#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
হঠাৎ বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো আভিরার। বাবাকে তো সুস্থ সবল দেখে এসেছে। তবে হুট করে কী হলো? রাস্তা যেন আজ ফুরাচ্ছে না। দুই ঘণ্টার রাস্তা যেতে বোধ হয় চার ঘণ্টা লাগবে।
কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার প্রাইভেট লিমিটেড এর সামনে গাড়ি থামতে ভাড়া মিটিয়ে আভিরা উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দৌড় লাগায়। পথচারীদের অনেকেই তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সেদিকে মেয়েটার কোনো খেয়াল নেই। সে তো ছুটতে ব্যস্ত।
পরনে তার সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ। খবর শুনে বাসার জামা পরেই বেরিয়ে এসেছে। পাল্টানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। ওড়নাটাও মাথায় নেই। সেই কখন পড়ে গিয়েছে। চুলগুলো কোনোরকম আটকে রয়েছে। সেটাও খুলে যাবে, খুলে যাবে ভাব। ভিতরে ঢুকতে কারো সাথে ধাক্কা খেলেও থামল না মেয়েটা। পিছন থেকে ভেসে এলো কারো রাশভারী কণ্ঠস্বর।
– হেই ইউ! কীভাবে হাঁটতে হয় জানো না?
আভিরা পিছনে না ফিরে ধরা গলায় বলল,
– দুঃখিত!
কণ্ঠ শুনে পিছনের মানুষটা চমকাল বোধহয়। মেয়েটাকে দেখার সুযোগ অবধি পায়নি। চোখের পলকে যেন হাওয়া হয়ে গেল।
হাত ঘড়িতে সময় দেখল, সকাল সাতটা বেজে পাঁচ মিনিট। এত সকালে সে নিশ্চয় এখানে আসবে না। তার তো এখানে থাকার কথাও না। তবে কণ্ঠটা যে তার চেনা। এ কণ্ঠ চিনতে তার কোনো ভুল হবে না। তবে সে কি ভুল শুনল?
কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ে পুরুষটার। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ডায়াল লিস্টে থাকা প্রথম নাম্বারটিতে কল লাগাল। একবার রিং হয়ে তা কেটে যায়, ধরল না কেউ।
আবারও কল লাগায়। না কেউ কল ধরছে না। ঘুমাচ্ছে বোধহয়। শীতের সকাল। এত সকালে উঠার কথাও নয়।
মোবাইল পকেটে পুরে গলায় লাগানো স্টেথোস্কোপ খুলে চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। চোখ জ্বলছে। সারা রাত দুই চোখের পাতা এক করতে পারেনি। রাতে ওটি ছিল। শেষ করতে করতে ভোর পেরিয়েছে। ঘুমানোর সুযোগ পায়নি। বাড়িও যাওয়া হয়নি। হসপিটালেই পড়েছিল। একটু আগে বাহির থেকে এক কাপ রং চা খেয়ে এসেছে। তবুও ঘুমে চোখ জোড়া মুদে আসছে।
যান্ত্রিক মুঠো ফোনটা সশব্দে বেজে উঠেছে। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে আবার রেখে দিল। ভেবেছে যাকে একটু আগে কল দিয়েছিল সে হয়তো ফিরতি কল করেছে। কিন্তু না, কলদাতা সে নয়। কল এসেছে অন্য কারো নাম্বার থেকে। মা নিশ্চয় লাবণ্যকে দিয়ে কল করিয়েছে। মাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলের রুমে গিয়ে দেখেছে ছেলে আসেনি। তাই কল দিয়ে বসে আছে। এখন কল ধরলে লাবণ্য বলবে, খালা চিন্তা করছিল। রাতে বাড়ি এলে না যে?
সেও প্রত্যুত্তরে একটা কথায় বলবে। রাতে ওটি ছিল, ব্যস। আর কোনো কথা হবে না। সব তো জানা কথা। মা, লাবণ্য সকলে জানে রাতে বাড়ি না ফেরার কারণ। তবুও রাতে বাড়ি না ফিরলে নিয়ম করে কল আসবে। তবে আজ কল রিসিভ করে এক মিনিটও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। আধ ঘণ্টার মতো সময় আছে হাতে। ঘুমানোর জন্য এ আধ ঘণ্টায় যথেষ্ট।
_
রিসিপশন থেকে খোঁজ নিয়ে চতুর্থ তলার ৪০৪ নম্বর রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল।
ঐ তো বাবা শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ, সেন্স নেই? না কি ঘুমে মগ্ন? মা কোথায়? আশেপাশে চোখ ঘুরিয়েও মায়ের দেখা পেল না। আভিরা বাবার কাছে গিয়ে বসে। চোখ বুজে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। বাবার এ অবস্থা দেখে আভিরা কেমন যেন ছটফটিয়ে ওঠে।
ওয়াশরুমের দরজা খুলে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হলো আনেসা। মেয়েকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করল,
– একা এলি?
