#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৩১.
– কি ভেবেছিলে মুহিব? একটা ব্রেকফেইল করা কন্ট্রোললেস গাড়ি ইয়াকীন শারাফের অনূভুতিকে কন্ট্রোল করবে? তোমার কাছে বুঝি এতোটাই সহজ কারো অনুভূতিকে থামিয়ে দেওয়া? তার জীবনবায়ু থামিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে?
বিস্ফোরিত চোখে শারাফের দিকে তাকালো মুহিব। কিন্তু শারাফের নির্বিকার প্রতিক্রিয়া। অতি স্বাচ্ছন্দ্যে তাকিয়ে রইলে ও মুহিবের দিকে। মুহিব হাতের রজনীগন্ধার স্টিক আরো শক্ত করে মুঠো করে নিলো। জোরপূর্বক হেসে বললো,
– ক্ কাকে কি বলছেন আপনি? গাড়ির ব্রেকফেইল মানে?
শারাফ খানিকটা ঝুকে প্রশ্নসুচক চাওনিতে তাকালো ওর দিকে। তবে ওর চাওনিতেই নিশ্চিত উত্তরের আনাগোনা। সবটা জানে মুহিব। মুহিব দৃষ্টিচ্যুত করে পাশে তাকালো মুহিব। দ্রুততার সাথে বললো,
– আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে শারাফ স্যার।
– ভুল হচ্ছে? তারমানে তুমি আমার গাড়ির ব্রেকফেইল করাওনি। রাইট?
সোজাশব্দে মুহিবকে তাক করলো শারাফ। বড়বড় চোখে তাকিয়ে রইলো ও। শারাফকে দেখে এতোটুকোও দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে না। মুহিব বললো,
– কি বলছেন আপনি এসব? আমি কেনো আপনার গাড়ির ব্রেকফেইল করাতে যাবো?
– কারন তুমি স্নিগ্ধতার আশেপাশে আমাকে মানতে পারছো না।
শারাফের স্পষ্ট জবাব। মুহিব যেনো অধৈর্য হয়ে পরলো এবারে। বললো,
– দেখুন স্যার, স্নিগ্ধতা শুধু আমার ভালো বান্ধবী। এর বাইরে আমাদের মাঝে কিছুই নেই! অডিটোরিয়ামে নবীনবরনের প্রোগ্রাম হচ্ছে। আমাকে যেতে হবে। আসছি।
শারাফকে পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলো মুহিব। শারাফ ওর বুকে হাত দিয়ে ওকে থামিয়ে দিলো। কিছুক্ষণ ওর হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ তুললো মুহিব। তবে শারাফের শান্তশিষ্ট চাওনিতে একবিন্দুও উত্তেজনা খুজে পেলো না। নিজের গলায় জোর এনে বললো,
– আপনার মনে হয়না আপনি লিমিট ক্রস করছেন? আপনি আমাকে ঠিকমতো চেনেনও না।
– আমি তোমাকে না চিনলেও, তুমি যাকে দিয়ে আমার গাড়িতে কারসাজি করিয়েছো, সে তোমার নামটা ভালোমতোই মনে রেখেছে মুহিব। আপাতত পুলিশস্টেশন আছে সে।
