#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৪০.
আকাশে পুর্ণচাঁদ আজ। আর তার আলোয় রাতের মোহনীয়তা গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ। স্নিগ্ধতার ঘরজুড়ে বেলিফুলের সুবাস। বাগানের বড় বেলিফুল গাছটায় ফুল এসেছে অনেকগুলো। গাছগুলো সাইফের লাগানো। স্নিগ্ধতার ঘর অবদি ঘ্রাণ পৌছাবে, সেভাবেই গাছগুলো লাগিয়েছিলো সাইফ। ব্যালকনির মেঝেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে স্নিগ্ধতা। আকাশীরঙা বড়হাতা শর্টকামিজের সাথে সাদারঙা ধুতি ওর পরনে। একহাতে তুলি আরেকহাতে মাটির ফুলদানি। ওটা ওর রুমেই উত্তরদিকের কোনাটায় রাখা ছিলো। খুব শখ করে এনেছিলো সাইফ এই ঘরের জন্য। রুমের দেয়ালে থাকা আঁকিবুকির জন্য ফিকে লাগছিলো ওটা। স্নিগ্ধতা ঠিক করলো এটা আরো সুন্দরমতো সাজিয়ে সাইফের বারান্দায় পাঠিয়ে দেবে ও। দুদিন পর অগ্নিলা আসবে সে ঘরে। সাইফের বিছানার পেছনের দেয়ালেও রঙ করার কথা ভেবেছে ও। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে, তুলির সরু ডগায় ফুলদানিতে সুন্দরমতো দাগ টানলো স্নিগ্ধতা। সাইফ খাবারের প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলো। মৃদ্যু আওয়াজে চোখ তুলে তাকালো স্নিগ্ধতা। ভাইকে দেখে মুচকি হেসে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো আবারো। বললো,
– খাইয়ে দাও। মানা করবো না। কারন কদিন পর ভাবী আসছে এ বাসায়। তখন তো আর এভাবে আমায় খাওয়াতে পারবে না। তাইনা?
– তোর নীলাকে এমন মনে হয়?
স্নিগ্ধতা হেসে দিলো। হাতেরকাজ পাশে রেখে বাবু হয়ে বসলো ও। সাইফও ওর সামনে বসে গেলো। ভাত মাখাতে মাখাতে নির্লিপ্তভাবে বললো,
– বললি না? তোকে আদর করলে নীলার অভিমান হবে, তোর নীলাকে এমন মনে হয়?
স্নিগ্ধতা লোকমা মুখে তুলে নিয়ে বললো,
– না। তবে আমার ডাউট আছে।
– কিসের?
– নীলাভাবী আসলে দেখো, আমাকে খাইয়ে দেওয়ার এই কাজটা সেই করবে। তোমার চেয়ে বেশি আদর করে সেই খাওয়াবে আমাকে দেখো। আমার তো চিন্তা, তখন এ নিয়ে আবার তোমাদের মাঝেই ঝামেলা না হয়!
দু ভাইবোন একসাথে হাসলো এবারে। স্নিগ্ধতা সাইফকে ফুলদানিটা দেখিয়ে বললো,
– দেখো! এইটা তোমার রুম-ব্যালকনির কোনাটায় রাখবো। সুন্দর হবেনা?
– যা আমার টুকির হাতের ছোয়া পেলো, তা অসুন্দর কিকরে হয়? তা শুধুই সুন্দর হবে! একদম তোর মতো!
– জানো? আমি ঠিক করেছি ভাবী এলে প্রতিদিন একদম তরতাজা ফুলে সাজাবো এটা আমি। তোমার ঘর থেকে ফুলের ঘ্রাণ সরতেই দেবো না! নীলাভাবি তোমার সাথে এ বাসার প্রতিটা কোনের প্রেমেও পরে যাবে দেখো!
