#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
সূচনা পর্ব.
-জেনেশুনে একজন এইডস আক্রান্ত মেয়েকে বিয়ে করতে পারবেন মিস্টার আরাফাত ? এই এইচআইভি যে শুধু আমাকে মারবে, এমনটা নয়। আমার স্বামীত্ব বরণের সাথেসাথে এই মারনরোগকেও বরণ করতে হবে আপনাকে। এই চরম সত্য জেনেও মৃত্যুর সাথে বিয়েতে আবদ্ধ হতে চাইবেন আপনি ?
আজ বাদে কাল যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে বলে মনেমনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, সেই মানুষটার মুখে এমন কিছু শোনার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলো না আরাফাত। প্রসারিত দৃষ্টিতে শতসহস্র বিস্ময় একে ঠায় মেরে দাঁড়িয়ে রইলো ও। মস্তিষ্কের নিউরনে তীব্রভাবে জোর দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো, আদৌও ও যা শুনছে, যা দেখছে, যা ঘটছে, তা বাস্তব কিনা। সামনে ধীরস্থির ভঙিমায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে প্রথমবার দেখার পর একটা শব্দই মস্তিষ্ক অতিক্রম করেছিলো ওর। ফুল! সদ্য প্রস্ফুটিত কোনো ফুল! যাকে ঘিরে প্রদর্শকের কেবল মুগ্ধতা তৈরী সম্ভব। যাকে একপলক দেখলেই মোহনীয়তা আর ভালোলাগার কোনো মায়াবী দুনিয়ায় ডুব দিতে বাধ্য হবে যে কেউ। যার ডাগরডাগর চাওনি, চোখের পাপড়ির ওঠানামা যেকোনো হৃদয়ের ছন্দপতনের জন্য যথেষ্ট। নম্রতায় জড়ানো চলন মন কাড়ারই উপায় করে রাখে। আর সেই মেয়ে এইডসের পেশেন্ট? মৃত্যু ওর দুয়ারে কড়া নাড়ছে?
ইন্জিনিয়ারিং শেষ করেছে আরাফাত। পড়াশোনা চলাকালীন হঠাৎই একদিন কলেজের বন্ধু সাইফের সাথে দেখা। মেয়েটা সাইফের বোন। সাইফের সাথে যোগাযোগ হবার পর ওর বোনকে দেখা। আর দেখা হওয়ার পর থেকেই ও কোনে এক ঘোরে চলে গিয়েছে যেনো। ওকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাবটা দেবে বলে সময় নিয়েছে আরাফাত। কিন্তু আজ হঠাৎ মেয়েটা বাড়ি বয়ে এসে সবটা পাল্টে দিলো। ও যা বলছে, তা কি আদৌও সত্যি? সত্যিই ও কি এইচআইভি আক্রান্ত? যদি সত্যি হয়, তবে এর চেয়ে নির্মম, নিষ্ঠুর আর কি হতে পারে? কেনোই বা এমন নিষ্ঠুরতা? আরাফাত অবিশ্বাসের সাথে কোনোমতে বললো,
-কি বলছো তুমি এসব?
মেয়েটা এতোক্ষনে একবার মাথা তুলে তাকালো। আরাফাতের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে, চোখ নামিয়ে নিলো আবারো। ঠোটের কোনের মৃদ্যু হাসিটা একবিন্দুও কমালো না। বাহাতের উপর ছড়িয়ে রাখা ওড়না ঠিক করতে সময় নিলো সেকেন্ড তিন। আরাফাত বিস্ময় নিয়েই দেখতে লাগলো ওকে। শুভ্রপরনে হালকা নীল রঙের কামিজ, তার হাতা একদম হাতের কবজি অবদি, সাদা সালোয়ার। গায়েররঙ দুধে আলতার ন্যায়, কবিদের মতো এমন বললে ভুল হবে বলে মনে হলো না আরাফাতের। উজ্জলবর্ণের বলে গালদুটো স্বাভাবিকভাবেই মৃদ্যু লালচে। ঠোটদুটো হালকা গোলাপি। সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত্ব রুপের জন্যই হয়তো আলাদা কোনো সাজের প্রয়োজনবোধ করেনা সে। সাদা পাতলা ওড়নাটা মাথায় তুলে দেওয়া। তবে ভেতরের কৃষ্ণবর্ণের সোজা চুলগুলো দেখা যায়। ওড়নার বাইরেও অল্পকিছু চুল বেরিয়ে তার গাল স্পর্শ করেছে। মেয়েটা মাথার ওড়না আরেকটু টেনে দিয়ে বললো,
-সত্যিটাই বলছি। আ’ম অ্যাফেক্টেড বাই হিউম্যান ইমিউনি ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস।
আরাফাত কি বলবে ভেবে পেলো না। ওর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘোরপাক খাচ্ছে। ওর দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী মেয়েটা মৃত্যুরোগ আপন করে বেচে আছে। অনেকক্ষন সময় নিয়েও মানতে পারলো না ও কথাটা। বললো,
-পরীক্ষা নিচ্ছো আমার? মিথ্যে বলে দেখতে চাইছো এমনটা শুনেও আমি বিয়ে করতে চাই কিনা তোমাকে?