কথা শেষ করে মুহিবের বুক থেকে শারাফ হাত সরালো নিজের। তারপর প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে আরামে দাড়ালো। মুহিব চোখ বন্ধ করে নিয়ে দাতে দাত চাপলো। নিজের ওপর রাগে হাতে থাকা ফুলগুলো সর্বশক্তিতে মুচড়ে ধরলো। শারাফ ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই স্নিগ্ধতাকে মনে ভয় ঢুকেছিলো ওর। স্নিগ্ধতাকে নিজের অনুভব বলার সাহস যেমন ওর হয়নি, তেমনি শারাফের প্রতি একটু একটু করে স্নিগ্ধতার দুর্বল হয়ে পরাটাও মানতে পারছিলো না ও। নাইবা মানতে পারছিলো অকস্মাৎ স্নিগ্ধতার আশেপাশে শারাফের বারবার আগমনকে। সেদিন যখন ও স্নিগ্ধতার কানে শালুক গুজে দিয়ে যায়, ঠিক পাশটায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলো মুহিব। নিজেকে সংবরন করতে না পেরে এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয় শারাফকে আঘাত করার। সেজন্যই মেকানিককে দিয়ে গাড়ির ব্রেকফেইল করিয়েছিলো ও। কিছুদিন শহর ছেড়ে থাকার জন্য ওই লোককে টাকাও দিয়েছিলো মোটা অংকের। কিন্তু লাভ হলো না কিছুতেই। সে লোক ধরা পরেছে। আর স্বচ্ছ জলের মতো সবটা বুঝে গেছে শারাফ।
শারাফ মুহিবের ওই আফসোসের চেহারাটা দেখলো। কিঞ্চিৎ বিস্মিতও হলো। এটা ভেবে না যে ওর সন্দেহটাই সঠিক। এটা ভেবে, ভালোবাসার মানুষটাকে পাওয়ার লোভ একটা মানুষকে কতোটা বদলে দিতে জানে। স্নিগ্ধতাকে যে মুহিব পছন্দ করে, ওর ব্যবহারে শারাফ আগেই টের পেয়েছিলো সেটা। এক্সিডেন্টটা আর চিরকুট দেখে মুহিবের নামটাই ওর মাথায় আগে এসেছিলো। তবে মানতেও কষ্ট হচ্ছিলো। স্নিগ্ধতার বন্ধু মানে ওর আপনজন। আর আপনজনের অন্যরুপের চেয়ে ভয়ানক যন্ত্রনার আর কিছুই নেই। যে মুহিবকে স্নিগ্ধতা হাসিখুশি বন্ধুত্বে দেখেছে, সেই মুহিবের এমন বিকৃত চিন্তাধারা ওর জন্য আঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়। বিষয়টায় পাকাপোক্তভাবে নিশ্চিত হবার জন্য শারাফ স্নিগ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে মুহিবের প্রতিক্রিয়া দেখেছে কেবল। সেখানে কেবল ঝকঝকে তৃপ্তিময় এক চোখ! মুহিবকে নিয়ে করা সন্দেহের ষোলোআনা পুর্ণ করতে ‘মেকানিক ধরা পরেছে’ এমন মিথ্যে বলার সাহস দেখাতে হয়েছে ওকে। ঘটলোও তাই! আজ আবারো ওর অবজার্ভেশন ঠিক হলো। কিন্তু তারপরও খুশি হতে পারছে না শারাফ। ও কখনো চাইনি কারো এতোটা তিক্ততার কারন হতে। মুহিব নিজের অপক্কতার জন্য যখন মনেমনে ক্ষোভ পুষছে, শারাফ একটা ছোট শ্বাস ফেলে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বললো,
– স্নিগ্ধতা আমাকে নিয়ে এখনো নিজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তুমি যা করতে চেয়েছিলে, তাতে আমি হয়তো ওর থেকে দুর হতাম। কিন্তু তাতে তুমি কি ওকে পেয়ে যেতে মুহিব? ওর মনে তোমায় নিয়ে অনুভূতি তৈরী হতো ? এসবের একাংশও স্নিগ্ধতা জানলে, তুমি ওর ঘৃণা ছাড়া আর কিছু পাবে?, এসব একবারো ভেবেছো? একবারো?