কথা শেষ করে হাসিমুখে আবারো তুলি হাতে নিলো স্নিগ্ধতা। একটু সময় নিয়ে বোনের হাসি দেখলো সাইফ। কিছুটা নতকন্ঠে বললো,
– এতো দ্রুত আমি তোকে কাছছাড়া করতে চাইনা টুকি।
আটকে গিয়ে চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। সাইফের চোখ ছলছল করছে। তবুও ঠোটে হাসি রেখে সাইফ বললো,
– স্বপ্নীলের সবাই অনেক ভালো টুকি। তুই ভালো থাকবি ওখানে। মিস্টার নাহিদ আমাকে ও বাসায় যেতে বলেছেন। তোকে নিয়ে। ওরা হয়তো চাইছে আমার-নীলার বিয়েটার সাথে তোর আর শারাফের…
সাইফ কথা শেষ করার আগেই পাশে থাকা ফোনটা বেজে ওঠে স্নিগ্ধতার। সেইভ করা নম্বরটা দেখে ইচ্ছে করে কল রিসিভ করলো না স্নিগ্ধতা। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। দ্বিতীয়বার ফোন বাজলে সাইফ বললো,
– পানি খেয়ে নিস। আমি রুমে যাচ্ছি। হুম?
জবাবের অপেক্ষা না করে সাইফ উঠে চলে আসলো নিজের রুমে। দরজা লক করে, ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো ও। বেসিনে দুহাত রেখে, শ্বাস ফেলতে লাগলো জোরে জোরে। আচমকা দেয়ালে ঘুষি ছুড়লো দুইটা। রাগ নিয়ে চোখেমুখে পানির ছিটা দিলো কয়েকবার। তারপর বেরিয়ে আসলো ওয়াশরুম থেকে। চোখমুখ, চুলের সামনে থেকে পানি ঝরছে সাইফের। হাতের তালুর উপরপিঠ জখম হয়ে আছে। আর ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টেবিলে থাকা কাগজদুটোর দিকে। একটা ডিএনএ রিপোর্ট। ও নিজে যেটা ল্যাব থেকে এনেছে। আরেকটা ব্যাংকের মানি রিসিপ্ট। যেটা অগ্নিলার ব্যাগ থেকে নেওয়া। অবশ্য নেওয়া বললেও ভুল হবে। চুরি করা। অতি সন্তর্পনে অগ্নিলার কাছ থেকে রীতিমতো হাতিয়ে নিয়েছে ও কাগজটা। অগ্নিলাকে ইন্সপেক্টর বাকেরের দেওয়া আসল ডিএনএ রিপোর্ট ভেবে।
সাইফের কাছে ওর দায়িত্বের সামনে বাকিসবকিছু বরাবরই তুচ্ছ। এতোবেশি ডেডিকেশনের জন্যই হয়তো হাতে এখনো অবদি আসা সব কেইসই সমাধা হয়েছে। কিন্তু প্রথমবার, প্রথমবার কোনো কেইসের জন্য এতোটা নিচে নামতে হয়েছে ওকে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও ছাড় দেয়নি ও। আর তার সবচেয়ে জঘণ্য রুপ, হবু জীবনসঙ্গীনিকেও সন্দেহ করা। খুনের মতো ককর্মে জড়িতদের সাথে অগ্নিলাকেও তালিকাভুক্ত করে দেওয়া।
এই মেয়েটা প্রথমদিনেই সাহসিকতা দেখিয়ে ওর ভালোলাগার জায়গাটা দখল করে নিয়েছিলো। কিন্তু সময়ের সাথে ওর আচরণ, কথা আর রহস্যজনক স্বভাবটার জন্য সে ভালোলাগায় সন্দেহ জুড়ে যায়। সবুজ-চঞ্চলের প্রতি অগ্নিলার রাগ, সবুজের মৃত্যুর সময় ওর বাসায় অনুপস্থিত থাকা, সবুজের দেহে পাওয়া জুতোর ক্ষুড়ের সাথে ওর জুতোর খাপ মিলে যাওয়া সবমিলিয়ে সাইফ স্বস্তিতে থাকতে পারেনি। যে মেয়েটা ওর ভালোলাগার হয়ে উঠতে শুরু করেছিলো, তাকে সন্দেহের তালিকায় রাখার মতো যন্ত্রণা আর দুটো হয় বলে ওর মনে হয়নি।
