#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৩৮.
প্রায় বিশমিনিট হলো ট্রাফিক সিগনালে আটকে আছে সাইফ। স্টেয়ারিং ধরে থাকা ওর হাতজোড়া শক্তমুঠো। তবে চেহারায় শান্তভাব। তবে সাইফের সে অপ্রকাশিত ক্ষোভের কারন জ্যাম না। কারনটা অন্যত্র। আজকে ল্যাবে গিয়েছিলো সাইফ। ডিএনএ টেস্টের রেজাল্ট আনার জন্য। যদিও ওটা পুলিশস্টেশন বসেই পেয়ে যেতে পারতো, তবুও ও চেয়েছিলো নিজে গিয়ে রিপোর্টটা চেইক করবে। এজন্য অগ্নিলকেও বলে দিয়েছিলো সারাদিন ব্যস্ত থাকবে, কল না করতে। ইনভেস্টিগেশনের সবটা মিলিয়ে সন্দেহভাজন প্রত্যেকের ডিএনএ স্যাম্পল ল্যাবে পাঠিয়েছিলো সাইফ। ও প্রায় নিশ্চিত ছিলো, সেখানের কারো না কারো স্যাম্পলের সাথে সাথে মার্ডারস্পটে পাওয়া রক্তের ডিএনএ ম্যাচ করবে। কিন্তু অদৃষ্ট বোধহয় এতো সহজে ছাড় দেবে না ওকে, নাইবা আসল দোষী এতো সহজে ধরা দেবে। রিপোর্টের প্রতিটার ফলাফল না সূচক। কারো ডিএনএ-র সাথে ম্যাচ করেনি রক্তের ডিএনএ। আর এই ঋণাত্মক ফলাফল মোটেও মানতে পারছে না সাইফ। এতোগুলো সাসপেক্টের মাঝে ডিএনএ কারো সাথে ম্যাচ করেনি,ওর নিজের কাছে এটা এক ভয়ানক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তৎক্ষণাৎ ল্যাব থেকে বেরিয়ে এসেছে ও।
হাজারদিক ভেবেও সাইফের কোনোরুপ হিসেব মেলে নি। বরং বারবার মনে হয়েছে, হয় ডিএনএ টেস্টিংয়ে কোনো না কোনো ভুল হয়েছে, নয়তোবা জেনেবুঝে কোনো স্যাম্পল সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ও ভালোমতোই জানে, প্রথমটা ঘটার সুযোগ কম। কিন্তু দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে কেউই ওর ভরসাযোগ্য না। পুলিশস্টেশন থেকে পেনড্রাইভ হারানোর পর থেকে ওর আর কাউকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়না। গাড়িতে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই বহুতল ভবনটার দ্বিতীয়তলায় চোখ আটকালো সাইফের। ভবনটা মুলত শপিং কমপ্লেক্স। দ্বিতীয় তলায় রেস্টুরেন্ট। খুব বেশি দুরে না হওয়ায়, কাচের দেয়ালের ওপাশে বসা ইন্সপেক্টর বাকেরকে চিনতে খুব একটা সমস্যা হলো না ওর। পাশে উল্টোপাশ হয়ে এক রমনী বসে। পরনে নেভীব্লু শাড়ি। সাইফ স্পষ্ট দেখলো, ইন্সপেক্টর বাকের রমনীকে কোনো কাগজ এগিয়ে দিচ্ছেন।
সাইফ সময় নিলো না। রাস্তা ফাকা পেতেই গাড়ি পার্ক করে সোজা চলে এলো রেস্টুরেন্টে। কিন্তু দরজা অবদি আসতেই ইন্সপেক্টর বাকেরের সাথে থাকা রমনীকে দেখৈ থেমে গেলো ওর পা। একরাশ এলোচুল দুলিয়ে মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে তার সাথে কথা বলছে সে। সাইফ শান্তশিষ্ট ভঙিতে এগোলো। সোজা গিয়ে তাদের টেবিলের পাশে দাড়ালো ও। ওকে দেখে চমকে উঠলো দুজনেই। রমণী দাড়িয়ে গিয়ে বললো,
– সাইফ? তুমি? এখানে?
