#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা
৪.
অফিসার্স মিটিংয়ে ছয়জন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারের সামনে পুরোনো কিছু কেইসের ফাইল করলেন ইন্সপেক্টর আফজাল। ওপরের ফাইলটার সিরিয়াল দেখে ভ্রু কুচকালেন সকলেই। একটা মার্ডার কেইসের জন্য এভাবে ইমারজেন্সি মিটিংয়ে বসায় বিরক্ত প্রত্যেকেই। কিন্তু উপায় নেই কোনো। উপরমহলের আদেশ নিয়েই মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন ইন্সপেক্টর আফজাল। তাই বাধ্য হয়েই মিটিংয়ে আসতে হয়েছে সবাইকে। অফিসারের একজন, ইন্সপেক্টর বাকের বললেন,
-এতো পুরোনো কেইস? অভিযোগকারী রিওপেন করানো নিয়ে ঝামেলা করেছে নাকি?
-রিওপেন না৷ উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমানের অভাবে কেইসগুলো কখনো সলভড্ হয়ই নি।
কথাটা শুনে চেহারার বিরক্তি আরো বাড়লো ইন্সপেক্টর বাকেরের। বললেন,
-ও! তো সেগুলো এখানে কেনো?
-কেনো সেটা বলবো বলেই তো আপনাদের ডাকা অফিসার।
-একটু ঝেরে কাসুন তো অফিসার। বলা হলো দু দিন আগের একটা মার্ডার কেইসের জন্য ইমারজেন্সি অফিসার্স মিটিং। আপনি বলছেন পুরোনো কেইসের কাহিনী। তো এমনটা বলার কোনো দরকার ছিলো ইন্সপেক্টর?
-বিনা দরকারে মিটিং ডেকে আপনাদের সাথে খোশগল্প করার জন্য অতিআগ্রহী আমি। আপনার কি আমাকে দেখে এমনটাই মনে হচ্ছে ইন্সপেক্টর বাকের?
আফজাল সাহেবের সোজা জবাবে অপমানিতবোধ করলেও কিছু বললেন না ইন্সপেক্টর বাকের। আফজাল সাহেব ফাইলগুলো একেএকে এগিয়ে দিলেন প্রত্যেকের দিকে। একেএকে সবগুলো ফাইল দেখে তারদিকে বিস্ময়ে তাকালেন সবাই। একজন তার হাতের ফাইলটা দেখিয়ে বললো,
-এটা ছ মাস পুরোনো কেইসের ফাইল অফিসার! এর সাথেও রিসেন্ট মার্ডারগুলোর ইনভল্বমেন্ট আছে?
আফজাল সাহেব শান্তগলায় বললেন,
-আমি তো এমনটাই দেখতে পাচ্ছি।
বাকের সাহেব একসাথে তিনচারটা ফাইল নিয়ে বসেছেন৷ প্রতিটা পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে সমস্ত মিলগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলেন উনি। সত্যিই কিছু অদ্ভুত মিল আছে সবগুলো খুনের ক্ষেত্রে। আফজাল সাহেব বললেন,
-আর ইউ ডান ইন্সপেক্টর? মে উই প্রসিড?
মুখ দিয়ে চিন্তার নিশ্বাস ছাড়লেন বাকের সাহেব। ফাইলগুলো ঠেলে এগিয়ে দিলেন উনি। বললেন,
-হি ইজ ঠু ডেন্জারাস অফিসার!
-ডেন্জারাস, সেটা জানি। ইনফ্যাক্ট, শুধু সেটাই জানি। এখন হি অর দে তাকে বা তাদেরকে কোন সর্বনামে ডাকবো, কোথায় পাবো, কিভাবে পাবো, সেটা জানার জন্যই আজকের মিটিং। আর এগুলো খুব দ্রুত জানতে হবে আমাদের। এজ সুন, এজ পসিবল!
-কিভাবে সম্ভব সেটা? এখানকার একটা কেইসেও কোনো হিন্টস্ মার্ক করা পসিবল হয়নি।
আফজাল সাহেব বললেন,
-যেটুকো দেখছেন, সেটুকোও কি এক্সপেক্ট করেছিলেন অফিসার?
