নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৭৩.

0
1

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৭৩.

বেলা বাড়ার সাথে গরমের তীব্রতা বেড়েছে। মধ্যদুপুরে মাথার ওপরে থাকা সূর্যটার রোদের চেয়ে উষ্ণতা যেনো কয়েকশগুন বেশি। রোদ কম পেয়ে যেনো সূর্যের খুব নিকট দিয়ে কয়েকবার পাক লাগালো একটা চিল। মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ পরিবেশ সবুজ ধারবিশিষ্ট পিচঢালা রাস্তায়। আর সে রাস্তার কিনারে দাড়ানো দুই মানব-মানবী। কালো টিশার্ট পরিহিত বলিষ্ঠদেহী যুবক চোখ বন্ধ করে তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে যুবতীকে। টিশার্টের হাফহাতার জন্য যুবকের হাতের রগবহুল পেশি দৃষ্টিগোচর হয়। তার জড়িয়ে ধরার ভঙিমা যেনো বলে ওঠে, সে বোধহয় বেচে থাকাকে আঁকড়ে ধরেছে। যুবতীর নাক তার বুকে ঠেকানো। হাতজোড়া নামানো। দৃষ্টিও নত। কয়েকমুহুর্তের ব্যবধানে অনড় থেকে কেবল ঘাড় ঘুরায় সে৷ ডানদিক বরাবর রিভলবার তাক করে দাড়ানো ব্যক্তিকে দেখে চোখ ভরে ওঠে তার। আর সে ব্যক্তি দৃঢ় আওয়াজে বলে ওঠে,

– আত্মসমর্পণ করো য়্যুমু।

স্নিগ্ধতা বুকে আটকে থাকা দম ছাড়ে। ওর চোখও যেনো ছাড় পায়। দুচোখ বেয়ে কয়েকফোটা জল বেরিয়ে আসে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে। সাইফ শারাফকে অনড় দেখে সামনে থেমে থাকা দুটো গাড়ির দিকে এগোলো। একটার জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই মুষড়ে যাচ্ছিলো ও। ফ্রন্টসিটে বসা অবস্থায় ওপরের দিক তাকিয়ে আছে আরাফাত। ওর চোখ খোলা, মুখ কিঞ্চিত হা হওয়া, দেহ স্থির। বোঝা যাচ্ছে, শ্বাসটাও অবশিষ্ট নেই। থুতনির কিছুটা নিচেই বু’লেটের হানা দেওয়া ছিদ্র। আর মাথার মাঝ বরাবর র’ক্তাক্ত গর্ত। বোঝাই যাচ্ছে, থুতনি হয়ে, মাথার ঠিক মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে সে বুলেট। সাইফ দাঁতে দাঁত চেপে যায়। শারাফ গত রাতেই ওকে শাওনের সব কুকর্মের প্রমাণসমেত দুটো ফাইল পাঠিয়েছিলো৷ সেখানে আরাফাতের সংশ্লিষ্ট থাকারও প্রমান আছে। যাকে এতোভালো বন্ধু ভেবেছিলো, সেই আরাফাতের ভেতরের এতো জঘণ্য মানসিকতার সাথে এইভাবে সাইফের পরিচয় হবে, ও কখনো কল্পনাও করেনি সেটা। ড্রাইভিং সিটে পরে থাকা রিভলবারটা রুমালে মুড়িয়ে পকেটে গোজে সাইফ। আবারো শারাফ-স্নিগ্ধতার দিকে এগোয়। হাতের রিভলবার ঠিকঠাক স্নিগ্ধতার দিকে ধরে বললো,

– লিভ হার শারাফ। তুমি যাকে ভালোবেসেছো, ও সে নয়! টুকি নয় ও। একটা ঠকবাজ ও। আমার কেইসসহ মোট তেরোটা খু’নের আসামী ও। একটা খু’নী।

শারাফ চোখ খুললো না। আবেশে, আরো শক্তকরে স্নিগ্ধতাকে জরিয়ে ধরে, শান্তভাবে বললো,

– অনেকবেশি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম স্নিগ্ধতা। অনেকবেশি!

