নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ২৬.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৬.

– শায়েরীর পা কেটেছে। কোনো হার্টব্লক হয়নি যে স্থেটোস্কোপ দিয়ে ওর হার্টবিট চেইক করতে হবে। দুবার বললো না ও ও ঠিক আছে? দেন হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ হার ইন দ্যাট ওয়ে?

মাঝবয়সী ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বজ্রকন্ঠে চেচিয়ে বললো অগ্নিলা। শায়েরী ওর উচ্চস্বর শুনে কেপে উঠলো। আরো ভালোমতোন মুখ গুজলো ও অগ্নিলার বুকে। প্যানিক এটাকের সম্ভবনা আছে এমনটা বলে চেইকআপ করছিলো ডক্টর। কিন্তু শায়েরীর অনুভব হলো, বুকে স্থেটোস্কোপ লাগানোর নাম করে ওকে বিশ্রিভাবে ছুয়ে দিচ্ছিলো সে। মুখফুটে কিছু বলতে না পারলেও শুধু বলেছিলো ও ঠিক আছে। ওর অস্বস্তি লক্ষ্য করেছে অগ্নিলা। শায়েরীর হাটু ছড়েছে, শারাফ সরে দাড়িয়েছে, তারওপর শায়েরী চাইছে না চেইকআপ করাতে। প্যানিক এটাকের নাম করে যে ডাক্তার সুযোগ নিচ্ছিলো, বুঝতে বাকি রইলো না ওর। দুবার বারন করার পরও যখন ডক্টর শোনেনি, বাধ্য হয়ে তার গায়ে হাত তুলেছে ও। ডাক্তার নিজেও উচুস্বরে বললো,

– আপনি আমাকে চড় মারলেন?

– পারলে আরো কয়েকটা দিতাম। কোন স্পর্শ সঠিক, কোনটা বাজে, এটুকো বোঝার বয়স শায়েরীর অনেক আগেই হয়েছে। আর মেয়ে হিসেবে, সাইকোলজির লেকচারার হিসেবে ওকে বোঝার ক্ষমতাও আমার আছে। সো ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু মেক এনি হিপোক্রেসি! ডোন্ট!

আঙুল উচিয়ে বললো অগ্নিলা। ওর কথা শুনে, বোনের অবস্থা দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেলো শারাফের। চোয়াল শক্ত করে দুহাত মুঠো করে নিলো নিজের। ওকে দেখে ঘাবড়ে গেলো স্নিগ্ধতাও। শারাফ ডানহাতে শার্টের বা হাতাটা টান মেরে সোজা গিয়ে কলার ধরলো ডাক্তারের। শারাফ ডাক্তারের নাক বরাবর ঘুষি লাগাতেই রক্ত আসতে লাগলো তার নাক দিয়ে। স্নিগ্ধতা আঁতকে উঠলো। মুখে হাত দিয়ে একপা পিছিয়ে গেলো ও। অগ্নিলা শায়েরীকে জরিয়ে আছে। শারাফ ডাক্তারের কলার আরো জোরে চেপে ধরলো। রাগে কাপছে ও। ওদিকে ডাক্তার নাক মুছছে আর টলছে। শারাফ দাতে দাত চেপে বললো,

– তোর সাহস কি করে হলো শাইকে ব্যাডটাচ করার? সাহস কি করে হলো তোর?

– দ্ দেখুন…

– তোকে তো…

দ্বিতীয়বারের মতো তার মুখে ঘুষি লাগালো শারাফ। কেবিনের ভেতর থেকে এবার আরো দুটো ছেলে, এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে আসলো। ছেলেদুটো এসে শারাফকে পেছন থেকে জরিয়ে ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না। উল্টো শারাফ ওদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ডাক্তারকে চড় থাপ্পর দিয়ে চলেছে। পুরো চেহারা রক্তাক্ত হয়ে গেছে তার। ঝামেলা দেখে ভদ্রমহিলা দ্রুত স্থানত্যাগ করলেন। এদিকে রক্ত দেখার পর সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে স্নিগ্ধতার। অগ্নিলা শায়েরীকে ধরে ছিলো। শারাফ থামছেই না দেখে ও স্নিগ্ধতাকে বললো,

– স্নিগ্ধতা? শারাফকে থামাও প্লিজ। নয়তো ও এখানে ভয়ানক কিছু করে ফেলবে। ওকে থামাও!

