#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৬১.
ব্রেকফাস্ট সেরে শাওন ল্যাপটপ নিয়ে ব্যালকনিতে বসেছে। হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটে আরেকবার টান মেরে আবারো হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পরলো ও। শেষবার বিয়ের আগে যখন দেশে এসেছিলো, নিজে গিয়ে সীমান্তে ড্রাগের চালান-কারবার ঠিকঠাক করে এসেছিলো। প্রি ম্যারেজ ব্যাচেলর ট্যুরের নাম করে কক্সবাজার যেতে হয়েছিলো ওকে। তবে আপাতত সেদিকটা অন্যজনের হাতে। নরওয়েতে থাকতে এতোটা পুঙ্ক্ষানুপুঙ্খভাবে দেখার সুযোগ হয়নি শাওনের। তাই দেশে ফিরেই মিটিংয়ে বাদবাকি তিনজনের কাছ থেকে পুরোটার হিসেব চেয়ে বসেছে ও। ওদের তিনজনের দেওয়া তিনটে পেনড্রাইভে সব হিসেব তোলা আছে৷ দেখতে দেখতেই হুট করে আরো মনোযোগী হয়ে ওঠে শাওন। ল্যাপটপের স্ক্রিনে থাকা একটা নাম ওর ভ্রুজোড়ায় ভাজ এনে দেয়। সিগারেটে আরো কয়েকটান দিয়ে ওটা শেষ করে এ্যাশট্রে তে ফেলে দিলো ও। নামটা নিয়ে আরেকটু জানাশোনা করতে যেতেই শাওনের কানে আসে দরজা খোলার আওয়াজ। সাথে গয়নার রিনঝিন। ল্যাপটপ বন্ধ করে ফেলে ও। কাঁধ হাত দিয়ে চেপে ধরে আয়েশী কন্ঠে বলে,
– কি বউ? শেষ হলো তোমার আড্ডা দেওয়া? এখন কি আমাকে একটু সময় দেওয়া যায়?
মেহেরুন ব্যস্তভাবে ড্রেসিংটেবিলের দিকে এগোচ্ছিলো। বরের কথায় হাসি ফোটায় ঠোটে। এগিয়ে গিয়ে শাওনের কলার চেপে ধরলো ও। ফিসফিসিয়ে বললো,
– না। এখন আর সময় দেবোনা আপনাকে বরমশাই। আমাকে একাকী ফেলে যে এতোদিন বিদেশ ছিলেন, তার শাস্তি দিতে হবেতো নাকি?
– তাও ঠিক!
শানকে ছেড়ে আবারো ড্রেসিংটেবিলের কাছে গেলো মেহেরুন। শাওন ল্যাপটপ খুলে আড়চোখে দেখলো ওকে। বললো,
– তোমার দেবর কই মেহু? ডাইনিংয়ে দেখলাম না তাকে?
– কালরাতে মহোদয় তার প্রেমিকা উরফ হবু বউকে বার্থডে উইশ করতে গিয়েছিলো। সারারাত প্রেম করে সে এখন ঘুমোচ্ছে।
– মনে হচ্ছেনা শারাফ একটু বেশিই বউপাগল হতে চলেছে?
– বউটাই এমন ওর। পাগল করার মতো! স্নিগ্ধতা! নামটাই ওর পার্ফেক্ট বর্ণনা! কি বলো?
শাওন নিরবে ঘাড় বাকালো। মেহেরুন ড্রেসিংটেবিল ছেড়ে কাবার্ড গোছাতে ব্যস্ত। স্নিগ্ধতার সাথে ওর ভাইয়ের বর্ণনাটাও মাথায় ঘুরছে শাওনের। তখনই ওর ফোনে ম্যাসেজটোন। চঞ্চলের ম্যাসেজ। শারাফের মা ডাক লাগালে মেহেরুন বেরিয়ে গেলো। শাওন উঠে দাড়িয়ে কল করলো চঞ্চলকে। কল রিসিভ করে বড়সড় সালাম দিলো চঞ্চল। বললো,
– কেমন আছেন ভাই?
– ভালো। ওদিকে সব?