-একদমই না। বরং এটাই চরম সত্য যে, আমাকে গ্রহন মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন।
-আচ্ছা, আমাকে তোমার পছন্দ না? এজন্য মিথ্যে বলে আমাকে তোমার লাইফ থেকে সরাতে চাইছো?
সেভাবেই মৃদ্যু হাসি বহাল রাখলো মেয়েটা। পরপরই চোখ তুল তাকালো আরাফাতের দিকে। ওর চাওনিতে হয়তো আরো একবার বুকের বা পাশটায় স্পন্দন বাড়লো আরাফাতের। তবুও সেটাকে প্রকাশ করলো না ও। মেয়েটা স্পষ্ট গলায় বললো,
-সত্যিকারের ভালোবাসা অনেক আকাঙ্ক্ষিত, অনেক দুর্লভ মিস্টার আরাফাত। যা সবাই পায়না। বিশ্বাস করুন, সে সত্যিকারের ভালোবাসা যদি আমার কাছে ধরা দেয়, তাকে উপেক্ষার সাহস আমার নেই। আমাকে বিয়ে করলে মরতে হবে আপনাকে মিস্টার। আমাকে বিয়ে করা মানে মৃত্যুকে আপন করা। আপনি অনেক ভালোমানুষ মিস্টার। আমি চাইনা আপনার কোনো ক্ষতি হোক। তাই প্লিজ ভালোবাসা অথবা বিয়ের দাবী নিয়ে কোনোদিন আর আমার সামনে আসবেন না প্লিজ!
-কিন্তু…
-কোনো কিন্তু নেই এখানে মিস্টার আরাফাত। আপনি চাইলেও আপনাকে আমার জীবনে জড়াবো না আমি। শুধু আপনি কেনো, কাউকেই না! এই মৃত্যুরোগ কেবলই আমার। নির্দোষ কারোর প্রাণনাশিনী হতে চাইনা আমি।
আরাফাত হতভম্ব। মেয়েটা স্মিত কন্ঠে বললো,
-আরেকটা অনুরোধ! ভাইয়াকে এ বিষয়ে কিছু জানাবেন না প্লিজ! আমি অসুস্থ্য, এটা শুনলেই ভাইয়া মরে যাবে। এ সত্যি জেনেও কারো কিছু করার নেই। এ রোগের তো চিকিৎসাই হয়না। বেচে থাকতে ভাইয়াকে মরে যেতে দেখতে পারবো না আমি। তাই প্লিজ, তাকে কিছু জানাবেন না। এটুকো দয়া করুন আমাকে। জীবনে সুস্থ্য কাউকে নিয়ে খুব ভালো থাকুন, এই দোয়া করি। আসছি।
আরাফাত আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু মেয়েটা একমুহূর্তও দাড়ালো না আর। যেমন কামিনীর সুবাসমেশানো দক্ষিণা হাওয়ার মতো এসেছিলো সে, ঠিক তার বিপরীত ঝড়ো বাতাসের মতো দ্রুতপদে বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে। আরাফাত পেছনপেছন আসছিলো। কিন্তু ওর মা, বাবা থামিয়ে দিলেন ওকে। আরাফাত ব্যস্তভাবে বললো,
-বাবা আমাকে বেরোতে হবে। ও…
ওর বাবা শক্তকন্ঠে বললেন,
-একমাত্র ছেলে তুমি আমাদের আরাফাত। তোমার পছন্দকে সবসময় সম্মান করেছি আমরা। মেয়েটা সুন্দরী বটে। বিয়েতে অমত করতাম না আমরা। কিন্তু একটা এইডস আক্রান্ত মেয়েকে ছেলেরবউ করে তোমার জীবনটাকে অনিশ্চয়তা আর ঝুকিতে ফেলে দিতে পারি না আমরা। ভুলে যাও ওকে। মেয়েটা বদনসিব। তোমার মতো কাউকে পেয়েও পেলো না।
