নিজেরই সৎ ভাই মাহিরকে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বসেছে মাতাল পিহু। আকস্মিক ঘটনায় বাকরুদ্ধ ছাদে থাকা সকল কাজিন।
ওষ্ঠজোড়া থেকে ওষ্ঠ সরিয়ে পিহু মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির রীতিমতো হতভম্ব হয়ে , নিজের সামনে থাকা মাতাল পিহুকে দেখছে। পিহু দাঁড়িয়ে থেকেও হেলছে দুলছে ! মাহিরের বুকে , পিহুর দু’হাত। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে পিহু সুধালো ,
— “মা…মাহির ভাই ! আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি!”
চৌদ্দ বছরের কিশোরীর সম্পূর্ন কথা শুনতেও পায়নি মাহির। সব কিছু কেমন ঘোলাটে ঠেকছে তার কাছে। অস্থির লাগছে। মুহূর্তেই পিহুর সামনে থাকা মাহিরের চোখ বন্ধ হয়ে আসল। মাটিতে লুটিয়ে গেল শরীর !
ছাদে থাকা সকলে “মাহির!” বলে চিৎকার দিয়ে উঠল। নিজের বড় ভাইয়ের কাছে মোহনা দৌড়ে আসল। মাটিতে বসে , নিজের ভাইয়ের মাথা কোলে দিয়ে ডাকতে লাগলে মাহিরকে!
মাহির জ্ঞান হারিয়েছে , পিহুর কাজে। পিহু মোহনার পাশে বসে , চিন্তিত কন্ঠে বলল ,
— “মাহির ভাইয়ার কী হয়েছে , মোহনা আপু?”
মোহনা রেগে , পিহুর বাহু ধরে চেঁচিয়ে উঠল ,
— “কপাল পুড়ি! জন্মের আগেই নিজের বাপ’কে খেলি! তোকে এত ভালোবাসা দিয়ে যে বড় করল , তাকেও খেতে চাইছিস এখন? অপয়া মেয়ে কোথাকার!”
পিহু মুহূর্তেই কেঁদে উঠল মোহনার কথা শুনে ,
— “আমি সত্যিই মাহির ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসি , মোহনা আপু! আমি মাহির ভাইয়ার খারাপ চাই না!”
কথাগুলো বলা শেষ হতে না হতে , পিহুর গালে কষে এক চড় মারল মোহনা! পিহু সামলে নিল মোহনার চাচাতো ভাই রেহান। চেঁচিয়ে উঠল মোহনার ওপর ,
— “শাট আপ , মোহনা! পিহু বাচ্চা মেয়ে , ওর সাথে এরকম ব্যবহার করতে একটুও বিবেকে বাঁধছে না তোমার?”
রেদওয়ানের কথায় , দাঁতে দাঁত পিষে পিহুর দিকে তাকিয়ে রইলো মোহনা। রেদওয়ানের ছোট ভাই রেহান আসল পানি নিয়ে ! মাহিরের মুখে পানি ছিটানো হলো! কয়েক মিনিটেই মাহিরের জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলতে ঝাপসা ঝাপসা পিহু’কে দেখল।
মোহনা রীতিমতো ডেকে যাচ্ছে নিজের আদরের ভাইকে ,
— “মাহির ভাই আমার! ঠিক আছিস তুই ? মাহির…”
মাহির ধীরে ধীরে উঠে বসল। এক মুহূর্ত পিহুকে দেখল। পিহু চোখের পলক ঝাপটিয়ে অসহায় মুখে মাহিরকে দেখছে। মুহূর্তেই মাহির কিছু না বলেই , পিহুর গালে কষে এক চড় মারল।
পিহু হতভম্ব হয়ে তাকালো মাহিরের দিকে। যে মানুষটা তাকে এত আদর করে , সেই মানুষটা তাকে মারল ? পিহুর ঠোঁট ভেঙে কান্না আসল। চেঁচিয়ে উঠল ,
— “সবাই খারাপ! মাহির ভাইয়াও খারাপ! এই দুনিয়ায় আমাকে কেউ ভালোবাসে না!”
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল পিচ্চি মেয়েটা। মাহির দাঁতে দাঁত পিষে দেখল পিহুকে!
রাগে মাহিরের গা জ্বলছে। মুহূর্তেই পিহুর আরেক গালে থাপ্পড় মেরে বসল। পিহু এবার হম্তভম্ব হয়ে গেল।
মাহির রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল ,
— “একদম আমার সামনে এই মেয়েদের রঙ ঢংয়ের কান্না দেখাতে আসবি না! ভালোবাসার কী বুঝিস তুই , বেয়াদব! নির্লজ্জ , বেহায়া মেয়ে! এসব নাটক করতে হলে , আমার সামনে আসবি না তুই । ইডিয়েট কোথাকার!”
মাহির মুহূর্তেই উঠে দাঁড়ালো। কাজিন সবাইকে ঠেলে ছাদ থেকে চলে গেল। মাথাটা গরম হয়ে আসছে তার। আজ রাতটা পার হলে , তার বড় বোন মোহনার বিয়ে।
কিন্তু আজ কী ঘটনাটাই না স্টুপিট’টা করে বসল ?
*
“মাহির ভাই ! ভীষণ রাগ করেছে আমার ওপর , রেদওয়ান ভাইয়া! আমার সাথে আর কথা বলবেন না , উনি!”
