নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৫৪.

0
3

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৫৪.

দরজায় কারো ছায়া দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিক তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফ মেঝেয় পরে থাকা পুরুকাচের রংয়ের কৌটোর দিকে একবার তাকিয়ে, ওরদিক তাকালো। স্নিগ্ধতা বিছানায় হাটু জড়িয়ে বসে আছে। শারাফকে দেখে দৃষ্টিভ্রম মনে করে নিচে নামতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু শারাফ নিজেই এগিয়ে আসলো। হাটু গেরে মেঝেতে বসে, রংয়ের কৌটোটা হাতে নিলো ও। স্নিগ্ধতা যেনো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। শারাফ যে সত্যিই এসেছে, মানতে পারছে না ও। শারাফ এগিয়ে এসে একদম সামনে বসলো ওর। হাতের রং বেডসাইড ড্রয়ারগুলোর ওপর রেখে বললো,

– রং চাইছিলে স্নিগ্ধতা?

ওর কথা শুনে বাস্তবে ফেরে স্নিগ্ধতা। হুরমুড়িয়ে ঝাপিয়ে পরলো ও শারাফের বুকে। ওর পিঠের শার্ট খামচে ধরে, জোরেজোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো,

– আমাক রঙ দিওনা শারাফ! আমার রঙ চাইনা! আমার তুমি চাই! এই শিল্প চাইনা আমার! কোনো আঁকিবুকি চাইনা! আমার এই হাতে আমি আর কারো স্কেচ করতে চাইনা! কোনো খু*নির স্কেচ করতে পারবোনা আমি! আমার কেবল তোমাকে চাই! শুধু তোমাকে! তুমি…

শারাফ একহাতে স্নিগ্ধতার ঘাড়ের চুল মুঠো করে নিলো। শান্তস্বরে বললো,

– ভ্যানচালক কার বর্ননা দিয়েছিলো স্নিগ্ধতা? তাকে চেনো তুমি?

স্নিগ্ধতা থেমে যায়। অস্থিরতা নিমিষেই শীতল বরফের রুপ নেয় ওর। শারাফকে ছেড়ে দিয়ে শূণ্য দৃষ্টিতে ও তাকিয়ে রইলো কেবল। শারাফ ওর দুগাল নিজের দুহাতের মাঝে ধরলো। স্নিগ্ধতার মুখের দিকে কয়েকদন্ড নিষ্পলক চোখে স্নিগ্ধতা তাকিয়ে থেকে বললো,

– বলেছি না, তোমায় বিধ্বস্ততা মানায় না। তোমার চোখে খুশির উজ্জ্বলতা মানায়, ওই গালে লজ্জার রক্তিমতা মানায়, ওই ঠোঁটে কেবল স্নিগ্ধ হাসিটা মানায়। আর আমি এই স্নিগ্ধতার বহরকে প্রতিনিয়ত ভালোবাসি। অনেকটা ভালোবাসি!

আলতো করে স্নিগ্ধতার কপালে কপাল ঠেকায় শারাফ। চোখ বন্ধ করে রইলো দুজনে। দরজায় দাড়িয়ে কিছু না শুনলেও, সাইফ পুরোটাই দেখলো। নিশ্চিত হলো এটা ভেবে, শারাফ সামলে নেবে স্নিগ্ধতাকে। স্নিগ্ধতার বিছানা থেকে খানিকটা দুরেই ক্যানভাস। ক্যানভাসে কেবল কপাল, ভ্রু, আর চোখ। শুকনো ঢোক গিললো সাইফ৷ এটুক দিয়ে এগোনোর পথ নেই ওর। সবকিছু ঘুরেফিরে সেই একদিকেই যাচ্ছে। য়্যুমুর লকেট। কিন্তু কোন য়্যুমু এটা? ওর গাড়িতে এক্সিডেন্ট করা মেয়েটা? নাকি অন্যকেউ? যদি অন্য য়্যুমু হবে, তবে কোথায় পাবে তাকে সাইফ? আর যদি সে ওর চেনা য়্যুমুই হয় তবে কেউ কেনো ওর লকেট নিয়ে ডক্টর নাজমুলকে খু*ন করতে যাবে? তিনবছর আগে যার এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়েছে, তার নামটা কিকরে ওর কেইসগুলোতে জড়িত থাকতে পারে? কিকরে?

