নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৫২.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৫২.

সন্ধ্যে ছ’টা৷ সমুদ্রের কোলে সূর্যাস্ত দেখতে কক্সবাজারের তীরজুড়ে মানুষের ভীড়৷ লাবনী পয়েন্টে উপস্থিত প্রত্যেকের চোখেমুখে আগ্রহ, উদ্দীপনা আর মুগ্ধতা। আর তাদের মাঝে চোখে না পরার মতো এক উদ্ভ্রান্ত মানুষ। তার গাঢ় নীল শার্টের গলার দিকের তিনটে বোতাম খোলা। ভাজ দেওয়া বড়হাতা। জিন্স গিরার খানিকটা ওপর অবদি গুটানো। এলোমেলো পায়ে সমুদ্রের দিকে এগোলো মানব। জলভরা আবছা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ডুবতে চলা সূর্যের দিকে। সূ্র্য ক্রমশ জলের অতলে হারাতে নিচে নামছে। আর তার সাথে যেনো আশপাশের ব্যস্ততা আরো বেড়ে যাচ্ছে। দৃষ্টিসীমা জুড়ে কেবল জল আর জল। দুরের জেলেনৌকা আর নীড়ে ফেরা পাখিগুলোর কেবল অবয়ব দেখা যায়। সেসব ছেড়ে যুবক তার মুঠোফোনের দিকে তাকালো। সেখানে আরেক অবয়বের ছুটে চলার ভিডিও। আবছা আলোতেও বোঝা যায় তার কোকড়ানো চুল, লং কামিজ আর জিন্স। নরওয়েজীয় ভাষার কোনো এক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে নিজের সাথে সুর্যাস্তের ভিডিও করেছে সে উৎফুল্ল রমনী। ছুটতে ছুটতে সেলফি স্টিকের ডগার ফোনে পুরো জায়গাটার দৃশ্য আটকেছে ওই সাতমিনিটের ভিডিওতে। যুবক নিজেও গুনগুনিয়ে সে গানটা গাইতে লাগলো। চোখ থেকে জল গরালো তার। চোখ বন্ধ রেখে মাথা নিচু করে চুপ রইলো সে। সুর্যের আলো চোখে লাগছে। কাধে স্পর্শ অনুভব করে পাশে তাকায় ছেলেটা। জ্যাকেট পরিহিত ওপর মানুষটি খুব শান্তভাবে বললো,

– পুরোটা না জানলেও, কিছুটার খোজ লাগাতে পেরেছি শারাফ।

শারাফ ঢোক গিলে গলা ভিজালো। ওর ভেজা চোখ দেখে উপস্থিত লোকটার ভেতরটাও বোধহয় হাহাকার করে উঠলো। সে বললো,

– দুদিন যাবত এই অদৃশ্য ছায়ার পেছনে পাগলের মতো ছুটছো। তোমার…

– দুদিন না রওনক ভাই। তিনবছর।

রওনক আরো অসহায় হয়ে পরলো যেনো। তারপরও নিজেকে সামলালো। শারাফের সামনে একটা ফাইলের মতো কিছু একটা তুলে ধরে বললো,

– নিজেকে সামলাও শারাফ। তিনবছর আগের অতীতকে নিয়ে নিজের বর্তমান আর ভবিষ্যতটাকে শেষ করে দিও না। য়্যুমু তোমার জীবনের মাত্র চারমাস জুড়ে ছিলো। পুরো জীবন পরে আছে তোমার সামনে। স্নিগ্ধতাকে নিয়ে সে জীবনটাকে সাজিয়ে নাও। অনেক সুন্দর একটা ভবিষ্যত ডিসার্ভ করো তুমি।

– সবটা সুন্দর হওয়ার হলে ভাগ্য এতো নিষ্ঠুর হতোনা।

– আবারো বলছি শারাফ। অতীত আকড়ে থেকোনা। এখানে থেকে নিজেকে শুধুশুধ কষ্ট দিওনা আর। এজ সুন এজ পসিবল ঢাকায় ফিরে যাও।

