#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৫১.
লকাপের ভেতরে মেঝেতে পরে আছে এক ত্রিশোর্ধ বয়সী। শুধু পরে আছে বললে ভুল হবে। শ্যামবর্নের ন’গ্নপ্রায় দেহটা মোচড়াচ্ছে আর ব্যথায় কাঁতড়াচ্ছে সে। সারা শরীরে লাঠির বেধরক মারের চিহ্ন। মোটা, লম্বা, কালচে দাগ। । সাইফ মাটিতে লোহার ফাপা পাইপ ঠেকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। জোরেজোরে শ্বাস ফেলতে গিয়ে প্রসারিত বুকপিঠ ওঠানামা করছে ওর। ডক্টর নাজমুলকে মারার সময় হসপিটালের সিসিক্যাম যে হ্যাক করেছিলো, তার ইউআরএল-আইডি ট্রেস করে দুদিন আগে তাকে ধরা হয়। আর তারপর থেকেই মাথা পুরোপুরিভাবে এলোমেলো হয়ে আছে সাইফের। দেশের সনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে, বর্তমানে ভালো স্যালারির বেতনভুক্ত থাকা মানুষটা কেনো হসপিটালের সিসিক্যাম হ্যাক করবে, কেনোই বা ডক্টরকে মারতে খু’নীকে সাহায্য করবে, তা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না ওর। এই কেনোর জবাব জানার জন্য গত দুদিন হলো তার ওপর অমানসিক অত্যাচার চালিয়েছে সাইফ। কাজে দেয়নি। তার জবাব কেবল এটুকুই, ‘আমি কিছুই করিনি। আমি কিছুই জানিনা।’
কথাটা সাইফকে কেইসে কোনোরুপ সাহায্য করতে পারবে না। তাছাড়া সে মিথ্যা বলছে এমন হবার সম্ভবনাকেও নজরান্দাজ করতে পারেনা ও। তাই অনবরত হাত চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে সাইফ। মারতে মারতে হাপিয়ে উঠেছিলো। আপাতত কিছুটা অস্থিরতা কমে এসেছে ওর। কনস্টেবল পানির গ্লাস নিয়ে বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকার আগে একপলক লোকটার দিকে তাকালো। ওর ওমন শোচনীয় অবস্থা দেখে ঢোক গিললো একটা। তারপর সাহস সঞ্চার করে ভেতরে ঢুকলো। পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো পাশের টুলে বসে থাকা সাইফের দিকে। সাইফ হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিলো। তারপর একঢোকে শেষ করলো ওটা৷ পানির স্বাদ যেনো ভয়ানক বিদঘুটে। এমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে হাতের পিঠে মুখ মুছলো সাইফ। উঠে দাড়িয়ে গ্লাসটা কনস্টেবলকে ধরিয়ে দিলো। হাতের পাইপটা দিয়ে একদফায় লোকটাকে ঘা লাগিয়ে, ওর মুখ বরাবর গিয়ে বসে বললো,
– এখনো সময় আছে মিস্টার তারেক। সত্যিটা বলে দিন। দেশের এতো মেধাবী একটা মুখকে আমি এমন অবস্থায় মানতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে আপনার ওপর লাঠিচার্জ করতে।
তারেক টুইটুম্বর হয়ে ফুলে থাকা চোখজোড়া মেলার চেষ্টা করলো। ঠোট, চোয়ালে লোহার পাইপের বারি খেয়ে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ব্যথায় মুখ নড়াতে না পারলেও কোনোমতে জিহ্বা নাড়িয়ে বললো,
– আ্ আমি সত্যিই হসপিটালের ক্যাম হ্যাক করিনি ইন্সপেক্টর। আমার ইউআরএল ব্যবহার করে কেউ ফাসাচ্ছে আমাকে।
– কিন্তু সেক্ষেত্রে তো আপনার ইউআরএল পাসকোড অন্যকারো জানা প্রয়োজন।
…
– বলুন মিস্টার তারেক। আপনি তো বর্ডার ওভারভিউয়ে চাকরিরত। আর বর্ডারের স্যাটেলাইট ইনফো শেয়ার করার অনুমতি নেই আপনার। এরপরও নিজের পাসকোড দিয়েছেন কাউকে?
