#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৪৪.
ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্র।
সময়টা মার্চ ২০২০। সময় অনুযায়ী ঋতুটা শীতকালের শেষ। তবে শেষযাত্রায় শীতের প্রকোপ কমলেও, তাপমাত্রার খুব একটা উন্নতি হয়নি। দুপুরের তীর্যক রোদ যখন সুউচ্চ ভবনগুলোর শীর্ষ ছুয়ে চার্লস নদীর স্বচ্ছ জলে প্রতিফলিত হয়, মনেহয় এই বোধকরি গ্রীষ্মের আগমন। কিন্তু বেলা গড়ানোর সাথে ভুল ভাঙিয়ে যায় উত্তরিয়া শীতল বায়ুপ্রবাহ। হিমজড়ানো বাতাসে বেরিয়ে পরা ব্যস্ত মানুষের দল হাতের তালু ঘষতে ঘষতে শরীরের উত্তাপ খোজে। কফিশপগুলোতে সে সময় লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। সেখানে কেউ পেমেন্ট শেষ করে, কফিমগ হাতে নিয়ে গন্তব্যে ছোটে, কেউবা পরিবার-প্রেয়সী নিয়ে বসে কফিমগে মৃদ্যু চুমুকের সাথে আড্ডা জমায়। সূর্য ডোবার আগ-মুহুর্তে চার্লসের তীরে একজোট হয় হাভার্ডের শিক্ষার্থী আর দর্শনার্থীরা। তেমনি এক দলের মাঝে ছুটে এসে ঘাসে বসে গেলো এক যুবতী। তার ফর্সা গরন আর ঘাড় অবদি কোকড়ানো চুল। পরনে জিন্স, সাদা টিশার্টের ওপর খয়েরীরঙা বড় কোট। গতি বেশি হওয়ায়, একহাতে থাকা জুসের লম্বাটে মগটা থেকে স্ট্র সমেত জুস পরে গেলো কিছুটা। মেয়েটা আরেকহাতের বইতিনটে ঘাসে রেখে, হাপাতে হাপাতে ইংরেজীতে বললো,
– ইয়াকীন কোথায়?
মুখে হাত দিয়ে, সুরতুলে ‘ইয়াকীননন’ বলে ডাক লাগালো প্রত্যেকে। মেয়েটা কপাল কুচকে সবার চেহারা দেখে নিলো। তারপর বললো,
– ডাক শুনে আসার হলে ও আগেই আসতো। ডেকেছি ওকে আমি।
– ও। তুমি ডেকেছো? এজন্যই পালিয়েছে বোধহয়।
– তোমরা কি আমাকে বলছো ইয়াকীন কোথায় নাকি আমি নিজেই খুজে নেবো?
– তোমার জ্বালাতন সহ্য করতে না পেরে ইয়াকীন বিডিতে ফিরে গেছে। আর ইউএস ফিরবে না বলেছে।
– ভেরি ফানি।
মেয়েটা ওদের কথাকে পাত্তা দিলো না। ইয়াকীনের সাথে কয়েকমাসের পরিচয় ওর। এখানে আসার পর, কেবল ঘোরাঘুরিতে ডুবে থাকা মনটা কখন যে এই ছেলের সাথে জুড়ে গেছে, সেটা ও নিজেও জানেনা। সময়ের সাথে এই চেনাজানাটা গাঢ়ই হয়ে চলেছে ক্রমশ। জুসের স্ট্রতে চুমুক দিয়ে আশপাশে আরেকদফা খুজলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে। ওর নাজুক মুখপানে চেয়ে এক ছেলে বলে উঠলো,
– ইয়াকীন থাকলে বলতো, বরফঝরা মৌসুমের শুভ্রতার চেয়ে তোমার শুভ্রতা আর আড় চাওনি বেশি আকর্ষক। তাইনা?
মেয়েটা জবাব দিলো না। সবার মাঝে এই ব্রুটো ছেলেটার চাওনি ওর মোটেও পছন্দ না। ব্রুটো আবারো বললো,
– বিডির মনোবিজ্ঞানী মন গুছিয়ে কথাবলা ভালোমতোই জানে। ছুটেচলা অশ্বিনী তো আর এমনিএমনি আটকাবেনা।
– তোমার এনালাইজেশন আমি বা এখানকার কেউই চায়নি ব্রুটো। নিজের কাছেই রাখো এসব।
কড়াকন্ঠে জবাব দিয়ে মেয়েটা পাশে বসা ছেলেটাকে ঠেলা লাগালো একটা। বললো,
– প্যাড্রিক? তুমি কি মুখ খুলবে? নাকি তোমার চশমা ভেঙে দেবো?
