#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১২
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
“তুই কোথায় গিয়েছিলি মাহিরের সাথে ?”
—- রাহার কথাটা কর্ণকুহুরে আসতেই , পিহু তোয়ালে থেকে মুখ মুছা বাদ দিয়ে রাহার দিকে তাকালো। পিহুকে চুপ থাকতে দেখে রাহা ধমকের সুরে বলল ,
— “কী হলো বলছিস না কেন ? কোথায় গিয়েছিলে ?”
পিহু স্বাভাবিক কন্ঠে বলল , — “তুমি জেনে কী করবে?”
পিহুর ত্যাড়ামি দেখে , চোখ মুখ কুঁচকে আসল রাহার। দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “ভীষণ বড় হয়ে গেছিস না তুই ? মুখে মুখে তর্ক করছিস !”
পিহুর আশপাশ তাকাতে তাকাতে বলল ,
— “অন্যের ব্যাপারে এত নাগ গলাচ্ছো কেন , রাহা আপু ? মাহির ভাই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ! সেটা আমার আর তার ব্যাপার !”
এবার ভীষণ রেগে রাহা পিহুর কাছে এগিয়ে আসল। পিহু কিছুটা ভয় পেল। এক কদম পিছিয়ে যেতে নিয়েও থেমে গেল।
রাহা পিহুর মুখোমুখি হয়ে দাঁত কট মট করে বলল ,
— “লজ্জা করে না তোর ? কাল আমাকে আর মাহিরকে ঐ অবস্থায় দেখেও , নাচতে নাচতে মাহিরের সাথে ডেটে চলে গেলি ?”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো , — “কোন অবস্থা ? কাল যে মাহির ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলে ! সে অবস্থার কথা বলছো ?
কিন্তু— মাহির ভাইয়া তো তোমাকে জড়িয়ে ধরে নি!
তুমি তাকে জোর করেছো !…”
রাহা অস্থির কন্ঠে বলল , — “সেও আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল ! আমি তাকে জোর করিনি! তুই ভুল ভাবছিস , পিহু!”
পিহু দু’হাত গুঁজল , — “কী বলতে চাইছো ? কেন বলছো এসব আমার কাছে ?”
রাহা ঘাবড়ালো , — “আর কেন বলব ? মাহিরের পিছু ছেড়ে দে। ও তোকে ভালোবাসে না !”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো , — “এখানে ভালোবাসার কথা কীভাবে আসল , রাহা আপু ? আর আমি কেন তার পিছু পড়ব ? আমাকে কী তোমার ওসব সস্তা মেয়েদের মতো মনে হয় , যারা জানে ছেলেটা ভালোবাসে না ! তারপরও তাদের পিছু পরে থাকে ! ছেলেটার ইনফ্যাক্ট কাছে যাওয়ারও চেষ্টা করে !”
রাহা তখন রেগে বলল , — “তাহলে এসব কী ?”
“কোন সব ?” — আয়াত স্বভাব সুলভ প্রশ্ন ছুঁড়ল।
রাহা মুখ বাঁকিয়ে বললো , — “কোন সব বুঝিস না ?
এতটাও পিচ্চি না তুই ! মাহিরের সাথে একা একা ঘুরে এসে পরলি! এটাকে জানিস কী বলে ? ডেটে যাওয়া বলে !”
“তো ?” — পিহুর সোজাসাপ্টা উত্তর। রাহা এবার ভ্রু কুঁচকালো , — “তো মানে কী ? নিজের ভাইয়ের সাথে কে ডেটে যায়? একবারও লজ্জা লাগল না ! শরম লজ্জার বেঁচে খেয়েছিস?”
পিহু ভড়কালো , — “কে ভাই ? মনে নেই , তুমি তো সেদিন আমাকে এক বছর আগে , মোহনা আপুর বিয়ের আগে বুঝিয়ে ছিলে , মাহির ভাই আমার আসল ভাই না ! আমার মনে তার জন্য যা কিছু , সেগুলো খারাপ কিছু না ! তাহলে এখন এসব বলছো কেন ?”
