#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন—০৫
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
“আপনি আমার পিছু পিছু কেন ঘুরছেন, মাহির ভাই!”
পিহুর কথায় , মাহির চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বলল , — “তোকে! তোকে ফলো করেছি আমি ? কই না তো !”
পিহু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আবারও হাঁটা ধরল। মোহনার পাশে বসা রেদওয়ান ডাকল , — “এই পিহু!”
রেদওয়ানের ডাকে , পিহু ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকালো। মোহনা থালায় থাকা বিভিন্ন পদের খাবার খাচ্ছে। তারপাশে থাকা রেদওয়ান আবারও ডাকল ,
— “এই পিহু! এখানে আয় !”
পিহু সেদিকে চলে গেল। পিহুর পিছু পিছু মাহিরও আসল। পিহুর পেছনে মাহিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে , রেদওয়ান হাসল , — “পিহু রাগ করেছিস নাকি ?”
— “রাগ ? কার ওপর ? কিসের জন্য ? আমি তো কারো ওপর রাগ করিনি , রেদওয়ান ভাই !”
পিহুর কথা শুনে , মাহির মুখ গোমরা করল। রেদওয়ান আরেক দফা হাসল। মোহনার থালা থেকে এক ডিম পোয়া উঠিয়ে , পিহুর দিকে এগিয়ে দিল। মোহনা ভ্রু কুঁচকালো। পিহু নিতে চাইল না । রেদওয়ানের জোড়া জোড়াতে পিহু নিয়ে নিল। রেদওয়ান বলল ,
— “যাহ , রেহানের সাথে খেলা কর ।”
পিহু ডিম পোয়া খেতে খেতে চলে গেল। রেদওয়ান মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির রাগে কটমট করে তাকিয়ে ! রেদওয়ান এক ঢোক গিলে বলল ,
— “ তোর চড়ুই পাখি তো উড়ে গেল ! তুই এখনও এখানে কী করছিস ?”
মাহির রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “ শালা ! মিরজাফরের দল !”
রেদওয়ান হাসার চেষ্টা করে বলল , — “থ্যাংকস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট , শালা বাবু !”
মাহির আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। পিহুকে খুঁজতে চলে গেল। মোহনা ভ্রু কুঁচকে বলল ,
— “কী বলছিলে মাহিরকে? হ্যাঁ ! কিসের পাখি ? পিহুর মতো অপয়া মেয়েকে পাখি বললে কেন ? আর পিহুর পিছু পিছু মাহিরকে পাঠালে কেন ? পিহু যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাক ! দরকার পরলে জাহান্নামে যাক ঐ
মেয়ে !”
মোহনার কথা শুনে রেদওয়ান বিরক্ত হলো ,
— “তোমার সমস্যা কোথায় , ভুবনমোহিনী ! ঐ পিচ্চি মেয়েটার প্রতি তোমার এত ক্ষোভ কেন ?”
— “আমার ভাইকে কীভাবে জাদু করেছে দেখছো
না ?”
— “ করুক ! সমস্যা কোথায় ?”
— “তুমি বুঝে বলছো এসব ? জানো ওরা ভাই বোন হয় !”
— “ওরা কোন ভাই বোন নয় , ভুবনমোহিনী !”
— “ঐ অপয়া মেয়েটা ! তোমাকেও জাদু করেছে তাই না ? তাই কীসব কথা বলছো ! ছিঃ ! তুমি ভেবেও বলছো তো এসব ? পিহু আর মাহির কখনো এক হতে পারে না , রেদওয়ান !”
“তোমাকে বোঝানো সম্ভব না আমার পক্ষে !” – কথাটা বলেই মোহনা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল রেদওয়ান।
*
“এখানে কী করছিস একা একা তুই ?”
মাহিরের ডাক শুনে পিহু পেছন ঘুরল। মাহিরকে দেখে , বাড়ির বাগানের দিকটায় আবারও হাঁটা শুরু করল ।
মাহির এবার প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে , পিহুর হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে তাকে আটকে ফেলল। পিহু তাকালো মাহিরের দিকে । মাহির এক হাঁটু ভেঙে পিহুর বরাবর হলো ,
“এখনো রেগে আছিস তুই ?” — মাহিরের মুখে ক্লান্তির ছোঁয়া! পিহু তার ফতুয়ার সাথে পড়া পাজামার পকেট থেকে রুমাল বের করে , মাহিরের ঘর্মাক্ত কপাল মুছে দিতে লাগল। মাহির পিহুর হাত খোপ করে ধরে ফেলে। পিহু বড় বড় নয়নে সেটা দেখেই , পরক্ষণেই হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু মাহির পিহুর হাত আরও শক্ত করে ধরল। কতক্ষণ চলে গেল , পিহুর চেষ্টা বৃথা গেল।
“মাহির ভাই , ছাড়ুন আমার হাত। কী করছেন
আপনি ?” —,পিহুর কথা কর্ণকুহুরে আসতেই , মাহির মুহূর্তেই হাত ছেড়ে দিল। পিহু নিজের হাত দেখল , কেমন লালচে হয়ে আসছে। পিহু করুণ দৃষ্টিতে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ,
— “আই’ম সরি পিহু ! আমি সত্যি এমন কিছু করতে চাই নি !”
