#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
২৭.
স্বপ্নীলের ড্রয়িংরুমে পারিবারিক আড্ডা বসেছে ছোটখাটো। আর সে আড্ডায় সবচেয়ে বেশি হাসিমুখটা শারাফের। অথচ কিছুটা সময় আগেও এক অন্যরুপেই ছিলো ও। শায়েরীকে নিয়ে ফেরার পথে শারাফ কেবল বলেছিলো, ডিসপেন্সারিতে হওয়া ঘটনার বিষয়ে স্বপ্নীলে কাউকে কিছু না জানাতে। পুরোটা পথ ওর রাগে শক্ত হয়ে থাকা চেহারাটা বিস্ময়ে দেখেছে অগ্নিলা। কিন্তু বাসার ভেতর পা রাখতেই সে চেহারা বদলে গেলো নিমিষে। চোখের পলকেই শারাফের রাগ পুষে রাখা চোখমুখ হাসিখুশি চাওনিতে বদলে গেলো। যেনো কিছু ঘটেই নি। অগ্নিলা-শায়েরী কেবল অবাকচোখে দেখলো সে পরিবর্তন। শায়েরীর পা দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে পরেছিলেন শারাফের মা। শারাফ সামলে নিয়েছে ওনাকে। অতঃপর সবার আলোচনা হয়ে উঠলো সাইফ-অগ্নিলার হয়ে যাওয়া আর হতে চলা সম্পর্ক। অতি স্বাচ্ছন্দে নিজেদের সাক্ষাৎগুলো নিয়ে বললো অগ্নিলা। মেহেরুন, শারাফের মা-বাবা, নাহিদ সাহেব, তার মিসেস সবাই মিলে বেশ আগ্রহে শুনলেন সবটা। শারাফ নিজেও বাদ যায়নি আগ্রহ দেখাতে। দুহাতে মুখ গুজে, ওউ অতি আগ্রহে শুনেছে অগ্নিলার কথা। কারন সাইফ যে ওর সাথে কেইস নিয়ে পরিচিত, এমনটা জানেনা কেউই। সবার সাথে কথা বলা আর ডিনার শেষ অগ্নিলা মেহেরুনের ঘরে আসলো। আজ ও একা ঘুমোবে এই ঘরে। মেহেরুন শায়েরীর কাছে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল নাড়ছিলো অগ্নিলা। কানে আসলো,
– নীলা?
পেছন ফিরলো অগ্নিলা। মেহেরুন দরজায় দাড়িয়ে আছে। অগ্নিলা হেসে দিয়ে বললো,
– কিরে? তোর ঘরেরই দরজায় কেনো তুই? ভেতরে আসতে পারমিশন নিবি নাকি?
– ড্যাড কল করেছিলো। তুই বাসায় ফিরলে কালই নাকি সে ইন্সপেক্টরের বাসায় যাবে। বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করডে।
বলতে বলতে মৃদ্যুপায়ে ভেতরে ঢুকলো মেহেরুন। একটুখানি হেসে অগ্নিলা কানের দুল খোলায় মনোযোগী হলো। আয়নায় অদ্ভুতভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো মেহেরুন। অগ্নিলা বললো,
– কি হলো? ওভাবে কি দেখছিস?
মেহেরুন জবাব দিলোনা। কি ভেবে অগ্নিলা উঠে দাড়ালো। বোনকে পেছন থেকে জরিয়ে ওর কাধে মাথা রেখে বললো,
– লাস্ট মমকে দেখেছিলাম তোকে এভাবে দেখতে। তোর বিয়ের আগে। আজ তুইও কিন্তু একইভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছিস আপু।
– তুই বড় হয়ে গেছিস নীলা। শাওনও বলছিলো।
– ভাইয়া আসবে না রে আপু?