কফিশপে স্থির হয়ে বসে আছে স্নিগ্ধতা। অনু জুসের বোতলে স্ট্র ঘুরাচ্ছে আর ওকে পরখ করছে। দুদিন ভার্সিটিতে আসেনি স্নিগ্ধতা। আর আজ সকালে সাইফ-শারাফ দুজনেই কল করেছিলো ওকে। দুজনেই বলেছে বিকেলবেলা স্নিগ্ধতাকে নিয়ে বেরোতে। কি হয়েছে, কেনো এভাবে বেরোতে বলা হলো ওকে, বিষয়টা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না ওর। তাছাড়া স্নিগ্ধতা নিজেও কোনো বিষয় নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে আছে, ব্যাপারটা টের পাচ্ছে অনু। ওর কথায় কফিশপে চলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মাথায় নানান চিন্তা নিয়ে বসে আছে সে। অনু দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দুহাত টেবিলে সশব্দে রেখে বললো,

– এভাবেই বসে থাকবি? কিছু বলবি না?

– হুম? হুম। কেমন আছিস?

সাড়া দিলেও মনোযোগ নেই স্নিগ্ধতার। ও আবারো একধ্যানে টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে। অনু বললো,

– আছি ভালো৷ তোর কথা বল। ভার্সিটি আসলি না কেনো এ দুদিন?

– এমনি।

– মুহিবের খবর জানিস? পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে ও।

স্নিগ্ধতা কিছুটা বিস্ময়ে চোখ তুলে তাকালো। অনু জানে না মুহিব শারাফের ক্ষতি করতে চেয়েছিলো। জানলে স্নিগ্ধতার সামনে ওর নামও নিতো না। স্নিগ্ধতা আবারো নিচদিক তাকিয়ে বললো,

– কেনো? পড়াশোনা কেনো ছাড়লো?

– জানিনা। ডিপার্টমেন্ট গ্রুপে জানিয়েছে, ভার্সিটিতে আর আসবে না ও।

– একচুয়ালি কি বলতো, ওর ভার্সিটিতে আশার উদ্দেশ্য ছিলি তুই। এখন যখন বুঝে গেছে, তুই অন্যকারো হতে চলেছিস, ভার্সিটিতে আসাটাই বৃথা মনে হয়েছে ওর। লেইম একটা!

বিরক্তিতে বললো অনু। স্নিগ্ধতা জবাব দিলোনা। অনু আবারো বললো,

– ও স্নিগ্ধতা? তোকে বলা হয়নি। গত পরশু নতুন হল এলোটমেন্ট লিস্ট দিয়েছে। বঙ্গমাতা হলে সিট হয়েছে আমার! ফাইনালী!

স্নিগ্ধতা বিস্ফোরিত চোখে তাকায়৷ ওর ওমন কিছুটা হচকিয়ে যায় অনু। স্নিগ্ধতাও নিজেকে সামলে নেয়। গলা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে,

– কি বলছিস কি তুই? এতোকিছু হবার পরও তুই হলে যাচ্ছিস? যেখানে মোহিনী…

– আরেহ রিল্যাক্স! আমি তো মোহিনীর রেফারেন্সে যাচ্ছি না যে ওর দল করতে হবে। তাছাড়া মোহিনী এখন রাজনীতিতে নেই। জানিস তো তুই!

কপালে ভাজ পরলো স্নিগ্ধতার। অনু চেয়ার টেনে ওর পাশে এসে বসলো। নমনীয়ভাবে বললো,

– কি হয়েছে স্নিগ্ধতা? বলছিস না কেনো আমাকে? কিছু হয়েছে বাসায়?

– হুম? না।

– শারাফ স্যার কিছু বলেছে?

