#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা
২.
ক্যাম্পাসের টিএসসিতে থার্টিটু সাইকোলজিয়ানদের যেনো ছোটখাটো পুনর্মিলনী উৎসব বসেছে আজ। বিশ-পচিশজন তরতরে যুবকের একত্র-উচ্ছ্বাসে মুখরিত পুরো জায়গাটা। যদিও ভার্সিটিতে এমন দৃশ্য খুবই কমন, তবুও সংখ্যার জন্য এই দলটাকে আলাদাকরে চোখে পরার যথেষ্ট কারন আছে। একই ক্যাম্পাস, একই ব্যাচ, একই সাব্জেক্ট, একই পরিচিতি সাইকোলজিয়ান কে ছাপিয়ে, আজ তারা একেকজন একেকনামে। কেউ সাইক্যাট্রিস্ট, কেউ ক্যাডার, কেউ এসআই, কেউ লেকচারার, কেউ সফল ব্যবসায়ী, কেউবা চাকরির পরীক্ষায় হার মেনে ঘরসংসার বাচাতে টিউশনিতে ছুটতে ছুটতে জুতোর তলা ক্ষইয়ে দেওয়া দায়িত্ববান সন্তান।
যারযার শত ব্যস্ততার পরও গ্রাজুয়েশনের তিনবছর পর প্রত্যেকে ক্যাম্পাসে এসেছে আজ। আসবেই বা না কেনো? ওদের সবচাইতে প্রিয় বন্ধুটি বিদেশ থেকে এসেছে যে! ডিপার্টমেন্টে সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্টের সাথে প্রত্যেকের সবচেয়ে ভালো বন্ধুর জায়গাটাও শারাফের হয়ে গিয়েছিলো। ভার্সিটিতে পড়াকালীন এমন কেউ ছিলোনা, যে শারাফকে অপছন্দ করতো। শারাফ ছিলোই এমন। যেকেনো প্রয়োজনে, যেকেনো সময় কাছে পাওয়া যেতো ওকে। তাই শারাফের আসার খবর শুনেই প্রত্যেকে চলে এসেছে প্রানের ক্যাম্পাসে। প্রফেসর নাহিদ আর ইন্সপেক্টর আফজালের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসতেই, সবাইকে একসাথে এভাবে দেখে বিস্ময়ে থমকে ছিলো শারাফ। ওর একটা ত্যাড়া স্বভাব আছে। মনোবিজ্ঞান পরলেও, দিবাস্বপ্নে বিশ্বাস করে না ও! তাই একমুহূর্তেই মেনে নিলো, সবাই সত্যিই এসেছে ক্যাম্পাসে!
সবার সামনে দাড়িয়ে ছিলো আবির। ওকে ঠোট কামড়ে হাসতে দেখে শারাফের বুঝতে বাকি রইলো না সবাইকে নিয়ে আসার প্লানটা ওরই ছিলো। শারাফ দৌড়ে গিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো যতোজনকে সম্ভব। আর পচিশজনের পুরো বাহিনী পঞ্চাশহাতের জোট পাকিয়ে জাপটে ধরলো ওকে। উল্লাসী চিৎকারে নিজেদের সুখকে জানান দিলো একসাথে। কুশলবিনিময় শেষ করে তারপর আড্ডামস্তির জন্য ঘাটি জমালো টিএসসিতে। চায়ের চিয়ারিং, সমুচার কাড়াকাড়ি, গিটারের টুংটাং আর টেবিলে হাত-তবলার সাথে “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”, “বেলা বোস”, আর “কফি হাউজ” এর মতো সব মিলিতকন্ঠের গান! সব একাকার হয়ে যেনো ফিরিয়ে দিচ্ছে তাদের স্বর্নালী অতীত। অনেকটাসময় এভাবে একসাথে হাসিমজায় কাটিয়ে একেএকে বিদায় নিলো সবাই। বাকি সবাইকে বিদায় দিয়ে আবিরের সাথে ঘাসে শুয়ে পরলো শারাফ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
-আজকে সবাই ক্যাম্পাসে আসলো। অথচ তিনবছর আগে সমাবর্তনের দিন, যে আরাফাত কিনা আজকের দিনটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি এক্সাইটেড ছিলো, সেই আরাফাতই আসলো না।
একটু থেমে আবারো বললো,
-কেমন আছে ও আবির?
