নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৫৭.

0
3

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৫৭.

শার্টের কলারের কাছের বোতামটা খুলে দিতে দিতে লকাপে ঢুকলো সাইফ। তারেক হাটুতে হাত রেখে বসে ছিলো। প্রথম দুইদিনে অনেক অত্যাচার করা হয়েছে তাকে। কিন্তু ‘জানিনা’ ছাড়া আর টু শব্দটাও করেনি সে। শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করতে এ কয়েকদিনে সাইফ আর কিছু করেনি তারেককে। ওর পরিবার জামিনের চেষ্টা করেছিলো। পারেনি। সাইফ আটকে দিয়েছে। প্রশ্নোত্তোরের তোপে ফেলে সত্যি বের উদ্দেশ্যে তারেককে রাখা। নিজের গলার দিকটা ডলা মেরে চেয়ার টেনে বসলো সাইফ তারেকের সামনে একটা ছবি ধরে স্পষ্টস্বরে বললো,

– অবয়বটাকে চেনেন?

তারেক চোখ তুলে তাকায়। আবছা ছবিটায় হুডিপরা একটা মানব অবয়ব শুধু। তারেক চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে,

– চেনার মতো কিছু নেই ছবিটাতে।

সাইফ ছবি সরিয়ে নিলো। অতঃপর তারেকের সামনে আরেকটা ছবি তুলে ধরে বললো,

– আর এটা?

আগ্রহহীন দৃষ্টিতে আবারো চোখ তোলে তারেক। কিন্তু ওর নিরস দৃষ্টি আতঙ্কিত হয়ে ওঠে মুহুর্তেই। যারমানে, ইংরেজীতে য়্যুমু লেখা লকেটবিশিষ্ট চেইনটা ওর অচেনা নয়। সাইফ দৃষ্টিক্ষেপ করলো লকাপের বাইরে। ওর কেবিনে রোলিং চেয়ারে বরাবর আরামে বসে শারাফ। এক পায়ের আরেকওপর পা তুলে, হাতলে কনুই রাখা ওর। থুতনি ধরে রেখে শারাফ সুক্ষ্ম চাওনি নিবদ্ধ করেছে তারেকের দিকেই। সাইফ আবারো তারেকের দিকে ফিরে বললো,

– স্পিক আপ মিস্টার তারেক। চেনা লাগছে এটা?

– ন্ নাহ!

শারাফ একটা রহস্যময় হাসি দিলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে টেবিলে থাকা খোলা ফাইলগুলোতে তাকালো ও। সেখানে থাকা কেইসইনফো দেখে বুঝলো, সাইফ কোনো রাস্তা ছাড়েনি খু*নীকে ধরার। তারপরও ফলাফল হিসেবে সবশেষে যেটা দাড়িয়েছে, ব্লাংক! খালি! সাইফ আবারো তারেককে প্রশ্ন করতে যাবে, ওর কানে আসলো,

– স্যার? নোটিস আছে একটা।

– রাখো। পরে দেখছি।

– স্যার আইটি সেক্টরের রিপোর্ট থেকে ওপরমহল নোটিস পাঠিয়েছে। ইটস আর্জেন্ট!

সাইফ বাইরে তাকালো। কেবিনে কনস্টেবল একটা খাম হাতে দাড়িয়ে। শারাফ খানিকটা পিছিয়ে পকেটে দুহাত গুজে দাড়িয়েছে। কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে আসলো সাইফ। কনস্টেবলের কাছ থেকে হাতে নেয় খামটা। তবে ওটার ভেতরের কাগজ পরেই কপালে ভাজ পরে সাইফের। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। মচমচ শব্দে কাগজটা মুঠো করে নেয় ও। শারাফ ঘাড় বাকিয়ে আগ্রহ নিয়ে বললো,

– কিসের কাগজ ওটা মিস্টার এহমাদ?

– তারেকের বেইল অর্ডার।

– মানে? জামিন হয়ে গেছে ওনার? কিভাবে? কে করালো?

– ওকে যে প্রমাণের ভিত্তিতে ধরে রেখেছি সেটা ভুল প্রমানিত হয়েছে। আইটি সেক্টরের তদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট বলা আছে, কেউ একজন সত্যিই ওর ইউআরএল হ্যাক করেছিলো। মানে ওর ইউআরএল থেকে নাজমুলের হসপিটালে সিসিক্যাম অন্যকেউ হ্যাক করিছিলো। যার মানে দাড়ায় এই মার্ডারে তারেকের কোনো ভুমিকা নেই। ওকে ধরে রাখার কারন নেই আমাদের কাছে।

চোখ বন্ধ করে দম নেয় সাইফ। কপাল চেপে ধরে কয়েকদন্ড চুপ করে রইলো। তারপর কনস্টেবলকে ইশারা করলো তারেককে ছেড়ে দেবার জন্য। কনস্টেবল গিয়ে লকাপ খুলে দিতো। তারেক অবাক হলোনা। ও জানতো মুখ না খুললে জামিন পেয়ে যাবে ও৷ জখমে পরিপূর্ণ হয়ে থাক শরীরটা নিয়ে ধুকতে ধুকতে বেরিয়ে আসলো লকাপ থেকে। সাইফের অত্যাচারের চিহ্ন ওর পুরো শরীরজুড়ে। বাইরে এসে শারাফকে দেখে ঘাড়ে হাত বুলালো তারেক। তারপর নড়বড়ে কন্ঠে সাইফকে বললো,

