#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৫৮.
‘জেনেলা সাকলিক’
দরজায় থাকা নেমপ্লেটটার দিকে তাকিয়ে আছে স্নিগ্ধতা। হাতে বিয়ের কার্ড। শারাফ দরজায় নক করে একপা পিছিয়ে দাড়ালো। ভেতর থেকে আওয়াজ আসলো, ‘কামিং’। শারাফ নিচে ঝুকে জুতোর ফিতা ঠিক করতে লাগলো। তার সেকেন্ড পাঁচেকের মধ্যে খুলে যায় দরজা। ধুসর রঙের কোটের মতো জামার ওপর সাদা এপ্রোন পরিহিত ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দেয়। সামনে দাড়ানো স্নিগ্ধতাকে দেখে থমকে যায় সে। তার গাঢ় খয়েরী মনির চোখজোড়া কানায়কানায় অশ্রুতে ভরে ওঠে। শারাফ মেঝেতে হাটুগেরে বসে ছিলো। উঠে দাড়ায় ও এবারে। মাঝ বরাবর দাড়ানো সুদর্শন সুঠামদেহী পুরুষকে চিনতে সময় লাগেনা ডক্টর জেনেলার। তার চোখের জলেরা বের হওয়ার পরিবর্তে মিলিয়ে যায়। চেহারা গম্ভীর হয়। মস্তিষ্ক যেনো তার ক্ষীপ্ত কন্ঠনালীকে শাষিয়ে দমন করে। মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিতে উদ্যত হয় জেনেলা। শারাফ রীতিমতো থাবা দেয় দরজায়। অদৃশ্য জোর খাটাতে থাকে দুজনে মিলে। শারাফ ইংরেজীতে বললো,
– রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া ডক্টরের ধর্ম না আন্ট জেনি।
শারাফের শক্তিতে হার না মানলেও এবার ওর কথায় পরাহত হয় জেনেলা। দরজা ছেড়ে টলোমলো চোখে চাইলো সে। তবে স্বাভাবিক স্বরে ইংরেজীতে শুধালো,
– বলুন। কিভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাদের?
শারাফও দরজা ছেড়ে নমনীয় হলো। আলতোকরে দুহাতে হাত ধরলো মহিলার। তার দুহাত দু চোখে ছুইয়ে, উপরপিঠে চুমো দিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বললো,
– কেমন আছেন আন্ট জেনি?
ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের হাত ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পরলেন ডক্টর জেনেলা। শারাফ ছাড়লো না তার হাত। ব্যর্থ হয়ে জেনেলা চোখের পানি ছেড়ে দেয় এবারে। কান্নারত থেকে বলে,
– হাত ছাড়ো ইয়াকীন।
– আগে বলুন কেমন আছেন আপনি।
– আমি কেমন আছি সেটা জানার অধিকার তোমার নেই। ছাড়ো আমার হাত।
– ইয়াকীন ছাড়ার জন্য হাত ধরেনা আন্ট জেনি৷ আপনি জানেন এটা।
– আর তোমার হাত ধরতে এসে আমার মেয়েটা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে ইয়াকীন।
– আন্ট জেনি…
– তোমার ব্যাখা চাইনা আমার। আমি জানি ও কার এক্সিডেন্টে মারা গেছে। কিন্তু ওর পরিণতির জন্য দায়ী তুমি!
শারাফ আস্তেকরে জেনেলার হাত ছেড়ে দেয়। আর বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। জেনেলার কথায় ওর চারপাশ আন্দোলিত হতে শুরু করেছে যেনো। শারাফ স্নিগ্ধতার দিক তাকিয়ে দেখে ওর অবস্থা ভালো নয়। রীতিমতো টলছে ও। শারাফ এগোতে যাবে, স্নিগ্ধতা নিজেই কোনোমতে বললো,
– ম্ ম্যাম? এ্ একটু পানি হবে?
বলেই স্নিগ্ধতা শরীর ছেড়ে দিচ্ছিলো। কিন্তু শারাফ ধরে ফেলে ওকে। জেনেলা আতঙ্কিত হয়ে কেবিনের দরজা পুরোপুরিভাবে খুলে দেয়। শারাফ স্নিগ্ধতাকে ধরে নিয়ে ভেতরের সিটে বসায়। পানি খাইয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। কিছুটা সময় নিয়ে স্বাভাবিক হয় স্নিগ্ধতা। জেনেলা ততক্ষণে ওর হাতের কার্ড দেখেছে। সে শান্তভাবে শারাফকে বললো,
– বিয়ে করছো?
– প্রথম কার্ডটা আপনাকেই দিতে এসেছি।
– কেনো? যাতে আমার বারবার মনে পরে, তুমি আমার মেয়েটাকে….
– আমি আপনার মেয়ের পরিণতিতে দায়ী নই আন্ট জেনি। আপনি তো জানেনই সবটা! তারপরও কেনো আমার বিপরীতে ক্ষোভ পুষেছেন বলতে পারেন? আপনার মেয়েকে আমি কখনো বলিনি বিডিতে আসতে। ও স্বেচ্ছায় বিডিতে এসেছিলো। চেয়েছিলো আমাকে সারপ্রাইজ দিতে। এমনকি এখানে এসেও আমাকে জানায় নি ও। আমি জানতামও না ও বিডিতে। তারপর ওর কক্সবাজার ট্যুর আর সেখানে….