বাবার কথায় বরাবরের মতো থেমে গেলো আরাফাত। কষ্টরা গলায় দলা পাকিয়ে আসতে লাগলো ওর। খোলা দরজায় বাইরে তাকিয়ে একটা তীব্র চাপা শ্বাস ফেলে বললো,
-বদনসিব তো আমি, যে তার মতো কাউকে পেয়েও পেলাম না। বদনসিব তো সেই পৃথিবী, যে সবচেয়ে সুন্দর, নিস্পাপ সত্ত্বাকে হারাতে চলেছে। বদনসিব তো তার বলা সেই সত্যিকার ভালোবাসা, যাকে সে না পারবে ফিরিয়ে দিতে, না পারবে ধরে রাখতে! এই বৃত্তের কেন্দ্র সে, আর তাকে ঘিরে আবর্তিত প্রত্যেকেই বদনসিব বাবা৷ প্রত্যেকেই!
•
ভার্সিটিতে নিজের কেবিনে দুহাতে মুখ গুজে বসে আছেন প্রফেসর নাহিদ। চেহারায় তার বেশ অনেকটা চিন্তার রেশ। যেটা তার সাথে বেমানান। চল্লিশোর্ধ্ব এই মানুষটি বাইরে থেকে অসম্ভব রকম হাসিখুশি একজন মানুষ। দেশের এই স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তিনি। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতাটা তার বরাবরই বেশি। নিজের, আশেপাশের সবার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল সবসময়। কিন্তু আজকে তার ভিন্নতা। কপালের সরু ভাজগুলো খানিকটা শিথিল করে পাশে থাকা ফাইলটা হাতে নিলেন আরো একবার। চারটে আলাদা ফাইল মিলিয়ে ষোলো পৃষ্টার একটা ফাইল করা। তার পুরোটা পড়ে কানের পাশ বেয়ে ঘাম গরালো তার। চোখ থেকে চশমা খুলে টেবিলের উপর রেখে শ্বাস ছাড়লেন তিনি। সে নিশ্বাস যে চিন্তার ছিলো সেটা পুরোপুরি বোঝা গেলো। প্রফেসর নাহিদ এবার সামনে তাকিয়ে সরাসরি বললেন,
-পরবর্তী পরিকল্পনা কি তোর? কেইস সল্ভ করবি, নাকি রিটারমেন্টের সময় এগিয়ে আনবি?
সামনে বসা মানুষটা যেনো দ্বন্দে পরে গেলো। এই ব্যক্তিত্বেও দ্বন্দ জিনিসটা বেমানান। ইনি প্রফেসর নাহিদের ছোটবেলার বন্ধু, ইন্সপেক্টর আফজাল। গোটা বারো বছরের পুলিশি ক্যারিয়ারে এমন দ্বন্দে প্রথমবার ভুগতে হচ্ছে তাকে। বন্ধুর কাছে আসার পর থেকেই থুতনিতে হাত রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন তিনি। কপালের ভাজ স্পষ্ট তারও। কিছু না বলে চুপচাপ ফাইলটার দিকে তাকিয়ে রইলেন শুধু। প্রফেসর নাহিদ স্বরে কিঞ্চিত ঠাট্টা মিশিয়ে বললেন,
-চুপ করে আছিস যে? এমন ক্রিটিকাল কেইস, ভয়ে সত্যিসত্যিই রিটায়ার করবি নাকি?
