#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন—০২
#আরোবী_খানস_সিনথিয়া
“মাহির ভাই! আমি ঐ লোককে বিয়ে করতে চাই না , বাঁচান আমাকে!”
“তোকে বাঁচিয়ে আমার লাভ কী , পিহু ?”
“আপনি যা বলবেন , আমি তাই করব!”
“সত্যিই?” — মাহির সবে প্রশ্নটা করেছিল। মাহিরের কোমরের শুভ্র রঙা পাঞ্জাবিটা খামচে ধরে রেখেছে পিহু। ভয়ার্ত মুখে উপর নিচে মাথা নাড়ল! যার মানে , সে কথা শুনবে!
মাহির এক নজর বুলালো পিহুর দিকে , দুপুরের কড়া রোদে মেয়েটির মুখ ঘেমে রক্ত জবার ন্যায় লাল!
এই মেয়েটিকে দেখে কার না মন উতলে আসবে? আহনাফ নামের ছেলেটিরও দোষ দেখছে না মাহির। মানুষ তো দিন শেষে সৌন্দর্যেরই পূজারী হয়ে থাকে।
মাহির যখন পিহুকে এক পলক দেখায় ব্যস্ত , তখন কর্ণকুহুরে আসল আব্বুর পুরুষালী কন্ঠ। আলভি মির্জা ভীষণ রাগী! লোকটা গম্ভীর মুখে বর বেশে থাকা আহনাফ’কে তুচ্ছ করে বলল ,
— “যে ছেলেটা মেয়েদের সম্মান রক্ষা করতে জানে না , সে ছেলের কাছে আমি আলভি মির্জা , আমার কোন মেয়েকেই দিবো না!”
কথাটা বলেই থামলেন আলভি মির্জা। মাহিরের দিকে তাকালেন , মাহির আব্বুর দিকে তাকিয়ে ছিল বিধায় তাদের চাহনি আটকে আসল।
আলভি মির্জা গম্ভীর কন্ঠে বললেন ,
— “মাহির , এই ইডিয়েটকে বিদায় করো পাঁচ মিনিটে! আমি ওর মুখও আর কখনো দেখতে চাই না।”
মাহির মাথা নাড়ালো। মাহির পিহুকে ছেড়ে আহনাফের দিকে এগিয়ে আসল। মাহির আহনাফের বাহু ধরতেই , আহনাফ ভয়ার্ত মুখে বলল ,
— “আমি নিজেই চলে যাচ্ছি ! আমাকে আপনাদের দিয়ে আসা লাগবে না!”
মাহির মৃদু হাসল , — “দিনশেষে পারফেক্ট ডিসিশনটাই নিলেন , আহনাফ চৌধুরী! আমাদেরও সুবিধা করে দিলেন ! থ্যাংক ইউ সো মাচ!”
মাহিরের কথার আগামাথা বুঝল না আহনাফ। মাথা দুলালো! নিজের বাবা মা’কে নিয়ে চলে গেল।
*
মির্জা বাড়ির বাইরের বাগানটায় , বিয়ের প্যান্ডেল সাজানো হয়েছিল। আত্মীয় দিয়েই জায়গাটা পরিপূর্ণ! তার সাথে বিশ্রী ভাবে হচ্ছে সমালোচনা। কেউ বলছে ,
“মোহনার মাঝেই কোন খুঁত ছিল , তাই ছেলেটি শেষে বিয়ে করতে তালবাহানা দেখালো!”
কেউ আবার বলছে , “ছেলেটিই ভালো না! নিজের বিয়েতে আরেক মাইয়ার দিকে নাহলে চোখ যেত কীভাবে?”
স্টেজে ভীষণ গম্ভীর মুখে লাল বেনারসী পরে বসা মোহনা। তার পাশেই বসা রাহা আর প্রিয়তা বেগম।
পিহু স্টেজে উঠে আসল। মোহনাকে সান্ত্বনা দিল ,
—- “মোহনা আপু ! মন খারাপ করো না! লোকটা তোমার যোগ্য ছিল না! তোমার জন্য তো একটা রাজকুমার আসবে ! যে তোমাকে অনেক ভালোবাসবে।”
পিহুর কথাগুলো শুনে , মোহনা যেন আরও রেগে গেল। ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো আরও ক্ষেপে উঠল ,
— “কপাল পুড়ি! আমার সুখ সহ্য হলো না তো তোর ? কেড়ে নিলি তো আমার খুশিগুলো! এত কিছু করেও , লজ্জা করল না একটুও আমার সামনে আসতে , অভাগী একটা!”
