিপ্লাই দিলো,“কী রোগ? কেমন রোগ?”
“এই ধরুন প্রেমের রোগ, মনের রোগ।”
এরপর আর রিপ্লাই দেয়নি মেয়েটা। সুশ্রী বোঝেনা, এই সঠিক মানুষগুলো দেরিতে কেনো আমাদের জীবনে আসে? কেনো আমাদের অনুভূতিগুলো ভুল মানুষের জন্য জন্মায়? আমরা তাকেই কেনো ভালোবাসি, যারা আমাদের ভালোবাসে না? আর কেনোই বা সময় থাকতে নিজেদের ভালোবাসা, অনুভূতির কথা আমরা সেই মানুষটিকে জানাতে পারি না? কীসের এত বাঁধা? কেনো আমরা একা একা কষ্ট পাই?
অথচ প্রশ্নের উত্তর মেলে না। ভীষণ কঠিন প্রশ্ন যে!
_______
রাস্তা পেরিয়ে হাতের ইশারায় রিক্সা থামিয়ে তাতে উঠে বসলো শিথিল। হঠাৎ আসা ঝড়ো হাওয়ার মতো তার মনাকাশে মেঘ জমেছে। কালো, ভয়ানক সেই মেঘ! চলন্ত রিক্সায় বসে তার মস্তিষ্কে গুমরে ওঠে চরম এক অপরাধবোধ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,“তোমাকে ভালোবাসতে না পারার অপরাধে আমায় মাফ করে দিও, সুশ্রী। তুমি শুধু ভালো থেকো। তোমার জীবনের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট আর আমার প্রতি সেই একপাক্ষিক অনুভূতিগুলো ধুয়ে যাক কোনো এক আশ্চর্য মায়ার বলয়ে। প্রার্থনা করি, স্রষ্টা তোমার জীবনে একজন চমৎকার মানুষ পাঠাক। যে তোমায় ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে আগলে নিবে।ভুলিয়ে দেবে সমস্ত দুঃখ, বেদনা আর অপূর্ণতা। যে দিতে পারবে তোমায় সঠিক ভালোবাসা প্রাপ্তির সুখ আর আনন্দ। তুমি শুধু ভালো থেকো, মেয়ে।”
চোখ বন্ধ করে হতাশামিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। হঠাৎ করেই ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার। অপরাধবোধে ভারি হয়ে উঠেছে বুক। মানুষের চোখ আর মন পড়তে না পারলেও এক মেয়ের অনুভূতির কথা জানতে, বুঝতে পারবে না এতোটা অবুঝ বা বোকা তো শিথিল নয়। শিথিল বুদ্ধিমান পুরুষ। মানুষকে নিখুঁতভাবে এড়িয়ে চলা এবং নিজের আবেগ, অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল তার নখদর্পণে। তাই সুশ্রীর একতরফা ভালোবাসার কথাও সে জানে। বহুদিন, মাস, বছর আগে থেকেই জানতো। শুধু জানতো না তার গভীরতা।
আর সুশ্রী? নিজেকে চতুর মনে করলেও আপাদমস্তক এক বোকা নারী ছিল সে। নিজের প্রেমকে সে লুকিয়ে রাখতে পারার জন্য দম্ভ করলেও আসলেই কী সে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল? উহু পারেনি। যেমন পারেনি ছোটো বোন মিশমির কাছে তেমনি পারেনি ওই পুরুষটির কাছেও। ঠিক অজান্তেই ধরা পড়া গিয়েছিল সে।
তখন পুরোদমে মেয়েটার এডমিশন প্রস্তুতি চলছে। পেয়ে গিয়েছে মেডিকেলে চান্স। কিন্তু বাবা মোজাম্মেল হোসেনের মন তাতেও ভরলো না। মেয়েকে ইঞ্জিনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পরীক্ষা দেওয়াবেন। নইলে আত্মীয়দের কাছে বুক ফুলিয়ে বলবেন কীভাবে? তাই সুশ্রীর প্রস্তুতি থামলো না। সেই সময়েই শিথিল খেয়াল করল অত্যন্ত মেধাবী, কোচিংয়ে দৌড়ানোর সাথে সাথে বাড়িতে আলাদা গৃহশিক্ষক থাকার পরেও মেয়েটা তাকে ম্যাসেজ বা কল দিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান চাইছে। যার মধ্যে সহজ প্রশ্নও ছিল অনেক।
