#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন— — ১১
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
মাহিরের গাড়ি থেমেছে হসপিটালের সামনে। চতুর্থ ফ্লোরের কেবিন রুমে মোহনা এডমিট ছিল। এখন রিলিজ করে দেয়া হয়েছে সবে ! মাহির কল করতেই মোহনাকে নিয়ে হসপিটাল থেকেই বের হয়ে আসল রেদওয়ান।
পিহুকে চোখে পরতেই চোখ মুখ কুঁচকে আসল মোহনার। পিহু ভয়ে মাহিরের পেছনে লুকিয়ে পরল। মোহনার এমন ব্যবহারে প্রচন্ড বিরক্ত হলো রেদওয়ান। বিয়ের আগে যতটা ভালোবাসা ছিল মোহনার ছিল , তা দিন দিন শুধুই কমে আসছে। ভেবেছিল , মোহনাকে বোঝাতে পারবে রেদওয়ান। পিহুর জন্য মোহনার ব্যবহারে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। উল্টো দিন দিন মোহনার রাগ যেন পিহুর জন্য বেড়েই যাচ্ছে।
রেদওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোহনাকে ব্যাকসিটে বসালো। পিহুকে ব্যাকসিটে বসতে বলে , নিজে ফ্রন্ট সিটে বসতে চলে গেল রেদওয়ান। কিন্তু পিহু বসবে না মোহনার সাথে। মোহনার আশে পাশে থাকতেই ভীষণ ভয় করে তার। পিহু বসছে না। গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। বলতেও পারছে না। মাহির পিহুকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে , গাড়ির ভেতর ঢুকতে যেয়েও থেমে গেল। মাহির ভ্রু কুঁচকে বলল ,
— “বসছিস না কেন ?”
পিহু আকুতির সুরে বলল , — “আপনার সাথে বসব।”
মাহির কিছুটা বিস্মিত হলো। কপালে ভাঁজ পরল ,
— “তখন তো আমার পাশে বসতে চাইছিলি না ;
এখন এতো ভালোবাসা উতলে কোথা থেকে আসল ?”
পিহু মুখ বাঁকালো। মাহির আর পিহুর ঝগড়া দেখে ,
রেদওয়ান গাড়ি থেকে বের হয়ে আসল ,
— “এই দাম তোরা !”
কথাটা বলেই মাহির থেকে চোখ সরিয়ে , পিহুর দিকে তাকিয়ে বলল , — “পিহু, যাহ ! সামনে বস! আমি পেছনে বসছি ।”
পিহু দ্রুত সিটে বসতে চলে গেল। পিহু খুশি মনে , সিটে বসতে দেখে মোহনার গা জ্বলে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “এই কপাল পুড়ি ! কী বোঝাতে চাইছিস? আমার পাশে বসলে তোকে বাচ্চা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতাম নাকি ? আমাকে কাল করতে চাইছিস সবার সামনে ? আজীবন তো সেটায় করে আসলি ! তোর থেকে আর কী আশা করা যায় ?”
রেদওয়ান বিরক্ত মাখা কন্ঠে বলল , — “অ্যাই চুপ !
টিপু তোমাকে নিয়ে কিছু বলেছে ?”
মোহনা তেড়ে বলল , — “বলার দরকার আছে ? দেখতে পাচ্ছো না ? কী নাটক করছে ?”
রেদওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ,
— “ও কোন নাটক করছে না। ও মাহিরের সাথে বসতে চায় ! ওর চাওয়াতে কোন ভুল আছে ?”
মোহনা ভ্রু কুঁচকালো , — “কেন নেই ?”
রেদওয়ান ডানে বামে মাথা নাড়ল , — “নাহ ; নেই !
প্লিজ একটু শান্ত হও ! মা হচ্ছো তুমি ? এভাবে এক পিচ্চি মেয়ের ওপর রাগ করছো ? এটা কী ঠিক ?
মেয়েটা তোমার বোন হয় ! এই মেয়েকে দেখতে না পারলে , নিজের বাচ্চাকে কীভাবে সামলাবে তুমি ?”