উনি চুপ করে গেলেন৷ আফজাল সাহেব মুচকি হেসে কলসিস্টেমে নক করে বললেন,
-কাম ইন।
সেকেন্ড পাঁচেকের মধ্যে ফর্সা গরনের এক যুবক দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। স্যালুট জানিয়ে বক্ষসোজা হয়ে দাড়িয়ে গেলো পুলিশি ভঙিমায়। বাকের সাহেব বললেন,
-হু ইজ হি অফিসার?
-মিট ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদ৷ এখনো অবদি কেইসগুলোর মোস্ট অথেনটিক কানেক্টিভিটি ওই ধরতে পেরেছে। কেইসটার ইনচার্জ হিসেবে ওকেই রাখতে চাইছি আমি।
ফাইলগুলোর তথ্যগুলো দেখে সম্মতি জানালো প্রত্যেকেই। জোরে একটা দম নিয়ে ফাইলসমেত মিটিংরুম থেকে বেরোলো সাইফ। কেনো যেনো ওর মনে হলো, অদৃশ্য আত্মার সাথে দ্বন্দযুদ্ধে নেমেছে ও। স্বেচ্ছায়…
•
বিকেল গরিয়ে সন্ধ্যে নেমেছে। ফি জমা দিয়ে অনুকে নিয়ে আবারো ডিপার্টমেন্টের সামনে আসলো স্নিগ্ধতা। ওর সব ড্রয়িং, স্কেচ সিড়িতেই রেখে গিয়েছিল, সেগুলো নেবে বলে। বাকিসবার বেশিরভাগই চলে গেছে। দুজন মেয়ে আর চারজন ছেলে রয়ে গেছে শুধু। অনু কিছু বলছে না। চুপচাপ একধ্যানে নিচদিক তাকিয়ে আছে। স্নিগ্ধতা সবার সামনে বলে কিছু বললো না। সিড়ি থেকে ওর ক্যানভাসগুলো নিয়ে চলে আসছিলো দুজনে। একটা ছেলে পেছন থেকে ডাক লাগালো স্নিগ্ধতাকে। এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। স্নিগ্ধতা প্রশ্নসুচক চাওনিতে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। আর ছেলেটা ওর চোখের দিকে তাকিয়েও চোখ নামিয়ে নিলো আবার। আশেপাশ দেখার মতো ব্যস্ততা দেখিয়ে বললো,
-চলে যাচ্ছিস?
মাথা উপরনিচ করলো স্নিগ্ধতা। ছেলেটা ওভাবেই ইতস্তত করতে লাগলো। স্নিগ্ধতা বললো,
-কিছু বলবি মুহিব?
মুহিব চমকে উঠলো যেনো। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে যতোগুলো ছেলে স্নিগ্ধতাকে দেখেছে, ওর প্রশংসা করেনি, মুগ্ধতায় পরেনি, এমন ছেলে কমই আছে। কেউ রুপের, কেউ গুনের। কেউ একবারের দেখায়, কেউ বারবারের দেখায়। তারমধ্যে কেউ প্রকাশ করেছে, কেউ করেনি। প্রকাশ করেছে যারা, প্রত্যেককেই অত্যন্ত নম্রভাবে প্রত্যাখান করেছে স্নিগ্ধতা। বলা যায় এই প্রত্যাখিত হওয়ার ভয়েই প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি বেশিরভাগের। এরমধ্যে মুহিব নিজেও একজন। স্নিগ্ধতার সাথের বন্ধুত্বটা কোনোভাবেই হারাতে চায়নি ও। জোরপুর্বক হেসে বললো,
-আ্ আসলে আমারও শেষ কাজ। তোকে বাসায় ড্রপ করে দেই?