ইন্সপেক্টর আফজাল নিরুত্তর এবারো। তার দ্বন্দের অনুভব হয়তো টের পেলেন প্রফেসর নাহিদ। স্বর কিছুটা নামিয়ে বললেন,
-এই ষোলো পৃষ্ঠার ফাইল বিশ, চব্বিশ কিংবা তারও বেশি হওয়ার আগেই কিছু একটা করতে হবে আফজাল। ব্যাপারটা কিন্তু খুবই গুরুতর।
আফজাল সাহেব এবার চোখ তুলে তাকালেন। কিছুটা উদ্ভ্রান্তের মতো করে বললো,
-এবারও কোনো ক্লু ছাড়েনি নাহিদ।
দরজায় নক পরলো। নাহিদ সাহেব আগে আফজাল সাহেবকে মাথা নেড়ে স্বাভাবিক হতে বললেন। অতঃপর গলা উচিয়ে বললেন,
-কে?
-স্যার চা।
আফজাল সাহেব টেবিল থেকে ফাইলটা ঠিকঠাকমতো গুছিয়ে নিজের কোলে রাখলেন। সত্যি বলতে এই ফাইল কাছে রাখতেও মনের মাঝে এক অদ্ভুত অনুভব অনুভুত হয় তার। কেরানী চায়ের কাপসহ ট্রে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। টেবিলে রেখে বললো,
-স্যার? থার্টি টু ব্যাচের একজন আপনার সাথে দেখা করতে চায়।
নাহিদ সাহেব বললেন,
-এক্স স্টুডেন্ট? এ সময়ে? কি বিষয়ে?
কেরানি ইতস্তত করতে লাগলো। নাহিদ সাহেব বললেন,
-কি হলো? বলুন কি বিষয়ে? একাডেমিক কোনো…
-ন্ না স্যার। একাডেমিক কিছু না।
-তাহলে?
কেরানির অস্বস্তি তখনো কাটেনি। তার অবস্থা বুঝে বললেন,
-উনি আমার বন্ধু। পার্শ্ববর্তী নদীয়া থানার এসআই। ওনার সামনে বললে কোনো সমস্যা নেই। আপনি বলুন।
কেরানি আশ্বস্ত হলো কিছুটা। হাত কচলাতে কচলাতে বললো,
-ইয়ে মানে, ছেলেটা বললো, স্ সে নাকি আপনার মেয়ের জামাই।
বিস্ফোরিত চোখে নাহিদ সাহেবের দিকে তাকালেন আফজাল সাহেব। নাহিদ সাহেব শব্দ করে হাসতে শুরু করেছেন কেরানির কথায়। আফজাল সাহেব তিতিয়ে উঠে বললেন,
-মুসকানের বিয়ে দিয়ে দিয়েছিস তুই?
আরো শব্দ করে হেসে দিলেন নাহিদ সাহেব। হাসতে হাসতে বললেন,
-হ্যাঁ! এতো বছরের সাংসারিক জীবনে,শেষ বয়সে ঘর আলো করে একটা মেয়ে আসলো, আর সেই ছয় বছরের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি আমি! দাড়া! মেয়েজামাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই তোকে! ওয়েট!
এরপর কেরানিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
-যাও আসতে বলো ওকে ভেতরে।
আফজাল সাহেব হতভম্ব হয়ে নাহিদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেরানী বেরিয়ে যেতেই দরজা ঠেলে একটা সাতাশ আটাশ বছর বয়সী ছেলে ভেতরে ঢুকলো। গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা না হলেও নিসন্দেহে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। চেহারায় মানানসই খোঁচাখোঁচা দাড়ি আছে গালে। উচ্চতায় বেশ অনেকটাই লম্বা। পরনের বড়হাতা নেভি ব্লু শার্টটার হাতা গুটানো। হাতে মোটা ফিতার ঘড়ি। একেবারেই ফর্মাল গেটআপে পেশির সুস্পষ্টতা যুবককে অনেকের মধ্যে নজড়ে আনার জন্য যথেষ্ট। যুবকের হাতে একটা ক্লিনফাইল। ছেলেটাকে দেখে নাহিদ সাহেবের হাসি আরো বর্ধিত হলো। ছেলেটা সোজা এসে মাথা দুলিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আফজাল সাহেবকে সালাম দিলো। সালামের উত্তর দিলেন আফজাল সাহেব। হাতের ফাইলটা টেবিলে রেখে ছেলেটা আফজাল সাহেবকে বললো,
-কেমন আছেন আঙ্কেল?
-হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ।
-শুকিয়ে গেছেন অনেকটা। পুলিশজীবনে প্রথমবারের মতো বড়সড় কোনো কেইসে কেইস খেয়েছেন নাকি?