স্নিগ্ধতা শুকনো ঢোক গিললো। রক্ত দেখে ওর চারপাশ ক্রমশ ঘুরছে। ওদিকে সত্যিই শারাফ খুব ভয়ানকভাবে রেগে গেছে। ওর এই রুপটা যেমন ওকে অবাক করেছে, তেমনি ভীতগ্রস্ত করে দিয়েছে। ধস্তাধস্তির আওয়াজ শুনে আশপাশ থেকে লোকজনও চলে এসেছে। ডাক্তারের অবস্থা অনেক আগেই রোগীর মতো হয়ে এসেছে। এবার শারাফকে থামানো না হলে বাড়াবড়িই হয়ে যাবে। অগ্নিলা বারবার ওকে বলে চলেছে শারাফকে থামাও। স্নিগ্ধতা বুঝেই উঠতে পারছে না কি করবে। এক পর্যায়ে কি হলো ওর, শারাফকে গিয়ে সামনে থেকে জরিয়ে ধরলো ও। চেচিয়ে বললো,

– শান্ত হোন মিস্টার শারাফ! ছেড়ে দিন ওনাকে! লিভ হিম! প্লিজ!

শারাফ নিজেকে সামলাতে নারাজ। শায়েরী ভয়ে কেদে দিয়েছে। কান্নারত স্বরে বললো,

– ছেড়ে দে ভাইয়া! অনেক হয়েছে! ছেড়ে দে এবার!

শারাফ থামলো। স্নিগ্ধতা জাপটে জরিয়ে আছে ওকে। শারাফের হৃদস্পন্দনও আজ বেগতিক। বোনের দিকে অসহায়ের মতো তাকালো শারাফ। ও থাকা সত্ত্বেও ওর বোনকে অপমানিত হতে হলো। না জানি কতোজনের বোন এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে! এমন কতোগুলো পশুর আলাদা আলাদা ধরনে অপমানের শিকার হয়েছে কতোজন! এমনটা ভাবতেই সবকিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে ওর। স্নিগ্ধতাকে ছাড়িয়ে আবারো ডাক্তারের দিকে এগোতে যাচ্ছিলো শারাফ। এবারে আরো শক্তিতে ওকে জরিয়ে ধরলো স্নিগ্ধতা। কম্পিতকন্ঠে বললো,

– নিজেকে সামলান মিস্টার শারাফ। প্লিজ কন্ট্রোল ইওরসেল্ফ! প্লিজ!

তারপর আশেপাশের মানুষগুলোর উদ্দেশ্যে বললো,

– আপনারা প্লিজ আগে ডক্টরকে এখান থেকে নিয়ে যান! তারপর যা বলার, করার, বলবেন বা করবেন। আগে ওনাকে এখান থেকে সরান।

ওনারা তাই করলো। জায়গা একটু ফাকা হতেই স্নিগ্ধতা শারাফকে ছেড়ে সরে দাড়ালো। শারাফের দিকে তাকালেই হাতপা কাপছে ওর। এতো ভয়ানক পরিস্থিতিতে এর আগে কখনো পরতে হয়নি ওকে। শারাফ দিশেহারার মতো মাথার চুলগুলো উল্টে ধরলো। তারপর পাশের চেয়ারে লাথি মারলো একটা। সোফায় বসে গিয়ে সামনে দাড়ানো বোনের দিকে জলভরা চোখে তাকালো ও। শায়েরী অগ্নিলার হাত ধরে, খুড়িয়ে এগোলো। বললো,

– আমি ঠিক আছি ভাইয়া। শান্ত হ তুই।

চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো শারাফ। মিনিটখানেকের মধ্যে দুজন পুলিশ আসলো সেখানে। অগ্নিলার কাছে সবটা শুনে, শায়েরীর জবানবন্দিও নিলো তারা। ভীড়ের ভেতর থেকে এক বোরখা পরিহিত ভদ্রমহিলা এসে অগ্নিলার পাশে দাড়ালো। বললো,

– আমরা এই ব্লকেই থাকি। অসুস্থতার জন্য, আমার মেয়েটাকে প্রায়শই ওনার কাছে আনা হয়। শুরুর দিকে ও কেবল বলতো অন্য ডক্টর দেখাতে, এই ডক্টর আঙ্কেলের চিকিৎসা নাকি ওর ভালো লাগে না। কিন্তু ওনার রেকোমেন্ডেড মেডিসিনে ও সুস্থ হয়ে যেতো বলে ওর কথাকে গুরুত্ব দেইনি। আমার মেয়েটা আজ বলছে, এই পশুটা ওকেও নাকি অনেক বাজেভাবে ছোয়। বাজে ইশারা-ভঙি করে।