রেদওয়ানের কথা শুনতেই , মোহনা আরও রেগে গেল ,
— “ ঐ মেয়ের জন্য তুমি আমার দিকে আঙুল তুলছো , রেদওয়ান ?”
কথাটা বলতে বলতেই নিজের পেট আবারও চেপে ধরল মোহনা। রেদওয়ান বিরক্তিতে আর কিছু বলছে না। অবস্থা বেগতিক দেখে মাহির অস্থির কন্ঠে বলল ,
— “শান্ত হও , মোহনা ! রেদওয়ান তোমাকে তেমন করে বলে নি !”
মোহনা রীতিমতো মতো রাগে ফুঁসছে। মাহির পিহুর দিকে তাকালো । পিহু বার বার ফুঁপিয়ে উঠছে কান্না করে দিবে সম্ভবত ! মাহির বলে উঠল ,
— “রেদওয়ান গাড়িটা তুমি চালাও ! পিহু বলেছিল, সে রিক্সা করে শহরটা ঘুরে আসতে চায়। আমি পিহুর সাথে রিক্সা করে বাড়ি ফিরছি !…এই পিহু উঠ !”
রেদওয়ান অস্থির কন্ঠে বলল , — “এটা কেমন কথা ? এই না না তোরা বস…”
কিন্তু মাহির বসল না। মাহির গাড়ি থেকে বের হয়ে আসতেই , পিহুও বের হয়ে আসল। রেদওয়ানের সাথে মাহির কিছু কথা বলেই , রেদওয়ানকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। রাস্তায় একটা রিক্সা ঠিক করেই পিহুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল মাহির ।
মাহিরের হাত শক্ত করে ধরে , রিক্সায় উঠল। রিক্সা চলছে মাঝামাঝি গতিতে। একটু পর পর মাহিরের কাধের সাথে পিহুর কাঁধে ধাক্কা লাগছে। যে কারণে পিহু অস্বস্তিতে পরেছে। মাহির থেকে খানিকটা সরে আসলে , মাহির পিহুর বাহু ধরে তাকে আবার নিজের কাছে টেনে আনল। পিহু এবার চুপসে গেল লজ্জায়। হেল দোল নেই একদমই!
পিহুকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েই গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে মাহির। উদ্দেশ্য আহনাফের বাড়ি যাওয়া । প্রায় ত্রিশ মিনিট পর পৌঁছালো।
দরজায় কলিং বেল বাজার শব্দ পেয়েই মিসেস আয়েশা বেগম দরজা খুললেন। সামনে এক যুবককে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন। ছেলেটাকে ভালো করে চেনেন। আলভি মির্জার একমাত্র ছেলে মাহির আলভি !
মাহির কে দেখে তিনি মোটেও খুশি হলেন না। ছেলেটা বিয়ে বাড়িতে আহনাফের সাথে পরে ভীষণ রুড বিহেভ করেছিল। এমন কী বাড়ি এসে শাসিয়ে গিয়েছিল বিয়ে ভাঙার পর , যেন পিহুর দিকে আহনাফ চোখ তুলেও না তাকায়।
আয়েশা বেগম ভীষণ বিরক্ত কন্ঠে বললেন ,
— “বাবা তুমি এখানে ?”
— “আহনাফ আছে আন্টি ?”
— “নাহ , বাবা ! আহনাফ এক সপ্তাহ আগেই লন্ডন চলে গেছে। কিন্তু হঠাৎ তুমি ওর খোঁজ কেন করছো ?”
মাহির কিছুটা ইতস্তত করে বলল , — “পিহুর কথা তো মনেই আছে আপনার ? আছে না ?”
