#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা
৭.
মেইনগেইটের খানিকটা সামনে অনুর সাথে দাড়িয়ে কথা বলছিলো স্নিগ্ধতা। প্রতিদিন আরো দেরিতে ক্লাস শেষ হলেও, আজকে প্রদর্শনী ছিলো বলে তাড়াতাড়িই ফিরবে বাসায়। একাই ফিরতো। কিন্তু সাইফ বারবার করে ওকে বলেছে একা বাসায় না ফিরতে। যাওয়ার সময় ওই নিয়ে যাবে। এমনিতেও আরাফাতের বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিলো সাইফ। তাই ওর কথায় আর দ্বিমত করেনি স্নিগ্ধতা। ভাইয়ের আসা অবদি অপেক্ষা করবে বলে অনুর সাথে দাড়িয়ে ছিলো ও। এরমাঝে ব্যাগের ফিতা টানতে টানতে মুহিবও এসে দাড়ালো। আশেপাশে চলাচল করছিলো অনেকেই। অনু মুহিবকে কিছু বলতে যাবে, হঠাৎই একটা মেয়ে এসে স্নিগ্ধতার ঠিক পাশের ছেলেটাকে চড় মেরে দিলো। পুরো জায়গাটা থমকে রইলো কয়েকদন্ডের জন্য। চলমান পা থেমে গিয়েছে সবার। গালে হাত রেখে ছেলেটা রক্তচক্ষু করে তাকালো মেয়েটার দিকে। পাশের বাইকে বসে থাকা আরেকটা ছেলে নেমে চেচিয়ে বললো,
-এতোবড় সাহস তোর? চঞ্চল ভাইয়ের গায়ে হাত দিলি?
তৎক্ষনাৎ ওদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া আরেকটা বাইক থেমে গেলো। সেখান থেকে আরো তিনটে ছেলে নেমে এসে দাড়ালো যে চড় খেয়েছে তার পেছনে। স্নিগ্ধতা, অনু সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ছেলেদুটোর দিকে। এরা ওদের ডিপার্টমেন্টের না। স্নিগ্ধতার মনে হলো, মেয়েটা বোধহয় অকারন ঝামেলা তৈরী করলো। ভালোমতোই বেরিয়ে যাচ্ছিলো ছেলেটা। মেয়েটা শুধুশুধু চড় মারতে গেলো তাকে। উচ্চস্বর শুনে মেয়েটা অগ্নিদৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকালো। কালোফ্রেমের চশমা আর মোটা করে কাজল দেওয়া চোখ মেয়েটার। অপ্রত্যাশিতভাবে ওই ছেলেটাকেও চড় মেরে দিলো সে৷ রাগ নিয়ে চেচিয়ে বললো,
-ক্যাম্পাসে শুধু মেয়েদের হ্যারাস আর গুন্ডামো করার উদ্দেশ্যেই আসা হয় তাইনা?
চুপচাপ তার দিকে বড়বড় চোখে তাকিয়ে রইলো প্রত্যেকে। অকস্মাক এমন পরিস্থিতির জন্য থমকে গিয়েছে সবাই। স্নিগ্ধতা ওর আশেপাশের ছেলেগুলোর দিকে তাকালো। অন্যসময় হলে সবাই মুখ খুলতো। কেউই অকারন ঝামেলা তৈরীর পক্ষে না ওরা। কিন্তু আজকে কেউ কিছু বলছে না মানে মেয়েটাই ঠিক। মুহিব ঘৃনার চোখে চঞ্চলকে দেখে নিলো। তার চোখগুলো রাগে লাল হয়ে গেছে। গালে হাত দিয়ে চড়দাত্রীর দিকে তাকিয়ে কাপছে ও। ওকে ওভাবে দেখে মনের ভেতরে কেমন একটা শীতলতা অনুভব হলো মুহিবের।
সিনিয়র আর রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার জেরে, আগে থেকেই ক্যাম্পাসের মেয়েদেরকে নানাভাবে হ্যারাস করে আসছে এই ছেলে আর ওদের দল। এসব জানার পর থেকেই চঞ্চলকে এই চড়টা মারার ইচ্ছা মুহিবের। কিন্তু পারেনি। ওদের রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা শুনে, বাকিসবার মতো থেমে যেতে হয়েছে ওকে। এদিকে নিজের কাপুরুষতার প্রমান পেয়েছে ও। বেশ বুঝলো, মেয়েটার সাথেও হয়তো বাজে কিছু ঘটেছে। হয়তোবা কিছু জানে না চঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতা, তার ভয়াবহতার বিষয়ে। তাই এসে চড় মেরে দিয়েছে। ওদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা চঞ্চলের বাইক থেকে স্নিগ্ধতার ওড়না ছাড়িয়ে নিলো। স্নিগ্ধতার হাতে ওড়না দিয়ে বললো,
