#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন—০৯
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
সকালের তখন নয়টা ত্রিশ বেঁজে গেছে। কিন্তু পিহুর একটুও উঠার নাম নেই। প্রিয়তা বেগম রুমে এসেই , পিহুকে ডাকতে লাগলেন ,
—“এই পিহু! উঠছিস না কেন? উঠ! এই মেয়ে…”
পিহু ঘুম ঘুম চোখে উঠে বসল। প্রিয়তা বেগম ভ্রু কুঁচকালেন পিহুর চেহারা দেখে। মায়ের মুখে বিস্ময়ের ছোঁয়া দেখে , পিহুর রীতিমতো ঘুম উধাও হয়ে গেল। পিহু হামি তুলতে তুলতে বলল ,
— “কী হলো , আম্মু ? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন ?”
— “তোর…তোর চোখ ফুলে আছে কেন? রাতে কান্না করে ছিলি নাকি?”
পিহু কোন উত্তর দিতে পারল না। কাল রাতের কথা মনে পরল তার। চোখে সেই দৃশ্য ভাসল , যা তার চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে বোধ হয় !
পিহুর এতসব চিন্তা ভাবনার মাঝে প্রিয়তা বেগম তাকে জরিয়ে ধরল। পিহু চমকালো।
প্রিয়তা বেগম পিহুর মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন , — “মোহনার সাথে যা হয়েছে । এতে তোর কোন দোষ নেই , পিহু ! ভুলে যা ওসব!”
পিহু ছোট করে বলল , — “হুম।”
প্রিয়তা বেগম কীভাবে জানবেন ? পিহুর মন কোথায় আটকে আছে ? মানুষ মানুষের মন পড়তে পারলে , হয়ত পিহুও মাহিরের ওপর রাগ করে থাকতে পারত না। পিহুকে নাস্তা করার তাড়া দিয়ে , প্রিয়তা বেগম নিচে চলে গেলেন।
পিহু বিছানা ড্রেসিং টেবিলের সামনে আসল। নিজেকে দেখে রীতিমতো ভড়কে গেল পিহু। চোখ দু’টো ফুলে যাওয়ার জন্য , কী বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে তাকে ! এই মুখ নিয়ে মাহিরের সামনে কখনোই যাবে না ! কথাটা ভেবেই পায়চারি করতে লাগল পিহু। কিন্তু হঠাৎ মনে পরল , মাহির কে হয় তার ? কিছুই হয় না ! সে কী ভাববে , ভেবে লাভ কী তার ? কথাটা ভাবতে ভাবতেই পিহু ফ্রেশ হতে চলে গেল!
নাস্তা করার জন্য সবেই পিহু নিজের রুম থেকে বের হয়ে ছিল। পাশের রুমটাই মাহিরের। মাহিরের রুমে উঁকি না দিয়ে , পিহু সোজা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেই , পেছন থেকে মাহিরও নিজের রুম ছেড়ে বের হয়ে গেল।
পিহুর পেছন পেছন এসে রীতিমতো সাফাই গাইছে মাহির , — “রাহা আর আমার মাঝে সত্যি কিছু নেই , পিহু ! বিলিভ কর !”
পিহু বিরক্ত হয়ে , হাঁটা বন্ধ করে দিল। পেছন ঘুরে মাহিরের দিকে চাইল। মাহিরের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। পিহু বিরক্ত কন্ঠে বলল ,
— “আজব ব্যাপার তো ? আপনার আর রাহার মাঝে যা ইচ্ছে থাকুক! তা আপনি আমাকে কেন বলছেন? আমি কী জানতে চেয়েছি ?”
মাহির কিছু বলতে পারল না। শান্ত কন্ঠে বলল ,
— “তাহলে রেগে আছিস কেন?”
— “আমি কখন বললাম , আমি রেগে আছি ? আর রেগে থাকলেই , আপনার কী ? আমি কী বলেছি , আমি আপনার ওপর রাগ করেছি?”
— “সরি !”
— “সরি কিসের জন্য?”
— “এমনি !”
— “এমনি কেউ সরি বলে , কখনো দেখেছেন ?”
— “হু !”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো , — “কাকে ?”
মাহির ভীষণ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল , — “আমার এক কলেজের বন্ধুকে।”
পিহু বাকরুদ্ধ। মাহির আবার বলল , — “তার গার্লফ্রেন্ড রাগ করলেও , সেও এভাবেই বিনা কারণে সরি বলত !”
পিহুর চাহনি বড় বড় হয়ে আসল মাহিরের কথা শুনে। মাহিরকে ছেড়ে দ্রুত কদমে নিচে নামতে লাগল। মাহির পিহুর পিছু পিছু আসতে আসতে বলল ,
— “কী হলো ? এভাবে পালাচ্ছিস কেন ? আমার পুরো কথা তো শোন ? ওর গার্লফ্রেন্ডও তোর মতো নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘুরত…”
পিহু এবার রেগে পেছন ঘুরল , — “কী বলতে চান আপনি ? আমি সারাক্ষণ রেগে থাকি ?”