তারেক জবাব দিলোনা। সাইফ শান্তশিষ্ট চাওনিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বললো,
– আপনার পারসোনাল ল্যাপটপ চেইক করে তেমন কিছু পাইনি। তারমানে এটা মনে করবেন না আমি এখানেই থেমে যাবো। আপনি ঠিক কি লুকোচ্ছেন, সেটা আপনার পেট থেকে টেনে বের না করা অবদি আপনাকে ছাড়ছি না আমি।
তারেক ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে শারীরিক যন্ত্রনায় কাতড়ালো। অনেকরকমের লোভ, আশা, ভয় দেখানো হয়েছে ওকে। তারপরও এখনো অবদি সেই এককথাই বলছে ও। আর তেমনটাই বলবে। কারন ও জানে, ওর মুখ দিয়ে একটু এদিকওদিক বের হওয়া মানেই মৃত্যু। সাইফ চুপচাপ পরখ করলো ওকে। তারেকের মুখখানা আর জবাবের ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছেনা মিথ্যে বলছে সে। তবে কিছু অবশ্যই লুকোচ্ছে। ইউআরএল পেয়ে যতোটা না আশাবাদী হয়েছিলো, সবটাই আবারো ফিকে হয়ে গেলো ওর। আবারো কোনো এক অদৃশ্য পর্দা ঢাকা দিলো পুরো কেইসটা। সাইফ আবারো কিছু বলতে যাবে, লকাপের বাইরে থেকে এক কনস্টেবল জোরালো ডাক লাগালো ওকে। পাইপটা সশব্দে ছুড়ে ফেলে লকাপ থেকে বেরোলো ও। ডেস্ক থেকে টিস্যু নিয়ে টেবিলে বসে বললো,
– কিছু পেয়েছো?
কনস্টেবল চকচকে চোখে বললো,
– জ্বী স্যার!
সাইফের দৃষ্টিও প্রসারিত হলো। কনস্টেবল একটা খাম এগিয়ে দিলে ওর দিকে। খামটা হাতে নিয়ে খুললো সাইফ। তিনচারটে ছবি সেখানে। করিডোরের মোড়টায় কালো হুডি পরিহিত এক অবয়ব। উল্টোপাশ হয়ে দাড়ানো বলে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এমনকি তার হাতেও কালো মোজা। কনস্টেবল বললো,
– এটা হসপিটালের দক্ষিণমুখী সিসিক্যামের ছবি স্যার। হিডেন। অথোরিটি ছাড়া আর কেউ জানতো না এ বিষয়ে। আর এই ফুটেজটার…
– হি ইজ দ্যা ওয়ান।
সাইফ পূর্ণবিশ্বাসের সাথে বললো। কনস্টেবল কিছু বললো না আর। হাতের তিনটা ছবি ঠিকঠাকমতো দেখে নিয়ে একটা ছবিতে চোখ আটকালো সাইফ। সে ছবিটায় অবয়বের হাতে একটা চেইনের মতো কিছু দেখা যায়। ছবি উচু করে সামনে তুলে ধরলো সাইফ। সন্দিহান চোখে চেইনের দিকে তাকালো। ওটার পেন্ডেন্টটায় থাকা লেখাটা পড়ে অস্ফুটস্বরে বললো,
– য়্যুমু?
