নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা ৩.

0
3

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা

৩.

রোদ্রজ্জ্বল বিকেলের তাপদাহ তীব্রতর হচ্ছে।পশ্চিম আকাশে হেলতে শুরু করা সুর্যটা তালগাছের পাতার ফাকফোকরে পুর্নবিকিরনে ব্যস্ত। বেলা শেষের রোদের কিরণ যেনো আরো বেড়ে গেছে। আর তারসাথে বেড়েছে চারুকলা ভবনের সামনের সিড়িতে বসা ছেলেমেয়েগুলোর ব্যস্ততা। পরেরদিন চারুকলা বিভাগের প্রদর্শনী। আর তাই প্রদর্শনীর জন্য দিনভর ব্যানার, ফেস্টুন, ছবি, শৈল্পিক জিনিসপত্র বানাতে হয়েছে ওদের। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বও ওদের নিজস্ব। গ্যালারি সাজানো থেকে যারযার টাস্ক শেষ করতে হবে আজকের মধ্যেই। এতোক্ষন অবদি কাজ করলেও, এবার আর ধৈর্য্যে কুলেচ্ছে না কারোরই। অবস্থাটা এমন, সিড়িতে, চেয়ারে, সামনের মাঠের ঘাসে বসাগুলো আধশোয়ার মতো করে শুয়ে পরছে আর দাড়িয়ে কাজ করতে থাকাগুলো বসে গিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা জরছে। সারাদিনের কাজের পর এখন আর একবিন্দু ধৈর্য্য অবশিষ্ট নেই কারো মাঝে। হাত তো চালাচ্ছে প্রত্যেকেই, কিন্তু তাতে না মনের সায় আছে, না দেহের। রয়েছে তো রয়েছে কেনল ক্লান্তির রেশ।

আর তাদের সবার মাঝে টানাটানা চোখের এক অধিকারীনি ফোমকার্ডে তুলি চালাচ্ছে৷ অতি মনোযোগ দিয়ে, অনেকবেশি ভালোলাগা নিয়ে। তার দৃষ্টি আর ঠোটের কোনের হাসি বলে দিচ্ছে, একবিন্দু বিরক্ত, ক্লান্তি নেই তার এই কাজে। হাতের চুড়িগুলোতে সুরের ঝংকার তুলে দিয়ে, সাদা ফোমকার্ড গাঢ় জলরঙে ছেয়ে দিচ্ছে সে। মাঝেমধ্যে তুলির সরু ডগাটা মুখে পুরে দিয়ে কিছু ভাবছে, আবার আঁকায় ব্যস্ত হয়ে পরছে। আঁকানে শেষ করে কার্ডে আলতোভাবে ফু দিলো ও। তারপর পাশে সিড়িতে রাখলো ওটা। মোটামুটি দশ বারোটার মতো কার্ড আঁকা শেষ তার৷ সাথে মাটির শো পিস, কাগজের ফুলসহ শেইপিং মাডের অনেকগুলো সাজানোর জিনিস রাখা ওখানে। মেয়েটা আরো একটা সাদা ফোমকার্ড নিতে যাবে, কেউ একজন ওর হাত থেকে ফোমকার্ডটা কেড়ে নিলো। বললো,

-তোর বিরক্তি নেই স্নিগ্ধতা? সেই সকাল থেকে লেগে আছিস এই ডিসপ্লে নিয়ে!

অনুর শাষন দেখে স্নিগ্ধতা মুচকি হাসলো। তুলিটা পাশে রেখে হাটুতে হাত ঠেকিয়ে বসে বললো,

-শিল্পধর্ম বলে, শিল্পে শিল্পীর বিরক্তি আসলে সে শিল্পী হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সো…

অনু হাতপা ছোড়ার ভঙিমায় আদুরে রাগ দেখালো। তারপর স্নিগ্ধতার পাশে বসে অন্যদিক ফিরে বললো,

-লেকচার ছুড়িস না। তুই বেশিবেশি জিনিস এজন্য বানাস যাতে আগেপরে তোর বানানো জিনিসই মোস্ট ইউনিক, বেস্ট লাইনস্টেইনার, ড্রিম ক্রিয়েটিভিটিসহ সব ক্যাটাগরিতে টপ করে। আর আমাদেরগুলো শেষমেশ ট্রাসবক্সে যায় এজন্য।

স্নিগ্ধতা উকি দিয়ে অনুর দিকে তাকালো। সন্দেহের স্বরে বললো,

-ওমা! চারুকলা থার্টি নাইনের টপার কি কোনোভাবে আমার মতো কোনোরকম সিজি নিয়ে বেচে থাকা পাব্লিককে নিয়ে জেলাস?