স্নিগ্ধতা বিস্ময়ে মাথা তুলে তাকায় শারাফের দিকে। এখনো এই মানুষটা ওকে নিয়ে ভয় পাবার কথা বলছে। এতোটাও ভালোবাসা তো ওর প্রাপ্য না। একপলক আরাফাতের মৃতদেহটার দিকে চাইলো স্নিগ্ধতা। ভয় তো ওউ করেছে শারাফকে নিয়ে৷ যদি গাড়ির ঘুর্ণনের সময় আরাফাতের হাতকে ওরই গলায় আটকে না দিতো, তাহলে যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারতো। কেননা সরে গিয়ে আরাফাতের নিশানা থেকে ও নিজে পারলেও, শারাফের প্রাণঝুকি ছিলো। বরাবর বিপরীতের গাড়িটায় শারাফ ছিলো। তাই কোনোরুপ ঝুকি নেয়নি স্নিগ্ধতা। সরে যাওয়ার পরিবর্তে আরাফাতের টালমাটাল হাতকে ওরই থুতনিতে আটকে দিয়েছিলো ও। কোথায় শুট করছে সেটা ভাবার সময় নেয়নি আরাফাত। অবস্থা ভাবার মতো স্থিতি ছিলোও না ওর। নিজের হাতে নিজেই খু’ন হয়েছে ও৷ শারাফের কথায় হয়তো সাইফও নমনীয় হতে চেয়েছিলো। পারলো না। শক্ত কন্ঠে বললো,

– ওকে ছাড়ো শারাফ।

শারাফ চোখ মেলে। স্নিগ্ধতাকে ছেড়ে ওর হাত ধরে। স্পষ্ট গলায় বলে,

– ইহজীবনে না।

নিস্প্রভ উত্তর। সাইফ চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিলো। নিজেকে সামলে বললো,

– ভোররাতে রত্নপুরে শাওনের গোডাউনটা ও জ্বালিয়ে দিয়েছে। তোমার ভাই শাওনসহ আরো চারজনের বিগলিত লা’শ পাওয়া গেছে সেখানে।

সাইফের কথাটা যেনো শারাফের বুকে তীরের মতো বেধে। স্নিগ্ধতার হাত মুঠো করে রাখা ওর হাত নমনীয় হয়ে আসে। স্নিগ্ধতা চোখ তুলে পাশে তাকালো। তবে শারাফ ওর দিক তাকায়নি। স্নিগ্ধতা এবারে হাতের দিকে তাকিয়ে মনেমনে আওড়ালো, ‘ছেড়ে দাও শারাফ। তোমার ভাইসহ অনেকে খু’ন হয়েছে এই হাতে। এই কলঙ্কিত হাত, আর একমুহূর্ত ধরে থেকো না। ধরে রাখতে চেও না। ছেড়ে দাও!’ সেকেন্ডের ব্যবধানে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো স্নিগ্ধতা। ছেড়ে দেবার পরিবর্তে, ওর হাত আরো শক্তমুঠো করে ধরেছে শারাফ। সাইফের নজর এড়ানি তা। ও রিভলবারটা নামিয়ে বললো,

– ওকে আইনের কাছে সমর্পিত হতেই হবে শারাফ। তুমি কিছুই করতে পারবে না এখানে। একটা দুটো নয়, সর্বমোট সতেরোটা খু’নের আসামী ও। শি ইজ আ কোল্ড ব্লা’ডেড মা’র্ডারার।

– নট মা’র্ডারার, শি ইজ অনলি সিক মিস্টার এহমাদ। এখানে আপনার আইনের কিছু করার নেই। এটা ইয়াকীন শারাফেরই কাজ। আর ও ইয়াকীন শারাফের।

শারাফের অসম্পর্কিত কথায় সাইফের রাগ হলো। প্রকাশ না করে চুপচাপ প্যান্টের পেছন থেকে হাতকড়া বের করে স্নিগ্ধতার হাতের দিক হাত বাড়ালো ও। আর শারাফ স্নিগ্ধতাকে টেনে সরিয়ে দিয়ে, ওদের মাঝে এসে দাড়ালো৷ সাইফ বললো,

– আমাকে কেনো রিয়্যাক্ট করতে বাধ্য করছো? মিসবিহেভ করতে চাইছি না আমি তোমার সাথে।

– ও আমার বউ মিস্টার এহমাদ। আপনি ওকে এ্যারেস্ট করতে আসবেন, আর আমি চুপ থাকবো, সেটা কেনো ভেবে নিয়েছেন?