শিথিল প্রাপ্তবয়স্ক, যুবক পুরুষ। তাই সে বুঝলো, সুশ্রী বিভিন্ন বাহানায় তার সাথে কথা বলতে চাইছে, আলাপ দীর্ঘ করতে চাইছে। তবু বুঝেও কিছু বললো না, এমনকি এড়িয়েও গেলো না। পাছে যদি পরীক্ষা খারাপ হয়? এরপর ধীরে ধীরে সমস্ত পরীক্ষায় সে বেশ ভালোভাবেই উর্ত্তীণ হলো। বুয়েট বাদে বেশ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেলো সাবজেক্ট। হলো বাবার গর্ব।কিন্তু ভর্তি হতে হলো তাকে সেই মেডিকেলেই।
শিথিলও একসময় কথা কমিয়ে দিলো। ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের লেখাপড়া, বন্ধু, ক্যাম্পাস, টিউশন আর ব্যক্তিগত জীবনে। সুশ্রীর কিশোরী মনে তখন সদ্য প্রেমে পড়ার ঝড়। স্যোশাল মিডিয়ায় প্রিয় পুরুষকে না পেয়ে ক্লাস বয়কট করে তার দেখা মিলতে লাগলো বুয়েট চত্বরে। কখনো দূর থেকে দেখতো, কখনো দেখা পেতো না, আবার কখনো বা দেখা হয়ে গেলেও ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকতো মন। শিথিল সেই ছলা কলা, হাবভাব বুঝে গেলো। নিশ্চিত হলো, রূপবতী মেয়েটি তার প্রেমে পড়েছে। এবার আর শিথিল প্রশ্রয় দিলো না। কৈশোরের আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। এই সময় মানুষ ভুল করে। কিন্তু সুশ্রীর ভুল করা মানায় না। একবার ভাবলো সরাসরি বুঝিয়ে বলবে, কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলালো। যদি মেয়েটা জেনে যায় শিথিল সব বুঝে গিয়েছে! তাহলে যদি পাগলামী প্রকাশ্যে শুরু করে দেয়? তখন? তখন কী করে তাকে আটকাবে শিথিল?
পুরুষ মানুষ গোটা পৃথিবীকে এড়িয়ে চলতে পারলেও অত্যন্ত রূপবতী নারীদের এড়িয়ে চলতে পারে না। পারে না তাদের প্রেম, পাগলামিকে হেলায় ফেলে দিতে। সেই ভয় তো শিথিল নামক প্রেম, ভালোবাসা বিরোধী যুবকেরও ছিল। তাই সে সরাসরি বললো না কিছু। বরং সুযোগ বুঝে একদিন খপ করে পেছন থেকে ধরে তুলে ফেলল বেশ কতক ছবি। মোবাইল ঘুরাতে ঘুরাতে বলে উঠল,“প্রমাণ জোগাড় করা ডান। এবার এটা আন্টিকে দেখিয়ে বলবো, তোমার মেয়ে ডাক্তারি পড়ায় ফাঁকি দিয়ে ঢাকা শহর চষে বেড়াচ্ছে। এত ফাঁকিবাজি কেনো ছোটো বোন?”
সুশ্রী আঁতকে উঠল। ভীত, কাঁপা হাতে মোবাইল কেড়ে নিয়ে প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা চালালো কিন্তু পারলো না। নিজের থেকে লম্বা, সবল ছেলের সঙ্গে কী পেরে ওঠা যায়? সেদিন দুজনে একসঙ্গে হাঁটলো। মগবাজার লেকে নৌকায় চড়ল। শিথিল মেয়েটিকে বুঝিয়ে বললো,“মন দিয়ে লেখাপড়া করো, সুশ্রী। এই বয়সে কারো প্রেমে পড় না। প্রেম শব্দটা উচ্চারণে খুব সহজ হলেও এর ভার অসহনীয়। তা সামলানোর মতো বয়স এখনো তোমার হয়নি। আর কখনো ক্লাসে ফাঁকি দিও না। তুমি মেধাবী মেয়ে। বাবা-মায়ের তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। তোমারও তো স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। এতদূর আসতেও কম পরিশ্রম করোনি। তাহলে কেনো পরিশ্রমকে বিফলে যেতে দিতে চাইছো?”