হতাশ চোখে তাকালো অনু। ওর চাওনি দেখে শব্দ করে হেসে দিলো স্নিগ্ধতা। অনু বললো,

-হাসবি না একদম! তোর আঁকার হাত, শৈল্পিক হাত ডিপার্টমেন্টের সবচাইতে সুন্দর! তারপরও তোর এই সিজি কিভাবে আসে সেটাই ভাবি আমি।

-হুম! সেটাই তো! এই দেখতো, চুড়িগুলোর জন্য হাত আরো সুন্দর দেখাচ্ছে কিনা আজকে?

স্নিগ্ধতা আগ্রহভরে হাত তুলে ধরলো নিজের।চুড়িগুলো নাড়িয়ে দেখালো অনুকে। অনু ওর হাত ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললো,

-মজা করছি না আমি স্নিগ্ধতা! আর কতো? সেমিস্টার তো গেলো কয়েকটা! এখন তো একটু সিরিয়াস হ? এক্সামে থাকে আলোছায়ার তৈলচিত্র, তুই একে দিবি রোদবৃষ্টির তৈলচিত্র! মার্কস দেবে কেনো তোকে এক্সামিনার?

স্নিগ্ধতা রঙতুলিগুলো গোছাতে গোছাতে বললো,

-ওইযে বললাম, শিল্পধর্ম! সময়, নিয়ম, বাধন মেনে শিল্প হয়না অনু। শিল্প হয় অনুভবের সম্বন্বয়ে। মনের প্রেক্ষিতে। পরীক্ষার হলে হোক, বা জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, আমার তুলিতে কেবল আমার মনের প্রতিচ্ছবিই আচড় পাবে৷ অন্যকিছু না।

-মিথ্যা বলিস না! তুই এমন করিস কারন তুই টপ করতে চাস না! কারন তুই চাস না আমি সেকেন্ড হই।

প্রথম দুলাইন জোর গলায় বললেও, শেষের কথাটা নোয়ানো গলায় বললো অনু। স্নিগ্ধতার হাত থেমে গেলো। পাশ ফিরতে যাবে, তখনি একটা বড় বক্স এসে থামলো ওদের সামনে। চোখ তুলে বক্সধারীর দিকে তাকালো দুজনে। আবির একটা বড়সর হাসি দিয়ে বললো,

-ডোনেশন প্লিজ?

স্নিগ্ধতা দেখলো বক্সটার গায়ে লেখা ‘দুস্থ্যদের জন্য ত্রান’। শারাফ আবিরের ঠিক পেছনেই পকেটে দুহাত গুজে দাড়িয়ে। ফুল দেওয়া মেয়েটা স্নিগ্ধতা না, সেটা ও এতোক্ষনে বুঝে গেছে৷ যে মেয়ে নিজের দুনিয়ায় এভাবে ডুবে আছে, নিসন্দেহে সে ওর জন্য ফুলটা পাঠায়নি। কে দিয়েছে, সেটা নিয়েও মাথাব্যথা নেই ওর আর। শুধুমাত্র কাছ থেকে স্নিগ্ধতাকে দেখবে বলে আবিরকে দুস্থ্যফান্ডের কালেক্টর বানিয়ে দিয়েছে ও। এবার কাছে থেকে মুগ্ধচোখে দেখতে লাগলো স্নিগ্ধতার চোখের পাপড়ির ওঠানামা। এখনো ওরদিকে তাকায়নি স্নিগ্ধতা৷ পাশ থেকে নিজের ব্যাগটা নিয়ে কিছু টাকা বের করলো ও। মুচকি হেসেে বক্সে পুরে দিলো টাকাটা। আবির মুখের হাসি বাড়িয়ে বক্সটা অনুর দিকে ধরলো এবার।

-সেমিস্টার ফি না দেওয়ায় যে কিনা কালকের পর থেকে ভার্সিটি আসতে পারবে না, তার কাছে ডোনেশন চাইছেন? পারেনও আপনারা!

পাশ ফিরলো প্রত্যেকেই। বেশ আধুনিকা বেশভুষায় তিনজন মেয়ে দাঁড়িয়ে। জিনস্, টপস্, উচু হাইহিল, কালার করা চুল। বোঝাই যাচ্ছে, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে মত্ত্ব বড়ঘরের মেয়ে এরা। চারুকলার ছেলেগুলো নড়েচড়ে বসেছে এখন। স্নিগ্ধতা বিস্ফোরিত চোখে অনুর দিকে তাকালো। ও তো ওকে বলেছিলো সেমিস্টার ফি নাকি দিয়ে দিয়েছে। এজন্যই খুশিমনে আজকে সবকিছু করছিলো ও। ও জানে, অনুর যথেষ্ট বেশি আত্মসম্মানবোধ। তাই বলে ও ভাবতেও পারেনি, সেমিস্টার ফি দেওয়ার মতো সময়েও ওকে কিছু বলবে না অনু। অনু মাথা নিচু করে আছে। মাঝের মেয়েটা চোখের সানগ্লাসটা নামিয়ে আবিরের দিকে এগোলো। পার্স থেকে মোটা একটা বান্ডিল ত্রানবক্সে ঢোকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু বান্ডিলটা মোটা হওয়ায় তা ভেতরে ঢুকলো না। মেয়েটা বললো,

-উপস্! বেশি ডোনেট করে ফেলেছি?