সাইফ অসম্ভব সুন্দর একটা হাসি দিলো। মেয়েটার হাতে থাকা কাগজটা নিয়ে বললো,
– আরেহ মিস অগ্নিলা চৌধুরী? আপনি এখানে?
অগ্নিলা অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইলো সাইফের দিকে। সাইফ ইন্সপেক্টর বাকেরের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
– গুড আফটারনুন স্যার। ল্যাবের কাজ শেষ করে এখানে লাঞ্চ করতে এসেছেন বুঝি?
ইন্সপেক্টর বাকের কিছু না বলে কেবল হাত মেলালেন। সাইফ একপলক অগ্নিলার দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের কাগজটা খুললো। তখনই আওয়াজ এলো,
– সাইফ? তুমি কখন এলে?
অগ্নিলার বাবার গলা শুনে পেছন ফিরলো সাইফ। কিন্তু অনেকগুলো মুখ একসাথে দেখে কপাল কুচকে এলো ওর। কি বলবে ভেবে পেলো না ও। অগ্নিলার বাবা মিস্টার চৌধুরী, তার মিসেস, মেহেরুন, মিসেস নাহিদ, মুসকান, শায়েরী সবাই একসাথে। সাইফ অগ্নিলার দিকে তাকালো। মিস্টার চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন,
– নীলা বলছিলো আজ নাকি জরুরি কাজ পরে গেছে তোমার? এরপরও এসেছো, সব ঠিক আছে সাইফ?
সাইফ নিরুত্তর। ইন্সপেক্টর বাকের বললেন,
– সব ঠিক আছে চৌধুরী সাহেব। আপনারা বিয়ের কেনাকাটা করবেন, আর বর থাকবে না, তা কি করে হয়? আর আমি যতোদুর চিনি সাইফকে, ও যথেষ্ট দায়িত্ববান ছেলে। সময় নিয়ে ঠিক চলে এসেছে দেখুন।
সাইফ তখনও চুপই রইলো। ইন্সপেক্টর বাকের মিসেস নাহিদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– আর থ্যাংক ইউ ভাবি। আপনার সাথে দেখা হয়েছিলো বলেই আজ সাইফের উডবির সাথেও দেখা হয়ে গেলো আমার। নাহিদ ভাই আর আফজাল সাহেবের বন্ধুত্বে মাঝখান থেকে আমিও উপকৃত হলাম বলুন?
…
– এনিওয়েজ। থ্যাংকস ফর দ্যা কোম্পানি মিস অগ্নিলা। নেক্সটটাইম মিসেস সাইফ এহমাদের ইনভিটিশনের অপেক্ষায় থাকবো কেমন? আসছি। এন্জয় ইওর শপিং।
অগ্নিলাসহ বাকিসবার থেকে সৌজন্যে বিদায় নিলেন ইন্সপেক্টর বাকের। মিস্টার চৌধুরী বাকিসবার সাথে পরিচয় করে দিলো সাইফকে। অগ্নিলা টের পেলো, সাইফ জোরালো হেসে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। সবার সাথে কথা বলা শেষে সাইফ পাশে দাড়ানো অগ্নিলার হাত ধরলো। বললো,
– আমার নীলার সাথে কিছু কথা আছে। এক্সকিউজ আস?
মুচকি হেসে সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত হয়ে পরলো। সাইফ অগ্নীলার হাত ধরে নিয়ে এসে এককোণে দাড়ালো। বললো,
– এসব কি নীলা? তুমি বিয়ের শপিংয়ে এসেছো, কথাটা আমাকে জানাতে পারতে? হ্যাঁ বলেছিলাম ব্যস্ত থাকবো। তাই বলে…
– শপিংয়ে আছি বললে আমার প্রতি তোমার সন্দেহটা ফিকে পরে যেতো না সাইফ? নাকি তুমি কাজ ছেড়ে আমাদের সাথে আসতে রাজি হতে? কোনটা?