আরো কত গম্ভীর গম্ভীর কথা সে বললো! সুশ্রী মুগ্ধ হয়ে নিরব শ্রোতার মতো শুধু শুনলো। মেনেও নিলো। তার মনে আরো গভীরভাবে একচ্ছত্র জায়গা দখল করে নিলো যুবকটি। অথচ তা সে জানতেই পারলো না। এরপর সময় পেরোলো। হুটহাট সুশ্রীর ফাঁকিবাজি, ক্লাস মিস দেওয়া থেমে গেলো। সেই একই অনুভূতি ভিন্নভাবে আবারো টের পেলো শিথিল। তবে বহু মাস পর। সেদিনও সুশ্রী হঠাৎ করে এলো তার বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। তবে লুকিয়ে নয়, বরং এবার তাকে জানিয়ে। বাহানা দিলো মা খাবার পাঠিয়েছে। কিন্তু তার সাজগোজের সামনে এই মিথ্যেটাও চতুর যুবক শিথিলের কাছে খাটলো না। সে ধরে ফেলল ওই লাজুক মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমস্ত অনুভূতি। তাই ভয়ে পিছু ফিরে আর চাইলো না। রূপবতীর প্রেমে পড়ে যাওয়ার ভয়ে। সেই রাতে তার ঘুম এলো না। বরং কাটলো নিদ্রাহীন।
মন বললো, মেয়েটাকে নিজের করে নে। কিন্তু মস্তিষ্ক বললো, এই ভুল করিস না শিথিল। এই মেয়ে সে নয় যাকে তুই চাস। এই মেয়ে তোর অপূর্ণতা, অপ্রাপ্তি কিছুতেই পূর্ণ করতে পারবে না।
কথা সত্য। শিথিলের জীবনের বড়ো অপূর্ণতা ছিল তার মা। অপ্রাপ্তি মায়ের আঁচল, মমতা, আদর আর যত্ন। বাবা বহুবার মায়ের স্থান পূরণ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। তবে বাবা হিসেবে তিনি অনন্য। আর এই অনন্য বাবার জন্যই তো তার আর আবৃত্তির নিয়তি ছিল ভিন্ন। বেঁচে থাকা ছিল ভিন্ন।
অপরদিকে সুশ্রী? সে তো পরিপূর্ণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা নিজ ক্যারিয়ার নিয়ে আত্মসচেতন নারী। মায়ের আদর, মমতার অভাব কী তা সে জানে না। বরং বাবা-মায়ের ভীষণ আদরের কন্যা। সে কী করে বুঝবে শিথিলকে? কী বুঝবে শিথিলের সংসার? কে বোঝাবে, ভালোবাসা আর সংসার এক জিনিস নয়। ডাক্তার হয়ে রোগীর সেবা করেও পুরোদস্তুর সংসারী হতে পারবে? এত সহজ? আর শিথিলই বা তা কী করে হতে দিতো? এক নারীর উপর এত চাপ মানায়? তার উপর আরেক কারণ হচ্ছে শাহিনূর। ভদ্রমহিলা আশেপাশের সবাইকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পছন্দ করেন। নিজের মতামত অন্যের উপরে চাপিয়ে দেওয়ার স্বভাব ছোটো থেকেই। শিথিল সেটা খুব ভালো করেই জানে। তাই তো বহুবার নানা বাহানায় এড়িয়ে যেতো উনাকে। কিন্তু উনার মেয়ে জামাতা হওয়ার পর কী আর সেই বাহানা খাটতো? না, খাটতো না। বরং স্বাধীনচেতা শিথিলের জীবনের নিয়ন্ত্রন চলে যেতো অন্যের হাতে। সুশ্রীও তো ধনী বাবা-মায়ের বাধ্য সন্তান। তার উপরেও শিথিলের অধিকার খাটতো না। অথচ তাকে পাওয়া ছিল ভীষণ সহজ।