– জ্বী ভাই। সব ঠিকঠাক। ড্রাগগুলো ঠিকমতো বর্ডারক্রস করেছে। এখন শুধু আমাদের রিসিভ করা লাগবে।
– গুড।
– আপনি আসবেন আর সব ঠিক থাকবে না, তা কি করে হয় বলুন? আপনি ভাই জিনিয়াস! কিকরে যে সবদিক সামলান না ভাই..!
শাওন চুপ রইলো। চঞ্চলের কল করার উদ্দেশ্যই ওকে তেলানো, তা ঠিকই টের পেলো ও। বললো,
– ছাত্রীহলে গিয়েছিলি?
চঞ্চল আটকে যায়। একটু থেমে বলে,
– ন্ না ভাই। ত্ তবে…
– সোজাভাবে বল!
– মাল হাতে পাওয়ার কথা শুনে ছেলেপেলেরা এখন একটু বায়না করছে ভাই। তাই বলছিলাম কি…
– নতুন মেয়েরা এসেছে?
– গতকালই এসেছে।
আবারো দুদন্ড চুপ থাকলো শাওন। কিছু একটা ভেবে বললো,
– ঠিকাছে। কাল থেকে যাস। ছেলেদের বলিস আর কোনো সমস্যা হবেনা।
শাওনের কথা শুনে লোলুপ চোখজোড়া চকচোখ করে ওঠে চঞ্চলের। আবার অনেকগুলো দিন পর সেই আগের মতো৷ নতুননতুন সঙ্গ পাওয়ার বাসনা মস্তিষ্কে বহমান হয়। কতোদিন পর আবারো ছাত্রীহলে যাবে ওরা! নারীসঙ্গ উপভোগ করবে, ক্ষমতা জাহির করবে! খুশিমনে কল কাটতে গিয়েও থামলো চঞ্চল। বললো,
– ও ভাই? তারেক ভাইয়ের নাম্বার অফ কেনো? কিছু জানেন আপনি?
– হুম। আমাকে টেক্সট করেছিলো। ওর বউ নাকি ওকে কোনোবিষয়ে সন্দেহ করছে। কয়েকদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখতে বলেছে। ভাবিস না এতো।
– আচ্ছা ভাই। স্লামালাইকুম।
ফোন কাটে চঞ্চল। কিন্তু শাওনের মাথায় একসাথে কয়েকটা বিষয় নাড়া দেয়। আপাতত সবটা মিটে গেলেও তারেকের ইউআরএল হ্যাক, এ্যারেস্ট হওয়া, আর এখন এমন ম্যাসেজের করে গায়েব হওয়া, এ বিষয়গুলোর কোনোটাকেই নজরান্দাজ করতে পারছে না ও। চঞ্চলকে তো বলে দিলো নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে। তারপরও ভেতরেভেতরে একটা ছোটখাটো খটকা লাগছে ওর। এতোদিনের ব্যবসা প্রথমবারের মতো আটকে দিতে হয়েছিলো। হিসাব করতে গেলে, কারন হিসেবে একজনের নামই আসে৷ আর তার জন্য সবদিক বিগড়ানোর পথে যাবে, তা কখনো মানতে পারবে না ও৷ কিন্তু একবার যখন ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, আগের মতো কি সাবলীল হবে আর সেটা? কোনোভাবে সবটা বিপরীতে চলে যাচ্ছে নাতো? শাওনের কপাল বেয়ে ঘাম গরায়।
•
সাইফ বড়সড়কটায় গাড়ি থামালো। ভেতরের গলিতে গাড়ি ঢুকবে না। মাথার টুপিটা ঠিকমতো পরে ও হনহনিয়ে এগোলো বস্তির রাস্তায়। সাথে আরো দুটো কনস্টেবল। আবছা আলোর গলিতে কিছুটা এগোতেই আসতেই বিদঘুটে গন্ধে নাক চেপে ধরলো ওরা দুজন। কিন্তু সাইফ টললো না। একই গতিতে এগিয়ে ময়লার স্তুপটার কাছে ভিড়লো ও। বস্তির মানুষজন জায়গাটা ঘিরে দাড়িয়ে আছো। গন্ধে সবারই নাকমুখ ঢাকা। আরেকজন কনস্টেবল আগে থেকেই ছিলো সেখানে। সাইফকে দেখে রুমাল নাকে রেখে ছুটে আসলো সে। সাইফ হাতমুঠো করে স্তুপের সামনে দাড়ালো। বস্তার খোলা মুখ দিয়ে একটা হাত বের হয়ে আছে। উল্টোপিঠে নখ উপড়ানো। সেটা দেখেই সাইফের চোয়াল আরো শক্ত হয়ে আসলো। হোক না হোক, এটা সেই সিরিয়াল কিলারেরই সপ্তম খুন। আর হাতটা অন্য কারো নয়, নিখোজ হওয়া তারেকের। ফরেনসিকের লোকেরা গিয়ে বস্তাটা বেডে তুললো। সাইফ শান্তভাবে কন্সটেবলকে বললো,
– বস্তা ছুয়েছে কেউ?