মাহির দ্রুত ডানে বামে মাথা নাড়ল। পিহু কোমরে দু’হাত গুঁজে , এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল , — “একবার শুধু বলে দেখুন…আমি আর কখনোই আপনার সাথে কথা বলব না !”
মাহির দ্রুত বলল , — “আরেহ না না…”
পিহু আর মাহিরকে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে , রাশেদা বেগম ডাকলেন। ডাক শুনেই , পিহু ডাইনিং টেবিলের দিকে ছুটে গেল। মাহির ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে পিহুর পেছন পেছন গেল।
পিহুর পাশের চেয়ারটায় মাহির বসতে গেলে , পিহু এক পা উঁচিয়ে , নিজের ঠ্যাং সেই চেয়ারে রাখল। মাহির ধীর কন্ঠে পিহুকে সরে যেতে বলল। কিন্তু পিহু মাহিরকে এমনভাবে ইগনোর করছে , যেন মাহির এখানেই নেই ! আশপাশ সব জায়গায় তাকাচ্ছে , শুধু মাহফিলের দিকেই তাকাচ্ছে না ! রান্নাঘর থেকে প্রিয়তা বেগম এসে ,পিহুকে সোজা বসিয়ে বকা দিলেন , মাহির বেচারার সাথে এমন ব্যবহার করার জন্য ! পিহুর পাশের মাহির বসলেও , পিহু নিজের খাবার নিজের মতো করে খেয়ে যাচ্ছে ! মাহির পিহুর আর একটু কাছাকাছি এসে , ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল , সে পিহুকে একদমই বোঝাতে চায়নি , সে রাগ নিয়ে ঘুরে ! পিহু তাকে ভুল বুঝছে! পিহু এবার বিরক্ত হয়ে , টেবিলের ওপর পাঞ্চ মারতেই , মাহির চুপ হয়ে গেল। ডাইনিং টেবিলের সবাই পিহুকে এক মুহূর্ত দেখে বুঝলেন , পিছু রেগে আছে ! কিন্তু তার সাথে কিছুটা অবাক হলেন , পিহুর ফোলা চোখ দেখে।
প্রিয়তা বেগম পিহুকে স্কুল লেইট করে যাওয়ার জন্য রীতিমতো বকছেন ! তখন মাহির প্রথম বার আগ বাড়িয়ে প্রিয়তা বেগমের সাথে কথা বলল। মাহিরের বলায় প্রিয়তা বেগম কী বলবেন ? কিছু খুঁজে পেলেন না ! মাহিরকে মাথা নাড়িয়ে চলে গেলেন। পিহু সবেই গাড়িতে বসেছিল। রেদওয়ান থাকলে , এতক্ষণে রেদওয়ানের বাইকে কযরে স্কুল চলে যেত!
ড্রাইভার আঙ্কেল এসেছে ভেবে , পিহু আগ বাড়িয়ে বলল , — “আঙ্কেল দ্রুত চলুন! আজ ভীষণ লেইট হয়ে গেছি আমি !”
— “আমাকে কী দেখে তোর আঙ্কেল মনে হয় ?”
পিহুর কর্ণকুহুরে আসতেই , পিহু হতভম্ব হয়ে সামনে তাকালো। পিহু বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল ,
— “আপনি ?”
মাহির হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। পিহু জেদ ধরো বলল ,
— “গাড়ি থামান! আমি আপনার সাথে যাবো না !”
— “পারব না !”
— “থামান বলছি !”
— “বড়দের মুখের ওপর তর্ক করছিস! দিন দিন সাহস বেড়ে গেছে তোর তাই না ?”
— “নাহ…মানে প্লিজ গাড়ি থামান , মাহির ভাই !”
পিহু আমতা আমতা করে কথাটা বলল। কিন্তু মাহির এবার বেশ গা ছাড়া ভাব দেখিয়ে বলল ,
— “পারব না।”
পিহু আর কিছু বলতে পারল না। রাগে কটমট করে মাহিরের দিকে তাকিয়ে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে , অচেনা রাস্তা দেখে পিহু ভ্রু কুঁচকালো ,
— “এটা তো স্কুলের রাস্তা না , মাহির ভাই! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনি আমায় ?”
মাহিরের ছোট উত্তর , — “ডেটে!”
পিহু বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল , — “কিহ?”
মাহির আমতা আমতা করে বলল , — “আই মিন ঘুরতে…ঘুরতে যাচ্ছি আমরা !”
চলবে—