ব্যক্তিগত জীবনের ভীড়ে লক্ষ্যকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিলো না। প্রতিটা কাজের শেষে দিনশেষে একটাই পরিণতি চেয়েছিলো ও। যে-ই খুনগুলোর পিছনে থাকুক না কেনো, পরের খুনটা হওয়ার আগেই এই কেইসের সব সুতো গুছিয়ে নেওয়া। আর তাই সন্দেহ থেকে সিদ্ধান্তে পৌছানো আবশ্যক ছিলো ওর। এজন্য নিজের মতো করেই সাইফ সাজিয়েছিলো সবটা। প্রমাণ খুজতে একপ্রকার ছায়া হয়ে যায় ও অগ্নিলার। তবে মেলেনি কিছুই। না পেনড্রাইভ হারানোর দিনের পুলিশস্টেশনের সিসিক্যামে অগ্নিলাকে মিলেছে, নাইবা সবুজের মৃত্যুস্হলের কোনো চিহ্নে। এমনকি আটমাস আগের খু*নে পাওয়া রক্তের দাগের সাথেও অগ্নিলার চুলের ডিএনএ মেলানোর চেষ্টা করেছিলো সাইফ। আর আজকে ওর সে সন্দেহটাও ভুল বলে ধরা দিলো। শরীর এবার নেতিয়ে আসলো সাইফের। ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে কপালের পানিকনা মুছে চেয়ারে বসলো ও। টেবিলে থাকা ব্যাংকের মানি রিসিপ্টটা তুলে ধরে বললো,
– আ’ম সরি নীলা। তুমি তোমার মতো করে আমায় ভালোবাসলেও, আমি তোমার মতো করে তোমায় ভালোবাসিনি। শুধুশুধু সন্দেহ করেছি তোমাকে। আ’ম সরি।
কয়েক মুহুর্ত কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে ওটা সরিয়ে রাখলো সাইফ। ল্যাপটপ খুলে দৃষ্টিক্ষেপ করলো তার স্ক্রিনে। পাঁচ পাঁচটা একইধাচের খু*ন আলাদাকেউ ঘটাতে পারে না। কিছু তো অজান্তে রয়ে গেছে ওর! কিছু তো বাদ পরছে। কিন্তু কি? মিনিট বিশের মধ্যে শারাফের টেক্সট আসলো ওর ফোনে। তার কিছুক্ষন পরই রুমের দরজায় নক পরলো। সাইফ গলা উচিয়ে বললো,
– জলদি ফিরিস।
অবাক হলো স্নিগ্ধতা। সাইফ চলে আসলে, তৃতীয়বারের কল বাজার পর ও রিসিভ করেছিলো কলটা। ও কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে শারাফ বলে উঠলো,
– বেরোতে পারবে?
– কিহ?
– তোমার এই বিস্মিত চেহারা পরিবেশটার সাথে মানানসই না স্নিগ্ধতা। মিস্টার এহমাদকে আমি সামলে নেবো। স্বাভাবিক হও। আমি তোমার বাসার সামনে। বেশি সময় নেবোনা।
কথাগুলো বলে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসলো শারাফ। ওর দৃষ্টি গাড়ির লুকিং মিররে। আকাশের চাঁদটা আজ কতো আলো বিলাচ্ছে। নিজেররুম থেকে চাঁদটা দেখে হুট করেই মনে হলো, এ আলোতে ওর স্নিগ্ধতাকে পাশে চাই। গাড়ি নিয়ে তাই বেরিয়ে এসেছে তৎক্ষনাৎ। স্নিগ্ধতা ফোন রাখলো। ও সাইফকে বলতে এসেছিলো শারাফকে মানা করার জন্য। কিন্তু সাইফ তো উল্টোটাই বলছে। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। যে ভাই ওকে একমুহূর্ত কাছছাড়া করতে রাজি না, সে ভাই নিজে আজ ওকে শারাফের সাথে বেরোতে বলছে। মাথায় ওড়না তুলে দিয়ে, মৃদ্যুপায়ে বাসা থেকে বেরোলো স্নিগ্ধতা। মুলদরজা পার করতেই দেখে রাস্তার পাশে দাড় করানো গাড়িটা। তার একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, পকেটে দুহাত গুজে দাড়িয়ে শারাফ। ঠিক পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলোতে চেহারা স্পষ্ট ওর। পরনে একটা ছাই-সাদার টিশার্ট আর ট্রাউজার। একপা দুপা করে এগোলো স্নিগ্ধতা। শারাফ আর ওর মাঝে দুরত্ব ক্রমশ কমছে। আর ওর শ্বাসপ্রশ্বাস গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ। গাঢ় হচ্ছে ভেতরের মিষ্টি দহন…
•