– না স্যার। আপনার কথামতো আমি দুরে থাকতে বলেছি সবাইকে। এমনিতেও গন্ধে কেউ এগোয়নি।
সাইফের দৃষ্টি বস্তার দিকেই। ওটার মুখ খোলাই ছিলো। দুজন মিলে ভেতর থেকে হাত ধরে টান লাগালে কনুই থেকে শুধু হাতটাই বেরিয়ে আসলো। আশেপাশের লোক কলরব করে উঠলো সেটা দেখে। সাইফ ফরেনসিকের দুজনকে ইশারা করলো বস্তাটা এ্যাম্বুলেন্সে তুলতে। ওরা করলোও তাই। সাইফ আবারো কনস্টেবলকে বললো,
– বস্তাটা সবার আগে কে দেখেছে?
– স্যার গন্ধটা নাকি দুদিন আগে থেকেই ছিলো। এমনিতেও এটা ময়লার স্তুপ আর পাশে ট্যানারি আছে বলে কেউ সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। বস্তাটাও ছিলো মুখবাধা। কিন্তু গন্ধ বাড়লে ব্যাপারটা ঘোলাটে লাগে সবারই। কয়েকটা টিনেজার ছেলে বিকেলবেলা খেলতে এসে হাতটা খেয়াল করে। বস্তার মুখের ছিন্নভিন্ন অবস্থা। কুকুর বেড়ালেই কেটেছে মনেহয়।
আশপাশ দেখে, খোজ নিয়ে পুলিশস্টেশন ফিরলো সাইফ। কিন্তু কেবিনে ঢুকতেই গতি কমে গেলো ওর। ভেতরে চেয়ারে ইন্সপেক্টর আফজাল বসে। সাইফ নিজেকে সামলে আগালো। স্যালুট করে দাড়ালো সোজা হয়ে৷ ইন্সপেক্টর আফজাল উঠে দাড়ালেন। স্পষ্টভাবে বললেন,
– ওয়ার ইউ ওয়েটিং ফর দিস সাইফ?
সাইফ মাথা নিচু করে নিলো। অফিসার আরো উচ্চস্বরে বললেন,
– আন্সার মি সাইফ! ইউ আর আন্সারেবল টু মি! ইউ উইল হ্যাভ টু আন্সার! এটারই অপেক্ষা করছিলে তুমি? হু?
সাইফ চোখ তুললো। বললো,
– আ্ আ’ম সরি স্যার। বাট দিস কিলার…
– আমার কোনো ব্যাখা চাইনা সাইফ। আই ওয়ান্ট আন্সার! জবাব চাই আমার! একটা মার্ডার কেইসকে হাতিয়ে তুমি সিরিয়াল কিলিং কেইস প্রমাণ করেছো। তিনবছর আগের খু’নের মামলা রিওপেন করিয়েছো। তারপর এতোগুলো দিন যাবত সবগুলো কেইস স্টাডি করে কি পেলে? তাদের মাঝে মিল আর কানেকশন ছাড়া আর কিছু করতে পেরেছো? এই খুনির বিষয়ে কোনো তথ্য জানতে পেরেছো? পেরেছো?