কান্না করতে করতে , চেঁচিয়ে বলল পিহু কথাগুলো। রেহান তার পাশে বসল। বড়দের মতো শাসিয়ে বলল ,
— “তোকে কী আমরা স্টুপিট শুধু শুধু বলি ? তুই কী কাজটা করলি জানিস? নিজের ভাইকে কেউ ঠোঁটে চুমু খায় , ইডিয়েট! এখন তো তোর চেহারাও কখনো দেখবে না , মাহির ভাই!”
রেহানের কথা শুনে , আরও জোরে কাঁদতে লাগল পিহু। রেদওয়ান বিরক্ত হলো , নিজের ছোট ভাইয়ের কথা শুনে। পিহু আর রেহান সম বয়সী হওয়ায় , তাদের সম্পর্কটা সাপ নেউলের মতো!
রেহানকে শাসিয়ে উঠল রেদওয়ান ,
— “শাট আপ , রেহান। আর একবার পিহুকে এসব কথা বললে , খবর আছে তোমার!”
কথাটা বলেই থামল এক মুহূর্ত রেদওয়ান। নিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বোন রাহা’র দিকে তাকালো। চাপা কন্ঠে বলল ,
— “রাহা!”
রাহা ধীর কন্ঠে বলল , — “জ্বি , ভাইয়া?”
— “পিহুকে নিজের সাথে নিয়ে যাও ! ঘুম পারিয়ে দাও!”
রাহার ছোট উত্তর , — “ওকে , ভাইয়া!”
“পিহু! এই পিহু! উঠ…আমার কাছে আয়। কাল না মোহনা আপুর বিয়ে? সকালে উঠতে হবে তো তাড়াতাড়ি নাকি!”
কথা গুলো বলতে বলতে রাহা , পিহুর কাছে এগিয়ে আসল। পিহুকে টেনে তুলে , নিয়ে যেতে লাগল।
মেয়েদের মধ্যে রাহা আপুই , তাকে ভীষণ যত্ন নেয়! আদর করে! আর ভাইদের মধ্যে মাহির আর রেদওয়ান! রাহা আর মাহির ভাইয়া আবার সমবয়সীও বটে। রাহা যেতে যেতে রেদওয়ানের শাসানো বাণী শুনল ,
— “আজ যা হলো! সব ভুলে যাবা তোমরা! বড়রা কেউ যেন না জানতে পারে , না হলে বাড়িতে ভীষণ ঝামেলা হবে!”
*
সকালের তখন এগারোটা বেঁজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। পিহুকে বিছানা থেকে টেনে তুলছেন বড় চাচী রাশেদা বেগম ,
— “এই হতচ্ছাড়ি ! আর কত ঘুমাবি? উঠ এবার! আজ না , মোহনার বিয়ে? রেডি হতে হবে না নাকি !”
মায়ের পাশে ভীতু মুখে রাহা দাঁড়িয়ে। পিহু উঠছে না দেখে , এবার রাশেদা বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ,
— “এই মেয়েকে তাড়াতাড়ি উঠিয়ে রেডি কর! আর তুইও রেডি হয়ে যাস কেমন?”
রাহা কিছু বলল না। শুধু মাথা উপর নিচে করল। যার মানে , “হ্যাঁ!” রাশেদা বেগম গট গট পায়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।
রুম থেকে বের হতে যেয়ে , রাশেদা বেগম দরজার সামনে , মাহিরকে দেখলেন। হেসে বললেন ,
— “কী যে মাহির ? তুই এখনও এখানে দাঁড়িয়ে? দেখ দেখ পিহুকে বড় বোনের বিয়ে ! তাও কেমন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে!”
মাহির তখনও পিহুর দিকে তাকিয়ে। চাপা স্বরে বলল ,
— “আপনাকে মিসেস মির্জা ডাকছেন , বড় আম্মু!”
কথাটা শুনেই মুখ কালো হয়ে আসল রাশেদা বেগমের। মাহির এখনও রাশেদা বেগমের ছোট বোন প্রিয়তাকে মা হিসেবে মেনে নেয়নি! রাশেদা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাহিরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন মোহনার রুমে। মোহনাকে রেডি করতে ব্যস্ত মিসেস প্রিয়তা মির্জা!
মাহির এক বার পিহুকে দেখে চলে যেতে নিলে , তার কদম জোড়া থেমে গেল রাহার কথা শুনে ,
— “ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর খেলা , মাহির! তাই না? আমাদের কপালে যারা নেই ! তাদেরকেই আমরা কী চরমভাবে ভালোবেসে ফেলি!”
কথা শুনে মাহিরের বুকটায় যেন রক্ত ক্ষরণ হলো। মাহির কিছু বলল না। ধীর কদমে চলে গেল।
*
বিয়েতে পিহু ভীষণ অস্বস্তিতে পরেছে। কেননা মোহনার বরং স্টেজে বসেও বার বার তার দিকেই তাকিয়ে। বরের নাম আহনাফ চৌধুরী। বরের সাথে আজকে সবার প্রথম পরিচয়! ছেলেটা লন্ডনে থাকত! দেশে ফিরেছে কাল। মাহিরের আব্বু আলভি মির্জা ছেলেকে খুব ভালো করেই চিনেন। তাই তো চোখ বন্ধ করেই , মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন !
কাজী সাহেব বিয়েটা পড়ানো শুরু করতেই ছেলেটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে। মোহনা কবুল’ বললেও
আহনাফ কবুল বলতে পারছে না। হঠাৎই সে বলে উঠল ,
— “আমি এই বিয়ে করতে পারব না , আঙ্কেল! আমার আপনার বড় মেয়ে না ! ছোট মেয়ে পিহুকে চাই!”
চলবে—-
সূচনা পর্ব
#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
২য় পর্ব— https://www.facebook.com/share/p/1atRAxBoWp/