– আমি আগেই বলেছিলাম ইন্সপেক্টর। এসবে আমার কোনো হাত নেই।

সাইফ একপলক তাকিয়ে দেখলো তারেককে। শারাফ মুখ খুললো এবারে। বললো,

– ছয়দিনের রিমান্ড যে সত্যিটা বের করতে পারেনি, সেটা কিন্তু সারাজীবন ধামাচাপা থাকবে না মিস্টার তারেক।

তারেক খুড়িয়ে খুড়িয়ে বেরোতে গিয়েও থেমে গেলো। শারাফ হাতে কলম নিয়ে নিব ওঠানামা করাতে করাতে বললো,

– আই মিন টু সে, বেল পেয়ে আপনি যদি ভেবে থাকেন বেচে গেলেন, তাহলে কিন্তু ভুল ভাবছেন আপনি। কারন রিপোর্টটা ভুল হলে আপনাকে শুধু সিরিয়াল কিলিংয়ের সন্দেহভাজন ধরা হতো। কিন্তু রিপোর্ট ঠিক হওয়ার মানে সত্যিই কেউ আপনার ইউআরএল হ্যাক করেছিলো। মানে কেউ আপনাকে এই সিরিয়াল কিলিং কেইসে ফাসাতে চেয়েছিলো। কিন্তু সেটা না হয়ে আপনি জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন।

– বুঝতে পারছেন মিস্টার তারেক? আপনি একটা সিরিয়াল কিলারের প্লান ইনিশিয়েসেশনে বাধা দিয়েছেন। এন্ড আই ডোন্ট থিংক এ ব্যাপারটা আপনার জন্য কোনোভাবে ভালো হতে পারে।

তারেক শুকনো ঢোক গিললো। সাইফের দিকে আরেকবার দেখে বেরিয়ে গেলো ও। শারাফ হেসে কলমটা টেবিলে রাখলো। সাইফকে বললো,

– সরি মিস্টার এহমাদ। যাকে এনালাইজ করতে আমাকে এনেছিলেন, সে জামিনে ছাড়া পেয়ে গেছে। হেল্প করতে পারলামনা আপনাকে।

– এনিওয়েজ। আমাকে এখন কনসাল্টেশন সেন্টার যেতে হবে। কেইসের জন্য অল দ্যা বেস্ট মিস্টার এহমাদ। আসছি।

সাইফ একধ্যানে নিচদিক তাকিয়ে বসে থাকতে দেখে শারাফ বেরিয়ে যাচ্ছিলো। সাইফ বিমূঢ়ভাবে বসে থেকে বলে উঠলো,

– আমাকে কি এখন ভক্ষকের রক্ষক হতে হবে শারাফ?

দরজায় দাড়িয়ে যায় শারাফ। পেছন ফিরে অদ্ভুতভাবে হেসে বলে,

– আইন অনেক আগেথেকেই এটা করে আসছে মিস্টার এহমাদ। ডোন্ট ফিল গিল্টি।

সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে বেরিয়ে আসে শারাফ। সাইফ টেলিফোন তুলে কল লাগায় কাউকে। রিসিভ হলে বলে,

– তারেকের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করো। হিজ লাইফ ইজ ইন রিস্ক।

চারুকলার সামনের সিড়িতে অনেকক্ষণ যাবত পেন্সিল নিয়ে বসে আছে স্নিগ্ধতা। শেষ ক্লাসটা ক্যান্সেল হয়ে গেছে। তাই স্নিগ্ধতা সাইফের অপেক্ষা করছে আর অনু ভার্সিটির বাসের৷ নিজের স্কেচবুকে আঁকাচ্ছিলো অনু। একবার পাশে তাকিয়ে দেখলো স্নিগ্ধতা এখনো আকানো শুরুই করেনি। অনু ওকে মৃদ্যু ধাক্কা লাগালো। বললো,

– ওহে আসন্ন বিয়ের কনে? তুলি হাতে নিয়ে বসে আছেন কেনো? এখনি কি বিবাহের দিবাস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন নাকি?

স্নিগ্ধতার অন্যমনস্ক থেকেই বললো,

– ভাইয়া শারাফকে পুলিসস্টেশন ডেকেছে।

অনু আকানো থামিয়ে ভ্রু কুচকালো। বললো,

– তো?

– শারাফকে পুলিশস্টেশন কেনো ডাকলো ভাইয়া?

– জেলে পুরবে বলে!

জোর দিয়ে বলে ওঠে অনু। রীতিমতো চমকে ওঠে স্নিগ্ধতা। অনু হতাশ হয়ে কপাল চাপড়ায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

– ভাই কদিন পর শারাফ স্যারের সাথে তোর বিয়ে। আর আজকে তোর ভাই তারসাথে দেখা কেনো করছে এই ভেবে তুই কাল মহাকাল এক করে দিচ্ছিস? লাইক সিরিয়াসলি?

