#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন—০৩
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
“পড়ছিস না কেন , পিহু?”
“রাতের বারো’টা পর্যন্ত কে পড়ে , মাহির ভাইয়া ?”
কথাটা বলেই পিহু খাতা থেকে নজর সরিয়ে মাহিরের দিকে তাকালো। পিহু দেখতে পেল , মাহির এক ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ,
— “লাস্ট গণিত পরীক্ষায় কত পেয়েছিলি জানি?”
প্রশ্নটা শুনে পিহু হাসার চেষ্টা করল ,
— “রাতের বারো’টা কেন , মাহির ভাই ? আপনি আমাকে সারারাত পড়ালেও আমি পড়ব।”
কথাটা বলে মাত্র থেমেছিল পিহু , মাহিরের পাশে বসা রেহান খিলখিলিয়ে হেসে বলল ,
— “মাহির ভাইয়া তোর কাছে পরীক্ষার রেজাল্ট জানতে চেয়েছিল! বল বল?”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো। মাহির , রেহানের কান টেনে বলল ,
— “তুই পড়ছিস না ? তুই লাস্ট ইংলিশ পরীক্ষায় যেন কত পেয়েছিলি?”
মাহিরের প্রশ্ন শুনে , রেহানের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোরের মতো , মুখ লুকানোর চেষ্টা করল। পিহু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল ,
— “মাত্র ৪৫ পেয়েছিল !”
মাহির পিহুর দিকে তাকালো। পিহু তখনো হাসছে। মেয়েটার চেহারায় এত মায়া কেন? আচ্ছা , পিহু কী জানে , সে কতটা আদুরে বিড়াল ছানা? আচ্ছা! মেয়েটার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকলে , মেয়েটার নজর লেগে যাবে না?
মাহিরের এতসব চিন্তাভাবনার মাঝে , মাহিরের কর্ণকুহুরে আসল রেহানের কথাটা ,
— “তুই তো ইংলিশে চল্লিশও তুলতে পারিস না , বোকা মেয়ে! গণিতে তো এক নাম্বারের জন্য ফেল করে বসে থাকিস!”
কথাগুলো শুনে মুহূর্তেই পিহুর মুখের হাসি উড়ে গেল। পিহুর মুখ ছোট হয়ে আসল। পিহু মাথা নিচু করে , খাতায় কলমে হাতে গণিতের প্রশ্ন সমাধান করতে বসল। পরমুহূর্তেই পিহুর কর্ণকুহুরে আসল , রেহানের ব্যথাতুর আওয়াজ!
পিহু তাকিয়ে দেখল , রেহান চোখ মুখ খিঁচে , পিঠে হাত দিয়ে রেখেছে। আর মাহির বেঁত হাতে , রাগি দৃষ্টিতে রেহানের দিকে তাকিয়ে !
মাহির রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল ,
— “কত বার বলেছি ? এভাবে কাউকে অপমান করবে না , রেহান ! রেহান সে সরি টু সরি পিহু!”
রেহান তখনও চোখ খুলেনি , চাপা স্বরে বলল ,
— “সরি , বোকা মেয়ে!”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো। মুহূর্তেই মাহির বলে উঠল ,
— “পাস্তা কে কে খেতে চায় ?”
পিহু আর রেহান মুহূর্তেই উৎকণ্ঠা হয়ে বলল , — “আমিই!”
মাহির চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে , পিহুর কনুই ধরে
বলল , — “পিহু , আমার সাথে আয়! আজ আমরা দু’জন পাস্তা খাবো। কিন্তু রেহানের শাস্তি , ও পড়বে! পাবে না পাস্তা!”
মাহিরের কথা শুনে , মুহূর্তেই রেহান মাথা নিচু করে পড়তে বসে গেল। রেহানকে দেখে , পিহু মাহিরের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মাহির হাসলো , চুপ থাকার ইশারা করল।
*
“দেখুন , আমি কিন্তু বড় আব্বুর কথায় আপনাকে বিয়ে করেছি! আপনার জন্য , আমার মনে কোন ফিলিংস নেই! আর আপনি আমার কাছেও আসবেন না!”
মোহনার এক শ্বাসে বলা কথাগুলো শুনে , মৃদু হাসল রেদওয়ান। ঠাট্টার স্বরে বলল ,
— “ওকে ম্যাম! কিন্তু আমি কিন্তু আপনাকে আমার প্রেমে ফেলতে বাধ্য করব বলে দিলাম!”
“মানে?” — মোহনার বিস্ময়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল। বিছানায় রেদওয়ান মোহনার পাশে বসল ,
— “এই যেমন ধরেন , আপনাকে রোজ প্রোপোস করবে! আপনার পিছু করব !”