সাইফ কিংকর্তব্যবিমুঢ়। মিনিটখানেক সময় নিয়ে অগ্নিলা সাইফের হাত থেকে কাগজটা নিলো। তারপর হেসে দিলে শব্দ করে। বিস্ময়ে ওর হাসিটা দেখতে লাগলো সাইফ। অগ্নিলা হাসি কমিয়ে বললো,
– আচ্ছা হয়েছে হয়েছে। হবু বউয়ের কাছে আর পুলিশি তলব খাটাতে হবে না।
– নীলা…
– কোনো এক্সপ্লেনেশনও লাগবে না সাইফ।
শান্তভাবে জবাব দিলো অগ্নিলা। সাইফ আবারো নিরুত্তর। অগ্নিলা বললো,
– এসেছো যখন, চলো একসাথে শপিং করবো।
– না নীলা। আজ হবে না। কাজ আছে আমার।
অগ্নিলা সাইফের শার্টের বুকপকেট চিমটি কেটে ধরলো। গলা উচিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
– না বলা সত্ত্বেও, আপনি নিজে এসেছেন এখানে ইন্সপেক্টর। তো আজকে আপনার একমাত্র কাজ আমি। অবশ্য আমিও কিন্তু কোনো ছোটখাটো ক্রিমিনাল নই। পুলিশের মন চুরি করেছি কিনা।
– বোঝার চেষ্টা করো নীলা, কাজ আছে আমার। তাছাড়া টুকিকে ছাড়া…
অগ্নিলা কোমড়ে হাত রেখে দাড়ালো। বললো,
– আমি কখন বললাম স্নিগ্ধতাকে ছাড়া? শারাফ তো ভার্সিটিতেই আছে। ওকে কল করে বলো স্নিগ্ধতাকে নিয়ে চলে আসতে। তাতেই তো হয়।
– কিন্তু…
– প্লিজ সাইফ! বিয়ে করলে শপিংও করতে হবে। আর এই এক ঝামেলা কয়দিন করবে বলো?
সাইফ কথা বাড়ালো না। শপিংয়ের ব্যাপারটা নিয়ে স্নিগ্ধতাও বলেছে ওকে। তাই একদিনে সবদিক মিটলে, কেনো নয়? ও কল লাগালো শারাফের ফোনে। শারাফ স্নিগ্ধতার সামনে বসে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো, আর স্নিগ্ধতা ওর হাতের চুড়িগুলো দেখছিলো। কল আসতে দেখে হাসি ফুটলো শারাফের ঠোটে। সেইভ করা নামটা স্নিগ্ধতাকে দেখালো ও। ভাইয়ের নাম দেখেই স্নিগ্ধতার চোখ বড়বড় হয়ে গেছে। শারাফ কল রিসিভ করে হাসিমুখে বললো,
– জ্বী বলুন মিস্টার এহমাদ? কেমন আছেন?
– এইতো ভালো। তোমার কি খবর?
– বেশ ভালো। এইতো আপনার বোনের সাথেই ক্যাফেটেরিয়ায় বসে আছি।
শারাফের এহেন উত্তরে সাইফ আটকে গেলো। ওর সামনে অগ্নিলাও হাসছে। সাইফ নিজেকে সামলে বললো,
– আব্ তুমি টুকির সাথে?
– জ্বী। কোনো ভুল করেছি মিস্টার এহমাদ? এখন আপনি যেমন ডিউটির মাঝে হবু বউয়ের সাথে ধুমিয়ে প্রেম করছেন, আমারও তো তেমন পড়াশোনার সাথে প্রেমটাও চালিয়ে যাওয়া উচিত। তাইনা?