শারাফের কথা মনে পরতেই ভেতরটায় এক অদৃশ্য অস্থিরতা শুরু হয় স্নিগ্ধতার। হাতে হাত কচলাতে শুরু করে ও। হঠাৎই পাশের টেবিল থেকে হাততবলা, আঙুলের বাজনা আর তালির শব্দে ভেসে আসে,

‘আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি
আর মুগ্ধ হয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি (ii)
বাজে কিনিকিনি রিনিঝিনি
তোমারে যে চিনি চিনি
মনে মনে কত ছবি একেঁছি
আমি দূর হতে…চোখে চেয়ে থেকেছি’

স্নিগ্ধতা অনু দুজনে তাকালো সেদিকে। টেবিলের সবারই বয়স রিটায়ারমেন্টের কোঠায়। স্নিগ্ধতারা বুঝলো, ছোটখাটো রিইউনিয়ন ওটা। গানটা বেশ আনন্দের সাথে গাইছে তারা। হাজারো অস্থিরতার ভীড়ে স্নিগ্ধতার মনটা একটুখানি শীতলতা পেলো যেনো। তাদের গাওয়া শুনতে শুনতেই হঠাৎ ওর পাশ থেকে কেউ সুর তুলে গাইলো,

‘ ছিল ভাবে ভরা দুটি আঁখি চঞ্চল
তুমি বাতাসে উড়ালে ভীরু অঞ্চল (ii)
ঐ রুপের মাধুরী মোর সঞ্চয়ে রেখেছি
দূর হতে তোমারেই…চোখে চেয়ে থেকেছি

যুবকের কন্ঠ শুনে এবার পুরো কফিশপ তাকালো স্নিগ্ধতাদের টেবিলে। পাশ ফিরলো স্নিগ্ধতাও। শারাফ ঠিক ওর পাশের চেয়ারটাতে বসে। যেখানে কিনা অনু ছিলো। একহাতের তালুতে গাল ঠেকিয়ে ও মুগ্ধতা নিয়ে স্নিগ্ধতাকে দেখছে, আর গান গাইছে৷ গতদিনের পর শারাফ অনেকবার কল করে কথা বলেছে পর সাথে। সবটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা। আশপাশ দেখে নিলো স্নিগ্ধতা। সবার চোখ ওদের দিকে। আর স্নিগ্ধতাকে দেখে নিলো শারাফ। স্নিগ্ধতার পরনে হালকা সবুজ বর্ণের বড়হাতা জামা। জর্জেটের ওড়না বাহাতের ওপর ছড়ানো। চুপিসারে লোকচক্ষু পরখ করা চোখজোড়ায় দুরন্তপণা। পাশের টেবিল থেকে বয়স্কদের একজন গলা উচিয়ে বললেন,

– আরে থামলে কেনো? গাও ইয়াংম্যান! গাও!

স্নিগ্ধতা অবাক হয়ে পাশে তাকালো। শারাফ মুচকি হেসে তেমন গালে হাত রেখেই গাইতে গাললো,

‘ কস্তুরি মৃগ তুমি
যেন কস্তুরি মৃগ তুমি
আপণ গন্ধ ঢেলে, এ হৃদয় ছুঁয়ে গেলে
সে মায়ায় আপনারে ঢেকেছি’

আশপাশ থেকে বাহবার শেষ নেই। কিন্তু স্নিগ্ধতা কেবলই চুপচাপ তাকিয়ে রইলো শারাফের দিকে। শারাফ ওর হাত নিয়ে আলতোকরে হাত বুলালো হাতের ওপর। হাত সরাতেই নখের ওপর আংটি চোখে পরলো স্নিগ্ধতার। নখে পরানো না। কেবল ওপরে রাখা। শারাফ সে আংটিতে ঠোঁট ছুইয়ে গাইলো,

‘ ঐ কপলে দেখেছি লাল পদ্ম
যেন দল মেলে ফুঁটেছে সে সদ্য (ii)
আমি ভ্রমরের গুঞ্জনে তোমারেই ডেকেছি
দুর হতে…চেয়ে থেকেছি
বাজে কিনিকিনি…..চেয়ে থেকেছি’

হাততালিতে মুখরিত হয় পুরো জায়গাটা। ধ্যান ভাঙে স্নিগ্ধতার। শারাফ ঠোঁটে হাসি বহাল রেখে বললো,

– তারপর ম্যাডাম? আর কতোদিন দুর হতে দেখবো আপনাকে?

