#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন—০৪
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
এক বছর পর ,
আজ মোহনার গর্ভধারণ ভোজ। মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমটা বিভিন্ন রঙের ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। লাইটিং করা হয়েছে। রেদওয়ান আর মাহির সবটা সামলাচ্ছে। মাহির রান্না ঘর থেকে বিভিন্ন খাবার থালায় করে নিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলটাই রাখছে। কিন্তু তার সেদিকে একদমই মন নেই !
মাহির যেদিকেই যাচ্ছে , সেদিকেই ঘন ঘন কাঁচের চুড়ির শব্দ পাচ্ছে। আজ তো জরুরি একটা দিন ! তাই না? কিন্তু মাহিরের মন পরে আছে সেই কাঁচের চুড়ির আওয়াজে। হাতে থাকা থালাটা টেবিলের ওপর রেখেই , মাহির গম্ভীর মুখে তাকালো পিহুর দিকে !
পনেরো বছরের পিচ্চি মেয়ের চোখে কাজল , আইলেনার , ঠোঁটে পিংক রঙা লিপস্টিক দেখেই ভড়কে গেল মাহির ,
— “চেহারায় এসব কী লাগিয়েছিস তুই ?”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো , — “কেন ? কী হয়েছে ? আমাকে কী সুন্দর লাগছে না , মাহির ভাইয়া ?”
পিহুর কথা শুনে , মাহিরের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসল। পিহুর বাহু ধরে , তাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল। পিহু অস্থির কন্ঠে বলছে ,
— “মাহির ভাইয়া! কী হয়েছে ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমায় ? আমি ব্যথা পাচ্ছি তো! ছাড়ো আমার হাত!”
মাহির শুনল না একটাও কথা। মাহিরের রাগী মুখ দেখে , পথ আটকালেন রাশেদা বেগম ,
— “কী হয়েছে , মাহির ? রেগে আছিস কেন? এই গাধা মেয়ে আবার কী করল ?”
মায়ের কথার সাথে তাল মিলিয়ে রেহান খিলখিলিয়ে হাসল ,
— “এসব কী লাগিয়েছিস , বোকা মেয়ে ? বড়দের মতো আটা ময়দা মেখেছিস। ভীষণ বাজে লাগছে তোকে!”
রেহানের কথায় মুহূর্তেই মুখ মলিন হয়ে আসল পিহুর। মুহূর্তেই রেহানকে বকে দিলেন রাশেদা বেগম।
মাহিন তখন রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল ,
— “অনেক বড় হয়েছিস , তাই না ? তোর বিয়ে দিয়ে দিব , বল ?”
মাহিরের কথা শুনে , পিহু দ্রুত ডানে বামে মাথা নাড়তে লাগল। তাদের মাঝে রাশেদা বেগম মাহিরকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন , — “মেয়েটা সবে বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছে , মাহির। এই বয়সে এসব শখ হয়ই! স্বাভাবিক ব্যাপার এসব!”
রাশেদা বেগমের কথা শুনে , মাহির কিছুটা শান্ত হলেও। পরমুহূর্তে রেহানের কথা শুনে ভীষণ ভড়কে গেল ,
— “মাহির ভাইয়া ! থাক না , পিহুকে তো সুন্দরই লাগছে ভীষণ!”
মাহির আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। পিহুকে টানতে টানতে , সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলার রুমে নিয়ে যেতে লাগল। মাহির এক বার পেছন ঘুরে রেহানের দিকে তাকালো।
মাহিরকে নিজের দিকে আড় চোখে তাকাতে দেখে , রেহান বিষম খেলো। এক ঢোক গিলে , দৌড়ে পালালো।
*
“এখনই মুখ না ধুয়ে আসলে , তোর গালে থাপ্পড় মেরে মেরে মেকাপের ভূত ছাড়াবো , পিহু!”
মাহির রাগান্বিত কন্ঠ কর্ণকুহুরে আসতেই , রুমের ভেতর রাহা দৌড়ে আসল। দেখল , মাহিরের সামনে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করছে পিহু।
“কী হয়েছে , মাহির ? পিহুকে বকছো কেন ?” — রাহার কন্ঠ পেতেই , পিহু দৌড়ে ছুটে গেল রাহার কাছে। রাহাকে ঝাপটে ধরল।
মাহির রেগে এবার দাঁতে দাঁত পিষে বলল ,
— “রাহা ! তুমিই এসব পিহুকে শিখাচ্ছো , তাই না? কাজটা কিন্তু তুমি মোটেও ঠিক করছো না!”
মাহিরের কথা শুনে রাহা মৃদু হাসল ,
— “কেন , মাহির ? কী করেছি আমি ?”
— “পিহুকে তুমিই এসবে আসকাড়া দিচ্ছো , রাহা! আমি ভালো করেই জানি?”
— “তাহলে তো তুমি এটাও জানবে , আমি এসব কেন করছি ?”
কথাটা শুনেই , রাহা থেকে টেনে পিহুকে নিজের কাছে আনলো মাহির ,
— “তোমার যত আক্রোশ! আমার ওপর মেটাতে পারো , রাহা ! কিন্তু পিহুকে এর মাঝে আনবে না ! পিহু কোন খেলনা না!”
— “খেলনা না , তা তো আমিও জানি! যদি খেলনা বানাই , কী করবে মাহির তুমি ? পরিবারের বিরুদ্ধে যেয়ে পিহুকে প্রটেক্ট করবে তুমি ? পারবে না! কখনোই পারবে না!”