•
ম্যাসাচুসেটসের আকাশে সাদামেঘের পেঁজোর মাঝেমাঝে আজ উজ্জল রোদ খেলা করছে। তবে ব্যস্ততা ফেলে সে রোদ্রমেঘের খুনশুটি দেখার সময় নেই কারোর। চার্লসের একপাড়ে পাথরবাধানো পথ। তার পাশের উদ্যানে গজানো কালচে সবুজ ঘাসগুলো বেশ বড়বড়। পুরো মাঠটার ঘাসের মাঝে সাদা ডেইজি ফুলের সমাগম। আর সে ঘাসের মধ্যে শুয়ে একজোড়া ঝলমলে চোখের অধিকারীনি আকাশ দেখছে। তার ফর্সা গালটা মেঘের কোলে লুকোচুরি করা রোদের উত্তাপেই লাল হয়ে গেছে। কোকড়ানো খোলা চুল ঘাসের মাঝে বিছানো। হাত উপরে তুলে সে একবার রোদ ঢাকছে, তো আবার হাত সরিয়ে চোখেমুখে রোদ মাখছে। আঙুল ছড়িয়ে মেয়েটা রোদ চোখে লালাগো আরো একবার। উজ্জলতায় চোখ বন্ধ করে নিয়ে হেসে মুখ ফিরিয়ে নিলো আকাশ থেকে। পাশে তাকিয়ে আরেকজোড়া দৃষ্টি দেখেনিজের চেহারার উচ্ছ্বাস কমিয়ে আনলো সে। ভ্রু কিঞ্চিত কুচকে, ইংরেজিতে বললো,
– ওভাবে কি দেখছো? কোনোভাবে আমার প্রেমে পরে যাওনি তো ইয়াকীন?
ধ্যান ভাঙ্গে শারাফের। বাহাত মাথার নিচে দিয়ে কাৎ হয়ে শুয়ে বললো,
– তোমার কি মনে হয়?
– যে ছেলে সবার মন বোঝে, আমারটা বোঝে না?
– যে ছেলে সবার মন গোছাতে জানে, তার মন গোছানো এতো সোজা না। জানা উচিত তোমার।
মেয়েটা আড়চোখে তাকালো। শারাফ বললো,
– আচ্ছা? এইযে আমি এখানে আছি, তুমি এখানে আছো। আমরা নিয়মিত দেখা করছি। কোনোদিন আমি চলে গেলে, বা তুমি চলে গেলে, এভাবে দেখা হবে না আমাদের। কখনো এমন দেখা না হলে, মিস করবে আমাকে?
– আমি তো কোথাও যাচ্ছি না। তুমি বিডিতে যাচ্ছো?
– হয়তো এটাকেই বলে সঙ্গগুন। আমার সাথে ওঠাবসা করতে করতে তুমিও মন বোঝা শিখে যাচ্ছো। সত্যিই বিডিতে যাচ্ছি।
অবাকচোখে তাকালো মেয়েটা। বললো,
– পিএইচডির জন্য সবেই তো আসলে। এখনই হঠাৎ ফিরবে কেনো?
– বড় ভাইয়ার বিয়ে। মাসখানেকের জন্য যাচ্ছি। ইটস্ মাস্ট! ইউনো..
শারাফের জবাবে চোখমুখে অন্ধকার নেমে আসলো ওর। ও হয়তো ভেবেছিলো শারাফ মজা করে বিডিতে ফেরার কথা বলেছে। কিন্তু ভাইয়ের বিয়ে কথাটা তো মজার বিষয় না। শারাফ উকি দিয়ে তাকালো ওর দিকে। বললো,
– কিন্তু তুমি কোথাও যাচ্ছো না কেনো বলোতো? আন্টি কি নরওয়েতে আজীবন একাকী থাকবে?
– মম আমাকে কাছে রাখার জন্য বড় করেনি ইয়াকীন। বরং চেয়েছে আমি ইচ্ছামতো নিজের লাইফ লিড করি। আমার শখ ইচ্ছাপুরণে নিজের সব বিলিয়ে দিয়েছে সে। মাতৃত্বের স্বাদ ছেড়েছে আমার পনেরো বছর বয়সে। পনেরোর পর তারসাথে পনেরো ঘন্টাও কাটানো হয়নি আর।
মন উদাস হয়ে গেলো শারাফের। ওকে ওমন দেখে মেয়েটাই হেসে দিলো এবারে। আবারো হাত আকাশের দিক তুলে ছায়া আর রোদের খেলায় মত্ত্ব হয়ে বললো,
– এখন আবার বলো না যে, আমি না ফিরলে ড্যাড তার দ্বিতীয় স্ত্রী আর বাচ্চাসমেত একাকী থাকবে কিনা! তার ক্ষণিকের আবেগ হিসেবে আমার জন্ম। তাই আমার উপস্থিতি অনুপস্থিতি, ডাজেন্ট ম্যাটার। বেশ আছে সে। তাছাড়া আমিও আমার ছুটতে থাকা মন নিয়ে বেশ আছি। যতোদিন না এই মন কোথাও আটকাচ্ছে, ততোদিন আমিও কোথাও আটকাবো না।
– আমি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি তোমাকে?