– বলেছে ডেইট ফাইনালাইজ করে জানাতে। চেষ্টা করবে ফ্লাইটের। তোকে বিদেয় করার জন্য সে নাকি খুব এক্সাইটেড।
– আচ্ছা। সে দেখা যাবে। এবার তুই বলতো, তোর সাইফকে পছন্দ হয়ছে তো? পরে আবার বলিস না যে একমাত্র বোনের হবুকে চয়েজ করার সুযোগ দেইনি তোকে।
– তোর সত্যিই ওনাকে পছন্দ নীলা?
মেহেরুনের কথায় অগ্নিলার হাত আলগা হয়ে আসলো। ওকে ছেড়ে, কিছুটা অবাক চাওনিতে তাকালো বোনের দিকে। মেহেরুনের শান্তদৃষ্টি। অগ্নিলা জোরপুর্বক হেসে বললো,
– এ্ এটা কেমন প্রশ্ন আপু? পছন্দ বলেই তো ড্যাডকে বলেছি। জানিস তো তুই।
– হ্যা। তুই ড্যাডকে নিজে বলেছিস ইন্সপেক্টরকে পছন্দ তোর। তারপরও কেনো যেনো তোকে কথাটা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো। সত্যি করে বলতো নীলা? বিয়েটা তুই মন থেকে করছিস তো? তুই সত্যিই ভালোবাসিস ইন্সপেক্টরকে?
বোনের গালে হাত রাখলো অগ্নিলা। আশ্বাসে হেসে বললো,
– তোকে আমি চিনি৷ সম্পর্কগুলোকে তুই এতোটা জটিল করিস না। তাহলে এই প্রশ্নটা ঠিক কার বলতো আপু?
…
– তোর দেবরের?
চমকানো চাওনিতে তাকালো মেহেরুন। অগ্নিলা আবারো বললো,
– বললি না? শারাফ কিছু বলেছে তোকে?
– ন্ নাহ! না তো! ও্ ও কেনো কিছু বলতে যাবে? আমি তো তোর বোন বল? তোর মুখে তোর মনের কথা শোনার ইচ্ছে হতে পারেনা আমার?
শেষ কথাটা মেহেরুন অন্যস্বরেই বলেছে। ওর অভিমানী কন্ঠ শুনে অগ্নিলা হাসলো। মেহেরুনের হাত ধরে বললো,
– হয়েছে হয়েছে। আর সিরিয়াস হতে হবেনা! এটা আমাকে মানায়। তুই সিরিয়াস কথা বলতে গিয়ে মুখখানা কেমন কেমন বানিয়ে রেখেছিস দেখ? একদমই ভালো দেখাচ্ছেনা তোকে।
– আমার প্রশ্নের জবাব দিলিনা নীলা।
মেহেরুনের তীক্ষ্ম প্রশ্নবাণ। বোনের হাত ছাড়লো অগ্নিলা। মৃদ্যু হেসে, মাথা নামিয়ে নিয়ে বললো,
– সাইফ একটা অমায়িক মানুষ আপু। ওর না একটা ছোটবোন আছে জানিস? স্নিগ্ধতা। আমার ইউনিভার্সিটিতেই পড়ে। মেয়েটা দেখতে ঠিক ওর নামের মতোই জানিসতো? একদম ফুটফুটে। ওকে দেখলে তোর মনে হবে, দুনিয়ার সব স্নিগ্ধতা তোকে ঘিরে আছে। আর এই বোনই সাইফের পৃথিবী। আমি সাইফকে ওর বোনকে আগলে রাখতে দেখেছি। কয়েকবারের দেখায় অনুভব করেছি, ভাই হিসেবে ও কতোটা পসেসিভ। প্রথমবার যখন ওকে দেখি, স্নিগ্ধতার ভাই হিসেবেই দেখেছিলাম। একদম আল্ট্রা পসেসিভ ভাই হিসেবে! আমার তখনই হয়তো লোভ হয়ে গিয়েছিলো রে আপু। লোভে পরে গিয়েছিলাম ওর ভালোবাসার৷ যে মানুষটা তার বোনকে এভাবে ভালোবাসতে জানে, সে মানুষটা না জানি তার জীবনসঙ্গীকে কতোটা ভালোবাসবে।
এটুক বলে অগ্নিলা একটু থামলো। আবারো বললো,
– আমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেইনি আপু। আমার বিশ্বাস সাইফ আমার মটোকে পূর্ণতা দেবে। সারাজীবন যার সাথে থাকবে, সে মানুষটাকে অনুভব না করেই বিয়েতে মত দিয়ে দেবে, তোর বোন এতোটাও বোকা নয়।