শিথিলের এই যুক্তি শুনে কেউ হয়তো হাসবে, ঠাট্টা করবে, কটাক্ষ ছুঁড়ে দেবে, কেউ বা আবার চুপিচুপি বিরক্তি ঝাড়বে। তবে শিথিলের তাতে কিছু যায় আসে না। সে মানুষকে বরাবরই গুরুত্ব দেয় কম। সংসার জীবনে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে, মানসিক দ্বন্দ্ব আর অশান্তি থেকে বাঁচতে যখন সে ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘরে ফিরে যত্নশীল, মায়াময়, পুরোদস্তুর এক বধূকে খুঁজে না পেয়ে হতাশ হবে তখন কী সেই মানুষেরা এসে তার সমস্যার সমাধান করে দিয়ে যাবে? নাকি তার হতাশা, অশান্তি, ক্লান্তি দূর করে দিতে মাথা রাখার জন্য কোল পেতে দিয়ে সান্ত্বনা দিবে? উহু, তা দিবে না। মানুষের কাজ অনধিকার চর্চা করা, অন্যের ভুল ধরা, অন্যের মতামত, পছন্দ-অপছন্দকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। মানুষ শুধু নিজের সুবিধার সময় পাশে থাকে, আর বাকি সময় কাটে সমালোচনায়।
একথা বহুবার বাবা তাকে বলেছেন। এও বলেছেন, “সর্বদা নিজের বিবেক আর মস্তিষ্কের কথা শুনবি, শিথিল। কে কী ভাবলো তা গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। লোকের কাজই তো শুধু বলা। তাই ওদের বলতে দিয়ে তুই অন্যমনস্ক হয়ে যা। যা ইচ্ছা তাই কর। শুধু করার আগে হারাম, হালাল দেখে নিস, বাবা। কখনো আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করিস না। দেখিস, কেউ যাতে তোর মাধ্যমে ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।”
কথাগুলো খুব ভালোভাবেই প্রভাবিত করে শিথিলকে। তাই সে মেনে নিয়েছে। এমনকি সেদিনও সে ভাবনায় পড়ল। দ্বিধা আর অস্থিরতায় গা ভাসিয়ে পরদিন সকালের ট্রেনে ফিরে এলো বাড়ি। তার জীবনের সমস্ত জটিল সমাধান একমাত্র বাবার কাছেই থাকে। বাবার সঙ্গে কথা বললেই মন ভালো হয়ে যায়। এবারেও তাই হলো। বাবার সঙ্গে শিথিলের সম্পর্কের গভীরতা আরো গাঢ় হয়েছিল সুহাসিনীর বিয়ের পর। সুহাসিনী বাড়ি ছাড়ার পর বাপ-ছেলে হয়ে গেলো একেবারে একা। ভবঘুরে হারুন চাচা তো কখন কোথায় যায়, কী করে তা নিজেই জানে না। ওই সময়ে নিয়ম করে দুজনার কথা হতে লাগলো। আগেও হতো তবে লেখাপড়ার বিষয়ে। যতক্ষণ হামিদুল হক বাড়িতে থাকতেন ছেলের হাতে ধরিয়ে দিতেন বই। পাঠ্যবই, ডিকশনারি, ইংরেজি সাহিত্য, হাদিস আর ধর্মীয় বই। কিন্তু এবার সেসবের বাইরে গিয়েও কথা হতে লাগলো। বেশি কথা হতো মাকে নিয়ে, দুনিয়া নিয়ে, মানুষ নিয়ে, পরকাল নিয়ে।
মেঘমেদুর দিনগুলোতে বারান্দা কিংবা জানালার ধারে বসে বাবা-ছেলের জম্পেশ চায়ের আড্ডা বসতো। শিথিল শ্রোতার মতো শুনতো আর মুগ্ধ হতো। বাবা খুব চমৎকার করে গল্প বলেন। যা শুনে যে কেউই কল্পনায় হারিয়ে যেতে বাধ্য। শিথিলও কল্পনায় হারিয়ে যেতো। তার কল্পনার বিস্তর জায়গা জুড়ে ছিল তার মা। মাকে সে সরাসরি না দেখলেও ছবিতে দেখেছে। বর্ণনা শুনেছে বাবার মুখে। মায়ের বর্ণনা বাবা খুব কোমল স্বরে করতেন। হাসির বর্ণনা, চোখের বর্ণনা, রান্নাবান্না আর সংসার সামলানোর বর্ণনা। যেসব শুনে মাকে কল্পনায় এঁকে ফেলল শিথিল। রোজ নিয়ম করে গল্প করা শুরু করল। শূন্য বাড়িতে ফিরে একা একাই হাসতো, মায়ের কাছে অভিযোগ জানাতো। কিন্তু হামিদুল হক কী তা কখনো জানতে পেরেছেন?