পিহু কিছুই বলল না। মলিন মুখে মাহিরকে দেখতে লাগল। মাহির কিছু একটা ভেবে বলল ,
— “চল , কাল আম্মু আব্বুকে দেখে আসি ?”
মুহূর্তেই পিহুকে উচ্ছ্বাসিত দেখা গেল ,
— “সত্যি , মাহির ভাই ?”
পিহুর মুখে হাসি দেখে , মাহিরও হাসল , — “হু , সত্যি ! যাবি আমার সাথে ?”
— “হ্যাঁ , হ্যাঁ , যাবো আমি !”
— “এবার রাগ কমেছে পিহু রানীর ?”
নামের সাথে রানী’ শব্দটা শুনতেই পিহু কিছুটা লজ্জা পেল। উপর নিচে মাথা দুলালো । মাহির এবার উঠে দাঁড়ালো। পিহুর হাত থেকে রুমাল কপালের ঘাম মুছল। পিহুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সেখান থেকে দুজনে প্রস্থান করল।
*
রাতের তখন নয়টা বেঁজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট । কাজিন সবাই রেদওয়ানের রুমে গল্প করছে। মেহনাজ ভীষণ বিস্ময় নিয়ে বলল ,
— “তুই আর পিহু কবর স্থানে যাচ্ছিস ? আমিও যাবো তোর সাথে , আম্মুর কবর যিয়ারত করতে !”
মাহির উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল , — “এখন না ! বেবি হোক ! তারপর যেও!”
— কিচ্ছু হবে না , মাহির !”
মোহনার কথা শুনতেই ধমকে উঠল রেদওয়ান ,
— “এতো এখন কিসের যাওয়া তোমার ? সারা বছর যাওয়ার নাম গন্ধও নেই ! যেই পিহু আর মাহির যাচ্ছে তোমারও নাটক করে যেতে হবে ওদের সাথে ? ওরা ডেটে যাচ্ছে নাকি আজব তো ।”
রেদওয়ানের কথায় মাথা হেট হয়ে আসল মোহনার। রেদওয়ান প্রচন্ড বিরক্ত বর্তমানে মোহনার ওপর। যত দিন যাচ্ছে , মোহনার যেন পিহুর প্রতি ক্ষোভ বেড়েই যাচ্ছে ; কিন্তু এই ক্ষোভ ঠিক কী কারণে তা খুঁজে পায় না আজ পর্যন্ত কেউ !
‘ডেটে যাওয়া’র কথাটা শুনতেই পিহু আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারল না ! চলে গেল দ্রুত কদমে । পিহুকে যেতে দেখে , মাহির ঘুমাবে বলে চলে আসল ! পিহু এখনো পিচ্চি হওয়ায় নিজের রুমের দরজা লাগিয়ে ঘুমায় না ! দরজাটা কিছুটা খোলা রেখে , চাদর জড়িয়ে ঘুমায় !
মাহির নিজের রুমে যাওয়ার আগে , উঁকি দিল পিহুর রুমে । মেয়েটা ঘুমের ভান ধরেছে । মাহির পিহুকে শুনিয়ে বলল , — “সকাল ছ’টার সময় সজাগ থাকিস। বলে রাখলাম , পিহু ! তোকে ঘুমে পেলে , রেখেই চলে যাবো আমি !”
“আপনি আমাকে বলেছেন– নিজের সাথে নিয়ে যাবেন , তাহলে এখন আবার শর্ত দিচ্ছেন কেন ? এত সকালে কেউ ঘুম থেকে উঠতে পারে নাকি ?” — মাহিরের কথাগুলো শুনে মুহূর্তেই পিহু লাফিয়ে উঠল ।
মাহির হাসল , — “ওহ্! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম! ওকে , তুই ঘুমা ! আমি তোকে উঠিয়ে দিব দরকার হলে। চিন্তা নেই তোকে নিয়েই আমি যাবো ! তোকে একা রেখে যাচ্ছি না আমি !”
কথাগুলো বলেই মাহির মিটি মিটি হাসতে হাসতে চলে গেল। পিহু থ’ মেরে রইল। লোকটা আসলে কী চাইছে ? পিহু বুঝতে পারল না ! লোকটা আদৌও তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে তো ?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পিহু কখন ঘুমিয়ে পরল। টেরও পেল না ।
“এই পিহু, উঠ! যাবি না আমার সাথে ? আম্মু আব্বুকে দেখতে ? পিহু? তোকে রেখে চলে যাবো ?”
মাহিরের ডাকে পিহু ধড়ফড়িয়ে উঠল। অস্থির কন্ঠে বলল , — “আপনি বলেছিলেন , আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন !”
মাহির হাসল , — “যলদি রেডি হো ! তোর হলেই আমরা বের হবো !”