মোহনা বাকরুদ্ধ হয়ে গেল রেদওয়ানের কথা শুনে। মোহনাকে চুপ থাকতে দেখে , রেদওয়ান ফের বলল ,
— “আমি কিন্তু দিনশেষে আপনার মুখে ভালোবাসি’ শুনেই ছাড়ব , আমার ভুবন মোহিনী !”
মোহনা , রেদওয়ান থেকে চোখ সরিয়ে , চাদর গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল , — “আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। সকালে উঠে আবার স্কুলেও যেতে হবে!”
রেদওয়ান চাপা স্বরে বলল , — “উফফ! মেয়েটা বড্ড আনরোমান্টিক !”
মোহনা কথাটা শুনল , — “তাহলে এই আনরোমান্টিক মেয়েকে বিয়ে করলেন কেন ?”
রেদওয়ান হাসল। বুঝতে পারল , রেদওয়ানের কথায় মোহনা বিরক্ত হয়েছে ! রেদওয়ান হেসে বলল ,
— “ আমার রোমান্টিকতা তোমারে মাঝে ছড়াতে !”
কথাটা শুনেই , ঝটপট চাদরের ভেতর মুখ লুকালো মোহনা। রেদওয়ানকে সে কখনো ঐ নজরে দেখে , এখন সে রেদওয়ানকে হাসবেন্ড কীভাবে মনে করবে ? আর রেদওয়ান? ছেলেটা বহুত নির্লজ্জ! আগেও এভাবে কথা বলত! তখন ভাই-বোন ছিল শুধু তাই একটা লিমিট রাখত! এখন তো সে লিমিটও রাখবে না রেদওয়ান!
মোহনা এসব কথা ভেবে ভেবে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো। কিন্তু দেখল না , তার প্রেমিক পুরুষ তার দিকে তাকিয়ে থেকেই একটি রাত কাটিয়ে দিচ্ছে।
*
“আপনি ঘুমাবেন এই রুমে?”
প্রিয়তা বেগমের কথা শুনে চাপা স্বরে উত্তর দিলেন আলভি মির্জা ,
— “আমার কথা আপনার ভাবতে হবে না , প্রিয়তা! আমি পড়ার ঘরে যাচ্ছি! আমার ছেলে মেয়ে কেউ আমার খোঁজ করলে , তাদের সেখানে পাঠিয়ে দিবেন!”
— “ঠিক আছে।”
— “আর একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম?”
— “জ্বি বলুন?”
— “আমার চলে যাওয়ার পর , আমার ছেলে মেয়েকে সামলানোর জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ আপনার ওপর!”
— “কী বলছেন আপনি এসব? আমি পিহুর যেমন মা , তেমনি মোহনা আর মাহিরেরও মা! কিন্তু আপনি জেনে অবাক হবেন , মোহনা আর মাহির ভীষণ আদুরে! তারা ছোট থেকেই ভীষণ ম্যাচিউর ছিল! আর মাহির তো উল্টো সারাক্ষণ পিহুকে সামলে রাখত! পিহু প্রথম মা’ ডাকটাও মাহিরকেই ডেকে ফেলেছিল!”
কথাগুলো শুনলেন আলভি মির্জা! কিছুটা অবাকও হলেন। তারপর রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।
*
“পিহু লবণ দে তো একটু ? পিহু, কেবিনেট থেকে তেল বের কর! পিহু!”
মাহিরের একেক ডাকে পিহু এখান থেকে ওখানে ছুটছে। বাচ্চাদের রান্না ঘরে দেখে আলভি মির্জা ছুটে গেলেন সেদিকে।
“কী করছো , তোমরা?”
আলভি মির্জার ডাকে পিহু পেছন ঘুরলেও , মাহির তখনও রান্না করায় ব্যস্ত।
পিহু তখন ধীর কন্ঠে উত্তর দিল , — “মাহির ভাইয়া বলল পাস্তা খাবে তাই , আঙ্কেল।”
পিহুর কথা শুনে মাহির এক পলক ভ্রু কুঁচকে তাকালো পিহুর দিকে। মাহির তো পিহুর জন্যই পাস্তা রান্না করছিল । পিহুর লেট নাইট নাস্তা খাওয়ার অভ্যাস আছে। মাহির কী পাস্তা একা একা খাবে নাকি ?
মাহিরের এতসব ভাবনার মাঝে , সে শুনতে পেল আলভি মির্জার কথা খানা ,
— “মাহিরের মতো তুমি আমাকেও আব্বু ডাকতে পারো , পিহু মা!”
পিহু ভীষণ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল , — “মাহির ভাইয়া বলেছেন , আপনাকে আব্বু না ডাকতে !”
আলভি মির্জা তখন ভ্রু কুঁচকালেন , — “কেন?”
— “কারণ আপনি আমার আব্বু না! আমার আব্বু কবরে ঘুমিয়ে আছেন!”