…
– তুমি কেইস হাতে নেওয়ার পরও একটা সনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খু’ন হলো। একটা ডাক্তার৷ আর এখন বোধহয় একজন বিশিষ্ট ইন্জিনিয়ার। যদি এমনভাবে খুনগুলো চলতেই থাকবে, দেন হুয়াট আর ইউ ডুয়িং সাইফ? কি করছো টা কি তুমি? হোয়ার ইজ দ্যা প্রোগ্রেস? তুমি কি জানোনা আমাকেও ওপরমহলে জবাবদিহি করতে হয়? জানোনা?
ভদ্রলোক অস্থিরচিত্তে অনর্গল বলে নিজের কপাল চেপে ধরলেন। টু শব্দটাও করলো না সাইফ। সত্যিই কোনো জবাব নেই ওর কাছে। খু’ন গওয়া মানুষজনের জীবনী, খু’নের উপায় আর খু’নির ডিএনএ, এছাড়া কিছুই হাত লাগেনি ওর। আর এগুলো ওর কোনো কাজেও আসেনি। ইন্সপেক্টর আফজাল একটু শান্ত হয়ে বললেন,
– আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কেইসটা তোমার কাছ থেকে নিয়ে অন্যকাউকে হ্যান্ডওভার করবো।
সাইফ বিস্ফোরিত চোখে তাকায়। বিস্ময়ে বলে,
– কি বলছেন আপনি স্যার?
ভদ্রলোক সামনে বিয়ের কার্ড তুলে ধরলেন। সাইফ দেখলো ওটা শারাফ-স্নিগ্ধতার বিয়ের কার্ড৷ প্রফেসর নাহিদ নিশ্চয়ই দাওয়াত করেছেন ওনাকে। ইন্সপেক্টর আফজাল বললেন,
– তুমি নিজের বোনের বিয়েতে মন দাও সাইফ। আর কেইস তো আজীবন এমন আনসলভ রাখা সম্ভব না। আমি অন্যকাউকে বেছে নেবো কেইসসলভ করার জন্য কেইসডিটেইলস এ টু জেড একসাথে করে দুদিনের মধ্যে জমা দেবে আমাকে। গুডডে।
– দুদিনের মধ্যে আপনার টেবিলে খু’নির পরিচয় থাকবে স্যার।
ইন্সপেক্টর আফজাল চলে আসছিলেন। সাইফের শক্তপক্ত গলা শুনে দরজায় থামলেন উনি। সাইফ আরো জোরালো গলায় বললো,
– আপনার বলা সময়ে এই কেইস না, আমি খু’নির পরিচয় আপনাকে হ্যান্ডওভার করবো স্যার। আই প্রমিস ইউ দ্যাট। গুড ডে!
একপলক সাইফকে দেখে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন অফিসার আফজাল। সাইফ বুঝলো ওর পুরো শরীর রাগে কাপছে। চোখ ভরে উঠেছে। পুলিশস্টেশনে একমুহুর্ত না দাড়িয়ে ফরেনসিকে চলে আসলো ও। আর এসে যা দেখলো, তাতে আরেকদফায় মাথা ঘুরে উঠলো ওর। ফরেনসিক টিম নিশ্চিত করেছে, বডিটা তারেকেরই৷ কিন্তু বডিকে বডি বলার উপায় নেই। হাত পায়ের মোট ছয়টি টুকরা করা হয়েছে। মাথা আলাদা করা। ফরেনসিকের একজন তারেকের ওপর হওয়া সমস্ত অত্যাচারগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে বললো সাইফকে। এটাও জানালো, তারেকের খু’নীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট আগের সিরিয়াল কিলারের সাথে ম্যাচ হয়েছে। সাইফ চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। চারবছরের চাকরীজীবনে এতো ভয়ংকর মৃত্যু দেখেনি ও। আগের খু’নগুলোর সাথে তারেককে অত্যাচারে বেশ পার্থক্য রাখা হয়েছে৷ তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে ফেললো সাইফ। এই পার্থক্যের মাঝে একটা প্রশ্ন আছে। তারেকের সাথে আলাদা করে এমন শত্রুতা কার? তার জবাব একজায়গাতেই ঠেকলো, তারেকের ইউআরএল হ্যাকারের। আর তার সন্ধান ওকে একজনই দিতে পারে। আরাফাত!
#চলবে…