কথাটা বলেই , মাহির চলে গেল। পিহু রুমে থাকা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। সকালের পাঁচটা বেঁজে পঞ্চাশ মিনিট। পিহু ঘুমে ঘুমে রেডি হতে চলে গেল।
*
“তুমি চিন্তা করো না , আব্বু ! তুমি না থাকলেও আমাকে ভালোবাসার জন্য আম্মু আছে ! মাহির ভাইয়াও আছে ! আমি তোমার সাথে আবার দেখা করতে আসব !”
নিজের আব্বুর কবরকে কতক্ষণ দেখে পিহু , কথাগুলো বলে , বসা থেকে উঠে পরল। মাহিরকে প্রশ্ন ছুঁড়ল , — “আপনি আছেন না আমার সাথে , মাহির ভাই ?”
মাহির উপর নিচে মাথা নাড়ল। পিহুর হাত ধরে , নিজের মায়ের কবরের কাছে যেতে লাগল । মাহির মনে মনে আওড়ালো , — “তোর জন্য এই দুনিয়ায় কেউ থাকুক আর থাকুক ! আমি থাকব…আমি মরার পরও তুই ভালো থাকবি সে ব্যবস্থা করে যাবো !”
হাঁটতে হাঁটতে পিহু আর মাহির , মাহিরের আম্মুর কবরের কাছে এলেন। মাহির কতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল । পিহু একবার কবরখানাকে দেখছে তো আরেক বার মাহিরকে ! পিহু এবার আর চুপ থাকতে পারল না ,
— “ আন্টি জানেন , আপনার ছেলে অনেক অনেক ভালো ! পুরো একজন জেন্টেলম্যান ! সে মোহনা আপু আর আমার ভীষণ যত্ন নেই ! আপনি তাকে ছেড়ে গেলেও , আমি তার পাশে আছি ! চিন্তা করবেন না ! আমি মাহির ভাইয়ার ভীষণ যত্ন নিব ! ঠিক আমার বাচ্চার মতো !”
মাহির এতক্ষণ মন দিয়ে পিহুর সব কথা শুনছিল। শেষের কথাটা শুনে মাহির হেসে ফেলল। পিহু ভ্রু কুঁচকালো। মাহির হাসি গিলে খাওয়ার চেষ্টা করল ,
— “তুই আমাকে নিজের বাচ্চার মতো সামলাবি ?”
— “হ্যাঁ , কেন ? দেখেন না , রেদওয়ান ভাইয়া , কখনো মোহনা আপুকে ভুবনমোহিনী ডাকে তো সবার আড়ালে মাই বেবি বলে ডাকে।”
— “তো ?”
— “মোহনা আপু এত বড় হলে , তাকে যদি রেদওয়ান ভাইয়া নিজের বেবি মনে করে যত্ন নিতে পারে , তাহলে আমিও আপনাকে আমার বেবি বানিয়ে যত্ন নিব ! আগলে রাখব !”
“ওকে ! আমি তোর বেবি !” — কথাটা মাহির ভীষণ কষ্ট করে বলল। হাসি চেপে রেখে , পিহুর হাত ধরে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে গেল। মাহির পিহুকে গাড়িতে উঠে বসতে বলল। পিহু আগেই দৌড়ে , গাড়ির দরজা খুলে , গাড়িতে বসতে যাবে! কিন্তু মাহির তো গাড়ি লক করেছে ! মাহির হাসল ! পিহু দরজা খুলতে পারছে না !
মাহির ধীরে সুস্থে হেঁটে আসতে আসতে খেয়াল করল , এক বাইক দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে ! ছেলে দুটোর মাঝে , পেছনে বসা ছেলেটার মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা ! হাতে তার এক বোতল ! সেটাকে ছেলেটা খুলে ফেলেছে! মাহির ছেলেটার নজর দেখল ! সামনে তো পিহু ছাড়া কেউ নেই ! মাহিরের মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল !
“পিহু !” বলে চেঁচিয়ে উঠল মাহির। পিহুর হাত টেনে গাড়ি থেকে ছিটকে নিয়ে আসল !
বাইকের ছেলেটা পিহুর ওপর এ সিড ছুঁড়তে গিয়ে , গাড়ির ওপর এসিড গুলো পরে গেল। মাহির আর পিহু ছিটকে রোডে পরে আছে। পিহুর হাত কিছুটা জখম হয়েছে। পিহু ব্যথায় কান্না করছে ! কিন্তু মাহিরের সেদিকে কোন হুঁশ নেই ! মাহির তাদের পাশ দিয়ে যাওয়া বাইকটাকে দেখল শুধু ! মাহির হতভম্ব হয়ে সাত মিনিটের রাস্তায় বসে ছিল ! মাহিরের হুশ ফিরল পিহু অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে ! মাহির পিহুর দিকে তাকালো। পিহু কান্না করতে করতে , নিজের ছিলে যাওয়া হাতটা মাহিরের সামনে ধরল!
চলবে—-