সাইফের রাগ প্রকট হয়। শাওন দোষী। কিন্তু তা বলে ভাইয়ের হত্যাকারীর প্রতি শারাফের ক্ষোভ থাকবে না, স্ত্রী বলে স্নিগ্ধতার সমস্ত অন্যায় মেনে নেবে, সবচেয়ে বড় কথা যে স্নিগ্ধতা নয়ই, বরং য়্যুমু, যে কিনা সবাইকে ঠকিয়েছে, তাকে সমর্থন করবে, এটা যেনো সাইফের রন্ধ্রের র’ক্তকে অগ্নিসম উষ্ণ করে তুললো। ও রাগ নিয়ে উচ্চস্বরে বললো,

– পাগল হয়ে গেছো তুমি? সজ্ঞানে আছো তো? বুঝতে পারছো না তুমি কাকে ডিফেন্ড করছো? টুকি সেজে এতোগুলো দিন আমাদের সবাইকে ঠকিয়েছে ও! এতোগুলো খু’ন করেছে! আরাফাত আর তোমার ভাইকে খু’ন করেছে! যেমনই হোক, ওরা তোমার ভাই আর বন্ধু ছিলো! আর ও তাদেরই খু’নী!

– ওদের পাপের চেয়ে ওদের সাথে আমার সম্পর্কটা বড় হলে, স্নিগ্ধতার কাজের চেয়ে আপনার ওর সম্পর্কটা কেনো বড় নয় মিস্টার এহমাদ?

সাইফ আটকে যায়। তারপর কঠোর কন্ঠে বলে,

– ঠিকই বলেছো তুমি। সম্পর্কটা বড় নয়, পাপটা বড়! আর ওর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!

শারাফ কিছু বলতে যাবে, স্নিগ্ধতা ওর পেছন থেকে এগিয়ে এসে নিজের ডানহাত তুলে ধরলো। ঠোটে অদ্ভুত হাসি রেখে, ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বললো,

– ঠিক বলেছেন। কোবো সম্পর্ক নেই আমাদের। এ্যারেস্ট মি মিস্টার এহমাদ।

শারাফ তখনো ওর বা হাত ধরে। স্নিগ্ধতা পেছন ঘাড় ঘুরালো। শারাফকে আকুলভাবে বললো,

– লিভ মি শারাফ।

শারাফ ছাড়লো না। বরং স্নিগ্ধতার ডানহাত নামিয়ে, একপা এগিয়ে সাইফকে বললো,

– মিস্টার এহমাদ ও স্নিগ্ধতা-ই! য়্যুমু না! আর এই খু’নগুলো ও ইচ্ছাকৃতভাবে করেনি। এটা ওর মানসিক অসুস্থতা। শি হ্যাজ মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার। চারবছর আগের এক্সিডেন্টের জন্য ও নিজেকে দায়ী করতো। বাবা মা হারানোর ট্রমা, তারপর য়্যুমুর ডায়রী পেয়ে ওর সাথে হওয়া দুর্ঘটনার সম্পর্কে জানা, এই দুটো বিষয় অনেকবেশি ইফেক্ট করে ওর ওপর। আর ও…

সাইফ শারাফের প্রথম দু বাক্য শুনলেও পরবর্তি কথাগুলো শুনলো না। শারাফকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

– যা-তা বলছো তুমি শারাফ! এই মেয়ে তোমাকেও নিজের মায়ায় ফাসিয়েছে। হুশ হারিয়েছো তুমি!