-ইচ্ছা করে এটা বাইকে আটকে দিয়েছিলো।
বিস্ফোরিত চোখে তাকালো স্নিগ্ধতা। তারমানে ওরা যখন কথা বলতে ব্যস্ত ছিলো, চঞ্চল ইচ্ছা করে নিজের বাইকে ওর ওড়না পেঁচিয়েছে। ওকে সবার সামনে অপমান করবে বলে। আর সেটা দেখেই মেয়েটা চড় লাগিয়েছে ওকে। মুহিব হাত মুঠো করে রইলো। স্নিগ্ধতাকে চঞ্চলের দলের সবার দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখার জন্য অনেককিছুই করেছে ও এতোদিন। অন্য ডিপার্টমেন্টের বলে এদিকে আসেও কম চঞ্চল। আজকে হুট করে এমনটা ঘটলো কেনো তবে? আশপাশ তাকিয়ে খানিকটা দুরেই গাড়িতে হেলান দিয়ে আলিশাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো মুহিব। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে এদিকেই তাকিয়ে ও। রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো মুহিবের। বুঝতে বাকি রইলো না ওর, আলিশাই চঞ্চলকে দিয়ে স্নিগ্ধতাকে অপমান করাতে চেয়েছে। মেয়েটা এবার চঞ্চলের দিকে ফিরে আঙুল উচিয়ে বললো,
-পরেরবার এমন বেয়াদবি দেখলে…
চঞ্চলকে আঙুলতাক করতে দেখে ফুসে উঠলো ওর পেছনের বাকি ছেলেগুলো। ওকে বলতে না দিয়ে একজন চেচিয়ে বললো,
-এই মেয়ে! তোকে তো…
-আইডি কার্ড বের কর।
শান্তশীতল গলায় বললো চঞ্চল। মুহিব নুইয়ে গেলো। যারা চঞ্চলের বিপরীতে বলবে, তাদের সাথে এমনই ঘটে। পরিচয় আর হল জানার পর তার জীবন নরক করে দেয় চঞ্চল আর ওর দলের ছেলেরা মিলে। আর এটা তো মেয়ে! কি জানি ওর জন্য কি অপেক্ষা করছে! কেউ না কেউ বিষয়টাকে থামাবে বলে আশা করেছিলো স্নিগ্ধতা। মুহিবসহ বাকিদের চেহারা দেখে সে আশা নিঃশেষ হয়ে গেলে ওর। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখে সে নিস্প্রভ। কোনোরুপ ভীতগ্রস্ত প্রতিক্রিয়া নেই তার। চঞ্চল এবার চেচিয়ে বললো,
-ভার্সিটির আইডি আর হল আইডি বের কর!
স্নিগ্ধতা কিছু বলতে যাচ্ছিলো। ঠিক তখনই ওর চোখে পরলো, ভীড়ের মাঝে সাইফও দাড়িয়ে। স্নিগ্ধতা বারন করেছে বলে কখনোই ভার্সিটিতে ইউনিফর্ম পরে আসেনি ও। আজও সেরকম। স্নিগ্ধতা ভাইয়া বলে ডাকতে যাবে সাইফ ওকে ইশারায় বুঝালো কিছু না বলতে। অবাক না হয়ে পারলো না ও। কখন এসেছে সাইফ? সবটা দেখে চুপ করে আছে কেনো? সচারচর কোথাও বাড়াবাড়ি কিছু দেখলে, সাইফকে ওই সামলায়। সেখানে সাইফ নিজে থেকেই চুপ আজ। ভাইয়ের এমনটা করার কারন না বুঝলেও, কারন আছে, এটা জানাই যথেষ্ট ওর জন্য। তাই সাইফের কথামতো চুপ রইলো স্নিগ্ধতা। মেয়েটা নিজের সাইডব্যাগ থেকে আইডিকার্ড বের করে এগিয়ে দিলো চঞ্চলের দিকে। ওটা ঝারা মেরে হাতে নিলো চঞ্চল। কিন্তু তাতে চোখ বুলাতেই চেহারার রঙ পাল্টে গেলো ওর। মেয়েটা দাতে দাত চেপে বললো,
-অগ্নিলা চৌধুরী। লেকচারার অফ সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট এন্ড এক্স সাইকোলজিয়ান অফ ব্যাচ থার্টি টু।