দেখতে সুন্দর হলেও মেয়েটার ভাবচলন আবিরের মোটেও পছন্দ হলো না। মেয়েটা বাকা হেসে বক্সের ওপর বান্ডিলটা রেখে শারাফের দিকে এগোলো। ঘাড় খানিকটা কাত করে আপাদমস্তক দেখে নিলো ও শারাফকে। বললো,

-মেয়েটাকে দিয়ে গোলাপ পাঠালাম, আর তুমি গোলাপটা রেখেই চলে এলে মিস্টার? ব্যাপারনা! আলিশা তোমাকে সবার সামনেই প্রোপোজ করার সাহস রাখে। আই লাভ ইউ।

শারাফ মুচকি হাসলো। মেয়েটা কোনোদিক না তাকিয়ে, আরেকটা গোলাপ নিয়ে হাটু গেরে বসে গেলো ওর সামনে। সবাই বড়বড় করে তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধতাও এবারে তাকালো শারাফের দিকে। অনেকক্ষন হলোই এই মানুষটার উপস্থিতি অনুভব করছিলো ও। শুধু চোখ তুলে তাকায়নি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের বকিষ্ঠদেহী যুবকের চেহারায় এক রহস্যময় হাসি। দৃষ্টি ওর দিকেই নিবদ্ধ। চোখ সরিয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। আবিরের কাছ থেকে ডেনেশন বক্সটা নিয়ে, সেমিস্টার ফি-র সমান টাকা হাতে নিলো ও। তারপর বক্সটা ফেরত দিয়ে অনুর দিকে ফিরে বললো,

-এটা আমার টাকা না। ভার্সিটির ফান্ডের টাকা। এখান থেকেই স্কলারশিপ পাবি তুই। এবারেরটা এখনই নিয়ে নে, যখন অফিসিয়ালি দিতে আসে, কম নিয়ে নিস। সেমিস্টার ফি জমা দিবি চল।

অনু বলার কিছু পেলো না। স্নিগ্ধতার যুক্তিতে খুঁত নেই একবিন্দু। স্নিগ্ধতা ওর হাত ধরে চলে আসলো ওখান থেকে। শারাফ শুধু দেখেই গেলো ওকে। নামের মতোই এ মেয়েটার কথা, কাজগুলো স্নিগ্ধ সুন্দর। ঠিক দুহাত সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটার গা ছুইয়ে আসা বাতাস ওকেও ছুইয়ে দিয়েছে। আর তাতেই মনে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে ওর। একধ্যানে স্নিগ্ধতার চলে যাওয়ার দিক তাকিয়ে বললো,

-দ্যা পার্ফেক্ট নেইম, স্নিগ্ধতা।

আলিশা মাটি থেকে উঠে দাড়ালো এবার। একবারের জন্যও ওর দিকে তাকায় নি শারাফ। ওর দৃষ্টি বরাবর দাঁড়িয়ে বললো,

-আই হ্যাভ প্রোপোজড ইউ মিস্টার!

-বাট আই ডোন্ট লাভ ইউ।

সোজা জবাব দিয়ে আবিরের হাত থেকে ডোনেশন বক্সটা হাতে নিলো শারাফ। আলতোকরে ছুইয়ে দিলো ওটা৷ ওটাতে স্নিগ্ধতার স্পর্শ আছে। আবির হেসে বললো,

-তুই তো গেছিস ভাই!

কিছু না বলে এলোমেলোভাবে পা বাড়ালো শারাফ। ওর জবাব শুনে রাগে চোখ ভরে উঠেছে আলিশার। ও যেখানেই যাক না কেনো, সবার দৃষ্টি সবসময় ওর ওপরই থাকে। আর এই ছেলে একবারের জন্য ওর দিকে তাকালোও না! শুধু আজকেই না! এর আগেও এমন হয়েছে। স্নিগ্ধতা থাকলে, প্রতিবারই হয়! সুন্দরী তো ওউ কম না। তারপরও ওই মেয়ের সাধারন সাজের কাছে বরাবর ওর সব সাজ ফিকে পরে যায়। ওর সামনে এলে মনে হয় সৃষ্টিকর্তা সৌন্দর্যের সব পশলা দফায় দফায় এক করে স্নিগ্ধতাকে তৈরি করেছে যেনো। আর এই স্নিগ্ধতার রুপ ওর গায়ে প্রতিনিয়ত কাটার মতো ফুটছে। ওর জন্য রুপ নয় ওটা, রুপকন্টক! বিষাক্ত রুপকন্টক!

#চলবে…

[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here