মেহেরুন নিজেও তৃপ্তির হাসি হাসলো এবারে। অগ্নিলাকে জড়িয়ে ধরলো ও। তবে মনেমনে শ্বাস নিলো স্বস্তির। ভুল বলেনি অগ্নিলা। সত্যিই প্রশ্নটার উৎপত্তি শারাফ ছিলো। ডাইনিংয়ে শারাফ হাসতে হাসতে বলছিলো, ‘বিয়েটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিস হটিকে বলো আগে সাইফ এহমাদকে ভালোবাসে কিনা শিওর হতে। পরে আবার পুলিশের লকাপে ফেসে আফসোস না করে।’ ও ঠাট্টাচ্ছলে বললেও কথাটা মোটেও ঠাট্টার লাগেনি মেহেরুনের। বোনকে চেনে ও। অগ্নিলা অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানুষদের দলে। ও বলেছে, সাইফের সাথে আগের পরিচয় ছিলো ওর। কিন্তু তারপরও শারাফের কথাটা শোনার পর, ওর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে বোঝাতে বেগ পেতে হচ্ছে মেহেরুনকে। তাই প্রশ্নটা করে বসেছে ও। এখন যখন অগ্নিলা নিজেমুখে ওকে বলেছে, সাইফকে ও মন থেকে চায়, এসব নিয়ে আর ভাবার প্রশ্নই ওঠেনা। আরেকটু কথাবার্তা বলে মেহেরুন বেরিয়ে আসলো রুম থেকে। ও বেরিয়ে যেতেই কল আসলো অগ্নিলার ফোনে। নম্বরটা সাইফের। অগ্নিলা কল রিসিভ করে হাসিমুখে বললো,
– হাজারবছর আয়ু হোক তোমার সাইফ। সবে তোমার কথাই বলছিলাম আপুকে। ড্যাড বোধহয় কাল বিকেলে যাবে তোমার ওখানে। তুমি ফ্রি থাকবে তখন?
– হুম।
– পুলিশস্টেশন যাবেনা?
– তোমার জন্য না হয় বয়কট করলাম?
অগ্নিলা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। একটুপর সাইফ হেসে দিয়ে বললো,
– কাল অফ ডে! প্রেমে পরে দিনতারিখও ভুলে যাচ্ছেন নাকি ম্যাডাম?
অগ্নিলা স্বাভাবিক হলো। সত্যিই পরদিন ছুটি। অনেকটা সময় নানা কথা বলে একসময় অগ্নিলা বললো,
– একটা কথা জিজ্ঞেস করবো সাইফ?
– হুম। বিনাসংকোচে।
– তোমার কি মনে হয়? এখন বিয়েটা করলে সেটা তোমার প্রফেশনাল লাইফে কতোটুকো ইফেক্ট করতে পারে?
– আমি আমার পার্সোনাল লাইফ আর প্রফেশনাল লাইফকে সম্পুর্ণ আলাদাচোখে দেখি নীলা। ওদের আলাদা উপায়েই লিড করি। সো ডোন্ট ওয়ারী। এদের কোনোটায় কোনোটার ইফেক্ট আসবে না। আমি আসতে দেবো না।
হাসি ফুটলো অগ্নিলার চেহারায়। কথা শেষ করে কল রাখলো সাইফ। এতোটা সময় ওউ হাসিমুখে ছিলো। কিন্তু কান থেকে ফোন নামাতেই হাসিটা মিলিয়ে গেলো ওর।
•
ওড়না কোমড়ে গুজে ঘর গোছাতে ব্যস্ত স্নিগ্ধতা। টেবিলক্লথ থেকে শুরু করে, পর্দাগুলোর ভাজ অবদি একটু পরপর ঠিক করছে ও। ঘরের প্রতিটা জিনিসপত্র একদম ঠিকঠাক হওয়া চাই ওর আজ। সাইফ সোফায় বসে। একবার খবরকাগজে মুখ গুজছে, তো একবার বোনের হন্তদন্ত অবস্থা দেখছে। বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করতে অগ্নিলার বাবা এ বাসায় আসবে, এমনটা শোনার পর থেকে যেনো শ্বাস ফেলেনি স্নিগ্ধতা। ওর অস্থিরতা দেখে সাইফ একপর্যায়ে বলে উঠলো,
– এবার থাম টুকি! সব ঠিকাছে তো!