একদমে কথাগুলো বলে দম ছাড়লো শারাফ। একপলক স্নিগ্ধতাকে দেখে নিয়ে বললো,
– আপনার মেয়ে আমায় ভালোবেসে বিডিতে এসেছিলো। কিন্তু আমি কখনো ওকে বলিনি আমি ওকে ভালোবাসি আন্ট জেনি। ও কেবলই আমার ভালো বন্ধু ছিলো।
স্নিগ্ধতা ওড়না শক্তমুঠো করে নেয় নিজের। ছলছল চোখজোড়া স্থির রাখে শারাফের স্পষ্টভাষী ঠোঁটের দিকে। শারাফ আরো বললো,
– যা হবার, সবটা আমার অগোচরেই হয়েছে। হোক সেটা আপনার মেয়ের একপাক্ষিক ভালোবাসা, সেই ভালোবাসার টানে ওর এদেশে আসা, কিংবা কক্সবাজারের সে দুর্ঘটনা। এখানে আমার ভূমিকা কোথায় বলতে পারেন? বন্ধু হিসেবে বাকিসবের মতো ওর সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছি৷ ম্যাসাচুটসে গিয়েও অনেক খুজেছি ওকে। কোনো খোজ পাইনি ওর। অনলাইন অফলাইন কোথাওনা! আমি জানতেও পারিনি ওর সাথে কি হয়েছে। আপনি যে তারপর থেকে বিডিতে রয়ে গেছেন, এটাও জানা ছিলোনা আমার। এতোবেশি রাগ পুষে রেখেছেন যে, আপনিও ওর বিষয়ে কিছু জানাননি আমাকে। তাহলে বলুন, এভাবে সবকিছুর অগোচরে থেকেও ওর পরিণতির জন্য আমিই দায়ী আন্ট জেনি? এমনটাই মনে হয় আপনার?
জেনেলা চুপ রয়। পরপরই চেয়ারে বসে ডুকরে কেদে ওঠে সে। যার অর্থ, ভুল বলেনি শারাফ। শারাফ তাকে শান্তনা দিতে এগোলো না। জানালার সামনে পকেটে হাত গুজে দাড়িয়ে রইলো চুপচাপ। আকাশে যেনো হাজারো বেহিসেবি কাহীনির আনাগোনা। স্নিগ্ধতা থমকে বসে ছিলো এতোক্ষণ। এবারে আস্তেকরে উঠে গিয়ে জেনেলার সামনে হাটু গেরে বসলো ও। বললো,
– শারাফের সাথে সামনে বিয়ে আমার।
শারাফ পেছন ফিরেছে। জেনেলাও কান্না থামিয়ে চোখ তুলে তাকায়। স্নিগ্ধতার ফর্সা গাল, ঘন, সিক্ত পাপড়ি, চোখজোড়ার লালচে ভাব আর গহীনতা যেনো তার অস্থিরতায় দাড়ি টানে। একপলক শারাফের দিকে তাকিয়ে, স্নিগ্ধতার চুলে হাত বুলায় জেনেলা। বলে,
– সুখী হও। যীশু মঙ্গল করুক তোমাদের।
স্নিগ্ধতা মুচকি হাসি ফোটালো ঠোঁটে। জেনেলার কোলে বিয়ের কার্ড রাখে বললো,
– আমার মা নেই আন্ট জেনি। আপনি বিয়েতে আসলে জানবো বিয়েতে আমার মা এসেছে।
– তা হয়না ডিয়ার।
– হয়। মা মেনেছি আপনাকে। এই বিয়েতে আপনাকে আসতেই হবে।
– তুমি যা চাইছো তা…
– আপনাকে আপনার যীশুর দোহাই।
জেনেলার গলায় ঝুলতে থাকা লম্বামতোন ক্রুশের লকেটটা তার আঙুলে গুজে দিয়ে বললো স্নিগ্ধতা। জেনেলা থেমে গেলো। মানা করার উপায় পেলোনা আর। শারাফের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। ও জানতো, ও শুধু জেনেলার ভুল ভাঙাতে পারবে। তবে তার অভিমান কেবল স্নিগ্ধতাই মেটাতে পারবে। হয়েছেও তাই। জেনেলা আবারো শারাফের দিক তাকায়। আকুতির চাওনিতে শারাফও তাকে আবেদন জানায় বিয়েতে আসার। জেনেলা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আলতোকরে ঠোঁট ছোয়ালো স্নিগ্ধতার কপালে। ওর একগাল ধরে বললো,
– বেশ। আমি আসবো তোমাদের বিয়েতে।
তৃপ্ত হাসিতে শারাফের দিকে তাকায় স্নিগ্ধতা। শারাফও নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে হাসলো। জেনেলার সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে ওরা। গাড়িতে ওঠার পর শারাফ লক্ষ্য করলো, স্নিগ্ধতা সিটবেল্ট লাগায়নি। শারাফ গাড়ি স্টার্ট দিলোনা। স্টেয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনে তাকিয়ে বললো,
– তোমাকে আগেই এ বিষয়ে বলতে চেয়েছিলাম। ম্যাসাচুসেটসে…
আকস্মিকভাবে ওর ওপর ঝাপিয়ে পরে স্নিগ্ধতা। শারাফ হতভম্ব। স্নিগ্ধতা অনেকবেশি শক্তিতে ওর গলা জরিয়ে রেখে বললো,
– যেটুকো বোঝার সেটা আমি বুঝে নিয়েছি শারাফ। যে নেই, সে নেই। তুমি শুধু কথা দাও আমাকে, সে আমাদের মাঝে আর কোনোদিন আসবে না। তুমি আমার কাছে কোনোদিনও তাকে প্রসঙ্গ বানাবে না। প্রমিস মি দ্যাট!