স্নিগ্ধতা স্থির হয়। পেন্সিল ধরে স্কেচ শেষ করবে বলে। তখনই একটা বই আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে ওর পাশে বসে পরে শারাফ। স্নিগ্ধতা বিস্ময় কাটিয়ে অস্থিরভাবে বলে,

– তুমি? পুলিশস্টেশন থেকে কখন বেরিয়েছো?

শারাফ স্বাভাবিক কন্ঠে জবাব দিলো,

– অনেক আগেই। সেখান থেকে কনসালটেশন সেন্টারও গিয়েছি। আপাতত একটা বই লাগবে। তাই ভাবলাম ভার্সিটির লাইব্রেরি ঘুরে যাই।

– অযুহাত কেনো দিচ্ছেন শারাফ স্যার? হবু বউয়ের কাছেই তো আসছেন। কোনো মামুলি স্টুডেন্টের কাছে তো না!

অনুর কথায় স্নিগ্ধতা মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়লো। শারাফ অনুর সাথেও কুশলবিনিময় করলো। এরইমাঝে ওর ফোনে ম্যাসেজটোন বেজে ওঠে। ম্যাসেজটা দেখে নিয়ে শারাফ স্নিগ্ধতাকে বললো,

– বেরোতে পারবে স্নিগ্ধতা?

– কোথায়?

– বিয়ের কার্ড ছাপা হয়ে গেছে। কালেক্ট করে নিতে বললো। আমি চাই কার্ড সর্বপ্রথম আমাদের দুজনের ছোয়া পাক।

ঠোঁটে হাসি ফোটে স্নিগ্ধতার। অনুর দিক তাকালে ও ইশারায় বুঝালো, আগাও বৎস! শারাফ উঠে দাড়িয়ে হাত বাড়ায় স্নিগ্ধতার দিকে। ওর হাতে হাত রেখে উঠে দাড়ায় স্নিগ্ধতা। ভরা ক্যাম্পাস তাকিয়ে রইলো স্বচিত্ত্বে হাতে হাত রেখে বেরিয়ে যাওয়া দুই মানব-মানবীর দিকে। শারাফের একপা পেছনে হাটতে হাটতে স্নিগ্ধতা ওর পিঠের দিকে মুগ্ধচোখে চেয়ে রইলো।
দোকানে পৌছে কার্ড নিয়ে ফেরে শারাফ। স্নিগ্ধতা গাড়িতেই ছিলো। গাড়িতে চড়ে বসে শারাফ ওরদিক কার্ড বাড়িয়ে দিলো। বললো,

– আমাদের নতুন সূচনার শুরু।

কার্ডটা হাতে নেয় স্নিগ্ধতা। আলতোভাবে হাত বুলায় সেটাতে। রাজকীয় খামে সাজানো হয়েছে বিয়ের কার্ড। তাতে গোটাগোটা হরফে বরকনের নাম লেখা। ইয়াকীন শারাফ, স্নিগ্ধতা এহমাদ। স্নিগ্ধতা দ্রুত পলক ফেলে। বন্ধ করে কার্ডটা। শারাফ মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। বললো,

– সো…? প্রথম কার্ডটা কাকে দিচ্ছো?

– আমার তেমন স্পেশাল কেউ নেই।

শারাফ ড্রাইভিং ছেড়ে একপলক তাকালো ওর দিকে। হেসে বললো,

– তাহলে আমার স্পেশাল মানুষটাকেই প্রথম কার্ডটা দিয়ে আসি চলো।

স্নিগ্ধতা কিঞ্চিৎ বিস্ময়ে শারাফের দিকে তাকালো। ক্ষীণস্বরে শুধালো,

– কাকে?

– আমার এক বান্ধবীর মাকে।

– ওহ।

– কি ব্যাপার? স্পেশাল মানুষ হিসেবে তোমার হবু বর তার বান্ধবীর নাম নিচ্ছে, অথচ তুমি জিজ্ঞেস করলে না কোন বান্ধবী? নো জেলাসী?

শারাফ সন্দিহান দৃষ্টিতে উকি দিলো স্নিগ্ধতার দিকে। ওর কথায় কেমনএকটা অনুভব হলো স্নিগ্ধতার। তারপরও হেসে বললো,

– না। হচ্ছে না জেলাসী। বান্ধবীকে নিয়ে তো বলোনি। বান্ধবীর মাকে নিয়ে বলছো। জেলাস কেনো হতে যাবো তবে?

– তাও ঠিক।

– বাই দা ওয়ে, তুমিই বা বান্ধবীকে ছেড়ে বান্ধবীর মাকে কেনো কার্ড দিতে যাচ্ছো? উনি থাকেন কোথায়?

নিশব্দে হাসলো শারাফ। তারপর চোখমুখ শক্ত করে গাড়ির গতি বাড়িয়ে বললো,

– বান্ধবী নেই। তবে ওর মা আপাতত এখানেই। ‘সেইফউই’ হসপিটালের প্লাস্টিক সার্জনদের একজন, ডক্টর জেনেলা।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here