বাড়ির সামনে চন্দ্রপ্রভা গাছটাকে হলুদ ফুল নিয়ে দোল খেতে দেখলেই মনে হতো, মা হাসছে! তাই বাড়ি থাকাকালীন রোজ নিয়ম করে গাছের যত্ন নিতো শিথিল। এটাও বাবাকে দেখেই শিখেছে। বাবা এখনো মায়ের ছোটো ছোটো বিষয়ও মনে রেখে যত্ন করে সামলে রেখেছেন।
তাই তো সুশ্রীর বেলায় যেখানে মনকে হার মানিয়ে মস্তিষ্কের কথা শুনেছিল সেখানে সেই একই শিথিল আর আবৃত্তির বেলায় তা পারলো না। প্রথমবার সে মেয়েটিকে ভুলে গেলেও বছর দেড়েক পর আর ভুলতে পারলো না। ওই চন্দ্রিমা উদ্যানে মেয়েটির ভিন্ন রূপ, হাসি আর কাজল কালো চোখ দেখে শিথিলের মস্তিষ্কে ভেসে উঠল কল্পনায় গড়ে তোলা ‘আসমা’। কিন্তু এ তো কল্পনা নয়, এ তো বাস্তব। আর বাস্তব যখন কল্পনার মতো সুন্দর হয়ে ধরা দেয়, তখন তা উপেক্ষা করা হয়ে পড়ে কঠিন। এরপর না চাইতেও শিথিল ভাবতে বসলো। শোয়ার জন্য কোল— যেখানে মাথা রাখলে সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। মমতার হাত— যা মাথায় ছোঁয়ালে সমস্ত বিষাদ সরে যায়। সামান্য যত্ন, আদরের লোভ শিথিলকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। বাবা বলেছিলেন,‘লোভ জিনিসটা খুব খারাপ রে, শিথিল!’
সেদিন সেই কথাটা হাড়ে হাড়ে টের পেলো শিথিল। কিন্তু পিছিয়ে আসা যে অসম্ভব! বাবা তার আদর্শ। বাবার ব্যক্তিত্বই তো পেয়েছে সে। তাই প্রেম, ভালোবাসা বিরোধী শিথিল প্রেমে পড়ে গেলো শ্যামরঙা, চোখে একরাশ মায়া নিয়ে বসে থাকা আবৃত্তি মেয়েটির। যেখান থেকে সরে আসা যায় না। তারপর সে দেখলো মেয়েটার কেউ নেই। শিথিল স্বার্থপর হয়ে উঠল। মস্তিষ্ক বললো, ‘এই হচ্ছে সেই! হ্যাঁ শিথিল, এই মেয়েই সেই, যাকে তুই চাস। এই তোর অপূর্ণতা পূর্ণ করে অপ্রাপ্তির খাতা বন্ধ করে দিতে পারবে। পারবে তোকে নিজের করে নিতে।’ শিথিলের সিদ্ধান্ত আরো পাকাপোক্ত হলো যখন সে জানলো, মেয়েটিরও চন্দ্রপ্রভা প্রিয়।
কি কাকতালীয় ব্যাপার! শিথিলের খুশি যেন আর ধরে না। তার কাছে চন্দ্রপ্রভা শুধুই একটি ফুল নয়। বরং মেঘমেদুর দিনে জন্মানো সকল ভালোবাসার প্রতীক চন্দ্রপ্রভা।
রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ধীর পায়ে বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো শিথিল। আজ এই প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে উপরে উঠতে তার ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু এই ক্লান্তির ওষুধ যে উপরেই তার অপেক্ষায় বসে আছে। অনেক কষ্টে দরজা পর্যন্ত এসে কলিং বেল চাপলো সে। আজ দেরি হলো না দরজা খুলতে। বরং দরজা খুলে বেরিয়ে এলো এক অপরূপা নারী। যার দিকে তাকালে শিথিলের মনে হয়, পৃথিবীর সব মায়া বুঝি ঠিক এখানেই এসে থেমে যায়। মুছে যায় জীবনের সকল জটিলতা। আবৃত্তি স্বামীর হাত থেকে বই ভর্তি ভারি ব্যাগ আর চা পাতা, গুঁড়া দুধের প্যাকেটটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো রাখতে। শিথিল চুপচাপ ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। জুতা খুলে রাখলো একপাশে। ড্রয়িং রুম পর্যন্ত পৌঁছাতেই পেয়ে গেলো ঠান্ডা পানি ভর্তি গ্লাস। তা খেয়ে সে গলা ভেজালো। কিছু না ভেবেই ঘর্মাক্ত শরীরে জড়িয়ে ধরলো স্ত্রীকে।