– আমার ননদ ওনার ভিজিট নেওয়ার পরদিন সুইসাইড করতে গিয়েছিলো। সে আজোবদি প্যারালইজড হয়ে হুইলচেয়ারে। ডিসপেন্সারির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবার উত্তেজিত হয়ে পরে ও। না জানি কতো ভয়ানক কিছু বলার আছে ওর।

আরো কয়েকজন মুখ খুললো এবার। সবার কথা শুনে ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। মানুষ এতোটাও জঘণ্য হয়। পুলিশদুটো কেবিন থেকে ডাক্তারকে বাইরে নিয়ে আসলো। ততোক্ষণে ওর চেহারার রক্ত জমাট বেধে কালচে হয়ে গেছে। সে লোকটা মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে কেবল। স্বপক্ষে যুক্তি দেখালো না। শারাফের মার খেয়ে যেমন তেজ কমেছে, তেমনি হয়তো বুঝে গেছে, তার কুৎসিত মনোভাব দুনিয়ার জানতে বাকি নেই। স্নিগ্ধতা দুপা এগিয়ে গিয়ে বললো,

– পেশেন্টরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে ডক্টরের কাছে আসে, ঈশ্বরের পর তাদের বিশ্বাস করে। আর আপনি? ছিহ! আপনার জন্য জেলই শ্রেয়। এমন শ্রদ্ধার জায়গায় আপনার মতো এমন নোংরা মানসিকতার কারো থাকার অধিকার নেই।

– ওর মতো সুযোগসন্ধানী পশুর বেচে থাকারই অধিকার নেই!

দাতে দাত চেপে বললো অগ্নিলা। শারাফ চোখ বন্ধ করে মাথা নামিয়ে বসে আছে। পুলিশদুটো তাদের সাথে টেনে নিয়ে গেলো ডাক্তারকে। একেএকে চলে গেলো বাকিসবও। বেশ কিছুটা সময় নিরবতার পর স্নিগ্ধতা এগোলো। বাসায় ফিরতে হবে ওকে এবার। শায়েরীর গাল ছুইয়ে দিয়ে সৌজন্যে হেসে বললো,

– এসব নিয়ে আর ভেবোনা। এন্ড টেক কেয়ার। হুম?

মাথা ওপরনিচ করলো শায়েরী। স্নিগ্ধতা অগ্নিলার দিক তাকাতেই ও শারাফের দিকে ইশারা করলো। একটু ভেবে স্নিগ্ধতা শারাফের পাশে গিয়ে দাড়ালো। একরাশ ইতস্ততবোধ ওর কাধে হাত রাখলো আলতোভাবে। হাত কাপছে স্নিগ্ধতার। অথচ এই হাতেই কিছুক্ষণ আগে সর্বশক্তিতে শারাফকে জরিয়ে ধরেছিলো ও। শারাফ এবারেও মাথা তুলে তাকালো না। স্নিগ্ধতা বললো,

– ই্ ইউ টু টেক কেয়ার।

জবাব দিলো না শারাফ। প্রথমবার নিজেকে প্রচন্ড অসহায় মনে হচ্ছে ওর। ওই সেই অক্ষম ভাই, যে নিজের বোনের সাথে থেকেও ওকে বাজে ছোয়া থেকে বাচাতে পারেনি, অসম্মান হওয়া থেকে বাচাতে পারেনি। একটা ছোট শ্বাস ফেললো স্নিগ্ধতা। আজ শারাফের এক অন্যরুপই দেখেছে ও। পরিস্থিতি অনুযায়ী ওর ব্যবহার হয়তো এমনটাই হওয়া উচিত। সাইফ হলেও, এমনটাই করতো। একটা ছোট শ্বাস ফেলে স্নিগ্ধতা বেরিয়ে আসলো ওখান থেকে। রয়ে গেলো শায়েরী, অগ্নিলা, শারাফ, আর ওর রাগ!