মোহনা রীতিমতো যা ইচ্ছে তা বলে এগিয়ে আসল পিহুর দিকে। পিহু পেছাতে যেয়ে , কারো সাথে ধাক্কা খেলো। মোহনাও চুপসে গেল ! বলতে পারল না আর কিছু!
পিহু পেছনে তাকালো। মাহির’কে দেখে , পিহু মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরল মাহির’কে ! চোখ বেয়ে তার অশ্রু গড়িয়ে পরল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ,
— “বিশ্বাস করুন , মাহির ভাইয়া। মোহনা আপুর সাথে এমন কিছু হোক ! আমি কখনো চাই নি!”
মাহির তখনও রাগে মোহনার দিকে , গম্ভীর মুখ করে তাকিয়ে! পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল ,
— “হুম , আমরা জানি । তোর কোন দোষ নেই , পিহু! শান্ত হো!”
পিহু চোখ তুলে তাকালো মাহিরের দিকে। মাহিরের চোখে আটকে গেল সে। পিহুর চোখে বেয়ে গালে , গড়িয়ে পরা অশ্রু মাহির , দুহাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে মুছে দিল। চাপা স্বরে বলল ,
— “রেহান কী করছে দেখ ! আমাদের বড়দের মাঝে কিছু কথা আছে!”
পিহু ছেড়ে দিল মাহিরকে। মাহিরের পেছনে দাঁড়ানো রেদওয়ানকেও দেখল। রেদওয়ানের পাশে দাড়ানো রেহান , দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল ,
— “ছিঁচকাদুনে মেয়ে! সারাক্ষণ কান্না করিস! এখানে আয় , দেখ আমার হাতে কী?”
পিহু তাকালো রেহানের হাতের দিকে। এক বক্স চকলেট দেখে পিহু ,সেটা হাত বাড়িয়ে নিতে গেল। রেহান মুহূর্তেই চকলেট বক্স সরিয়ে ফেলল।
পিহু ভ্রু কুঁচকালো। রেহান মজার ছলে বলল ,
— “দেবো না তোকে !”
কথাটা বলেই রেহান দৌড়ে পালাতে নিল। পিহুও এবার মাহির’কে ছেড়ে রেহানের পিছু নিল। মাহির পিহুকে সতর্ক করল ,
— “পিহু , সাবধানে! পরে টরে ব্যথা পাস না কিন্তু!”
কিন্তু পিহু শুনল না। মাহিরের কাঁধে রেদওয়ান হাত রাখল। মৃদু হেসে বলল ,
—- “ রেহান আছে না , সামলে নিবে তাকে।”
কথাটা শুনে মাহির বিড় বিড় করল ,
— “সেটারই তো ভয়!”
মাহিরকে অন্যমনস্ক দেখে , রেদওয়ান বলল ,
— “কী ভাবছিস তুই ?”
“কিছু না।” — মাহিরের ছোট উত্তর। মাহিরকে নিয়ে রেদওয়ান , মোহনার কাছে আসল। রাহা ভাইয়ের মনের খবর জানে। তাই ভাই আসতেই , মোহনার পাশ থেকে উঠে আসল রাহা। মাহিরের পাশে দাঁড়ালো। রাহা দাঁড়িয়েছে দেখে , মাহির দূরে সরে আসল। রাহা বাঁকা হাসল।
রেদওয়ানকে নিজের পাশে বসতে দেখে , মোহনা কিছুটা অবাক হলো। রেদওয়ান কিছুটা অস্বস্তি ফিল করল। কীভাবে কী বলবে বুঝতে পারল না!
— “মোহনা?”
— “কিছু বলতে চাও , রেদওয়ান?”
— “আমাকে বিয়ে করবে , মোহনা?”
মোহনা বিস্মিত হলো। বিস্ময়ে বলে উঠল ,
— “কী বলছো এসব ? ভেবে বলছো তো ? আমাকে অবলা নারী ভেবো না , রেদওয়ান! আমি ভীষণ স্ট্রং একটা নারী!”
মোহনার কথা শুনে রেদওয়ান ঠাট্টা করে হাসল মৃদু ,
— “এতটা অবুঝ তো তুমি না , মোহনা ! যে , আমার ভালোবাসা দেখবে না!”
মোহনা অস্বস্তিতে পরল। মোহনা সব জেনে বুঝেও রেদওয়ান’কে ইগনোর করছিল শুধু রাশেদা বেগমের জন্য। না হলে , রেদওয়ানের মতো প্রেমিক পুরুষ কে হাতছাড়া করে? রাশেদা বেগম নিশ্চয় পিহু’কে তার ছেলের বউ বানাতে চান ! তাই তো উঠতে বসতে পিহু’র নাম জপেন!