মুহুর্তেই রেগে পিহুর গাল শক্ত করে চেপে ধরল রাহা ,
— “কারণ তখন আমি বুঝতে পারিনি , মাহির তোকে মেনে নিবে! ভাবিনি , মাহির সমাজের পরোয়া করবে না! ভেবেছিলাম , ও তোর ওপর রেগে তোর থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলবে। তোর জন্য আমাকে রিজেক্ট করেছিল ! তোর জন্য !”
পিহু নিজের গাল ছাড়ানোর চেষ্টা করল রাহার থেকে। এক দু’বার চেষ্টার পর জোরে রাহার হাতের কব্জি বরাবর ঘুষি বসাতেই , রাহা ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলো। দ্রুত ছেড়ে দিল পিহুর গাল। কটমট করে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো পিহুর দিকে।
পিহুর গাল দুটো রক্ত জবার ন্যায় লাল হয়ে আছে। পিহু দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “দেখো , রাহা আপু। আমরা কাউকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারি না!
তারা কাকে পছন্দ করছে না দেখে , তোমার নিজের জন্য কাউকে সুযোগ দেয়া উচিৎ! যে তোমাকে ভালোবাসবে , তোমাকে ভালো রাখবে , রাহা আপু !”
পরমুহূর্তে রাহার কাঁপা কাঁপা কন্ঠ শুনল পিহু ,
— “তুই চাইলেও তো আমার ভালোবাসার মানুষকে আমাকে দিয়ে দিতে পারিস? বল পারিস না ? তুই তাকে ছেড়ে দিলে , আমি তাকে আগলে নিব ! তাকে ভালোবাসব , তাকে ভালোও রাখব !”
পিহুর কাছে এর উত্তর নেই। কয়েক মিনিট রাহার দিকে তাকিয়ে থেকে পিহু উত্তর করল ,
— “আমি তাকে ছেড়ে দিলেও সে কখনো তোমার হবে না , রাহা আপু ! ভুলে যাও তাকে !”
রাহার এবার চোখে কান্নারা টলমল করছে। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরার মতো অবস্থা ! রাহার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ! গলা আটকে আসছে তার ! ভীষণ কষ্টে
বলল ,
— “সব পারলেও , তাকে ভুলে যাওয়াটা যে
অসম্ভব! তাকে ভালোবাসতে না পারাটা মৃত্যুর সমান , পিহু! তুই বুঝবি কী করে ? তুই তো পেয়ে গেলি মনের মানুষ ! আমরা হলাম আসল কপাল পুড়া ! খোদার দরবারে তাকে ভিক্ষা চেয়েও পেলাম না !”
পিহুর কাছে আর সান্ত্বনা দেয়ার মতো মেলল না রাহার। কথাটা বলে আর দাঁড়ালো না রাহা। যেভাবে এসেছিল রেগে , তার চেয়েও দ্বিগুণ বুকের বা পাশের ব্যথা নিয়ে চলে গেল।
*
“ এই বোকা মেয়ে ! এত কম খাচ্ছিস কেন ? আর একটা রুটি নে !”
রেহানের কথায় আড়চোখে তাকালো পিহু। ডাইনিং টেবিলে নাস্তা করতে করতেও পিহুকে ‘বোকা মেয়ে’ বলে ডাকছে। ভালো কথা বলেছে , ভালো কথা ! কিন্তু এ কেমন কথা ? কথায় কথায় পিহুকে কেন বোকা মেয়ে বলে ক্ষ্যাপাবে? নিজে কী ? বাদুড় ছেলে কোথাকার ! স্কুল বাড়িতে কোথাও তাকে এক মিনিটও বসে থাকতে দেখা যায় না ! পিহু তাও বোকা মেয়ে! কিন্তু রেহান…রেহান এক জঙ্গল থেকে বিতাড়িত বাদুড়!
পিহু মুখ বাঁকিয়ে বললো , — “আমি বোকা মেয়ে না! ডোন্ট কল মি ইডিয়েট ইন বেঙ্গলি!”
রেহান হাসল পিহুকে জ্বালাতে পেরে ,
— “তাহলে কী ? ব্যাটা ছেলে ?”
কথাটা বলেই শব্দ করে হাসল রেহান। ডাইনিং টেবিলে তাদের সাথে বসা রাশেদা বেগম বকা দিলেন ছোট ছেলেকে ! তাও রেহানের একটুও লাজ দেখা দিল না। পিহু রেগে বলল ,
— “আই’ম আ প্রিসিয়াস ওমেন…এন্ড ইউ আর আ
মাংকি!”