পিহুর কথাগুলো শুনে আলভি মির্জা কথা বলার খৈই হারালেন। হাসার চেষ্টা করে বললেন ,
— “আমি তোমার আব্বুর বন্ধু , পিহু মা। তোমার আব্বু আমাকে বলেছে , এ দুনিয়ায় আমি পিহুকে একা রেখে যাচ্ছি! আমার পিহুকে সামলে রেখো। তাই তোমার যদি কখনো কিছু লাগে তাহলে আমাকে বলবে।”
আলভি মির্জার কথা শুনে , পিহু স্বাভাবিক ভাবেই বলল ,
— “দরকার নেই , আঙ্কেল। আমার যা যা লাগে , মাহির ভাইয়া আমার বলার আগেই নিয়ে আসে। আর জানো ? মাহির ভাইয়া ! কীভাবে যেন আমার মনের কথাও বুঝে যায়!”
পিহুর কথা শুনে , মাহির মুচকি হাসল। পিহু পুরো মাহির বলতে পাগল। পিহুর সব কথায় যেন মাহির থাকে। আর মাহিরের সব কাজেই পিহুর অস্তিত্ব মিশে থাকে!
আলভি মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ভাবলেন , প্রিয়তা বেগম সত্যি কথায় বলেছেন! তার ছেলে দেখছি , দু’বোন পেয়ে দায়িত্ববান পুরুষ হয়ে গিয়েছে এই বয়সেই। আঠারো বছরের ছেলেদের রক্ত নাকি ভীষণ গরম থাকে? ছন্নছাড়া হয় বাবা মার ছায়া না পেলে! কই! মাহির তাহলে সেগুলোর বিপরীত কেন? আরও যেন জেন্টেলম্যান হয়েছে ছেলেটা?
আলভি মির্জা এবার পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে মাহিরের কাছে গেলেন। ধীর কন্ঠে বললেন ,
— “বাইরের দেশে আন্ডারগ্রাজুয়েট কমপ্লিট করতে কখন যাচ্ছো , মাহির ?”
মাহির আব্বুর দিকে তাকালো না। রান্নায় চোখ রেখেই বলল ,
— “আমি যাচ্ছি না এ দেশ ছেড়ে! এখানেরই এক ভার্সিটিতে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করব! ভর্তি এক্সাম তো দিলাম! দেখি কোন ভার্সিটিতে চান্স পাই!”
ছেলের সিদ্ধান্ত যে আলভি মির্জার একটুও পছন্দ হলো না , তা তার চোখে মুখে স্পষ্ট। তিনি রাগ সামলে বললেন ,
— “এ কেমন কথা? তোমার বাপ দাদা , চাচা এমন কি চাচাতো ভাইও বাইরের দেশে থেকে পড়াশোনা করে এসেছে ! আর তুমি যাবেন না ! এটা বেমানান!”
—“আপনারা যে পথে চলেছেন ! সে পথেই কেন আমার চলতে হবে ? আমার পা দু’টো , আমি যেখানে চাইবো , সেখানে হাঁটবে!”
মাহির কথাটা বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল। আলভি মির্জা তখন রেগে বললেন ,
— “তাহলে এখন কী ভাবছো তুমি ? আমাদের বিজন্যাসও সামলাবে না?”
কথাটা শুনে , মাহির পিহুর দিকে তাকালো। বাপ ছেলের ঝগড়ায় , পিহু ভীষণ ঘাবড়ে গেছে। মাহিরের টিশার্ট রেখে , ট্রাউজার খামচে ধরে রেখেছে। মাহিরের সাথে একবারে মিশে আছে যেন।
মাহির রান্না শেষে চুলো বন্ধ করে বলল , — “আপনারা আগেই জানেন , আমি সাইন্টিস্ট হতে চাই! আমি সেটাই হবো ইনশাআল্লাহ!”
মাহিরের সাথে আর তর্ক করতে পারলেন না আলভি মির্জা। গট গট কদমে রান্না ঘর ছাড়লেন। মাহির পেয়ালায় পাস্তা ঢালছে ! সে সময় পিহু বলে উঠল ,
— “মাহির ভাইয়া! আমিও তোমার মতো সাইন্টিস্ট হতে চাই ! আমি তোমার সাথে সাথে থাকব সারাক্ষণ!”
পিহুর কথা শুনে , মাহিরের হাত থেমে গেল। পিহুর দিকে তাকালো। পিহুর দিকে ঝুঁকে বলল ,
— “সত্যিই হতে চাস?”
— “আমি কীভাবে হবো ? আমি তো ভালো স্টুডেন্ট না তোমার মতো!”
মাহিরের ছোট উত্তর , — “আমি আছি না তোর
সাথে ?”
নেক্সট পর্ব —
https://www.facebook.com/share/p/1E1gpm18EB/