-তোকে কতোবার বলবো, ও কখনোই তোর কোনো খোজ নেয়না। তুই নির্লজ্জ্বের মতো বারবার ওর কথা কেনো জানতে চাস?
-কেমন আছে সেটা বল!
-শুনেছি প্রেমে ছ্যাঁকাঘটিত কারনে ভালো নেই।
আবিরের স্পষ্ট জবাব। ওর কথা শুনে শারাফ উঠে বসলো তৎক্ষনাৎ। অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইলো আবিরের দিকে। আবির নিজেও উঠে বসলো এবার। বাংলার পাঁচের মতো মুখ বানিয়ে, মাথা উপরনিচ ঝাকিয়ে বোঝালো এটাই ঘটেছে। শারাফ চিন্তায় পরে গেলো। আরাফাত প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়েছে এই কথার সাথে আরাফাত প্রেমে পরেছে, এটাও ওর কাছে শকিং লাগছে। ভার্সিটির অন্য ডিপার্টমেন্টের বন্ধুগুলোর মধ্যে আরাফাত ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলো। ছিলো! শারাফ-আরাফাতের “শারাফাত” নামের বিখ্যাত সে বন্ধুত্ব আজ আর নেই। অত্যন্ত ছোট একটা বিষয়ের জন্য শেষ হয়ে গেছে সে বন্ধুত্ব। সিএসই-র স্টুডেন্ট বলে পড়াশোনার বাইরে বুঝতো না কিছুই। ভার্সিটিলাইফে ওর দেখা সবচেয়ে বিশুদ্ধ ছেলেগুলোর একটা আরাফাত। ক্যাম্পাসের সবচাইতে সুন্দরী মেয়েদের থেকেও সবসময় তিনফুটের সামাজিক দুরুত্ব বজায় রাখতো ও। বলতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে ছাড়া নাকি ও কারো প্রেমে পরবে না। ওর কাজেও তাই প্রকাশ পেতো। আর সেই ছেলেটা প্রেমে পরেছে। আর প্রথম প্রেমেই…শারাফের মনে হলো একবার, এ সময় যদি ও থাকতে পারতো ওর কাছে! আবির বললো,
-মেয়েটা নাকি সত্যিই অনেক সুন্দরী। কিন্তু…
-ভাইয়া, ভাইয়া! ওই আপুটা আপনাকে এটা দিতে বলেছে!
আবিরের কথার মাঝেই একটা বাচ্চা মেয়ে এসে একটা গোলাপ ধরলো শারাফের সামনে। ভ্রুকুচকে গোলাপটার দিকে তাকালো শারাফ। মেয়েটা গোলাপটা ওর হাতে গুজে দিয়ে নাচতে নাচতে চলে গেলো। আবির কপালে গুনে গুনে চারটে ভাজ ফেলে গোলাপের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর চাওনি হতাশায় পরিনত হতে বেশি সময় লাগলো না। এই হলো শারাফ নামের ‘শরাব'(নেশালো বস্তু)। যেখানেই যাবে, দুচারটে ঘায়েল হবেই! আজও ব্যতিক্রম হলো না। এদিকে ওকে গ্রামের চাচাতো বোনও পাত্তা দেয় না! দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আবির।
শারাফ আবিরের মাথা হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলো। তারপর নিজেও খানিকটা ঘাড় বাকিয়ে দৃষ্টিসীমা তাক করলো মেয়েটা যেদিকে ইশারা করেছিলো, সেদিকে। আরেকটা বাচ্চা মেয়ে কোলভর্তি গোলাপ নিয়ে ওদের মাঝামাঝিই আড়াআড়িভাবে দাড়িয়ে। আর তার ওপাশে একজোড়া চোখ। কোনো মেয়ের। চারুকলা ডিপার্টমেন্টের সামনের সিড়িতে বসে আছে মেয়েটা। পরনে অফ হোয়াইট রঙের থ্রিপিস। সাদা ওড়নাটা সিড়িতে ছড়িয়ে আছে অনেকটা জুড়ে। গোলাপগুলো দিয়ে মেয়েটার মুখের বাকি অংশ আড়াল হয়ে আছে। শুধু চোখজোড়া দেখা যায়। শারাফ থমকে গেলো অকারনেই।