বাসার দরজা খোলা দেখে অবাক হলো স্নিগ্ধতা। সাইফের এত জলদি ফেরার কথা না আজ। ও বলেছিলো, মিটিং আছে ওর, লেইট হবে। ধীরপায়ে বাসায় ঢুকলো স্নিগ্ধতা। ড্রয়িংরুম থেকে সাইফের রুমের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো ও। রুমের দরজা খোলা, পর্দা উড়ছে আর রুমের ভেতরটা লন্ডভন্ড হয়ে আছে। স্নিগ্ধতা ছুট লাগালো। কিন্তু রুমে ঢুকতেই ‘আহ’ বলে, পা ধরে থেমে গেলো। সাইফ নিচে পরে থাকা ফাইলগুলো শেলফে ঢুকাচ্ছিলো। বোনের ব্যথাতুর আওয়াজ শুনে চমকে উঠে ছুটে আসলো ও। স্নিগ্ধতার সামনে মেঝেতে বসে গিয়ে, ওর পা চেপে ধরে ব্যস্তভাবে বললো,

– কি হলো? দেখে আসবি তো রুমে!

পা তুললো স্নিগ্ধতা। ওর পায়ে ভাঙা পেপারওয়েটের কাচ বিধেছে। সাইফ বের করে দিলে ওটা। স্নিগ্ধতা পুরোরুমে চোখ বুলিয়ে বললো,

– রুমের এ অবস্থা কেনো?

জবাব দিলো না সাইফ। স্নিগ্ধতাকে ধরে এনে এলোমেলো বিছানায় বসিয়ে দিলো। তারপর তুলো দিয়ে রক্তটুকো মুছে, সেলোটেপ বের করে ওর পায়ে লাগিয়ে দিলো। আবারো ফাইলগুলোর দিকে এগোলো সাইফ। স্নিগ্ধতা বললো,

– কি হয়েছে ভাইয়া? রুমের এ অবস্থা কেনো?

– আমি করেছি।

– মানে?

সর্বোচ্চ বিস্ময়ে বলল স্নিগ্ধতা। সাইফকে চেনে ও। কোনো বিষয় নিয়ে, কোনোদিন এভাবে রুম এলোমেলো করেনি সে। বললো,

– কি? এভাবে রুম উল্টেপাল্টে দিয়েছো কেনো হঠাৎ?

সাইফ বোনের দিকে ফিরলো। শীতলস্বরে বললো,

– কেউ আমার পেনড্রাইভ বদলে দিয়েছে টুকি।

– কি বলছো কি ভাইয়া?

স্নিগ্ধতার বিস্ফোরিত চাওনি। সাইফ দাতে দাত চেপে বললো,

– এমনটাই হয়েছে। কেউ ইচ্ছে করে আমার…

বলা শেষ না করেই ও দেয়ালে ঘুষি ছুড়লো একটা। স্নিগ্ধতা কপালে হাত দিয়ে ঠোটে ঠোট চেপে ধরলো নিজের। সাইফ ডানহাতে কপাল চেপে ধরে, পাইচারী করতে করতে বললো,

– ওইদিন আরাফাত ভার্সিটিতে দরকারেই গিয়েছিলো। যদিও আমি ওকে বলিনি, ও নিজে থেকেই কলাভবনের সিড়িতে থাকা নষ্ট সিসিক্যামের কিছু ফুটেজ রিগেইন করেছিলো। আর সেখানে এমন কিছু লিড ছিলো যে, সেগুলো সবুজের মার্ডার কেইসের দিক পাল্টে দিতো। শেষবার দেখা করতে গিয়ে সেগুলোই হ্যান্ডওভার করে ও আমাকে। বাসায় এসে ওই ফুটেজ অনুযায়ীই আমি এগোনোর প্লান করেছিলাম। আজকের মিটিংয়ের কারনও সেটা। কিন্তু মিটিংরুমে গিয়ে দেখি, পেনড্রাইভটাই আমার না!

– কেউ তোমার পেনড্রাইভ কি করে পাল্টে দিতে পারে? এটা কি করে সম্ভব?

– কিভাবে সম্ভব বুঝতে পারছি না। তবে যেভাবে সম্ভব হওয়ার সম্ভবনা ছিলো, সেটা পরখ করার পর থেকেই সবটা আরো বেশি উল্টেপাল্টে যাচ্ছে।

সাইফ নিজের মাঝে চিন্তারত থেকেই বললো। স্নিগ্ধতা এবারেও বুঝে উঠতে পারলে না ওর কথা। বিস্ময়, অবিশ্বাস রেখে বললো,

– মানে? তুমি জানতে কে পাল্টেছে পেনড্রাইভ? কি পরখ করেছো তুমি?

– পুলিশস্টেশনের সিসিক্যাম ফুটেজ।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here