মোহনা দীর্ঘশ্বাস ফেলল , — “আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না , রেদওয়ান। আমি আপনাকে ভালোবাসি না।”
রেদওয়ানের সরল প্রশ্ন , — “তাহলে কী অন্য কাউকে ভালোবাসো?”
মোহনা ডানে বামে মাথা নাড়ল , যার উত্তর , “না।”
ততক্ষণে স্টেজে উঠে আসলেন মির্জা দু’ভাই ; বড় ভাই আলিফ মির্জা , রেদওয়ান , রাহা এবং রেহানের আব্বু! ছোট ভাই আলভি মির্জা , মোহনা আর মাহিরের পিতা । পিহুর সৎ বাবা।
আলিফ মির্জা গলা খাকারি দিলেন। আলিফ মির্জাকে দেখে প্রিয়তা বেগম। জায়গা করে দিলেন বসার। আলভি মির্জার পাশে প্রিয়তা বেগম দাঁড়ালেও , আলভি মির্জা প্রতি বারের মতো তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে অবহেলা করলেন।
“বড় আব্বু ! কিছু বলবে ?” — মোহনা নিজের পাশে বসা আলিফ মির্জাকে প্রশ্ন ছুঁড়ল। আলিফ মির্জা মৃদু হাসল। ধীর কন্ঠে বলল ,
— “বড় আব্বুর ডিসিশনে বিশ্বাস রাখো , আম্মু ? সে যে তোমার ভালো চায় ?”
— “আব্বু যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেল , তখন তুমিই ছিলে , বড় আব্বু ! তোমার জন্যই তো আমি কত স্ট্রং হতে পেরেছি।”
মেয়ের কথা শুনে , আলভি মির্জা লজ্জিত হলেন। ভাবলেন , দ্বিতীয় বিয়েটা তিনি কখনো করতে চান নি। ভাবির কথা শুনলেন , তার ছোট বোন প্রিয়তা তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা! তার হাসবেন্ড রোড এক্সিডেন্ট এ মৃত্যু বরণ করেন। মা বাবাও নেই যে , তাকে দেখবে এ সময়! তাই প্রিয়তা ভাবির সাথে এ বাড়িতে থাকতে শুরু করল।
অনেক কিছু ভেবেই আলভি মির্জা বিয়ে করে নিলেন যখন পিহু এক মাসেরও হয়নি ! পিহুর প্রতি বাড়ির ছোটদের আলাদা মায়া জন্মেছিল। রেদওয়ান আর মাহির , পিহু বলতে পুরো পাগল ছিল!
কিন্তু বিয়ে করেও , নিজের প্রথম স্ত্রীকে ভুলতে পারলেন না আলভি মির্জা। এক রুমে থেকেও দু’জন মানুষের মাঝে কোন কথাবার্তা নেই! বিয়ের সম্পর্কেও তাদের কোন টান নেই! সব শেষে আলভি মির্জা বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমালেন লন্ডনে।
পুরনো অতীত থেকে ফিরলেন আলভি মির্জা। মোহনাকেও , রেদওয়ানকে বিয়ে করাতে রাজি করালেন আলিফ মির্জা।
মোহনার পাশে বসা রেদওয়ান , ধীর কন্ঠে বলল ,
— “চিন্তা নেই আমার ভূবন মোহিনী! বিয়েটা হোক একবার! আপনাকে আমার প্রেমে ফেলতে বাধ্য করব।”
মোহনা বিস্ময়ে তাকালো রেদওয়ানের দিকে , রেদওয়ান মুচকি হেসে চোখ টিপি মারল এক। মোহনা হা হয়ে গেল মুহুর্তেই। বিড় বিড় করল ,
— “আমি ভাবতেও পারিনি , রেদওয়ান! তুমি এতটা নির্লজ্জ হবে।”
রেদওয়ান হাসল। বোনের বিয়েতে মাহিরও খুশি হলো। তখনই সে মুহূর্তে , মাহির পাশে থাকা আব্বুর কথা শুনতে পেল ,
—- “কী ভেবেছো , মাহির ? বাইরের দেশে কখন যাচ্ছো?”
মাহির আব্বুর দিকে তাকালো। কিছু বলতেই যাবে , তার আগে , পেছন থেকে পিহুর মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসল ,
— “ মাহির ভাই! তুমি সত্যিই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?”
মাহির বিস্ময়ে মুহূর্তেই পেছন ঘুরল। পিহুর ফ্যাকাশে মুখ দেখল। পিহুর হাতে থাকা বাগানের গোলাপ ফুল গুলো মুহূর্তেই স্টেজে পরে গেল।
চলবে—
নেক্সট পর্ব — https://www.facebook.com/share/p/14UXG58K7RT/