নিস্তব্ধ রজনীর দ্বিপ্রহর। রুমের ঠিক মাঝখানটার মেঝেতে বসে আছে অগ্নিলা। ওর সামনে একটা জ্বলন্ত মোম। রুমজুড়ে থাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারকে ঘুচিয়ে মোলায়েম আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে সেটা। ঠোটের কোনে তাচ্ছিল্য হাসি রেখে, ছলছল চোখে অগ্নিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মোমের অগ্নিশিখার দিকে। এক পর্যায়ে নখ বাড়িয়ে দিলো সে আগুনে। আবার উত্তাপ অনুভব করতেই সরিয়ে নিলো আঙুল। বললো,
– এইটুকুন আঁচে পুড়লে কিছু হবে না ধারক। তুমি বরং এভাবেই জ্বলতে থাকো একটুআধটু। তবে আমি এতো সহজে জ্বলবো না। পৃথিবী জানুক, তুমি এই মোমের মতো নমনীয়, আর আমি ওই অগ্নিশিখা। তুমি জ্বলতে জানো, আর আমি জ্বালাতে।
জবাবহীন পরিবেশটায় নিরবে পাশে পরে থাকা কাগজটা হাতে নিলো অগ্নিলা। চোখ বুলালো পুরো কাগজটায়। এই একটা কাগজ ওর সমগ্র পরিকল্পনার সমাধিসৌধ করতে সক্ষম। ওর এতোগুলো দিনে একটু একটু করে সাজানো পরিস্থিতিকে তছনছ করে দিতে সক্ষম। এতো সহজে তা কি করে হতে দেবে ও? কিছুতেই হতে দেবে না। কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ভরে উঠলো অগ্নিলার। অস্ফুটস্বরে বললো,
– আগের চারটে খুনের প্রমাণ, সবুজের মার্ডারের সময়কার হলের সিসিক্যামের আসল ফুটেজ আর ওই পেনড্রাইভের মতো, এই ডিএনএ রিপোর্টও কোনোভাবে তোমার হাতে পৌছোবে না সাইফ। আমি হতে দেবোনা সেটা।
দমকা হাওয়ায় কেপে উঠলো মোমের অগ্নিশিখা। তীর্যক আলোতে দৃশ্যমান হলো রিপোর্ট রেজাল্ট ঘরের ‘পজিটিভ’ শব্দটা। অগ্নিলা শুকনো ঢোক গিলে বরাবর চোখ বুলালো কাগজটায়। সেখানে থাকা স্যাম্পল অফ সাসপেক্ট (সন্দেহভাজনের নমুনা) লেখাটার পাশে লেখা, হেয়ার(চুল)। আর ঠিক তার নিচে নেইম অফ সাসপেক্ট (সন্দেহভাজনের নাম) এর জায়গায় স্পষ্টাক্ষরে লেখা, অগ্নিলা চৌধুরী!
চোখ জ্বলে উঠলো অগ্নিলার। কিন্তু কিই বা পেলো সত্যের প্রতি এই জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে? জীবন-মরনের এক বিশ্রি খেলা। যা আজ ওকে সবকিছু থেকে আলাদা করে দিয়েছে। তবে ভুল করেনি সে পথে ফেলে আসা ওর অস্তিত্বের চিহ্নটা। কি হলো, অকস্মাৎ শব্দ করে হেসে দিলো অগ্নিলা। কাগজটার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ধোকা ব্যাপারটা আজব তাইনা? এই ঋণাত্নক শব্দটা আমাদের সবচেয়ে আপনের সাথে যায়। পর কেউ আমাদের খু*ন করে গেলেও, আমরা কখনো তাকে বলতে পারি না, তুমি আমায় ধোকা দিয়েছো। কিন্তু আপন কেউ, পরমাত্মীয় কেউ যখন আমাদের সাথে বিরোধিতা করে, আমরা বলে দেই, ধোকা দিয়েছো আমাকে। তুমি একজন ধোকাবাজ!
অগ্নিলা একটু থামলো। তারপর আবারো ঘাড় বাকিয়ে কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
– হ্ হেই? তুমি না আমার রক্ত? আমার সবচেয়ে আপন? তাও তুমিও আমার সাথে ধোকাবাজি করলে? হ্যাঁ? কি দরকার ছিলো আট মাস আগে ওই টিনের বেড়াতে লেগে যাওয়ার? কি দরকার ছিলো এতোদিনের রোদ, বৃষ্টিতেও নিজেকে জিইয়ে রাখার? কি দরকার ছিলো কারো নজরে আসার? কি দরকার ছিলো?