বিয়ের মাস দুয়েক পেরোনোর পরেও লাজুক আবৃত্তি কেঁপে উঠল। পুতুলের মতো চুপটি করে রইল স্বামীর বাহুডোরে। মেয়েটির স্পর্শে শিথিলের সমস্ত হতাশা, ক্লান্তি ধীরে ধীরে যেন নিঃশেষ হয়ে যেতে লাগলো। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে বুক হালকা হলো। কিছু মুহূর্ত পর তাকে ছেড়ে দিতেই আবৃত্তি মুচকি হেসে বললো, “গোসল সেরে এসো। একসঙ্গে খাবো।”
শিথিল সেকথা শুনলো। ঘরে গিয়ে সোজা পোশাক নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো। আবৃত্তি মাদুর পেতে খাবার বেড়ে বসলো। খাবার টেবিল এখনো কেনা হয়নি। নতুন সংসার। সবকিছু আনতে একটু সময় তো লাগবেই। শিথিল গোসল সেরে এসে খেতে বসলো। আজকের পদ হচ্ছে ঘন করে মুগডাল, চিংড়ি দিয়ে পালংশাক, আর চিতল মাছ ভুনা।
আবৃত্তির রান্না অসাধারণ। এ কয়েকদিনের সংসারে শিথিল তা ভালো করেই বুঝেছে। খেতে খেতে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে কত গল্প যে হয়! খাওয়া শেষে একসঙ্গে সব গোছগাছ করে ঘরে এলো দুজনে। আবৃত্তি বিছানায় বসতেই শিথিল এসে কোমর জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল তার কোলে। আবৃত্তি কিছুই বললো না। বরং পরম যত্নে নিজের আঙুলগুলো চালাতে লাগলো চুলের ভাঁজে। কয়েক মুহূর্তের নিরবতার পর ভেসে এলো তার মৃদু রিনরিনে কণ্ঠস্বর থেকে প্রশ্ন,“শরীর খারাপ লাগছে? সেই কোন ভোরে ঘুম থেকে উঠেছো। এখন বরং একটু ঘুমিয়ে নাও। ভালো লাগবে।”
শিথিলের বাঁধন শক্ত হলো। নরম শাড়িতে মুখ ঘষলো। তার অপরাধবোধ আচমকাই মিলিয়ে গেলো কোথাও। মন, মস্তিষ্ক একসঙ্গে বলে উঠল,“তুই কোনো ভুল করিসনি, শিথিল। তুই একেবারে সঠিক মানুষটাকেই বেছে নিয়েছিস, ভালোবেসেছিস। এই সুখ, এই স্পর্শ, এই আহ্লাদ, যত্ন তোর নিয়তিতেই ছিল। তুই ঠিক, শিথিল। তুই ঠিক। তুই পরিপূর্ণ আজ। শিথিলদের পাওয়ার অধিকার শুধু আবৃত্তিদেরই আছে।”
তৃপ্তির হাসি হাসলো শিথিল। মুখ তুলে তাকালো ওই সুন্দর চোখ দুটোয়। বললো,“ঘুমালে চলবে না এখন। আজ তিনটা টিউশনি আছে। ফিরতে কিছুটা রাত হতে পারে। তাই এই আধ ঘণ্টা আমি এখানে শুয়ে থাকবো। বিরক্ত করবে না একদম।”
কথা শেষ করে পূর্বের মতো শুয়ে রইল শিথিল। আবৃত্তি এবারো কিছু বললো না। ছেলেটার জন্য ভীষণ মায়া হয় তার। বিয়ের পর থেকেই ছেলেটাকে ভীষণ পরিশ্রম করতে দেখছে। মাঝেমধ্যে তো রাতেও ঠিকমতো ঘুমায় না। সারাদিন ভার্সিটি, ক্লাস, টিউশনে দৌড়ায়। রাত হলে বসে পড়ার টেবিলে। কীসব থিসিস নাকি করে। আবৃত্তির মনে হয়, শিথিল হয়তো একটু তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। নিজের ক্যারিয়ার গোছাতে গিয়ে সংসারের দায়িত্ব ভারী পড়ে গিয়েছে তার উপর। অথচ বাবার ভীষণ আদরের ছেলে সে!
কিন্তু মেয়েটা তো জানে না, শিথিলের জীবনে সে ভারী নয় বরং এক যোগ্য সঙ্গিনী, ভরসার স্থল, প্রাপ্তি এবং ভালোবাসা।