– হুশে আপনি ফিরুন মিস্টার এহমাদ। সারিকার বর্ণনায় করা খু’নীর স্কেচে স্নিগ্ধতাকে দেখে, আপনি তখন সাময়িকের জন্য দিশেহারা হতেই পারেন। স্নিগ্ধতার কথায় মেনে নিতে পারেন ও য়্যুমু, যে কিনা প্লাস্টিক সার্জারী করে স্নিগ্ধতা হয়েছে। ভুলে যেতেই পারেন মাত্র একসপ্তাহে একটা মানুষ পুরোপুরি বদলে যেতে পারেনা। তার গলার স্বর নকল করতে পারেনা। ভিনদেশী ভাষা এতো সহজে উচ্চারন করতে পারেনা। ট্রমায় আছি বলে সময় নিয়ে, কেউ কয়েকসপ্তাহের ব্যবধানেই অন্যের অবস্থান সামাল দিতে শিখে যায়না। কয়েকমাসের মধ্যে কেউ এমন পটুহাতের ড্রয়িং শিখতে পারেনা। সর্বোপরি একটা ব্যক্তিত্বকে হুবহু আয়ত্ব করতে পারেনা। কিন্তু এতোক্ষণে তো অনেকটাসময় পেরিয়েছে মিস্টার এহমাদ। মস্তিষ্ককে সচল করুন এবারে। তারপর নিজেকে প্রশ্ন করুন, ও কে? কার সাথে চারবছর একছাদের নিচে খুনশুটি, আদর, যত্নে কাটিয়েছেন আপনি? অচেনা য়্যুমু সাকলিক? নাকি আপনার আদরের বোন টুকি?

শারাফের এতোগুলো কথায় সাইফ এবারে দিশেহারা হয়ে পরে। ফাঁকা দৃষ্টিতে একবার শারাফের দিকে, তো একবার স্নিগ্ধতার দিকে তাকায়৷ স্নিগ্ধতা দ্রুততার সাথে বললো,

– শারাফ মিথ্যে বলে আমাকে ডিফেন্ড করতে চাইছে মিস্টার এহমাদ।

ওর হাত ধরে টান লাগায় শারাফ। মুখোমুখি দাড়িয়ে দাঁতে দাঁতে চেপে বললো,

– আর একটা মিথ্যেও না স্নিগ্ধতা! একটাও মিথ্যে না!

পরপরই নমনীয় হয় শারাফ। স্নিগ্ধতার একগাল ধরে বললো,

– যা হয়েছে, সবটা তোমার ডিসঅর্ডারের জন্য হয়েছে। এটা আমি আইন, আদালত, পুরো পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করে দেবো স্নিগ্ধতা। তোমার গায়ে কোনো আঁচ আসতে দেবো না আমি। শুধু তুমি আমাকে ছেড়ো না। অনেক ভালোবাসি তোমাকে! অনেক!

– সত্যিটা সত্যিই হয় শারাফ। মিথ্যে দিয়ে সেটাকে ধামাচাপা দেওয়া যায় না।

স্পষ্টস্বরে বললো স্নিগ্ধতা। গাল থেকে শারাফের হাতও সরিয়ে দিলো ও। তারপর সাইফের দিকে তাকিয়ে বললো,

– নিজের দায়িত্ব পালন করুন মিস্টার এহমাদ। পালিয়ে যাওয়ার আগেই এ্যারেস্ট করুন আমাকে। নয়তো আপনি জানেন, আমি চাইলে আপনার চোখকে কতোভাবে ধোকা দিতে পারি।

সাইফের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। স্নিগ্ধতার পালানোর কথা শুনে সব ভুলে ও রিভলবার তাক করে আবারো। শারাফ ওটা সরিয়ে দিলো। বললো,

– ও আমার স্ত্রী। কি প্রমাণের ভিত্তিতে আপনি ওকে এ্যারেস্ট করতে চাইছেন মিস্টার? আছে কোনো প্রমাণ? বা কোনো ওয়ারেন্ট পেপার?