…
– ভালোবাসাকে ভালোবেসে বাধতে হয় মুহিব। ওতে তোমার আমার কারো জোর খাটে না। নিজেকে এতোটা অধঃপতনে না নামালেও পারতে।
মুহিব একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ একদফা রুক্ষ বাতাসে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতা উড়ে উঠলো। শারাফ স্বাভাবিক হয়ে পাশ ফিরলো। চোখ তুলে তাকাতেই চকিত হলো মুহিব। ওদের সামনে স্নিগ্ধতা দাড়িয়ে। কিয়দক্ষণ নিরব থেকে ও শারাফকে পাশ কাটিয়ে মুহিবের দিকে এগোলো। বললো,
– স্টিকগুলো দে। লাগবে।
মুহিব একটা শুকনো ঢোক গিললো। তারপর হাত বাড়িয়ে রজনীগন্ধা স্নিগ্ধতার হাতে দিলো। ওগুলো নিয়ে, শারাফকে অগ্রাহ্য করে পা বাড়াচ্ছিলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু একপা এগোতেই আঁচলে টান পরায় থামতে বাধ্য হলো ও। গলার অংশ চেপে ধরে, পেছন ফিরে দেখে শারাফের একহাতে ওর শাড়ীর আঁচল। শারাফ একপা এগিয়ে বললো,
– আপনার ভালো বাসায় না বাসায়, আমার সত্যিই কিছু যায় আসেনা মিস স্নিগ্ধতা। অল আই নো ইজ, আমার অনুভূতি, একান্তই আমার। সেখানে আপনি কখনো প্রভাবক হতে পারবেন না।
– আপনি…
– তবে অভিমান করবেন না প্লিজ! সেখানে আমার চরম দুর্বলতা আছে। আপনার অভিমানী চাওনিতেও ভয়ানক প্রেম আঁকা। ম’রে যাবো!
বলা শেষ করে বুকের বা পাশে আঙুল ধরলো শারাফ। তারপর একবার স্নিগ্ধতার শাড়ি, একবার নিজের হাতঘড়ি দেখিয়ে বুঝালো, আঁচল ঘড়িতে আটকেছিলো। স্নিগ্ধতার চেহারায় বিস্ময়। মুচকি হাসি দিয়ে একহাত পকেটে গুজে দুপা পেছলো শারাফ। তারপর চলে আসলো ওখান থেকে। মুহিব আজও কেবল নিরব প্রত্যক্ষদর্শী। স্নিগ্ধতার শাড়ীর আঁচলটা কখনো শারাফের ঘড়িতে আটকায়ই নি। কথা বলার সুযোগ করে নেবার জন্য শারাফ নিজেই আঁচল ধরেছিলো স্নিগ্ধতার। অথচ তারপরও সবটা কতো প্রেমময়, কতো সুন্দর!
•
কফিশপে বসে কোল্ডকফির মগে স্ট্র ঘুরিয়ে চলেছে সাইফ। অগ্নিলা টেবিলে হাত রেখে তাতে মুখ গুজে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সাইফের হাতঘড়িতে নিজের মুখটা চোখে পরলো ওর। উল্টিয়ে ক্লিপে আটকে রাখা সামনের চুলগুলোর অনেকেই বেরিয়ে এসেছে। অগোছালো লাগছে ওকে দেখতে৷ হবেই বা না কেনো? ঘন্টাখানেক আগে মহোদয় যখন তাকে কল করে দেখা করতে চায় বলেছে, ও কিছুই ভাবেনি আর। আয়নায় একপলক নিজেকে দেখে শুধু লিপস্টিকটা গাঢ় করে পরেছে। গাড়ির চাবি নিয়ে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এসেছে বাসা থেকে। কিন্তু আসার পর কুশলবিনিময় ছাড়া সেভাবে কিছু বলেনি সাইফ। অগ্নিলা কিছুই বললো না। কেবল নড়েচড়ে বসলো। একটাসময় পর সাইফ চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,
– এভাবে হুট করে আসতে বলেছি বলে অপ্রস্তুত হয়ে যাওনি?
– একদমই না। ইভেন আমিও ভাবছিলাম দেখা করবো। ইউ জাস্ট গেভ মি আ রিজন।
– কেনো দেখা করবে ভাবছিলে?
সাইফের প্রশ্নে মৃদ্য হাসলো অগ্নিলা। তারপর সামনের দিকে ঝুকে ফিসফিসিয়ে বললো,
– সত্যি বলবো?
– মিথ্যা বললে জেলে পুরে দেবো!
শব্দ করে হেসে দিলো অগ্নিলা। সাইফ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। অগ্নিলা হাসি কমিয়ে সাইফের হাত ধরলো। ওর হাতঘড়িটা নিজের চেহারার দিকে সোজা করে নিয়ে, ওটা দেখে চুলগুলো ঠিক করলো। তারপর মাথানত করে, কিঞ্চিৎ লজ্জামিশ্রিত স্বরে বললো,
– তোমার কাছে আমি আজীবনের জন্য সারেন্ডার সাইফ এহমাদ।
জিভ দিয়ে ঠোট ভেজালো সাইফ। টের পেলো হাত ঘেমে উঠেছে ওর। অগ্নিলাকে লজ্জা পেতে দেখলে ওর কিছু তো একটা হয়। অগ্নিলার কপালে থাকা কিছু চুলের দিকে হাত বাড়ালো ও। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে ওর হাত আটকে দিলো অগ্নিলা। হাসিমুখে বললো,
-একটা প্রশ্ন করবো?