মুখে স্বীকার না করলেও মুহিবের অনুভূতি অজানা নয় স্নিগ্ধতার। তেমনি মুহিবেরও তো ওর উত্তর অজানা না। সবটা জেনেও যারা নিরবে ওকে পছন্দের তালিকায় বসিয়ে রেখেছে, তাদেরকে কি-ই বা বলবে ও? প্রত্যাখিত হবে জেনেও যদি ওর প্রতি কেউ দুর্বল হয়ে পরে, সে জন্য ওকে কেনো আত্মগ্লানিতে থাকতে হবে? কেনো এই অদ্ভুত নিয়ম চারপাশের? প্রশ্ন নিয়েই মুহিবের দিকে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। মুহিব আর তাকাতে পারছে না ওর দিকে। অনু বললো,
-স্নিগ্ধতা তোর সাথে যাবেনা, সেটাতো তুই জানিসই মুহিব। কেনো ওকে…
-আমার কাজ আছে অনু। আসছি।
মুহিব দ্রুতপদে চলে গেলে ওখান থেকে। শক্ত হয়ে দাড়িয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। অনু ওর কাধে হাত রেখে বললো,
-ওকে দোষ দিস না স্নিগ্ধতা। আল্লাহতায়ালা অনেক যত্ন করে বানিয়েছেন তোকে। সু্ন্দরপুজারীরা তো মোহে পরবেই। এই আমার কথাই ধর! আমি ভেবেছিলাম, কালকের পর থেকে আর তোকে দেখতে পাবো না। দারিদ্রের জন্য পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার চেয়ে, তোর থেকে দুরে থাকতে আমার বেশি কষ্ট হতো। রোজরোজ তোর মায়াবী চেহারাটা দেখা হবে না আর, কান্না পাচ্ছিলো এটা ভেবেই! বিশ্বাস কর!
মন খারাপ ছিলো। তারপরও স্নিগ্ধতা একপলক ওর দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে ফেললো। বললো,
-মেয়ে হয়ে মেয়ের ওপর ফল করছিস?
অন্যসময় হলে হয়তো গাল ফুলাতো অনু। কিন্তু এবারে তা না করে বললো,
-হুম। সবার মতো আমিও প্রেমে পরে গেছি আপনার। কে এতো প্রেমময় হতে বলেছে আপনাকে বলুনতো?
-হয়েছে হয়েছে! তোর ওভারলোডেড প্রশংসার তোপে দিন গরিয়ে যে রাত হচ্ছে, সে খেয়াল আছে? পঞ্চমুখী আজকে নির্ঘাত বাস মিস করবে!
অনু আশপাশ দেখে বললো,
-উপস্! হ্যাঁ চল চল!
হাটা লাগালো দুজনে মিলে। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে বাস পেয়ে বাসে চলে গেলো অনু। স্নিগ্ধতা গেইটে দাড়িয়ে রিকশা খুজতে লাগলো উকিঝুকি দিয়ে। সেকেন্ডদুইয়ের মধ্যে একটা সাদা গাড়ি এসে থামলো ওর সামনে। ভেতরে ড্রাইভিং সিটে বসা যুবক হেসে গাড়ির দরজা খুলে দিলো। স্নিগ্ধতা সরু চোখে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। বললো,
-আমি একাই বাসা যেতে পারি, কতোবার বললে কথাটা তুমি মানবে বলোতো?
-আরো একটা আশিক?