ছন্দ তুলে মৃদ্যুগতিতে ওই চোখের পাপড়ির খোলা-বন্ধ হওয়া দেখে নিজেই পলক ফেলার কথা ভুলে গেলো শারাফ। সামনের গোলাপের সৌন্দর্য ফিকে পরে গেলো ওর কাছে। একধ্যানে তাকিয়ে রইলো ওই চোখজোড়ার দিকে। মেয়েটার হাতে রঙিন কাগজ। ডেকেরেশনের কোনো কিছু বানাচ্ছে হয়তো। বা হাত ভর্তি রুপালীরঙা সরু চুড়ি। হাতের নড়াচড়ার সাথে চুড়িগুলো বাজছে হয়তো। দুরুত্বের জন্য কানে আসলে না শারাফের। শুধু প্রাণভরে দেখলো কবজি অবদি ঢাকা, ফর্সা হাতের সঞ্চালন আর থেমে থেমে ওর হৃৎস্পন্দন থামানো পলক ফেলা।
ফুলগুলো সামনের যে বাচ্চার হাতে ছিলো, মেয়েটা হেলতেদুলতে লাগলো এবার। চোখের অধিকারীনির পুরো চেহারা দেখতে পাবে ভেবেই অস্থিরতা শুরু হয়ে গেলো শারাফের। বাইরে সে অস্থিরতা প্রকাশ পেলো না শুধু। কাকে দেখবে বলে শারাফের হাতে মাথায় ঠেলা খেলো, উকিঝুকি দিয়ে সেটা বোঝার চেষ্টা করলো আবির। কিছু বুঝলো না। তবুও শারাফকে জ্বালাতে বললো,
-কিরে? কই ডুবলি?
ঠিক তখনই ব্যাগ কাধে করে একটা ছেলে পাশ কাটাচ্ছিলো ওদের। যেতে যেতে শীষে “ডুবেছি আমি তোমার চোখের অনন্ত মায়ায়” গানের সুর তুললো ছেলেটা। আবির আহম্মকের মতো একবার ছেলেটার দিকে একবার শারাফের দিকে তাকিয়ে রইলো। শারাফ দু হাটুতে দুই কনুই ঠেকিয়ে, মুঠো একসাথে করে বসলো। মেয়েটার দিকে দৃষ্টি স্থির করে, ঠোটে মুচকি হাসি রেখে বললো,
-ওটাকে ডাক। সাঁতার শেখাবো।
আবির হেসে উঠে গেলে। শারাফ তখনো একই খেয়ালে। আচমকাই সরে দাড়ালো দুজনের মাঝের সেই বাচ্চা মেয়েটি। সরে গেলো গোলাপের আড়াল। আর ঠিক তখনই উল্টোপাশ ফিরলো মেয়েটা। ওপাশের সিড়িতে আরো কাগজ রাখা, সেগুলো নেওয়ার জন্য। মেয়েটা কাগজ বেছেবেছে দেখছে৷ ততক্ষণে হাতের ফুলটা কনিষ্ঠা আঙুল থেকে ঘুরাতে ঘুরাতে অনামিকা আবার অনামিকা থেকে কনিষ্ঠা অবদি ঘুরিয়ে এনেছে শারাফ। এবারে আর অধৈর্য লাগছে না, অস্থির লাগছে না। এমন দেখা না দেখার মাঝে থেকে ওর মনে হলো, এটুকোই বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে ওর জন্য। মনের কোনে মেয়েটার নামও ঠিক করে নিলো ও। অসময়ে, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রলয় এনেছে যে, তাকে কি নামে ডাকা যায়? নিসন্দেহে, প্রলয়া।
মনেমনে দেওয়া ওর ডাকনাম মেয়েটার কানে গেলে কিনা, কে জানে! আচমকা দমকা হাওয়ার তোপে কানে গোজা বাধছাড়া চুলগুলো উড়ে উঠলো মেয়েটার। বা হাতে চুল কানে গুজে নিলো সে। শুভ্রবর্ণের গালের প্রাকৃতিক লালচে ভাবটা চোখে পরলো শারাফের। অতঃপর একরাশ এলোচুলের সঞ্চালনের সাথে পাশ ফিরলো মেয়েটা।