সাইফ থেমে যায়। জবাব দিতে পারে না। ওর ফোনে চঞ্চলের খু’নীর যে ছবি ছিলো, তা অগ্নিলা ডিলিট করে দিয়েছে। সারিকার কথায় করা স্কেচটাও ওরা সরিয়ে ফেলেছে। ইন্সপেক্টর বাকের ওর কেইসের অব্যহতির কাগজ নিয়ে পুলিশস্টেশন গেছে, সে বিষয়েও ম্যাসেজ এসেছে ওর ফোনে। এতোক্ষণে অবশ্যই সে স্নিগ্ধতার বিরুদ্ধের প্রমান সরিয়েছে আর নিজের মতো করে সাজিয়েছে। এসব ঠিক করতে সময় চাই সাইফের। কিন্তু স্নিগ্ধতাকে এইমুহুর্তে এ্যারেস্ট না করলে ও না আবার হাতের বাইরে চলে যায়। এ চিন্তাও আছে। শারাফ বললো,

– ভবিষ্যতে প্রমান অথবা এ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ছাড়া, আমার স্ত্রীর দিকে রিভলবার কেনো, ফুলের টোকাটাও তাক করার সাহস করবেন না মিস্টার এহমাদ। ইয়াকীন শারাফ এই এক বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়নি। দেবে না।

শারাফ স্নিগ্ধতার হাত ধরে হাটা লাগাতে যাচ্ছিলো। মুখ খুললো স্নিগ্ধতা। বললো,

– মিস্টার আরাফাতকে আমি মে’রেছি মিস্টার এহমাদ। ওই রিভলবারে আমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে।

সাইফ তাচ্ছিল্যে হাসলো। শারাফের হাত থেকে স্নিগ্ধতার হাত ছাড়িয়ে দিলো নিজে। তারপর স্নিগ্ধতার দুহাতে হাতকড়া পরিয়ে শারাফকে বললো,

– কথা ছিলো, আমি নিজে আমার বোনকে তোমার হাতে তুলে দেবো। কিন্তু এই মেয়ে তোমার জন্য কলঙ্কস্বরুপ শারাফ। ও টুকি হলেও, ওর গায়ে লাগা এতোগুলো খু’নের কলঙ্ক কখনোই মোছার নয়। ওকে শাস্তি পেতেই হতো।

স্নিগ্ধতা ঘাড় কিঞ্চিৎ কাৎ করে, হাসিমুখ আর অশ্রুসজল নয়নে ভাইয়ের কথাগুলো শুনলো। পরে পাশে দেখলো, রাগে শারাফ হাত মুঠে করে নিয়েছে। বড়বড় শ্বাসের জন্য ওর বুকের ছাতি ওঠানামা করছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সাইফ বললো,

– তবে হ্যাঁ, যদি তোমার দ্বিতীয় কথাটা সত্যি হতো, যদি এমনটা হতো যে ও সত্যিই মানসিক অসুস্থতার দরুন এসব করেছে, তাহলে যেভাবেই হোক, আমি ওর গায়ে কোনো আঁচ আসতে দিতাম না। এদেশের আইনে মানসিক অসুস্থতাকে কোনো কারন হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না। আর আমি এই আইনের সমর্থক নই। ও টুকি হলে, আমি অবশ্যই তোমাকে নিজের এনালাইসিস আদালতে পেশ করার সুযোগ দিতাম। যে করেই হোক!

শারাফ স্নিগ্ধতা দিকে এগোলো। শুকনো ঢোক গিললো স্নিগ্ধতা। শারাফ জলভরা চোখে চেয়ে বললো,

– সবটা মেনে, শুধু একটা জিনিস চেয়েছিলাম তোমার কাছে। ‘কখনো আমাকে ছেড়ে যেও না।’ আর তুমি সেটাই চাইছো?