চশমার কথা শুনেই অন্তরাত্মা যেনো শুকিয়ে গেলো প্যাড্রিকের। নাকের ডগায় বই ঠেকিয়ে পড়ছিলো ও। হচকিয়ে উঠে চোখের চশমাখানা খুলে ফেললো। আটকানো স্বরে বললো,
– আ্ আজ বিকেলে ওর বোর্ডিংয়ের ওপারে টিউলিপ ফিল্ডে যাওয়ার কথা। তবে এখন কোথায় জানিনা।
বিশ্বজয়ের হাসি দিলো মেয়েটা। কাধের ব্যাগটা ঝুলিয়ে উল্টোপথে হাটা লাগালো ও। সবে ক্যাম্পাসের গন্ডি পেরোবে, অকস্মাৎ কেউ একজন লাফিয়ে পথ আগলে দাড়ালো ওর। ও দুপা পিছিয়ে গেলো। তবে সময় না নিয়ে সামনের মানুষটাকে দেখলো ঠিকমতো। নেভিব্লু টিশার্টের ওপর কালো জ্যাকেট পরা ছেলেটার চেহারায় শেষ বিকেলের আলো এসে পরেছে। অমায়িক একটা হাসি দিলো ও। ছেলেটা প্যান্টের পকেট থেকে একটা গোলাপীরঙা টিউলিপ বের করে সামনে তুলে ধরলো ওর। মেয়েটা হেসে দিয়ে বললো,
– গোলাপী তো প্রেমের রঙ। গোলাপী টিউলিপ প্রেমিকাকে দিতে হয়। ভীনদেশী বান্ধবীকে হলুদ টিউলিপ দিতেই পারতে ইয়াকীন।
হাতের ফুলটা ছুড়ে ফেলে দিলো শারাফ। দুহাত জ্যাকেটের পকেটে গুজে আরামে দাড়ালো। ভ্রমণপ্রেমি বিদেশিনীর স্বভাব বাকিসবের চেয়ে আলাদাই। কারনটা বুঝতেও খুববেশি বেগ পেতে হয়নি শারাফকে। যে মেয়ে কিনা বিশ্বভ্রমণে নেমে কোথাও দুচারদিনের বেশি স্থায়ী হয়নি, ম্যাসাচুসেটসে তার অবস্থানকাল চারমাস। ওর সাথে পরিচয়ের পর থেকেই ম্যাসাচুসেটসে রয়ে গেছে ও। দুদন্ড কপাল কুচকে তাকিয়ে থেকে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলে মেয়েটা। শারাফ উল্টোভাবে পিছিয়ে আবারো পথ আগলে দাড়ালো ওর। দুহাত পেছনে রেখে, কিঞ্চিৎ ঝুকে দাড়িয়ে বললো,
– চলে যাচ্ছো কেনো?
– অকারনে!
– অভিমান হয়েছে?
…
– ব্যাপার না! আমি তোমার অভিমান ভাঙাতে জানি।
প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাটা বললো শারাফ। তারপর পকেট থেকে আরেকটা গোলাপী টিউলিপ বের করে কানে গুজে দিলো মেয়েটার। দুহাতে মুখ ঢেকে উচ্ছ্বলতায় হেসে দিলো সে।
*
– কিছু মনে পরে গেছে?
স্নিগ্ধতার কথায় চমকানো চাওনিতে ধ্যান ভাঙে শারাফের। স্নিগ্ধতা অনেকটা এগিয়েছে ওর কাছে। বৃদ্ধা রুমে নেই। শারাফকে আসতে দেখে হয়তো বেরিয়ে গেছে সে। স্নিগ্ধতা মৃদ্যুপায়ে আরো এগোলো। আগেররাতে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে আসার সময় একটা দোপাটি*** ফুল দিয়েছিলো শারাফ। বাসায় ফিরে সেটা ভুলে গাড়িতেই ফেলে এসেছিলো স্নিগ্ধতা। আর সে শুকনোপ্রায় ফুলসমেত আজ শারাফ উপস্থিত। স্নিগ্ধতা ওর হাতে থাকা ফুলটার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
– এটা তো আমার জিনিস। মনে পরে গেছে বলে এখনই দিতে চলে আসতে হবে?
শারাফ অতিদ্রুত হাত সরিয়ে নিলো। ফুল নেওয়ার সুযোগ পায়নি স্নিগ্ধতা। শারাফ বললো,
– তোমার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলোর স্মৃতি, এমনিতেও প্রতিমুহুর্তে তোমাকে ভাবতে বাধ্য করে। চলে আসতে তো অজুহাত লাগে কেবল।
স্নিগ্ধতা জবাব দিলোনা। মাথানত করে রইলো। শারাফ বললো,
– এনিওয়েজ, তোমায় কিছু একটা ফিরিয়ে দিচ্ছি। বিনিময়ে আমি কি পাবো?
– আমি ব্যতিরেকে আর কি চাই আপনার?