প্রথমলাইনে সালাম, পরেরলাইনে কোনোরুপ সংকোচছাড়াই এমন প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না আফজাল সাহেব। তারউপর আগুন্তক হয়েও আগুন্তকের ছিটেফোটা লক্ষন মিললো না তার মাঝে। ছেলেটা তার অপ্রস্তুতদশা লক্ষ্য করে পাশের চেয়ার টেনে আস্তেধীরে বসলো। নাহিদ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে কিছুটা সন্দেহজনক স্বরে বললো,
-কি বস? তোমার পুলিশ ফেসেছে?
নাহিদ সাহেব হাসলেন। আফজাল সাহেব নাহিদ সাহেবের দিকে তাকালেন ছেলেটার পরিচয় জানার জন্য। সে ইশারায় বোঝাচ্ছে, হ্যান্ডেল মাই স্টুডেন্ট ফার্স্ট। আফজাল সাহেব নড়েচরে বসলেন এবার। পুলিশ হয়ে সাইকোলজির কাছে ধরাশয়ী হতে রাজি নন তিনি। বললেন,
-আমাকে এতো ভালো চেনার মাধ্যম কি তোমার স্যার?
ছেলেটা হাসলো। ট্রে থেকে এককাপ চা এগিয়ে দিয়ে বললো,
-ব্রিলিয়ান্ট অবজার্ভেশন! এই না হলে পুলিশি চোখ!
আফজাল সাহেব চায়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরমুখে বললেন,
-পরে নেবো।
-কেনো?
-সাইকোলজি কি বলে?
-এতো টিনি বিষয়ে সাইকোলজি?
-টিনি ক্রিয়েটস দ্যা হিউজ।
ইন্সপেক্টর আফজালের কথায় ছেলেটা একপলক নাহিদ সাহেবের দিকে তাকালো। নাহিদ সাহেব ঘাড় নাড়াতেই সে মাথা ঝাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আফজাল সাহেবের পাশে হাটতে হাটতে বললো,
-হুম! সাইকোলজি বলে, চা ঠান্ডা করে খান। যাতে চা খাওয়ার সময় গরমে জিহ্বা পোড়ার চিন্তার বদলে অন্যকিছু চিন্তা করতে পারেন। অন্যকিছু বলতে আপাতত আমিই! আমি কে, কেনো আসলাম, আপনাকে কিভাবে চিনি, আমার পাওয়ার অফ অবজার্ভেশন চেইক ইত্যাদি। চেয়ারের ডানহাতলে হাত রেখে বসে আছেন যাতে কপাল চেপে ধরতে ডানহাতটা দ্রুত ইউজ করতে পারেন। কলার ঠিক করে আসেননি বাসা থেকে। এখানে সবাই ডিপার্টমেন্টেট হেডের বন্ধুকে পাগল ভাবছে কিনা, সেটা ভেবে কলারে হাত দিয়ে আয়নাছাড়া কলার ঠিক করেছেন, আরো বাকা ভাজ পরেছে তাতে। এন্ড দ্যা স্পেশাল ওয়ান, এসির মাঝেও দুই বন্ধুর কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম। মানে নির্ঘাত কোনো পাপ করেছেন দুজনে মিলে।
এটুকো বলে ছেলেটা চোখ টিপ দিলো নাহিদ সাহেবকে। উনি এগিয়ে গিয়ে চড় লাগাতে যাচ্ছিলেন ওর কাধে। “আরেহ্ সরি” বলে কোনোমতে হুড়মুড়িয়ে সরে দাড়ালো ছেলেটা। যদিও ছেলেটার বলা সবগুলো কথাই সত্যি, ইন্সপেক্টর আফজাল তবুও সন্তুষ্ট হলেন না যেনো। বললেন,
-এই অবদিই?