গতানুগতিকভাবে দেখাটা তখনই হওয়ার কথা থাকলেও, এবারেও তার মুখ দেখা হলো না শারাফের। মেয়েটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় টুলের সাথে লেগে আরেকজনের হাতে থাকা কাগজের টুকরোর বক্স পরেছে মাটিতে। স্ট্যান্ডফ্যান লাগিয়ে কাজ করছিলো ছেলেমেয়েগুলো। পরে যাওয়া সব রঙিন কাগজের টুকরো উড়তে শুরু করে দিলো বাতাসে। আর তাই কাগজগুলো আটকানোর ভঙিমায় মুখের ওপর হাত তুলে ধরেছে সে মেয়েটা। তার হাতের তালুও ঈষৎ লালচে। যেনো রঙিন কাগজের রঙ লেগে আছে কোনোভাবে। শারাফ ঘাড় বাকিয়ে সোজা হয়ে বসলো। ঠোটের কোনের হাসি প্রসারিত করে বললো,
-শুনছো প্রলয়া, এভাবে দফায় দফায় শ্বাস থামিয়ে দিয়ে, বারবার মৃত্যু না দিয়ে, একেবারে মেরে ফেলো। মরে যাই।
আস্তেধীরে হাত নামিয়ে চোখ মেললো মেয়েটা। ঘন কালো চোখ, ভ্রু, পাপড়ির সাথে যুক্ত হলো লালাভ চিকর, রক্তজবার মতো টকটকে ওষ্ঠ, আর সে ঠোটে মুচকি হাসি। ওর ঠিক পেছনে বাইক স্টার্ট দিতে গিয়ে হেডলাইট জ্বালিয়েছে কেউ। শারাফের চোখ বরাবর লাগার কথা সে আলো। তবুও দৃষ্টিচ্যুত করলো না শারাফ। মুগ্ধচোখে তাকিয়েই রইলো মেয়েটার দিকে। টের পেলো, এ মুগ্ধতার রেশ এতো দ্রুত কাটার নয়। মৃদ্যু বাতাসে খোলা সামনের চুলগুলো নড়াচড়া করছে মেয়েটার। আর সে গায়ে এসে পরা রঙিন কাগজের টুকরোগুলো সরাতে ব্যস্ত। কোলে, চুলে লাগা কাগজের টুকরোগুলো হাতে ঝারতে লাগলো ও। তারপর চোখ তুলে সামনের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে, হেসে দিলো শব্দ করে। হাসির শব্দ পুরোটাই এবার কানে আসলো শারাফের। সাথে গায়ে কোনো অদৃশ্য স্নিগ্ধ বাতাসের ছোয়াও পেলো হয়তোবা। চোখ একবার নামিয়ে আবারো মেয়েটার দিকে তাকালো শারাফ। মৃদ্যুস্বরে বললো,
-স্নিগ্ধতা।
-আপনি কি করে ওর নাম জানলেন?
কথাটা শুনে অবাকচোখে পাশে তাকালো শারাফ। আবির ওই জুনিয়র ছেলেটাকে ধরে বসিয়েছে। এতোক্ষন যাবত ও একইগানের হুইস্টলিংই করছিলো। কি-ই বা করবে? সাত বছরের সিনিয়রের র্যাগ! উপায় নেই। কিন্তু সেই সিনিয়রের মুখে ব্যাচমেটের নামটা শুনে বলেই ফেললো ও কথাটা। শারাফ কিঞ্চিত সামলানো স্বরে বললো,
-ওর নাম, স্নিগ্ধতা?
-জ্ জ্বি। চারুকলা, থার্টি নাইন ব্যাচ।
চেয়ারে হেলান দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে আরামে বসলো শারাফ। অজান্তেই হাসি ফুটলো ওর ঠোটের কোনে। এই অচেনা মেয়েটাকে পুরোপুরিভাবে দেখার আগ অবদি প্রলয়া নাম দিয়েছিলো ও। যদিও, অস্থির এক অনুভূতির প্রলয় তৈরীর দায়ে ছিলো তা। কিন্তু সম্পুর্ন চেহারা দেখে ওর মুখ থেকে তার উল্টো নামই বেরিয়েছে। স্নিগ্ধতা! যেটা কিনা সত্যিই ওর নাম! এর চেয়ে বড় ঘটনাক্রম আর কি? মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ঘটনাক্রম শুধু সেগুলোরই ঘটে, যেগুলোকে সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্যই পৃথিবীতে পাঠান। কথাটা মনে করে হাসলো শারাফ। যদি তাই হয়, তবে এই স্নিগ্ধতা ওকে আজীবন মুড়িয়ে রাখুক! কোনোদিন না কমুক এই মুগ্ধতা! তাকে আপন করার আগের সমস্ত প্রলয় না হয় আজকের মতোই উপভোগ করবে ও?
#চলবে…
[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