সাইফ দ্বিতীয়বার চমকানো চোখে অগ্নিলার দিকে তাকালো। অগ্নিলা এতোক্ষণ ঠোট টিপে হাসলেও এবার শব্দ করে হেসে দিলো। এদিকে শারাফ স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটিয়ে হাসছে আর স্নিগ্ধতা দু আঙুলে কপাল চেপে ধরে মুখ লুকোচ্ছে নিজের। ভাগ্যিস অনুটা কলের দোহাই দিয়ে আগেই এখান থেকে গেছে। নইলে শারাফের এমন কথা শুনলে ওকে পরে খুব শোনাতো ও। শারাফ হঠাৎ ব্যস্তভাবে বললো,
– হ্যালো? মিস্টার এহমাদ? এতোটা মিষ্টিস্বরে আপনি হাসছেন? আমি আপনার বোনের সাথে আছি জেনে এতোটা খুশি হয়েছেন? ওয়াও!
স্নিগ্ধতা চোখ তুলে তাকালো এবার। কাচুমাচু চোখমুখ করে শারাফকে ইশারায় বোঝালো, সাইফকে না খোচাতে। শারাফ এবার আরোবেশি আগ্রহ দেখিয়ে বললো,
– বাই দা ওয়ে, আপনার হাসির শব্দটা এমন মেয়েলী মেয়েলী শোনাচ্ছে কেনো মিস্টার…
– স্টপ আনোয়িং হিম শারাফ! এটলিস্ট ওকে তো ছাড়ো? ভুলে যেও না আমার উডবির সাথেসাথে স্নিগ্ধতার ভাইও! সো কন্ট্রোল ম্যান!
রীতিমতো ধমকানো স্বরে বললো অগ্নিলা। সাইফের কাছ থেকে ফোনটা কেড়েছে আগেই। ও জানে, শারাফ কোনো কিছুতে অনুমতি পেয়ে গেলে তাতে কতোটা মিশে যায়। অগ্নিলার কথা শুনে এপাশে শারাফও শব্দ করে হেসে দিলো। অগ্নিলা বললো,
– লোকেশন সেন্ড করছি, স্নিগ্ধতাকে নিয়ে জলদি চলে এসো। উই আর ওয়েটিং।
– ওকে মিস হটি! তোমার কথা বাদ, যার বোনের নামে শ্বাস নিচ্ছি, তার আদেশ পালন করাই যায়। আসছি আমরা।
অগ্নিলা কল কাটলো। সাইফকে ফোনটা ফেরত দিয়ে ইশারায় বুঝালো, শারাফ ওমনি। ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস ছাড়লো সাইফ। ও যা করেছে, সেটুকো পুষিয়ে নিতে হলেও থাকতে হবে ওকে আজ। শারাফ মোবাইল থেকে চোখ তুলে স্নিগ্ধতাকে বললো,
– চলো! আমার সাথে যেতে হবে তোমাকে।
– কোথায়?
– প্রেম করতে। তোমার ভাইয়ার আদেশ!