– তুমি বোঝো কি ঠিক আছে ঠিক নেই? নতুন বর, লজ্জালজ্জা মুখ করে চুপটি করে বসে থাকো বলে দিচ্ছি!
– এই নতুন বরকে দিয়ে যে তুই হবু শশুড়ের জন্য স্ন্যাকস বানিয়ে নিলি, তার কি?
– ত্ তো? আমার রান্নাটা মজা হলে আমিই রান্না করতাম। তাছাড়া হবু শশুড়ও তো জানুক, তার হবু মেয়েজামাই পুলিশ হওয়ার সাথেসাথে রান্নার হাতও অসাধারণ।
– তাই না?
সোফার পাশের ফুলদানীটা থেকে স্নিগ্ধতার দিকে ফুলের গোছাটা ছুড়ে মারলো সাইফ। ওটা হাতে ধরে শব্দ করে হেসে দিলো স্নিগ্ধতা। বুড়োআঙুল দেখালো সাইফকে। সাইফ উঠে দাঁড়িয়ে এবার ধাওয়া করলো ওকে। স্নিগ্ধতা খিলখিলিয়ে হাসছে, সাইফ ওকে পেছন থেকে ধাওয়া করছে। সোফার চারদিক ঘুরতে ঘুরতে খুনশুটি চলছিলো দু ভাইবোনের। এরইমাঝে কলিংবেল বেজে উঠলো। সাইফ থামলো। স্নিগ্ধতা ভ্রু নাচিয়ে বললো,
– ওই এসেছে তোমার হবু শশুড়! এবার সব বলে দেবো তাকে। পুলিশ হয়ে নিরোপরাধীকে ধাওয়া করেছো, তোমায় যেনো মেয়ে না দেয় সে!
– দাড়া দেখাচ্ছি….
এগোনোর ভান করেও থামলো সাইফ। হেসে কোমড়ের ওড়না ছেড়ে দিলো স্নিগ্ধতা। চুল একটু নেড়েচেড়ে ঠিক করে, হাসিমুখে গেইট খুলে দিলো ও। কিন্তু দরজায় দাড়ানো মানুষটাকে দেখে থমকে গেলো। আকাশীরঙা শার্ট, কালো প্যান্ট, শার্টের বড়হাতা গুটানো, একহাত প্যান্টের পকেটে গুজে হাসিমুখে দরজায় দাড়িয়ে শারাফ। আপাদমস্তক দেখে নিলো ও স্নিগ্ধতাকে। আকাশীরঙা গোলজামা ওর পরনেও। হাতে একগুচ্ছ ফুল। বাসায় ঢোকার আগেই, পাশের কাচের দেওয়ালেথাকা পর্দার ফাকফোকর থেকে স্নিগ্ধতার অবয়ব চোখে পরছিলে ওর। দু ভাইবোনের খুনশুটিও দেখেছে। অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ একটা হাসি দিয়ে ওর হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে নিলো। স্নিগ্ধতাঅবাক হয়ে চোখ তুলে তাকালো। শারাফ অকস্মাক চোখটিপ দিয়ে বলে উঠলো,
– এইতো অনেকদুর এগিয়েছেন মিস স্নিগ্ধতা। এবার শুধু ভালোবাসি বলা বাকি। খুববেশি সময় নেবেন না কেমন? জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে যে!
#চলবে…