শারাফ চোখ বন্ধ করে জরিয়ে ধরলো স্নিগ্ধতাকে। মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালো স্নিগ্ধতার কথার প্রতিত্তোরে।
•
সাইফ ল্যাপটপে চেইনের মডেল দেখছিলো। কেইসে হাতে থাকার মতো শুধু য়্যুমুর লকেটটাই আছে৷ এই য়্যুমু কোন য়্যুমু, তা শিওর না হওয়া অবদি কোনোদিকেই এগোতে পারছে না ও। কক্সবাজারে ওর গাড়িতে মারা যাওয়া য়্যুমুর কোনোরকম অনলাইন প্রোফাইল নেই৷ কাগজপত্র বলতে পাসপোর্ট-ভিসা আর ডেথ সার্টিফিকেট জোগার করতে পেরেছে। তবে সেখান থেকে কোনোরকমের শত্রু বের করতে পারেনি ওর। কফিমগের ট্রে টেবিলে রাখলো। সেটা খেয়ালই করলো না সাইফ। অগ্নিলা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বললো,
– ব্যস্ত তুমি?
– হুম? না। বলো…
ল্যাপটপে মনোযোগ রেখে বললো সাইফ। দরজায় দাড়ানো স্নিগ্ধতার দিকে তাকালো অগ্নিলা। মেয়েটা বেশ কিছুক্ষন হলো দরজাতেই দাড়িয়ে। দরজায় দাড়িয়ে দুবার ‘আসবো ভাইয়া’ বলেছে ও। সাইফের কানে যায়নি সেটা। ওউ আর ভেতরে আসেনি। অগ্নিলা হুট করেই ল্যাপটপ বন্ধ করে দিলো সাইফের। সাইফও বিরক্তি নিয়ে চোখ তোলে। কিন্তু কিছু বলার আগেই অগ্নিলার ইশারায় দরজায় তাকায়। স্নিগ্ধতাকে দাড়ানো দেখে উঠে দাড়ায় ওউ। বেশ বুঝতে পারে কি ঘটেছে। এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে ঘরে ভেতরে আনে স্নিগ্ধতাকে। হাসিখুশিভাবে বলে,
– তোকে আর কতোবার বলবো আমার ঘরে আসতে তোর অনুমতি নিতে হবেনা।
স্নিগ্ধতা জবাব না দিয়ে হাতে থাকা বিয়ের কার্ড তুলে ধরে। ওগুলো দেখতেই তীব্র অপরাধবোধে ‘চ্যাহ’ শব্দ করে সাইফ। কার্ডের দোকান থেকে ম্যাসেজ এসেছিলো ওর ফোনেও। কিন্তু কেইসের ঝামেলায় মনে ছিলোনা ওর। সাইফ প্রচন্ড আত্মগ্লানি নিয়ে বললো,
– বিশ্বাস কর টুকি, এটার কথা আমার মনেই ছিলো না।
– এটার কথা মনে রাখা আবশ্যক নয় সাইফ। শুধু বোনটার কথা মনে রেখো৷ সামনে স্নিগ্ধতার বিয়ে।
নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা নিচু রাখে সাইফ। পরপরই মাথা তুলে, দুগাল ধরে স্নিগ্ধতার। ঝকঝকে চোখে চেয়ে বলে,
– যাই কিছু হয়ে যাক, টুকির বিয়েতে কোনো কমতি থাকবে না নীলা৷ ধুমধাম করে বিয়ে হবে ওর! আমার একমাত্র বোনের বিয়ে বলে কথা!
স্নিগ্ধতা ভাইয়ের হাতের ওপর হাত রাখলো। অগ্নিলা এসে ওর হাত থেকে কার্ডগুলো হাতে নিলো। একটা খুলে, এপিঠওপিঠ দেখে নিয়ে বললো,
– সুন্দর হয়েছে কার্ডগুলো। তা প্রথম কার্ডটা কাকে দেবে সাইফ?
সাইফ কিছু বলার আগেই মুখ খোলে স্নিগ্ধতা। স্পষ্টভাবে বলে,
– মিস্টার আরাফাতকে।
#চলবে…