স্নিগ্ধতা নিরবে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তবে সে চাওনি পড়তে অসুবিধা হয়নি শারাফের৷ তারা স্পষ্টভাবে বলছে, ‘আমাকে আপন করে নাও শারাফ। দ্বিমত নেই আমার।’ স্নিগ্ধতা মুখে বললো,

– একই প্রশ্ন আমারও।

শারাফ নিশব্দে হেসে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। টেবিলে থাকা ফোনটার কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘ভেতরে এসো তোমরা’। হচকিয়ে যায় স্নিগ্ধতা। খেয়াল করলো শারাফের পেছনে দরজা দিয়ে একেএকে পুরো স্বপ্নীল কফিশপে ঢুকতে শুরু করেছে। শারাফের বাবা-মা, শায়েরী, মেহেরুন, মুসকান মিস্টার নাহিদ আর তার তার মিসেস। সবাইকে একযোগে দেখে বিস্ময়ে দাড়িয়ে যায় স্নিগ্ধতা। শারাফের পুরো পরিবারের হাতে প্লাকার্ড। একলাইনে দাড়ানো মানুষগুলোর হাতে সিরিয়ালি লেখা, ‘Will you marry’ শারাফও উঠে দাড়ায় এবারে। সবার সামনে দাড়িয়ে গিয়ে কোটটা খুলে চেয়ারে বাঝায়। ভেতরে থাকা টি-শার্টে লেখা, ‘Me’ একটুপর চকলেট খেতে খেতে আরেকটা প্লাকার্ড হাতে শারাফের পাশে এসে দাড়ায় মুসকান। সেটাতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। স্নিগ্ধতা বিমুঢ়। পুরো পরিবারসমেত শারাফ আজ ওর সামনে প্রশ্ন নিয়ে দাড়িয়েছে, ‘Will you marry me?’

– মিস্টার এহমাদ সবটা তোমার ওপর ছেড়েছে স্নিগ্ধতা। আর আমি শুধু তোমার সম্মতির অপেক্ষায় আছি।

শারাফের কথা আর ওর দৃষ্টি অনুসরন করে একপাশে সাইফ-অগ্নিলাকেও দেখতে পেলো স্নিগ্ধতা। ভেতরটা অচেনা যন্ত্রনা আর ভয়ে ভরে উঠতে লাগলো ওর। টের পেলো, এখানকার প্রতিটা ঘটনা ইচ্ছাকৃত। আংটিসমেত শারাফ হাত বাড়িয়ে দিলো ওর দিকে। বললো,

– বি মাইন স্নিগ্ধতা। উইল ইউ?

স্নিগ্ধতা মনকে দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ দিলোনা। একটা শুকনো ঢোক গিলে হাত বাড়িয়ে দিলো নিজের। হৈহৈ করে উঠলো সকলে। বিশ্বজয়ের হাসিতে ওর হাতে আংটি পরিয়ে দিলো শারাফ। এবারে ওর হাতে চুমো দিয়ে বললো,

– এইতো ধরেছি! আর ছাড়ছি না তোমাকে।

লোকলজ্জা যেনো ভুলে গেলো স্নিগ্ধতা। কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে শারাফের বুকে মুখ গুজলো ও। অস্ফুটস্বরে বললো,

– ছেড়োনা শারাফ। ছেড়োনা প্লিজ! শুধু জেনো, তোমার লোভে আমি আমার পৃথিবী বিসর্জন দিতেও রাজি। পারিপার্শ্বিক সেখানে তুচ্ছ! একেবারেই নিছক!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here