রেহান ভড়কালো , — “কিহ? কী বললি তুই? আমি বাদুড়?”
পিহু মাথা নাড়ল , — “ হু , তুই একটা বাদুড়! তাও জঙ্গল পলাতক! মানুষদের সাথে বসবাস করা ভদ্র বাদুড়!”
কথা দু’টো শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো রেহান। পিহুর ঝুটি বাধা চুল টেনে বলল ,
— “আবার বল ? আমি কী?”
— “বাদুড় কোথাকার ! ছাড় আমার চুল !”
তখনও রেহান ছাড়েনি পিহুর চুল। এবার রাশেদা বেগম গর্জে উঠলেন। মুহূর্তেই আম্মুর ভয়ে পিহুর চুল ছেড়ে দিল রেহান। পিহু কটমট করে তাকালো রেহানের! রেহান মাথা নিচু করে নাস্তা শেষ করতে লাগল।
*
মাহির নিজের ভার্সিটিতে এসেছে সবে। ক্লাস করার মুড একদমই নেই। মাথাটা ভীষণ গরম ইদানিং! পিহুর মোহনা যেসব ব্যবহার করে , সেসব সহ্য করার মতো না! কিন্তু মোহনাকে সে এখন কিছু বলতেও পারে না ! মেয়েটা প্রেগন্যান্ট ! বাচ্চা হলে ভেবেছে , তখন মোহনাকে জেরা করবে , পিহুর সাথে এত কিসের রাগ তার যে মেয়েটার জীবন নষ্ট করতে চাইছে ! তার ওপর রাহা ! প্রচন্ড বিরক্তিকর একটা মেয়ে ! কাজিন না হলে ঠাটিয়ে এক চড় মেরে সোজা করে ফেলত মেয়েটাকে!
মেয়েটা দিন দিন এত বেহায়া হচ্ছে ! বলার বাইরে—
কাল পিহুর সামনে নাটক করল , যেন ভুল বুঝে দূরে সরে যায় ! আর বেয়াদবটাও সেসবই বুঝল!
এতসব ভেবে মাহির সবে প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করেছিল। তার পেছন থেকে বন্ধু তামিম!
হেসে বলল ,
— “কী হলো ? পড়াখোর পড়ালেখা ছেড়ে বিড়িখোর বখেটা হচ্ছে ? ব্যাপার কী বন্ধু ?”
মাহির আরও বিরক্ত হলো । সিগারেট ঠোঁটে দিয়ে আগুন ধরালো লাইটার দিয়ে। একটান দিয়ে বলল ,
— “রাহা আছে না ?”
— “হু , কী করেছে আবার ?”
— “নিজের লিমিট ভুলে যাচ্ছে ! কাল রাতে যা করল , তারপর থেকে মেয়েটার প্রতি ঘৃণা লাগা শুরু করেছে ! মনটা বিষিয়ে যায় কালকের কথা ভাবলে !”
তামিম ভ্রু কুঁচকালো , — “কী করেছে মেয়েটা সেটা তো বলবি !”
মাহির সিগারেট ফেলে , পা দিয়ে পিষে , রাগে গজ গজ করতে করতে বলল , — “আমার থেকে পিহুকে দূরে সরানো অপচেষ্টা চালাচ্ছে! কাল পিহু আমাকে ওর সাথে ভুল বুঝে , পুরো আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিলো—”
“তারপর তুই কী করলি ?” — তামিম ভীষণ উৎসুক হয়ে প্রশ্নটা করল । মাহির আড়চোখে তাকালো ,
তামিম চিন্তিত কন্ঠে বলল , — “কিছু করিস নি ? একটা চুমু খেয়ে উগড়ে দিলি না মনের কথা ?”
মাহির ভড়কে গেল , — “জীবনটাকে সিনেমা পেয়েছিস যে , মজা নিচ্ছিস? পিহুর সাথে কী আমার এখনো বিয়ে হয়েছে নাকি যে , ওসব করব ? তোর মতো নির্লজ্জ পেয়েছিস? ওকে বুঝিয়ে ছিলাম! ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিলাম ! দ্যান পিহুর রাগ অভিমান শেষ !”