– ফিরবো ভাই। আজই ফিরবো।

রওনক দুবার ওর কাধ চাপড়ে চলে গেলো ওখান থেকে। শারাফ ফাইলটা হাতে নিয়ে সেটার ওপর পাতায় হাত বুলালো। মোটামুটি অন্ধকার নেমেছে চারপাশে। তবে কভারের হাসোজ্জল মুখের ছোট্ট ছবিটা দেখতে সমস্যা হচ্ছে না কোনো। ছবিটা দেখে শারাফের মনে প্রশান্তি অনুভব হলো হয়তোবা। কিন্তু ছবি থেকে হাত সরিয়ে নিতেই ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে লাগলো ওর। কভারের নিচে ইটালিক হরফে লেখা, ‘Death Certificate Of Yumu.(A Norwegian Tourist)’ – (য়্যুমু নামক এক নরওয়েজিয়ান পর্যটকের মৃত্যুসনদ)
ফোন বেজে ওঠে শারাফের। ফোন তুলে সেদিকে তাকালো ও। এ চারদিনে মা ব্যতিত প্রত্যেকের ফোনকল উপেক্ষা করলেও এই কল উপেক্ষার ক্ষমতা হলোনা। কল রিসিভ করে শারাফ কানে ধরলো ফোনটা। কল রিসিভ হতে দেখে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে শ্বাস ফেললো স্নিগ্ধতা। চোখ বন্ধ করে বড়বড় স্বস্তির শ্বাস নিতে লাগলো প্রাণভরে। দুটোদিন কোনোরুপ যোগাযোগ নেই মানুষটার সাথে। তবুও আজকে কল রিসিভ করে নিরব শারাফ। চোখের কোনা বেয়ে জল গরালো স্নিগ্ধতার। চোখ মেলে, মুখ দিয়ে শ্বাস ফেলে বললো,

– কেমন আছো শারাফ?

– তোমার থেকে দুরে।

দুজনের নিরবতায় কয়েকমুহুর্ত কেটে গেলো। আর কিছু বললো না কেউই। ফোনের ওপারের সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেলো স্নিগ্ধতা। ভেতরটা তৎক্ষনাৎ ধ্বক করে উঠলো ওর। শারাফ শান্তিশিষ্ট স্বরে বললো,

– এ যন্ত্রনাকে আমি আর দীর্ঘ হতে দেবো না স্নিগ্ধতা। সব বিষাক্ততার ইতি টানবো। চিরতরে। দ্রুতই ফিরছি তোমার কাছে। রাখছি।

শারাফ কল কাটলো। নিস্তব্ধ হয়ে ফোন বুকে আকড়ে ধরলো স্নিগ্ধতা। কি করতে চলেছে শারাফ? সত্যিই কি তা যন্ত্রণার শেষ? বিষাক্ততার ইতি? নাকি নিকষতার শুরু? চোখ দিয়ে জল গরাতেই যাচ্ছিলো স্নিগ্ধতার। ঠিক সে সময়েই কানে এলো,

– টুকি?

ভাইয়ের অকস্মাক এমন ডাক শুনে স্নিগ্ধতা চমকালো। অগ্নিলাও বাসায়ই। এসময় এভাবে ডাক লাগানোর কথা নয় সাইফের। চোখমুখ মুছে, মেঝে থেকে উঠে সোজা সাইফের ঘরে ছুট লাগাতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু তার আগেই সাইফ ওর ঘরে চলে আসে। হাতে ফোন নিয়ে ও দ্রুত এগিয়ে আসলো স্নিগ্ধতার দিকে। বললো,

– তোকে এই মুহুর্তে একটা স্কেচ করতে হবে।

স্নিগ্ধতা সাইফের পেছনে রুমের দরজায় তাকালো। সেখান থেকে কোনো এক ছায়াময়ীকে ছুটে বেরিয়ে গেলো যেনো। সাইফ তাড়া দেখিয়ে বললো,

– ফাস্ট টুকি! ফাস্ট!

দ্রততার সাথে ক্যানভাসের সামনে বসে যায় স্নিগ্ধতা। ফোন লাউডস্পিকারে দিয়ে ওর পাশে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলো সাইফ। ওপাশ থেকে একের পর এক বর্ননা বলে চলেছে সে, আর পেন্সিল দিয়ে ক্যানভাসে হাত চালাচ্ছে স্নিগ্ধতা। বর্ণণা অনুযায়ী আঁকতে আঁকতে ছবিটার কপাল-চোখ আকতে গিয়ে হাত থেমে আসলো স্নিগ্ধতার। আস্তেধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ভাইয়ের দিকে। বললো,

– কলে কে ভাইয়া? কার স্কেচ করছি আমি?