— “সেটা সময় বলবে , রাহা! তোমাকে যেন পিহুর আশে পাশেও না দেখি ! যদি আবার দেখি , ওকে কান পড়া দিচ্ছো , ভালো হবে না একদম!”
রাহা কিছু বলতেই নিবে , তখন পিহু মাহিরকে ছেড়ে রাহার কাছে যেতে নিল। মাহির রেগে পিহুর বাহু টেনে নিজের বুকের ওপর ফেলল পিহুকে। শাসিয়ে বলল ,
— “পিহু! তোকে যদি আমি রাহার আশে পাশেও দেখেছি , আমি আর কখনো তোর সাথে কথা বলব না!”
“কিহ?” — পিহু বিস্ময়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল। মাহির তাকে ওয়াশ রুমে পাঠালো।
রাহার মুখোমুখি হলো মাহির , — “প্লিজ রাহা! এমন কিছু করো না , যা পিহুকে কষ্ট দিবে।”
রাহা হাসল , — “আমিও তো কষ্ট পেয়েছিলাম!”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল , — “আমি তোমাকে ভালোবাসি না।”
রাহার ঠান্ডা মাথার উত্তর , — “তাহলে চেষ্টা করে দেখতে এক বার !”
—- “সম্ভব না ! আমার মন অন্যকারো দখলে !”
— “কার পিহুর?”
প্রশ্ন ছুঁড়ে রাহা হাসল। মাহির এক দু’মিনিট সময় নিল ,
— “নাহ ।”
— “মিথ্যে কেন বলছো , মাহির ? এক প্রেমি আরেক প্রেমি’কে চিনে ফেলে!”
— “আমি এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাই না , রাহা ! স্টপ দিজ ননসেন্স!”
— “তাহলে পিহু এখন তোমার কাছে ননসেন্স টপিক হয়ে গেল ?”
রাহা সবেই কথা খানা বলেছিল , কিন্তু মাহির মুহূর্তেই রাহার গলা চেপে ধরল ,
— “পিহুর ব্যাপারে আর এক বার বাজে কিছু বললেও , খুব খারাপ হয়ে যাবে , রাহা !”
কথাটা বলেই মাহির , ঝাড়া মেরে , রাহার গলা থেকে হাত ছেড়ে দিল। রাহা মুহূর্তেই রেগে গেল। গট গট কদমে রুম ছেড়ে দিল।
পিহু সবেই মুখ ধুয়ে বের হয়েছে। তার থ্রিপিস পানিতে ভিজে চুব চুব হয়ে আছে। পিহুর অবস্থা দেখে মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল , হাঁটু গেড়ে পিহুর সামনে বসল। পিহুর মুখ মলিন।
মাহির পিহুর সাথে কথা বলার চেষ্টা করল ,
— “ পিহু! আমার সাথে কথা বলবি না ?”
— “আপনি ভীষণ পচা , মাহির ভাইয়া ! আপনি শুধু আমাকে বকা দেন।”
— “ আই…আই’ম সরি , পিহু !”
মাহিরের মুখে সরি শুনতেই , পিহুর মুখ থেকে ফ্যাকাশে ভাব উধাও হয়ে গেল ,
— “সত্যি সরি ?”
— “হু , আমি ভীষণ ভীষণ সরি !”
— “তাহলে আমি মেকাপ লাগাতে পারি ?”
পিহুর কথা শুনে মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল ,
— “বড় হলে !”
পিহু গাল ফুলালো । মাহির হার মেনে বলল ,
— “ওকে , একটু একটু লাগাতে পারিস! কিন্তু–”
— “কিন্তু কী , মাহির ভাই ?”
— “আমি ছাড়া তোকে মেকাপ লুকে আর কেউ দেখতে পারবে না , রাজি হলে বল ?”
— “রাজি , রাজি , আমি রাজি !”
পিহুর হাসিমুখ দেখে মাহিরও হাসল। পিহু পর মুহূর্তেই বলল ,
— “রাহা আপুর সাথে কথা….”
পিহুর কথাও শেষ হয় নি , মাহির গম্ভীর মুখে বলল ,
— “একদমই না! তোকে যদি আমার বারণের পরও কথা বলতে দেখেছি , পিহু! আমি আর কখনো তোর সাথে কথা বলব না!”
পিহু মুহূর্তেই অস্থির কন্ঠে বলল , — “মাহির ভাইয়া পচা!”
মাহিরও বিরক্ত হলো , — “হ্যাঁ! আমি বহুত পচা। আসবি না আমার কাছে ; আমার পিছু পিছু যদি তোকে ঘুরতে দেখেছি , তোর পায়ের হাড় গুড়ো করে ফেলব!”
কথাগুলো বলেই মাহির উঠে পরল। পিহুকে ছেড়েই রুম থেকে বের হয়ে গেল। পিহু মাহিরকে যেতে দেখে , দৌড়ে তার কাছে গেল।
মাহির হাসল , — “এখন আমার পিছু পিছু আসছিস কেন ? আমি না পচা ?”
“হ্যাঁ! আপনি ভীষণ পচা ! আর বাড়িটা কী শুধু আপনার ? এই সিঁড়িটা কী আপনার ?”
— “তোরও একার না!”
— “আপনারও না! আমি যেখানে খুশি হাঁটব!”
কথাটা বলেই পিহু , মাহিরকে ধাক্কা মেরে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মাহির বাকরুদ্ধ হয়ে , পিহুর যাওয়া দেখল।
চলবে—
নেক্সট পর্ব —
https://www.facebook.com/share/p/1HjXJ7Lo3x/