— “মনে থাকবে না কেন ? ঐ একটা অপয়া মেয়ের জন্যই আমার ছেলেটার বিয়ে হলো না সেদিন।”
মাহির রেগে উঠল কথা দু’টো শুনে ,
— “ফাস্ট অফ অল , পিহু কোন অপয়া মেয়ে না । আর আপনার ছেলেকেও পিহু ফাসায় নি। আপনার ছেলে একটা আস্ত লম্পট! নিজের বিয়ের দিনই , অন্য মেয়ের দিকে নজর দিয়েছিল। হি ইজ আ শেমলেস বা*স্টা*র্ড ! আমি একবার শাসানোর পরও সে পিহুকে দেশে ফিরলে , বিরক্ত করে ! দেখুন , আপনার ছেলেকে বলবেন , আর একবার যদি আমি শুনেছি ! ও আবার পিহুকে ডিস্টার্ব করেছে। কিংবা পিহু যে রাস্তা দিয়ে যায় , সে রাস্তায়ও দাঁড়িয়েছে ! আমি তাকে জা*নেই একেবারে ফেরে ফেলব ! এটা কোন হু*মকি না ! এটা আসলেই আমি করে ফেলব ! নিজের একটা ছেলেকে হারাতে না চাইলে , তাকে সামলে নিন
আন্টি !”
কথাগুলোই মুখ গোমরা হয়ে আসল আয়েশা বেগমের। বিড় বিড় করলেন , — “হতচ্ছাড়াটা আবার আমাদের নাক কাটিয়ে দিল !”
মাহিরকে আস্বস্ত করলেন , — “আমি কথা দিচ্ছি বাবা। আহনাফ আর এমন কিছুই করবে না !”
মাহির চাপা স্বরে বলল , — “এমনই যেন হয় !”
আর দাঁড়ালো না মাহির ; চলে গেল !
*
পিহু সবেই বাড়ি ফিরেছিল। রেহান সোফায় বসে বসে হাঁক ছাড়ল , — “এই বোকা মেয়ে কোথায় গিয়েছিলি এত সাত সকাল ?”
রেহানের কথা শুনে রাশেদা বেগমও পিহুর দিকে আড়চোখে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন ,
— “তোকে ডাকতে গিয়েছিলাম! পাইনি তোকে। এত সকাল সকাল মাহিরের সাথে বের হয়েছিলি নিশ্চয়? তোর খেয়াল আছে এখনো নাস্তা করিনি ! তোর জন্য বসে আছি ! যলদি হাত মুখ ধুয়ে আয় ! নাস্তা বাড়ছি!”
পিহু মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। রাশেদা বেগম সোফা ছেড়ে উঠে পরলেন। রান্না ঘরে গেলেন নাস্তা এনে ডাইনিং টেবিলে সাজাতে লাগলেন। আজ প্রিয়তা বেগম তার সাথে নেই ! মোহনা আসায় খাবার নিয়ে ওপরে চলে গেলেন। প্রিয়তা ছাড়া মোহনাকে কেউ সামলাতে পারে না। মোহনা বাড়ি এসেই প্রিয়তা বেগমের কাছে পিহুর নালিশ জুড়ে দিল। মেয়েটা কেন সারাক্ষণ মাহিরের পিছু পিছু ঘুরবে ? বড় হচ্ছে ! বাইরের মানুষ কথা রটাবে তার ভাইকে নিয়ে !
প্রিয়তা বেগমের কথাটা খারাপ লাগলেও , কিছু বলতে পারলেন না। উল্টো চুপ করে শুনলেন। তারপর মোহনার খোঁজ নিলেন। মোহনা উপরে রুমে রেখে এসে আবার নিচে নাস্তা নিয়ে আসলেন। রাশেদা বেগম বোঝালেন , তোর নিজের মেয়েকে দূরে ঠেলে পরের মেয়েকে বেশি যত্ন করে লাভ নেই ! দেখবি একদিন সাপের মতো ছোগল মারবে। কিন্তু প্রিয়তা বেগম কথাটা কানে তুললেন না। ভীষণ অনুতপ্ততায় ভুগেন তিনি। বাচ্চা দু’টো তার জন্য এক কথায় এতিম হয়েছে! বাবা থাকতেও বাবা ছাড়া বড় হওয়া কী সহজ ব্যাপার?
বাবা মা ছাড়া কখনো কেউ আপন হয় না ! তার বড় বোন রাশেদা হলেও , তিনি তার বড় বোনকে সাপোর্ট করতে পারেন না। কারণ মাহির আর মোহনা এক কথায় অত বেশি আদর পায় নি রাশেদার । অবহেলার শিকার একটু হলেও হয়েছে ! আসলে এতিম শিশুদের প্রতি মায়া সবার লাগলেও , দয়া কারও হয় না !
চলবে—