– ডক্টর নাজমুলকে অত্যাচারের পর তাকে যে ভ্যানওয়ালার ভ্যানে করে পাঠানো হয়, সে ভ্যানওয়ালা। খু*নির চেহারা দেখেছে ও।

কথাগুলো শুনেই হাত থেকে পেন্সিল পরে যায় স্নিগ্ধতার। সাইফ হুশে ফেরে। ুত্তেজনায় ও ভুলে গিয়েছিলো যে খু*ন শব্দটাও ওর বোন নিতে পারে না। কথা ঘোরানোর জন্য তড়িঘড়ি করে বললো,

– ট্ টুকি? তুই আমি যা বলেছি ভুলে যা। তুই শুধু স্কেচটা…

কথা শেষ হয়নি সাইফের। জ্ঞান হারিয়ে উচু টুলটা থেকে মেঝেতে পরে গেলো স্নিগ্ধতা। ফোনের ওপাশ থেকে ভ্যানওয়ালা হ্যালো হ্যালো করছে। সাইফ সেকেন্ডদুইয়ের জন্য কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে থেকে হাটুগেরে বসে পরলো মেঝেতে। বোনকে দুহাতে আগলে নিয়ে ডাকতে শুরু করলো। এরমাঝেই কানে এলো, ফোনের ওপার থেকে লাউডস্পিকারে ভেসে আসছে,

‘স্যার? আমি ত আপনারে সাহায্য করবার লাগি ফোন দিলাম। আমারে বাচাইয়া নিয়েন। এতোগুলা দিন ঘরে বউবাচ্চার কাছে ফিরিনাই। শুনতাছেন স্যার..? স্যার?’

ঝড় পরবর্তী প্রকৃতির মতো হুট করে শূনশান হয়ে গেলো সবটা। ফোন কেটে গেছে। মাথার চুল উল্টে ধরে বোনের দিকে তাকালো সাইফ। কয়েকমুহুর্ত সময় নিয়ে আস্তেকরে বললো, ‘টুকি চোখ খোল।’

সুইচ দিতেই ঘরটায় হলুদ নিয়ন বাতি জ্বলে উঠলো। সে সাথে চমকে উঠলো অগ্নিলাও। চোখ ঘুরিয়ে পুরো ঘরটা দেখে নিলো সন্দিহান দৃষ্টিতে। এ ঘরে আগেও অনেকবার এসেছে অগ্নিলা। তবে আজ প্রথমবার একাকী ঢুকেছে। হলুদ লাইটে অগ্নিলার অনুভব হলো, ঘরজুড়ে ছয় ছয়টি খু’নের আসামীর ঘ্রাণ। সেই কাঠের তাক, সেগুলোতে আটকে রাখা মৃত-জীবিতর ছবি, পেপারকাটিং, একেক তাকে অতিযত্নে সাজিয়ে রাখা মানুষ মা’রার হাতিয়ার। সূচ থেকে শুরু করে, নেইলকাটার, সবরকমের ছু’ড়ি চা’কু, এসিড, ইস্ত্রি, ইলেকট্রিক শক সিস্টেম, ওয়াটার হিটার, ব্লেন্ডার, রক্ত লেগে থাকা পাথর। মোটকথা কারো ওপর অত্যাচারের সর্বোচ্চ সীমা পার করে দেওয়ার সবরকমের উপকরন। ভয়ানক মৃ*ত্যুখেলার চিহ্ন। তবে সেসবে না, অগ্নিলার আগ্রহ তার শুরুতে। ও আগেই অনুমান করেছিলো, এ মৃত্যুখেলার কারণ আদর্শ না, উদ্দেশ্য। এবার শুধু সত্যিটা জানা চাই ওর। তাই সুযোগ বুঝে, সবার চোখের আড়ালে চুপিসারে চলে এসেছে আজ।