“তোর মতো পানসে লোক দিয়ে আর কী আশা করা যায় শুনি ? ধ্যাত ! চান্স মিস করে দিলি তুই ! টিপুর জন্য বড্ড আফসোস লাগছে ! তোর মতো আনরোমান্টিক ছেলেকে প্রেমিক হিসেবে পেল ! মেয়েরা যে তোর মতো পানসে ছেলেদের মাঝে কী দেখে ? আমি এখন অব্দি বুঝলাম না ! প্রেমিক তো আমার মতো হওয়া উচিৎ! নিশিকে রোজ একটা করে চুমু খাই ! কখনো কখনো হাইডোজও দিয়ে দেয় ! বিয়ের পর রোজ হাইডোজ দেব ! আর তিনটা বাচ্চা নেবো! পাঁচ জনের হ্যাপি ফ্যামিলি!”
তামিম ভীষণ উৎসুক হয়ে কথাগুলো বলল। কিন্তু মাহিরের কপালে ভাঁজ , — “তুই এত দূর পর্যন্ত চলে গেলি ? আমি এখন অব্দি প্রেম করাতেও যেতে পারছি না ! বিয়ে তো বিলাসিতা !”
তামিম মাহিরের কাঁধে হাত বাড়ি মারতে মারতে বলল ,
— “এক বছর আগের ঘটনা মনে আছে ?”
মাহির ভ্রু কুঁচকালো , — “কোন ঘটনা ?”
— “পিহু যে তোকে কিস করেছিল ?”
প্রশ্নটা শুনে মাহির অস্বস্তিতে পরল। ধীর কন্ঠে বলল ,
— “হু !”
— “সেই ঘটনাটাই তুই রিক্রিয়েট কর !”
মাহির ভড়কে গেল , — “পাগল নাকি তুই ?”
তামিম স্বাভাবিক কন্ঠে বলল , — “তুই এক বোতল না দু’বোতল শেষ করলেই কিছু করতে পারবি ! আই বিলিভ দ্যাট ! এর আগে পারবি না ! তোর জেন্টেলনেস
পিহুকে আদরের অভাবে ভুগাবে !”
মাহির হাসঁ ফাঁস করতে করতে বলল , — “ওসব
বিয়ের পর ! এর আগে না !”
তামিম তখন উৎকণ্ঠা হয়ে বলল , — “তাহলে বিয়ে করে নে !”
মাহির ভ্রু কুঁচকালো , — “এখন ওর বয়স কত ? পনেরো! পিচ্চি একটা মেয়ে ! আমাকে সামলানোর জন্য হলেও , ওকে আরও বড় হতে হবে !”
তামিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল , — “বাদ দে ! তোর দ্বারা এসব প্রেম করা পসিবল না ! পিহু বড় হোক ! তারপর বিয়ে করে , আমার কাছে আসবি তুই ! আর কথাই বলবি না তুই এ ব্যাপারে ! যা করতে বলছি , তাও করবি না , আবার কানের সামনে এসে ভন ভনও করবি মাছির মতো !”
মাহিরকে ছেড়ে তামিম যেতে যেতে বলল ,
— “শালা বন্ধু নামে কলঙ্ক ! আমি এখন ভার্সিটিতে মুখ দেখাই কী করে ? নিশি জানলে , যদি বলে তুমিও ক’দিন পর তোমার বন্ধুর মতো নিরামিষ হয়ে যাবে ! ব্রেকাপ করব ! তখন আমি কী করব ? কাকে আমার বউ বানাবো? শ্যামলা বলে গার্লফ্রেন্ড পাইনা ! যাকে একটা পেলাম , সেটাও হাত ছাড়া হয়ে যাবে ! এই হতচ্ছাড়ার জন্য !”
তামিম কথা শুনে কপালে হাত মাহিরের । মাহিরের জন্য তার গার্লফ্রেন্ড তার সাথে কেন ব্রেকাপ করবে ?
বেশি বুঝে ছেলেটা ! তার সাথে বাঁচালও !
চলবে—
নেক্সট পর্ব—
https://www.facebook.com/share/p/1AxsQQCB6A/