– হুম?
– পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসো সাইফ?
– টুকিকে।
জবাব দিতে দুদন্ডও সময় নেয়নি সাইফ। অগ্নিলার হাসি বর্ধিত হলো। একরাশ উৎসাহ নিয়ে ও আবারো জিজ্ঞাসা করলো,
– আর তারপর?
– আমায় দায়িত্বকে।
সাইফের শান্তশিষ্ট ভঙিমার জবাব। নিমেশেই হাসিটা অম্লান হয়ে গেলো অগ্নিলার। তারপরও চেহারায় জোরপূর্বক হাসি আঁকলো ও। সাইফের হাত নামিয়ে দিলো আস্তেকরে। সাইফ হয়তো টের পেলো ওর অল্পক্ষণ ওমন হাসিটা নুইয়ে যাওয়ার কারন। বললো,
– নীলা…
– নোপ! আজ আমি কিন্তু তোমায় বলবো না আমি কাকে বেশি ভালোবাসি। সো পাল্টা প্রশ্ন ইজ নট এলাওড!
– তুমি নিজের অবস্থান জানতে চাওনা।
– ওসব থাক। আমার এটুকোই জানার ছিলো। এন্ড আ’ম স্যাটিসফাইড। একদিন সময় করে এই প্রশ্নটা আমাকে করো সাইফ। কথা দিচ্ছি, সেদিন আমার জবাবে তুমিও তৃপ্ত হতে বাধ্য হবে। আমি তোমায় আফসোসের সুযোগ দেবো না। দেখে নিও।
চোখ চিকচিক করছে অগ্নিলার। কিন্তু ওর চেহারায় এক অমায়িক হাসি। সাইফ হয়তো হারিয়ে গেলো ওর সেই হাসির দিকে তাকিয়ে। ও উঠে দাড়ালো। অগ্নিলার চেয়ারের পাশে এগিয়ে দাড়িয়ে বললো,
– আমি মনের কথা গুছিয়ে বলতে জানিনা নীলা। সোজাভাবেই বলছি, আমি নিজে তোমায় আমার সাথে জড়িয়েছি। আর এটাও জানি যে, সে সিদ্ধান্তে আমাকে কখনো আফসোস করতে হবে না। তবে তারসাথে তোমারও এটা জেনে রাখা প্রয়োজন, যদি কখনো আমার জীবন আর তুমি, এই দুইয়ের মাঝে আমাকে কোনো একটাকে বেছে নিতে হয়, আমি তোমাকে বেছে নেবো। তুমি আমার এতোটাই প্রিয়।
অগ্নিলা উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্তভাবে বললো,
– স্টপ ইট সাইফ! কি থেকে কি বলছো তুমি?
– আর কোনো গ্রহনযোগ্য তুলনা মনে পরেনি আমার।
সাইফের নিস্প্রভ জবাব। অগ্নিলার দৃষ্টি নিমীলিত হলো। আস্তেধীরে মাথা গুজলো ও সাইফের বুকে। বললো,
– আ’ম সরি ইন্সপেক্টর। আমি বুঝতে পারছি, আমার তোমাকে এভাবে প্রশ্ন করাটা উচিত হয়নি। আ’ম সরি। আর কোনেদিনও এমন প্রশ্ন করবো না তোমাকে। প্রমিস!
একহাতে ওকে জরিয়ে, আরেকহাতে ওর চুলে আঙুল চালালো সাইফ। ওর বুকের মাঝে কতো স্বস্তিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে কেউ একজন। এই মেয়েটা খুব দ্রুতই ওর সবটায় জুড়ে যেতে চলেছে। কিন্তু ও ঠিক নিজেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কোনো দৃশ্যমান কাননে? নাকি অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে?
#চলবে…