স্নিগ্ধতার কয়েকহাত পেছনে দাড়িয়ে তীব্র আক্রোশে কথাটা বললো আবির। এরপর হতাশচোখে তাকালো শারাফের দিকে। শারাফ গুরুত্বহীনভাবে হাতের ঘড়ি ঠিক করছে নিজের। আবির আরো অবাক হলো। এতোক্ষন রিডিং রুমে ছিলো দুজনেই। স্নিগ্ধতা অনুকে নিয়ে চলে যাবার পর শারাফ থেসিসের জন্য দরকারি বই দেখতে গিয়েছিলো সাইকোলজির সেমিনারে। ওখান থেকে রিডিং রুম। এরপর বেরিয়ে আসার সময় চারুকলায় গিয়েছিলো প্রদর্শনীর টিকিট নিতে। ঘটনাচক্রে ওখানে গিয়ে আবারো স্নিগ্ধতাকেও দেখতে পায় ওরা। কথপকথন না শুনলেও, মুহিবের বিষয়টা বুঝতে বেগ পেতে হয়নি শারাফের। আবিরও বুঝেছে বিষয়টা। এখন আবার এমন পরিস্থিতি দেখে ওর প্রতিক্রিয়া খুব একটা অযৌক্তিক না। কিন্তু শারাফ কিছুই বললো না। আবির আরো কিছু বলতে যাবে, শারাফ গা ছাড়াভাবে বললো,
-ওটা ওর ভাই হয়।
বিস্ফোরিত চোখে শারাফের দিকে তাকিয়ে রইলো আবির। শারাফ চোখ তুলে তাকালো। তারপর ওর কিঞ্চিত হা হওয়া মুখটা হাতে বন্ধ করে দিয়ে ইশারা করলো সামনে দেখার জন্য। রোবটের মতো পাশ ফিরলো আবির। গাড়ির ভেতরে থাকা যুবক মাথাটা চুলকে বললো,
-তুই একা যেতে পারবি এটা জানি তো আমি! এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম…
-মোটেও এদিক দিয়ে যাচ্ছিলে না! তোমার বোনকে একা পেয়ে কেউ তুলে নিয়ে গেছে, এই ভয়ে উল্টোপথেই চলে এসেছো তুমি! আমাকে…
স্নিগ্ধতা বলে চলেছে। বলে চলেছে বললে ভুল হবে। একপ্রকার শাসাচ্ছে যুবককে। কিন্তু তার কিছুই কানে এলো না আবিরের৷ কেবলমাত্র “বোন” শব্দটা শুনেই আবারো হা হয়ে আছে ওর মুখ। শারাফের দিকে তাজ্জবের মতো তাকিয়ে রইলো শুধু। শারাফ ঠোটে মৃদ্যু হাসি রেখে কেবল স্নিগ্ধতার কথা শুনছে। স্নিগ্ধতা যখনই যুবককে বলছে আর কতোদিন বলবো তোমায়, তখনই ও বুঝে গেছে, এটা এমন কেউ, যার ওর বারনের ওপর অধিকারবোধ খাটানোর অধিকার আছে। আর ইতিমধ্যে স্নিগ্ধতাকে নিয়ে ওর যে ধারনা হয়েছে, তাতে ও নিশ্চিতই ছিলো, কোনো ছেলেকে এই অধিকার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত না স্নিগ্ধতা। সেটা যে কারনেই হোক না কেনো। তাই যুবক যে নিসন্দেহে ওর ভাই-ই হবে, অন্তত সেটা বোঝার মতো মনোবিজ্ঞান আয়ত্ত্ব করেছে ও। কথা বলতে বলতে কয়েকবার হাত নাড়িয়েছে স্নিগ্ধতা। খোলা চুল কানে গুজে দেওয়ার সময় যখন তালু দৃষ্টিগোচর হলো, কবজিতে থাকা কালো দাগটা তৎক্ষনাৎ নজর কাড়লো ওর। চুপচাপ বেশ অনেকটা বকা হজম করার পর যুবক মিনমিনে গলায় বললো,
-আর কতো কথা শুনাবি টুকি? এভাবে রাস্তায় দাড়িয়ে দাড়িয়েই শাসনপর্ব শেষ না করে, বাসার জন্যও কিছু বরাদ্দ রাখ?
কথা বাড়ালো না স্নিগ্ধতা। বাড়িয়ে লাভ হয়নি কোনোদিনও। গাল ফুলিয়ে ফ্রন্টসিটে উঠে বসলো চুপচাপ। স্নিগ্ধতার সে রুপটাকেও মুগ্ধনয়নে এটে নিতে ভুললো না শারাফ। যুবকের শেষ কথায় বুঝলো, ভাইয়ের কাছে স্নিগ্ধতার আদুরে ডাকনাম টুকি। এবারে যুবকের নাম দেখার উদ্দেশ্যে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের সামনের নেমপ্লেটে চোখ বুলালো ও। সেখানে সাদা নেমপ্লেটে কালো হরফে স্পষ্টাক্ষরে লেখা, “ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদ, ডিএমপি”
#চলবে…
[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