রুমে ঢুকে আগে সেই YS খোদাই করা কাঠের গোলাকার ওয়ালপিসের দিকে এগোলো অগ্নিলা। কয়েকদন্ড তাকিয়ে থেকে সারকথা বোঝার চেষ্টা করলো ওটার। লাভ হয়নি। সে বর্ণদুটো যেনো পণ করেছে ওর কাছে ধরা দেবেনা। অগ্নিলা চোখ বন্ধ করে নিজেকে শক্ত করে নিলো। এমন সুযোগ প্রতিদিন পাবে না ও। দ্রুততার সাথে পুরো ঘরটা ছেঁকে সত্যি খুজতে নেমে পরলো এবারে। ধারালো বস্তুগুলোর আড়ালে খুজতে লাগলো তাদের আদিকথা। হঠাৎই একটা কাঠের শেলফে হাত পরে অগ্নিলার। ফাপা কাঠটা খট আওয়াজ করে ওঠে। তারসাথে মস্তিষ্কেও খট শব্দ হয় ওর। এই তাকটা বাকিগুলোর মতো নিরেট কাঠের না। এটার ভেতরটা ফাপা। অগ্নিলা উবু হয়ে নিচদিকে তাকালো। সত্যিই তাই। চারকোনা ফ্রেম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, নিচদিকে খোলা যায় তাকটার!

অগ্নিলার বুকের ভেতরটায় যেনে হাতুরি পেটাতে শুরু করেছে। আস্তেধীরে বসে গেলো ও। পাশে তাকালো একবার। টেবিলে রাখা গ্লাসে স্বচ্ছ ডিস্টিল ওয়াটার চকচক করছে। কেমিক্যালের টেস্টটিউব ধুয়ে রাখতে ব্যবহার হওয়া সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ পানিটা। একহাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে শেষ করলো পুরোটা। ভয়ভয় নিয়ে ডানেবামে টান লাগালো তাকের নিচটা। একটু জোরে ডানদিক ধাক্কা লাগাতেই সজোরে কিছু একটা মেঝেতে পরে যায়। হুড়মুড়িয়ে সরে যায় অগ্নিলা। ওর দরদর করে ঘাম বইতে শুরু করেছে। মেঝেতে পরে থাকা ডায়েরিটা দেখে কন্ঠনালী আবারো শুকিয়ে উঠলো ওর। ভেতরটা বলছে, এখানে, এই ডায়রীতেই এ উপন্যাসের শুরু। বারবার জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে আশপাশ দেখে নিলো ও।

না! কেউ নেই! কারো থাকার কথাও না! নিজের কাজে বেরিয়েছে দ্বিতীয়জন। অগ্নিলার বুদ্ধিমত্তা জানান দিলো, এই ডায়রীটাই সে রহস্যের পাতালপুরী। সম্মুখে ছিলো, এরপরও সেটা খুজে পায়নি ও। এতোটাই মোহাবিষ্ট হয়ে ছিলো যে, একজনের কথায় নিজের আন্দাজের কথাও ভুলে ছিলো। বদ্ধ ধারণায় ছিলো, এসব খু*ন নেহাতই তাদের পাপের ফল। কারো উদ্দেশ্য না।
দম নিলো অগ্নিলা। আর নিজের মতো ভাববে না ও। এখান থেকেই সব জবাব কুড়োবে। ডায়রীটা নিয়ে পাশের চেয়ারে বসে পরলো ও। মোটা কাগজের পুরোনো ডায়রীর কভারে ইংরেজিতে লেখা ‘আমি হ্যামলেটের অফেলিয়া হবোনা।’ সাথে এক ষোড়শীর ছবি। পিঠে কোকড়ানো চুল, হাতাকাটা ফ্রক। ছবিটা পুরোনো বলে মনে হলেও, নজরকাড়া ছিলো মেয়েটার উজ্জ্বল চোখজোড়া। অগ্নিলা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওই চোখজোড়ার দিকে। নিচে একটা তারিখসমেত কয়েকলাইন লেখা ছিলো। তবে তা পড়তে পারলো না অগ্নিলা। কেবল ইংরেজিতে লেখা নামটা পরলো। ‘য়্যুমু’