কথাটা শুনে মেয়েটা কেবল ভ্রু কুচকালো। শারাফ ওর হাত নামিয়ে দিয়ে নিজের ডানহাত মুঠো করে আকাশের দিক ধরে বললো,
– এবার তাকাও। রোদ লাগবে না।
ওর কথা তাকাতে গিয়েও রোদের তীব্রতায় চোখ সরিয়ে নিলো মেয়েটা। শারাফের মুঠো করা হাতের ছায়া রোদ থামাতে যথেষ্ট ছিলো না। মেয়েটা পাশে তাকিয়ে বললো,
– মুঠো খুলে তো রাখো! তাহলে না রোদ আটকাবে?
শারাফ আবারো ওকে আকাশে তাকানোর জন্য ইশারা করলো। দ্বিতীয়বারের মতো আকাশে তাকাতে যাচ্ছিলো মেয়েটা। ঠিক তখনই মুঠো করা হাত খুলে ফেলে শারাফ। ওর হাত থেকে কিছু একটা পরতে দেখেই মেয়েটা চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। পরমুহুর্তে আস্তেধীরে চোখ খুলে দেখে ওর মুখ বরাবর একটা চেইন ঝুলছে। শারাফের আঙুলে বাঝানো ওটা। মেয়েটা শারাফের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এটা কার?
– যার নাম লেখা, তার!
খুশিমনে উঠে বসলো সে। শারাফও বসে চেইনটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে নেওয়ার জন্য ইশারা করলো। কিন্তু মেয়েটা বললো,
– একজন পরিয়ে দিলে তবে নেবো।
– কে?
– যে কিনেছে, সে!
মৃদ্যু হেসে চেইনের লক খুললো শারাফ৷ মেয়েটা উল্টোপাশ হয়ে বসে ঘাড়ের চুলগুলো উচিয়ে ধরলো। শারাফ চেইনটা পরিয়ে দিলে ওকে। আড়চোখে শারাফের দিকে তাকালো মেয়েটা৷ পরে গলায় থাকা পেন্ডেন্ট ছুয়ে দিলো আলতো করে। সরু চেইনের মাঝ বরাবর ছোট্ট করে দ্বিগুন পুরুত্ব আর বাকা হরফে লেখা, ‘YUMU’
•
শারাফ চোখ মেলে শক্তহাতে রেলিং আকড়ে ধরলো। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনের বারান্দায় দাড়িয়ে নিচদিক তাকিয়ে ও। সর্বপূর্ব কোনের দেয়ালগুলো ঘেষে সকালের রোদ নিচের রাস্তায় পরেছে। আর রাস্তায় তখন স্নিগ্ধতা আর অনু দাড়িয়ে কথা বলছে। অনু ছায়া দাড়ানো, হাতে দুতিনটে বই। আর স্নিগ্ধতার কোলে মোড়ানো লম্বা কাগজ, আরেকহাতে ছোটখাটো একটা ক্যানভাস। তবে ওর গায়ে রোদ পরছে। পরনের হালকা সবুজ রঙের জামাটার দু এক জায়গায় থাকা ছোট্ট আয়নাগুলোতে রোদ প্রতিফলিত হচ্ছে। সে ঝলসানো রশ্মির বিচ্ছুরণ যেনো স্নিগ্ধতার চারপাশকে আরোবেশি আলোয় ভরিয়ে তুলছে। স্নিগ্ধতা কথা বলতে বলতে একহাত তুলে চোখে পরা রোদ আটকালো। কিন্তু তার দুদন্ড পরই থেমে গেলো রোদ। নিজের শরীরের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। পুরো শরীরে রোদ লেগেছে, কেবল ওর মুখচোখ ব্যতিত। ঘাড় ঘুড়িয়ে সূর্য বরাবর তাকালো ও। ঠিক সে মুহুর্তেই সরে দাড়ালো শারাফ। স্নিগ্ধতা রোদের জন্য চোখ দ্রুততার সাথে বন্ধ করে নিলো। পরে নিজহাতে রোদ আড়াল করে, চোখ খুলে দেখে দ্বিতীয়তলার কোনাটায় দাড়িয়ে শারাফ। পরনে মেরুন রঙের একটা শার্ট। শারাফ আবারো রোদ আটকে দাড়ালো। প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে ম্যাসেজ লিখলো,