নিরস চাওনিতে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওর কানের পেছনের চুলে আঙুল গুজে সামনে ছেড়ে দিলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– অফিসিয়ালি আমার হওয়ার আগের এই আনঅফিশিয়াল স্টেজটা এন্জয় করো স্নিগ্ধতা। ট্রাস্ট মি, তোমার লাইফের সুন্দরতম মুহুর্ত উপহার দেবো আমি তোমায়।
পকেটে একহাত গুজে দুপা পেছোলো শারাফ। তারপর ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরোনোর জন্যপা বাড়ালো। বই বুকে গুজে ওর পেছনপেছন এগোলো স্নিগ্ধতাও। শারাফের ঠোটের মুচকি হাসিটা, ওর হাটার ভঙিমা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, এই যাত্রাটুকো নিয়ে কতোশত সুখ বুনছে ও মনেমনে। গাড়ি অবদি শারাফের দু কদম পেছনপেছন আসলো স্নিগ্ধতা। শারাফ গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দাড়লো। দুদন্ড দৃষ্টিবিনিময় হলো দুজনের। শারাফ কিঞ্চিৎ ঝুকে দাড়িয়ে বললো,
– আজকে আমি লোয়েস্ট স্পিডে ড্রাইভ করবো। অনেক সময় পাবে আমাকে দেখার। ডোন্ট ওয়ারি।
নিচের ঠোট কামড়ে ধরে হেসে দৃষ্টিনত করলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো। স্নিগ্ধতা গাড়িতে উঠে বসে নিজের সিটবেল্ট লাগিয়ে নিলো। শারাফ স্টেয়ারিং ধরে একবার দেখে নিলো ওকে। মোবাইলে কিছু একটা করে, লুকিং গ্লাস স্নিগ্ধতার চোখের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললো,
– কিছু কাজ আমার জন্যও বরাদ্দ রাখা উচিত ছিলো।
স্নিগ্ধতা বেশ বুঝলো, ‘কিছু কাজ’ কথাটা দিয়ে সিটবেল্ট লাগানোর কথা বুঝিয়েছে শারাফ। তবুও কিচ্ছু না বোঝার ভান করে বললো,
– তাই? তা ঠিক কোন কাজটা আপনার জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত ছিলো? আমার ভাইয়ার দেওয়া দায়িত্বপালন ছাড়া আর কি কি পারেন আপনি?
– ইয়াকীন ভাই? আপনার বইটা।
পাশ থেকে আওয়াজ শুনে স্নিগ্ধতা ওর জানালায় তাকালো। সেখানে বই বাড়িয়ে দাড়িয়ে একজন। শারাফ ‘থ্যাংকস্ ইয়ার’ বলে, স্নিগ্ধতার দিকে অনেকটা ঝুকলো। আর দম নিয়ে একদম সিটের সাথে মিশে গেলো স্নিগ্ধতা। ছেলেটা বই দিয়ে চলে গেলো। শারাফ বইটা জানালা দিয়ে হাতে নিয়ে, স্নিগ্ধতার সিটের পেছনে একহাত রাখলো। তারপর ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে রইলো ওরদিক। অনেকটা কাছাকাছি থাকায় বড়বড় চোখে শারাফের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফ ঠোটের কোনে একটু বাকা হাসি ফুটিয়ে বললো,
– কি পারি? সবরকম পরিস্থিতি তৈরী করে হলেও, আমি তোমার কাছে আসার সুযোগ করে নিতে পারি। ইজ’ন্ট ইট এনাফ?
কথা শেষ করে কিয়দক্ষণ স্নিগ্ধতার ঠোটের দিকে তাকিয়ে রইলো শারাফ। স্নিগ্ধতার চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। ঘাড় নেড়ে হেসে নিজের জায়গায় ফিরলো শারাফ। মুখ দিয়ে দম ছাড়লো স্নিগ্ধতা। গলা ঝেরে বললো,
– তাই না? এনাফ। তবে সে সুযোগের কোনোরুপ অপব্যবহার করলে সোজা জেলে। এটা জানেন তো?
শারাফ শব্দ করে হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। স্নিগ্ধতা বললো,
– আপনি ইচ্ছে করে এখন ওনাকে বই দিয়ে যেতে বলেছেন!
– লাইব্রেরিতে রেখে এসেছিলাম। এখন দিয়ে যেতে বললে যদি বই আর তোমার সান্নিধ্য, দুটোই একসাথে পাওয়া যায়, হুয়াই নট?
স্নিগ্ধতা বলার কিছুই পেলো না। অবাকচোখে চেয়ে রইলো কেবল। শারাফ ড্রাইভিং করতে করতে বললো,
– তোমার কি মনে হয় স্নিগ্ধতা? তোমার ভাইয়া এমনিএমনি আমার সাথে যেতে বলেছে তোমাকে?