– আপাতত তোমার কাছ থেকে তুমি সম্বোধন শুনতে চাইছি।
অকস্মাৎ শারাফের এমন আবদারে কিঞ্চিৎ চকিত চাওনিতে তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফ নিস্প্রভ। স্নিগ্ধতা বুঝলো, এই মানুষটা তার কথা-কাব্য ওকে প্রতিমুহুর্তে জড়িয়ে নিচ্ছে। সেটাকে বলা যায় অতি নির্বিকারচিত্তে, একইসাথে অতি সঙ্গোপনে। অবশ্য ফেরার পথও নেই সেখান থেকে। নতমস্তিষ্কে বললো,
– তোমাকে সম্বোধনে আমি শব্দহীন শারাফ। যদি এই ‘তুমি’ সম্বোধনে তুমি তুষ্ট হও, তবে তাই হোক। সে ‘তুমি’ সম্বোধনেই, আমি তোমায় ভালোবাসি।
মুগ্ধচোখে চেয়ে রইলো শারাফ ওর দিকে। মেয়েদের বলা ভালোবাসি শব্দে কতোটা লাজুকতা মেশানো থাকে, তা এই মুহুর্তে স্নিগ্ধতাকে দেখলে যেকেউ পরিমাপ করতে পারতো। চোখ তুলে আর তাকালো না স্নিগ্ধতা। কম্পিতস্বরে বললো,
– আর আমার প্রাপ্য?
শারাফ এবার মেঝেতে পরে থাকা ছবিটার দিকে তাকালো। চারবছরের আগের অতীতের ছায়া সেখানে। তবে অনুভব নেই। প্রকাশের সুযোগ পাওয়ার আগেই বিদায় নিয়েছিলো তারা। এগিয়ে গিয়ে ছবি আঁকা খাতাটা তুললো ও। ছবিটা সাদাকালো পেন্সিলে আঁকা ছিলো। ব্যালকনির সামনে এগিয়ে, সেকেন্ড দশেক সেখানের কালারপ্লেটে তাকিয়ে রইলো শারাফ। তারপর তুলিটা হাতে নিয়ে ছবির ফুলটাকে গোলাপী রঙ করে দিলো ও। আবারো স্নিগ্ধতার সামনে দাড়িয়ে বললো,
– হাভার্ড?
– আঁকানোর সময় যেটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আমি সেটাই আঁকিয়ে ফেলি। তুমি আমায় ফুল দিয়েছো ঠিকাছে। তবে এই জায়গাটাই কেনো মাথায় আসলো বুঝতে পারছি না। এমনও হতে পারে?
এটুক বলেই আনমনে হয়ে গেলো স্নিগ্ধতা। যেনো প্রশ্নগহ্বরে পরে গেছে ও। কিছুক্ষণ ওরদিক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, হাতে থাকা ফুলটা ওর কানে গুজে দিলো শারাফ। শান্তশিষ্ট গলায় বললো,
– যদি তুমি চাও।
– ম্ মানে?
– তুমি শুধু আমার সাথে থেকো স্নিগ্ধতা। সে সব হবে, যা তুমি চাও।
– স্নিগ্ধু? সাইফ এসেছে।
বৃদ্ধার উচু আওয়াজের ডাক শুনে বাইরে তাকালো শারাফ-স্নিগ্ধতা। খোলা দরজা দিয়ে ড্রয়িংরুম দেখা যায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলো সাইফ। স্নিগ্ধতা শারাফকে ইশারা করে পা বাড়ালো বেরোনোর জন্য। আচমকা শারাফ বলে উঠলো,
– আম্মার মতো মিস্টার এহমাদও চেয়েছিলো, আরাফাত তোমার জীবনে আসুক। তাইনা স্নিগ্ধতা?
পা থেমে গেলো স্নিগ্ধতার। মূর্তমানের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ও শারাফের দিকে। শারাফ আরো একপা এগিয়ে বললো,
– তোমার পৃথিবীকে উপেক্ষা করে তুমি আমার হয়েছো স্নিগ্ধতা। সেই তোমাকে প্রশ্নতাক করার কথা আমি কল্পনাও করতে পারিনা। কিন্তু কখনো যদি তোমার মনে হয়, তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছো, তখন ঠিক কোনটাকে মেনে নেবে? তোমার পৃথিবীকে? নাকি তোমার ভুলকে?
স্নিগ্ধতাও এগোলো। চোখ চিকচিক করছে ওর। তবুও শারাফের চোখে চোখ রেখে দৃঢ়তার সাথে বললো,
– দেন সে কনগ্রাটস্ টু মি শারাফ। কারন তোমার বলা আমার ‘ভুল’-ই আমার ‘পৃথিবী’ হয়ে উঠছে। আর তাকে ছাড়া বিকল্প কোনো পথ অবশিষ্টই নেই আমার। বেমালুম পথ হারিয়ে বসে আছি আমি।
জবাব দিয়ে সময় নিলো না স্নিগ্ধতা। বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। আর স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো শারাফ। স্নিগ্ধতা ওর ভুলকে পৃথিবী মানতে পারলে, ওউ নিজের পৃথিবীকে স্নিগ্ধতার জন্য ভুলে ভরিয়ে দিতে পারবে। ওর মতে, হারানোর ভয় যেখানে, সে প্রেমে সবকিছু জায়েজ। মিথ্যার মায়াজাল, সত্যের সুপ্তকোণ, অনুনয়ের রদবদল, হিংস্রতার হানা সবকিছু জায়েজ! সব!!!
#চলবে…