এবারো প্রকৃতি নিরব। অগ্নিলা নিজের মতো করে বলতে লাগলো,
– হাহ! দরকার ছিলো না কোনো! তবুও আমার অন্যায়ের রেশ তুমি, তোমাকে তো কারো না কারো কাছে ধরা পরতেই হতো। আর পরেছো তো পরেছো, শেষঅবদি কার হাতে পরেছো? যার কাছ থেকে আড়ালের জন্য আমি বিয়ে নামক পবিত্র সম্পর্ককেও ছাড় দেইনি, সেই ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদের কাছে। সিরিয়াসলি?
পাশে মেঝেতেই থাকা ফোনের ওয়ালপেপারে তাকালো অগ্নিলা। সেখানে সাইফের ছবি। অগ্নিলা করুণ কন্ঠে বললো,
– আ’ম সরি। বাট নট সরি ইন্সপেক্টর। শুধুমাত্র তুমি এই কেইস হ্যান্ডেল করছো জেনে আমি তোমার চারপাশে প্রেম ছড়িয়েছি। মাকড়শার জালের মতো মায়া নামক চক্রব্যূহ রটিয়েছি। সেই আমাকে পরখ করতে, তোমার করা এই ছোটছোট নাটকগুলো ধরতে পারাটা খুব কঠিন ছিলো না বিশ্বাস করো। তোমার মনে প্রেম বস্তুটার সাথে সন্দেহের বীজ চারা গজিয়ে ফেলেছে, তা আমি জানতাম সাইফ। তাই শুরু থেকেই তোমায় আন্ডারেস্টিমেট করা হয়ে ওঠেনি। রেস্তোরায় মাথায় হাত বুলিয়ে, শান্তনা দেওয়ার নাম করে ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়া যায়, এমনটা হয়তো তোমার দ্বারাই সম্ভব। আর তুমি এতোভাবে এগোলে, আমিও কি করে থেমে থাকি বলো? আমাকেও সবটা আমার মতো করেই গোছাতে হয়েছে। যদিও স্পেশাল থ্যাংকস টু মিস্টার বাকের, তারপরও তোমার নীলা হওয়ার ফায়দা তো আমি লুটতামই। তার একাংশ তোমার চোখেও পরেছে। তবে তাতে লাভটা কিন্তু আমারই। তোমার আত্নগ্লানি, এ কাগজ শেষঅবদি আমার কাছে, আর এখন অগ্নিলার অগ্নিতে…
কাগজটা মোমের আগুনে পুড়িয়ে দিলো অগ্নিলা। ওটা পরিপুর্ণ ছাই হয়ে আসলে টুপটাপ দুফোটা জল গড়ালো ওর চোখ থেকে। একহাতে গাল মুছে অগ্নিলা শক্ত গলায় বললো,
– তোমার আমার সন্দেহ করার কারন যদি এই পাঁচটে খু*নের মুল হয়ে থাকে, তবে আমার তোমার কাছে আসার লক্ষ্য সেগুলোর প্রশাখা সাইফ। যতোদিন না আমি আমার লক্ষ্যে পৌছাচ্ছি, তুমিও কোনোপ্রান্তে প্রান্তে পৌঁছাতে পারবে না। যতো গভীরে এগোনোর চেষ্টা করবে, আমি ততোটাই বিমুখে সরিয়ে নিয়ে যাবো তোমাকে। একটা শ্লোক আছেনা? শাম-দাম-দন্ড-ভেদ। আমার চারপাশটা আমি সেই রীতিতে রটিয়ে নিয়েছি সাইফ। প্রেম-পরিবার সব পিছুটান ছেড়ে শাম-দাম চুকিয়েছি আমি। তুমি-আমি’র মতো আইন-অন্যায়ের মাঝে দন্ডও চলমান। আর বাকিটা পুরণ করে দিতে, গল্পের ইতিতে থাকবে ভেদ! অনাকাঙ্ক্ষিত ভেদ! যাকে বলে, Divide And Rule! Division of love, rule of hatred.
সবরকম পরিণতির জন্য প্রস্তুত হও সাইফ। প্রস্তুত হও। এতেই তোমার মঙ্গল। সবার মঙ্গল।
#চলবে…