পরিচয়টা শুনে যেনো অদৃশ্য কোনো ঝড় বয়ে গেলো উপস্থিত সবার মাঝে। অগ্নিলা আশেপাশে তাকালো। শিক্ষিকা হিসেবে এ ভার্সিটিতে আজকেই ওর প্রথম দিন। তাই আজকে কোনোরুপ অপ্রীতিকর পরিস্থিতি একদমই চায়নি ও। কিন্তু সামলাতে পারলো না নিজেকে। মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও, ওর নিজেরই আত্মনিয়ন্ত্রণে খুঁত আছে। মেয়েদেরকে হ্যারাস হতে দেখলে মাথা ঠিক থাকে না ওর। রাগটা বেরিয়ে আসে। চঞ্চলকে স্নিগ্ধতার ওড়না বাইকে পেঁচাতে দেখে বুঝে গিয়েছিলো, ছেলেটা জঘন্যভাবে অপমান করতে চাইছে স্নিগ্ধতাকে। মানতে পারেনি ও তা। তাই চড় লাগিয়ে দিয়েছে এসে। তার ওপর পাশের ছেলেটার গলার স্বরও ভালো লাগেনি ওর। তাই ওকেও চড় লাগিয়েছে।
সাইফ ডানহাতে নাক ঘষে, ঠোট টিপে হাসলো। মনোবিজ্ঞানের শিক্ষিকার রাগ নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা এতো কম হবে, বাকিসবের মতো এমনটা ধারনা করেনি ওউ। গাড়ি পার্ক করার সময় ছেলেটাকে ওউ দেখেছে স্নিগ্ধতার ওড়না পেচাতে। রাগ নিয়ে পা বাড়িয়েছিলো, তার আগেই অগ্নিলা এসে চড় মেরেছে চঞ্চলকে। মনেমনে মানতে বাধ্য হলো, নামের মতো কাজেও সে এক রণমূর্তি। অগ্নিলা আইডিকার্ডটা কেড়ে নিলো চঞ্চলের থেকে। বললো,
-তিনবছর আগেই হল ছেড়েছি বলে ইনভ্যালিড হল আইডিকার্ড আপনাকে আর দেখালাম না বড়ভাই। ডোন্ড মাইন্ড প্লিজ।
…
-এনিওয়েজ! পরিচয়পর্ব শেষ? নাও লিসেন। এরপর কখনো এমন কিছু দেখলে, তোমাকে রাস্টিকেট করার সবরকমের ব্যবস্থা আমি নেবো। সুযোগ দিচ্ছি, শুধরে যাও।
অগ্নিলার গলার স্বর অধঃগামী। স্বাভাবিক হয়ে এবারে পাশের ছেলেগুলোর দিকে ফিরে বললো,
-এন্ড ইউ অলসো। তোমাদের কারো তরফ থেকে, আর কখনো, কোনোরকম ঝামেলা চাইছি না আমি। বাবা-মা তোমাদের পড়াশোনার জন্য ভার্সিটিতে পাঠিয়েছে। সো সেদিকেই মনোযোগ দাও।
অগ্নিলার কথায় চঞ্চল দমলো না। বরং বাকা হাসি ফুটলো ওর ঠোটের কোনে। বললো,
-ম্যাডামের দেখি প্রচুর চিন্তা আমাদের নিয়ে!
অগ্নিলা শক্ত হয়ে দাড়িয়ে। চঞ্চল ওর দিকে একপা এগোলো। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
-যাকগে! আমাদের কথা ছাড়ো! তুমি কার কলিজায় হাত দিয়েছো, জানো না ম্যাডাম। আগে তো স্টুডেন্ট ছিলে। টিচার হয়ে নতুন এসেছো না? ক্যাম্পাসের নতুন এক দৃশ্যচিত্র দেখাবো তোমাকে। রেডি থেকো। নন্দিত নরকে স্বাগতম।
কথাগুলো বলে হাসি আরেকটু প্রসারিত করলো চঞ্চল। এরপর স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে, নিজের গালে হাত বুলিয়ে বললো,
-চঞ্চল কারো কথায় কাজ করে না। আলিশা কেনো? আলিশা চৌদ্দগোষ্ঠীও আমাকে তোমার কাছে আনতে পারতো না যদি তুমি এমন…
কথা শেষ না করে, স্নিগ্ধতাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বিশ্রি একটা হাসি দিলো চঞ্চল। যা দেখে পায়ের তলার মাটি গরম হয়ে গেলো সাইফের। হাত মুঠো করে, পারিপার্শ্বিক ভুলে যেইনা চঞ্চলের দিকে এগোবে ও, “স্নিগ্ধতা!” বলে চিৎকার করে উঠলো অনু। সাইফ থেমে গেলো। পাশে তাকিয়ে দেখে, অনুর ওপর শরীরের ভর ছেড়ে দিয়েছে স্নিগ্ধতা। জ্ঞান হারিয়েছে ও।
#চলবে…
[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