স্নিগ্ধতার চোখ বেয়ে দুফোটা জল গরায়। শারাফ একহাতে ওর ঘাড়ের চুল মুঠো করে ধরলো। চোখভরে দেখে নিলো সেই শুভ্র-স্নিগ্ধ মায়াবী মুখ, টাটাটানা চোখজোড়া, আর রক্তজবার মতো ঠোঁটের অধিকারীনিকে। তার ফর্সা পরনের কালো সালোয়ার কামিজ আজ মানানসই লাগছে না ওর কাছে। স্নিগ্ধতার হাতের রিনঝিন চুড়ির বদৌলতে হাতকড়া সহ্য হচ্ছে না ওর। বুকের ভেতরের ব্যথাটা আরোবেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই স্নিগ্ধতার চুল আরেকটু বেশি শক্তিতে চেপে ধরলো শারাফ। চোখ বন্ধ করে নিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওর অনেকটা কাছে এগিয়ে এসে ওর কপালে ঠোঁট ছোয়ালো। বললো,

– তোমার সব চাওয়া মানলেও, এ চাওয়া আমি মানবো না স্নিগ্ধতা। আমি তোমাকে ভালোবাসি।

স্নিগ্ধতা বড়বড় করে চোখ মেলে। ওকে ছেড়ে একপা পেছোলো শারাফ। সাইফকে বললো,

– আপনি যখন বাস্তবতা মানতে রাজি নন, তাহলে ডিএনএ টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করুন মিস্টার এহমাদ। আপনার, ডক্টর জেনেলা আর ওর ডিএনএ ম্যাচ করালেই ‘ও যে স্নিগ্ধতা, আপনারই বোন!’ সে সত্যিটা কাগজে কলমে চোখে পরবে আপনার। যেমনটা আপনি চাইছেন।

স্নিগ্ধতা বিস্ফোরিত চোখে চাইলো। শারাফ কোনোদিক না তাকিয়ে বললো,

– বাদবাকি সব প্রমাণও পেয়ে যাবেন আপনি। ওর ডিআইডি’র এনালাইসিস রিপোর্ট আছে আমার কাছে। যেটা আমার একার না, ওর প্রথম থেরাপিস্টসহ আরো দুজন ফরেইন ডক্টর, একজন রিসার্চারের হাতে করা।

– শারাফ!

আওয়াজ শুনে শারাফ স্নিগ্ধতার দিক ফিরেও তাকালো না। বরং সাইফকে কঠোরতার সাথে বললো,

– সেগুলো আনা অবদি, ওকে পুরোপুরি নির্দোষ প্রমাণ করা অবদি আমার প্রাণবায়ু আপনার কাছে আমানত রইলো মিস্টার এহমাদ। তার যেনো একচুল ক্ষতি যেনো না হয়! একচুলও না! ওর জন্য এতোদিন চুপ থেকেছি আমি। এতোকিছুর পর ওর কিছু হলে, আমি কিন্তু সব শেষ করে দেবো! সব!

শারাফের কথা শুনে সাইফের শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। শারাফ আরেকবার স্নিগ্ধতাকে দেখে নিলো। স্নিগ্ধতা এখন সাইফের সাথে থানায় যাবে ভাবতেই ওর কলিজাটা যেনো খামচে ধরে কেউ। তবুও নিজেকে বুঝিয়ে, গাড়ি নিয়ে দ্রুততার সাথে চলে গেলো ও। স্নিগ্ধতা থম মেরে দাড়িয়ে রইলো। শারাফের বলা প্রতিটি কথায় আরেকবার ডুব দেয় সাইফ। পুরোটায় কোথাও ভুল খুজে পায় না। আশায় কানায় কানায় ভরে ওঠে ওর বুক। সে বুক ওর আদরের বোনকে ফিরে পেতে চায়, আবারো জরিয়ে ধরতে চায়, টুকি বলে বলে ছুটতে চায় ওর পিছুপিছু, আদর করতে চায়। পাশের স্তব্ধ রমনীর দিকে আশাতুর চাওনিতে তাকালো সাইফ। স্নিগ্ধতা ওর হাতের হাতকড়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সাইফ কিছু বলার আগেই ও বিরবিরিয়ে বলতে লাগলো,

– আমি টুকি হলেও, আমার গায়ে লাগা এতোগুলো খু’নের কলঙ্ক কখনোই মোছার নয়। শাস্তি আমাকে পেতেই হবে। পেতেই হবে।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here