– তাহলে…?
– তোমার হবু ভাবী অগ্নিলা চৌধুরী বলেছে তাকে।
স্নিগ্ধতা অবাক হলো না। সাইফের কাজকর্মের ধরন বোঝা শারাফের জন্য কঠিন কিছু না। সরু চোখে তাকিয়ে থেকে বললো,
– আর অগ্নিলা ম্যামকে আপনি বলেছেন।
দৃষ্টি সামনে রেখে ওভাবেই নিশব্দের হাসি উপহার দিলো শারাফ। বললো,
– আগেরবার তোমাকে বাসায় পৌছে দেওয়ার সময় তোমার ভাইয়ার সিচুয়েশন ছিলো, তুমি আমার আশেপাশে কেমন ফিল করো সেটা পরখ করা। আমি বুঝেছিলাম উনি চাইছেন আমাকে তোমাকে স্পেস করে দিতে। সেজন্যই বলে রেখেছিলাম, আমি তোমাদের বাসার দিকেই যাবো। সি! কাজ পরে যেতে, সে তোমাকে সেই আমার সাথেই পাঠালো।
– আপনি একটা ঐন্দ্রজালিক!
– উহুম! ওইটা নিসন্দেহে তুমি।
– আমি? আমি কি করলাম?
– তুমি কি করেছো জানিনা। তবে তুমি আমার লাইফের সেই অনবদ্য অংশ হয়ে গেছো, যে অংশে রাগ, লোভ, অন্যায়, মিথ্যে কোনোটাতেই নিজেকে সংবরণ করা হয়ে ওঠেনা আমার। যে অংশের সবকিছুতে আমার নিউরনেরা অক্ষমতার প্রমাণ দেয়, অবুঝ হয়ে যায়। শুধু একটা কথাই মনে হয়, তোমাকে চাই। ইউ আর দ্যাট অনলি ইনফিনিটি, হোয়ার আই হ্যাভ লস্ট মাইসেল্ফ টোটালি! তাই আমার দৃষ্টিতে যদি কেউ যদি মায়াময়ী হয়, সেটা একমাত্র তুমি।
স্নিগ্ধতা পলক ফেললো না। তবে শারাফও তাকালো না ওর দিকে। বললো,
– আর এখন যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছো, তাতে মনে হচ্ছে আরোবেশি বশীকরনের মন্ত্র একেছো! এমন চাওনি দেখে তোমাকে সোজা কাজিঅফিস নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। দ্য মাইন্ডগেইমার ইয়াকীন শারাফ ইজ স্টার্টিং টু লুজ হিজ সেল্ফকন্ট্রোল সুপ্রিমেসি। সো ডোন্ট ডু দিস স্নিগ্ধতা। আমি সত্যিই তখন সর্বহারা হবো।
স্নিগ্ধতা মুচকি হেসে, চোখ সরিয়ে নিয়ে বাইরে তাকালো। আড়চোখে একবার ওকে দেখে নিয়ে, সামনে তাকালো শারাফ। বুকজুড়ে বদ্ধ সুখেরা নিমীলিত যন্ত্রনার আঁচে নিস্প্রভ। স্নিগ্ধতাকে ভালোবাসি বলার পর থেকেই ওর ভেতরটায় এক অদ্ভুত যন্ত্রনাময় সুখ। যেখানে পাওয়ার সুখের সাথে প্রতিমুহুর্তে হারানোর যন্ত্রনা অনুভব হয়। অনুভব হয়, বন্ধুত্ব শব্দটা আজও ওর জীবনের সুখ শব্দটাকে আঁচড়ে চলেছে৷ যেনো প্রেম না, কলঙ্ক একেছে এই সুখ। কলঙ্ক!
#চলবে…