কৌতুহল অগ্নিলার শিরদাড়ায় উষ্ণস্রোত তৈরী করেছে যেনো। অজ্ঞাত ভাষার লেখা, সাথে ইউএস, নরওয়ে, ইস্তাম্বুল, সুইজসহ আরো কয়েক দেশের ভ্রমণের ছবি। কেবল তারিখগুলো পড়তে পারছিলো অগ্নিলা। খুববেশি সময় ওর হাতে নেই। তাই ডায়রীর পাতা উল্টিয়ে যাচ্ছিলো কিছু তৎক্ষনাৎ খুজে পাবার উদ্দেশ্যে। দেখতে দেখতেই হঠাৎ হাভার্ডের দুটো ছবি সামনে চলে আসে ওর। দৃষ্টি প্রসারিত হলো অগ্নিলার। স্বাভাবিকভাবেই, সেখানকার লেখাগুলোও ও পড়তে পারলো না। কিন্তু আরো একবার পাতা উল্টাতেই ওর পুরো শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। এক যুবকের সাদাকালো ছবি। ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল আর শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে কপাল ধরার ভঙ্গিমায় বসে সে নিচদিক তাকিয়ে হাসছে। ছবিটার নিচে জেলপেন দিয়ে বাংলায় লেখা, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি ইয়াকীন’

অগ্নিলার চোখ ভরে উঠলো। আপনাআপনিই কপালে হাত চলে গেছে। সবকিছু এলোমেলো লাগছে। সবকিছু যেনো আবছা লাগছে৷ কে এই য়্যুমু? শারাফকে ভালোবাসি কেনো লিখেছে? ম্যাসাচুসেটসে থাকতে শারাফ কি ওর সাথে কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছিলো? নাকি অন্যকিছু? অগ্নিলা দ্রুত পাতা উল্টায়৷ ডায়রিতে আর বাংলার অস্তিত্ব নেই। সব অন্য ভাষায় লেখা। মোবাইলে ট্রান্সলেশনের সময় ওর হাতে নেই। ডায়রীর বাকি পাতাগুলো দেখে নিতে আবারো পাতা উল্টাতে যাবে, কেউ অকস্মাৎ হাত ধরে ফেলে অগ্নিলার। আর তখনতখনই ওর হাত থেকে শব্দ করে পরে যায় ডায়রীটা। কম্পমান দেহটা নড়চড়ের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে যেনো। তারপরও ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায় অগ্নিলা। পাশের ব্যক্তিটি ওর একহাত ধরে রেখে, উবু হয়ে আরেকহাতে ডায়রীটা তুললো। অগ্নিলা বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে। সে একহাতে ডায়রী নেড়ে ময়লা সরালো। তারপর অগ্নিলার দিক তাকিয়ে অতি শান্তভাবে বললো,

– মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর? তুমি আন্দাজ করোনি এটা আমার দুর্বলতা? তারপরও এটাতে হাত দিলে কেনো?

– জবাব দাও নীলাম্যাডাম। চুপ থেকোনা। এ ডায়েরী আমার হাতে থাকা মানে আমার অন্যরুপ। আশা করি বুঝতে পারছো?

– তারআগে তুমি জবাব দাও।

– যদি না বলি?

– দোহাই লাগে তোমার! সত্যি বলো প্লিজ! এই দুর্বিষহ জীবন আমি আর নিতে পারছি না। সাইফের ওমন উদ্ভ্রান্ত রুপ আমি আর মানতে পারছি না। আমার কষ্ট হয় ওকে ওভাবে দেখলে। সহ্য করতে পারিনা।

– আর তার উদ্ভান্তির জন্য যা আমি সয়েছি? সেটা? তার মূল্যায়ন কে দেবে নীলাম্যাডাম?

– ম্ মানে? ক্ কিসের কথা বলছো তুমি?

– সত্যি বলো প্লিজ! আ্ আমরা যাদেরকে মেরেছি, কোনো আদর্শ পালনে খু*ন হয়নি ওরা। তাইনা? মেয়েদের হ্যারাজ করেছে, তার শাস্তিস্বরুপ খু*ন হয়নি কেউ। বরং আমাকে ব্যবহার করে তুমি যে ছয় ছয়টা খু*ন করেছো, তা শুধুমাত্র নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাইনা? তাইনা?