যুবক এবার হেসে ফেললো শব্দ করে। বললো,
-তারমানে আপনি মানছেন আমার অবজার্ভেশন আরো বেশি।
-নাহিদকে তোমাকে নিয়ে অভারকনফিডেন্ট দেখলাম, তাই…
ছেলেটা ঠোট টিপে হেসে চেয়ারে বসলো আবারো। পেপারওয়েটটা নিয়ে টেবিলের উপর ঘুরতে ছেড়ে দিয়ে হেলান দিয়ে বসে বলতে লাগলো,
-বড়হাতা শার্ট পরে ফ্যামিলির কাছে বা হাতের কাটা দাগটা ধামাচাপা দিলেও, এইখানে বন্ধুর কাছে এসে ঠিক হাতা গুটিয়ে ফেলেছেন আঙ্কেল। একইভাবে কোলে থাকা ফাইলটা কেউ দেখুক বা না দেখুক, নাহিদ আঙ্কেলকে ঠিকই খুলে দেখানো শেষ আপনার! আর এইযে কোলের ফাইলটাই আপনার চোখের নিচে কালি পরা আর স্বাস্থ্যহানীর কারন। ছবিতে বেশ তুষ্টপুষ্ট দেখেছিলাম। মাত্র সাত আটমাসের ব্যবধানে এমন হয়ে গেলেন। কোনো সিঙ্গেল কেইস সাত আটমাস ঝুলিয়ে রাখার পাত্র আপনি নন। ফাইলের ভেতরের একপেইজ ভাজ পরা৷ তারহুড়ো করে ঠিক করতে গিয়ে আরো এলোমেলো করে দিয়েছেন ওটা। যতোদুর চোখ যায়, ওখানে পায়ের গিটের ছবি। থেতলানো। কেইসটা কোনো প্রি প্লানড্ মার্ডারের। অনেকগুলো পেইজ, একাধিক মার্ডারের ঘটনা। হুইচ মিনস্, সিরিয়াল কিলিং কেইস। আর যেহেতু নাহিদ আঙ্কেলের কাছে এসেছেন, মার্ডারারের মেন্টাল টেন্ডেন্সি ট্রেস করার জন্যই এসেছেন। তবে আমি আসার আগমুহুর্তে চেহারার যে রঙ ছিলো আপনার, মনে হয় না খুব একটা উপকার পেয়েছেন এই ব্যাটার কাছে এসে! এজন্য অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে সমবেদনা প্রকাশ করছি।
ওর কথা বলার পুরোটা সময়ই টেবিলের পেপারওয়েটটা ঘুরছিলো। বলা শেষ করে ওটাকে ধরে ফেললো ছেলেটা। অচেনা যুবকের মুখে গরগর করে সত্যি শুনে আটকে রইলেন আফজাল সাহেব। ছেলেটা আরেকটু এগিয়ে বসে আগ্রহ নিয়ে বললো,
-কিছু ভুল বললাম আঙ্কেল?
প্রফেসর নাহিদ ইন্সপেক্টর আফজালের চেহারা দেখে হোহো করে হাসতে লাগলে। অবুঝের মতো বসে রিলেন ইন্সপেক্টর আফজাল। প্রফেসর নাহিদ এগিয়ে গিয়ে তার কাধে হাত রেখে বললেন,
-বুঝলি আফজাল, এনার পাওয়ার অফ অবজার্ভেশন নিয়ে এখনো অবদি প্রশ্ন তুলতে পারিনি আমরা। আমার স্টুডেন্ট কম, টিচার ইনি! সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের থারটি টু ব্যাচের সবচাইতে তুখোড় স্টুডেন্ট। ফ্যাকাল্টির গোল্ডমেডেলও আছে ওর। হাভার্ড থেকে থেকে হিউম্যান সাইকোলজি এন্ড মাইন্ড এর উপর ডক্টরেট শেষ করেছে। যদিও দেশীয় থেসিসের মুল্যায়ন আমরা বাঙালিরা দেবো না, ও শুধু প্র্যাক্টিকাল নলেজ গেইন, এক্সপেরিয়েন্স নামের থেসিস এই ভার্সিটিতেই শেষ করতে এসেছে।
প্রফেসর নাহিদের কথায় ইন্সপেক্টর আফজাল আরেকবার আপাদমস্তক দেখে নিলেন ছেলেটাকে। আস্তেধীরে বললেন,
-ছেলেটাকে চেনাচেনা লাগছে না?
আবারো শব্দ করে হাসতে শুরু করলেন প্রফেসর নাহিদ। ছেলেটাও ঠোট টিপে হাসছে। হাসি কমিয়ে নাহিদ সাহেব বললেন,
-এতেক্ষনে চেনা চেনা মনে হলো তোর? আরে এ আর কেউ নয়! আমার বড় ভাইজানের ছোট ছেলে, ইয়াকীন শারাফ।
#চলবে…
শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link