‘তোমাকে বিব্রত করতে আসা রোদকে গর্বের সাথে বলে দাও, তার আর তোমার মাঝে আপাতত আমি আছি। সো এ মুহুর্তে ওর উদ্দেশ্যসাধন সম্ভব না।’
ম্যাসেজটোন শুনে ক্যানভাসটা অনুর হাতে দিয়ে ফোন চেইক করলো স্নিগ্ধতা। হেসে ফেললো ওটা পড়ে। তারপর জবাবে লিখলো,
‘তোমাকে গর্বের সাথে জানাচ্ছি যে, আপাতত তোমার আর আমার মাঝে আমার ক্লাস আছে।’
উপরে তাকিয়ে ফোনটা ব্যাগে রাখলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু সেখানে নেই শারাফ। আশপাশ খুজতেই দেখে শারাফ নিচে নেমে এসেছে। এগিয়ে গিয়ে অনুর দিকে তাকাতেই অনু হাটা লাগালো। স্নিগ্ধতা বললো,
– আগেরদিন ভাইয়া অনেকরাতে ফিরেছিলো। তোমাদের সাথে দেখা করতে না পেরে অনেক আফসোস করেছে।
– ক্লাস শেষ কখন তোমার?
– দেরি হবে। দুটো নাগাদ।
শারাফ জবাব দিলোনা। ওকে চুপ দেখে স্নিগ্ধতা কিছুটা দমে গেলো। নিভুপ্রায় স্বরে বললো,
– কেনো বলোতো? কোনো সমস্যা হয়েছে?
– শো এর জন্য কিছুদিনের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে হচ্ছে। দুটোয় গাড়ি।
চোখ ছলছল করে উঠলো স্নিগ্ধতার। শারাফ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো নিজের।এদিকওদিক তাকিয়ে নিজেকে সংবরনের চেষ্টা করলো। স্নিগ্ধতার দিক ফিরে দেখে চোখ লাল হয়ে আছে ওরও। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই স্নিগ্ধতা নিজের গলার চেইনটা হাতে ধরলো। ঠোঁটে জোরালো হাসি রেখে বললো,
– সাবধানে এসো।
শারাফ ওর গালের দিকে হাত বাড়িয়েছিলো। ঠিক তখনই ফোনে ম্যাসেজ আসে স্নিগ্ধতার। ফোনের দিকে তাকায় দুজনেই। স্ক্রিনে অনুর ম্যাসেজ। ‘ম্যাম ক্লাসে ঢুকেছেন।’ স্নিগ্ধতা শারাফকে কথা বাড়ানোর সুযোগ দিলোনা। গলায় দলা পাকিয়ে আসা নিজের কথাগুলোও প্রকাশ করলো না। জলভরা চোখে ‘দ্রুত ফিরো শারাফ। অপেক্ষায় থাকবো।’ কথাটা বলে দিলো স্নিগ্ধতা। তারপর গলায় থাকা পেন্ডেন্টটা শক্তকরে ধরে ক্লাসের দিকে পা বাড়ালো। ওর শেষ কথাটা রীতিমতো ধারালো অস্ত্রের মতো ভেতরটায় আঘাত হানলো শারাফের। দুহাত মুঠো করে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে স্নিগ্ধতার চলে যাওয়া দেখলো ও। সময়ের সাথে কেমন দুরুত্ব বাড়ছে দুজনার মধ্যে। আর এই দুরুত্বেই যেনো ওদের গল্পের সব ভয়াবহতা নিহিত। এই সাময়িক দুরে যাওয়াই যেনো অনেককিছুর মুখোমুখি করতে চলেছে ওকে, স্নিগ্ধতাকে, প্রত্যেককে!
#চলবে…