অগ্নিলার হাত ছেড়ে দিয়ে টেবিলে উঠে বসলো সে। টু শব্দটাও বেরোলো না অগ্নিলার মুখ দিয়ে। ওর ভয়ার্ত চাওনি বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। সামনের মানুষটাকে পুরোপুরিভাবে অচেনা লাগছে ওর। আর সে স্বাভাবিক আওয়াজে বললো,

– পুলিশের নেক্সটস্টেপ, হিডেন ক্যামেরার ছবি, ভ্যানওয়ালার লোকেশন, এমন ছোটছোট খবর ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে নিতে, তাকে এনগেইজড রাখতে তোমাকে আমার উদ্দেশ্যের ছায়াতলে আনতে হতো ম্যাডাম। সেখানে তোমার নারীবাদী আদর্শকে ব্যবহার করা ছাড়া কোনো উপায় নজরে আসেনি আমার। সে সবকিছু করেছি, যা করা দরকার বলে মনে হয়েছে৷ হোক তা উদ্দেশ্য বহির্ভূত খু*ন।

অগ্নিলা আকাশসম বিস্ময়ে বললো,

– এসবের বাইরেও মে*রেছো?

– যারা বাধা হিসেবে ছিলো। ভ্যানওয়ালাসমেত, পাঁচজন। তুমি সেদলে ভীড়ো না প্লিজ। আর যাই হোক, আমি তোমার বিশ্বাসঘাতকতা টলারেট করতে পারবোনা।

অগ্নিলা আরেকদফা চমকে দুপা পেছোলো। সাহস সঞ্চার করে বললো,

– কি চাও কি তুমি? ঠিক কোন উদ্দেশ্যে এতোগুলো জীবন নিয়ে খেলছো?

ওর প্রশ্ন শুনে হাতের ডায়রীটা ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখলো সে। তারপর ঘাড় কাত করে আবারো অগ্নিলার দিক তাকিয়ে বললো,

– নরওয়েজীয় পড়তে পারোনি তাইনা?

– ফাইন। আমি পড়ে শোনাচ্ছি তোমাকে। শোনো তবে আমার উদ্দেশ্য।

পেছোতে পেছোতে অন্য টেবিলে পিঠ ঠেকে গেলো অগ্নিলার। ও বেশ বুঝতে পারছে, সামনেরজন স্বাভাবিক নয়৷ য়্যুমুর জীবনকাহিনীতে সে-ও জুড়ে আছে ভয়ানকভাবে৷ আর সেটা এতোবেশি ভয়ানক যে তার প্রভাবে সে সব করতে পারে। হোক তা আত্নগোপন-আত্নপ্রকাশ, প্রেম-ঘৃণা, দ্রোহ-মিলন, মিষ্টি সম্পর্কের ভিত্তি গড়া কিংবা কারো নৃসংশ খু*ন!

বিলাসবহুল হোটেলের বিছানাভর্তি জামাকাপড়। য়্যুমু সেখানকার সব উল্টেপাল্টে দিয়ে একটা একটা বের করে করে দেখছে। কোনোটা সোফায় ছুড়ে মারছে, তো কোনোটা পাশের লাগেজের ওপর। এসবের মাঝে ফোন বেজে ওঠে ওর। না দেখেই কল রিসিভ করে কানে ধরে নরওয়েজীয় ভাষায় বললো,

– হ্যাঁ মম? আমার ব্লু স্কার্টটা দিয়েছিলে তুমি?

– ভিডিও কল করেছি য়্যুমু! কানে না ধরে সামনে ধরো ফোনটা।

ফোন সামনে ধরে য়্যুমু ব্যস্তভাবে বললো,

– এখন ভিডিও কল করার সময় মম? দেখছো কি অবস্থা করেছি রুমের? সব প্যাকিং বাদ পরে আছে আমার!

মেয়েকে নিজের আশপাশ দেখালেন ভদ্রমহিলা। হেসে বললেন,

– ডিউটিতে আছি। সত্যিই এখন কল করার সময় না। তবুও রুমের কি অবস্থা করেছো সেটা দেখতেই কল করেছি।

– হ্যাঁ। জলদিজলদি এবার হেল্প করো আমাকে। ড্রেস কোনটাকোনটা নিবো জলদি বলো!

ভদ্রমহিলা পুরো বিছানায় চোখ বুলিয়ে বললেন,

– এখানে সব তো শীতকালীন পোষাক য়্যুমু! বিডিতে তো গরম হবে।

– ব্যাপার না। আই’ল ম্যানেজ। তুমি বলো কোনটা ওখানকার জন্য প্রেফারেবল মনে হচ্ছে?

– যাকে সারপ্রাইজ করতে যাচ্ছো, তাকে জিজ্ঞেস করলেই ভালো হতো না?

দ্রুততার সাথে হাত চলছিলো য়্যুমুর। মায়ের কথায় একটু থামলো ও। ভদ্রমহিলা আবারো বললেন,

– যখন তোমার বয়স পনেরো হলো, তারপর থেকে তোমাকে কোথাও পনেরো দিনও স্থির থাকতে দেখিনি। অথচ সেই তুমি ম্যাসাচুসেটসে আছো চারমাস হলো।

– ইয়াকীনকে পছন্দ করো এটা এতোদিন বলে কেনো দাওনি?

য়্যুমু ক্ষুদ্রশ্বাস ফেললো। হাতের জামাকাপড় সরিয়ে রেখে বললো,

– সুযোগ হয়নি।

– তো এখন সুযোগ করতে বিডিতে যেতে হবে তোমাকে?

– ভাইয়ের বিয়ের জন্য দুদিন হলো ইয়াকীন নিজের দেশে গেছে। আর এ দুদিনে আমি টের পেলাম, ও আমার অভ্যসে পরিণত হয়েছে। ওকে ছাড়া থাকতে পারছি না আমি। আপাতত একারনেই বিডিতে যাচ্ছি। আর যাচ্ছিই যখন, সুযোগটা করে নেবো। চারমাসে বাংলা শিখেও কখনো বলিনি ওর সামনে, সারপ্রাইজ দেবো বলে। এবার ওর দেশে, ওর ভাষায়, ওর পছন্দের বেশে ওকে ভালোবাসি বলবো৷ কেমন হবে মম?

– য়্যুমু…

– যা হবে হবে। ওর দুইধরনের জবাবের জন্য আমি দুদিক ভেবে রেখেছি জানোতো মম! যদি ইয়াকীন আমাকে রিজেক্ট করে তবে আমি কোনোদিনও বিডিতে যাবোনা। সেক্ষেত্রে আমি ওখানকার সবজায়গা ঘুরে নেবো বলে যাচ্ছি। আর যদি ও আমাকে এক্সেপ্ট করে তাহলে তো আমি ওখানেই থেকে যাবো। সেক্ষেত্রে বর নিয়ে হানিমুনে যাবার আগে সিঙ্গেল ট্যুর দিলাম একটা। কি বলো?

ভদ্রমহিলা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। নাম, গায়ের গরন, চেহারার প্রস্ফুটন, মেয়ের সর্বাঙ্গে ওর বাবার বৈশিষ্ট্য। সে মেয়েকে দুরে দেখলে যতোনা কষ্ট পায়, কাছে থাকলে আরোবেশি অস্থির হয়ে পড়ে এজন্য। অনেক আগেই য়্যুমুকে নিজের মতো ছেড়েছে। প্রেমের টানে নিজের দেশ, বেশ, ঘর, বংশ সব ছেড়েছিলো সে নিজেও। এমনকি খ্রিস্টান থেকে মুসলমান হবার ধর্মান্তরের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলো। কিন্তু যে মানুষটার জন্য ছেড়েছিলো, একরাতের ভোগ্য পণ্য মনে করে তাকে ছুড়ে ফেলেছিলো সে লোকটা। কোনো দাম পায়নি তার ত্যাগ। মাকে চুপ থাকতে দেখে য়্যুমু মুখ খুললো। বললো,

– ওখানে আমার ধর্ম, জন্ম নিয়ে কথা হবে, এ নিয়ে টেনশন করোনা মম। শারাফ জানে, তুমি ক্রিশ্চান হলেও আমাকে মুসলিম হিসেবেই মানুষ করেছো। এটাও জানে, আমি একজনের একরাতের মোহের ফল। তাই ও যদি এ কারন দেখিয়ে আমাকে প্রত্যাখান করে, আমি খুশি হবো। আমার কলঙ্কসমেত যে আমাকে গ্রহন করবে না, এমন কাউকে আমার চাইনা।

– আর হ্যাঁ, অন্যান্যদেশ ভ্রমনের মতো বিডিতে যাওয়াকেও স্বাভাবিকভাবে নাও মম। দ্রুতই ফিরছি নরওয়েতে। যাই কিছু হোক, আমি হ্যামলেটের অফেলিয়া হবোনা।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here