– হ্যাঁ।
আভিরার সোজাসাপ্টা জবাব।
– একা আসতে গেলি কেন? তোকে না বললাম আমি গিয়ে নিয়ে আসব।
– কখন আনতে? তুমি বুঝি বাবাকে এ অবস্থায় ফেলে আমায় আনতে যেতে?
– আজ না গেলে কাল যেতাম। তাই বলে তুই একা চলে আসবি? তোর বাবা যদি জানে এ কথা তাহলে কি রাগটাই না করবে। সে খেয়াল আছে তোর?
– আছে। কিন্তু বাবা জানবে কীভাবে? আমি তো বলব না। আর আমি জানি তুমিও বলবে না। তাছাড়া আমি আর ছোটো নেই। এ কয়েক ঘণ্টার রাস্তা আমার জন্য কিছুই না। এত চিন্তা যে কেন করো।
– তুই আমাদের চিন্তা বুঝবি না। ছেলেমেয়ে, বাবা মায়ের কাছে সবসময় ছোটোই থাকে বুঝলি।
– বুঝলাম।
– আচ্ছা মাকে কিছু জানাসনি তো? মা জানলে কিন্তু চিন্তায় শেষ হয়ে যাবে।
– না বলিনি, ঘুমে ছিল। জোনাকিকে বলে এসেছি। তাযীম কই?
– পাশের রুমে, ঘুমাচ্ছে। ছেলেটা সারা রাত কান্না করেছে। ভোরের দিকে ঘুমিয়েছে। চোখের সামনে তোর বাবাকে ছটফট করতে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
আভিরা জানে তার ভাই কেমন ভীতু স্বভাবের। একটুতেই ভয় পেয়ে কেঁদেকুটে অবস্থা বেহাল করে ফেলে। সে বার অঙ্কে ভুল হওয়ায় তোফায়েল আহমেদ একটা ধমক দিয়েছিল খালি। ব্যস, ধমক খেয়ে সে কী কান্না ছেলেটার!
ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেছে। আভিরা ওর কান্না দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। সামান্য ধমকে একটা মানুষ কীভাবে এত কান্না করতে পারে।
– আমি ওর কাছে গেলাম। তুমি বাবার কাছে থাকো। বাবার ঘুম ভাঙলে আমায় ডেকো কেমন।
– আচ্ছা ডাকব, তুই যা।
তাযীমের ফর্সা গোলগাল মুখটা লাল হয়ে আছে। নাকের ডগায়ও লালচে আভা। চোখের চশমাটাও খুলেনি। আভিরা সযত্নে চোখের চশমাটা খুলে ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাযীমের পাশে থাকা খালি জায়গাটাতে শুয়ে পড়ল।
তাযীমের ছোটো থেকে চোখে সমস্যা। চশমা ছাড়া ছেলেটা কিছুই দেখে না। আভিরা একবার তাযীমের চশমা চোখে দিয়েছিল। পুরোপুরি চোখে দেয়নি, তাতেই যেন দুনিয়া অন্ধকার ঠেকল। এ চশমা একদিন পরে থাকলে তার ভালো চোখ নষ্ট হতে বেশি সময় লাগবে না।
_
নার্সের ডাকে ঘুম ভাঙে। হঠাৎ ঘুম ভাঙার কারণে মাথায় প্রচণ্ড চাপ অনুভব হলো। ডানে বামে ঘাড় কাত করে দু হাতে মাথার চুল টেনে ধরল। না আজ ভালোই ভুগতে হবে তাকে। মাথা যন্ত্রণায় টেকা যাচ্ছে না। না ঘুমালেই বোধ হয় ভালো হতো। আধ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ব্যথা কমার বদলে আরও বেড়েছে যেন।
– স্যার।
নার্স আবারও ডাকতে উঠে দাঁড়ায়। সাড়ে সাতটার উপরে বাজে। দশ মিনিট দেরি করে ফেলল। রাউন্ডে যেতে হবে। কিন্তু ব্যথায় মাথার রগ ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। এক হাতে কপাল ঘষে সোজা বাইরে পা বাড়ায়। সিঁড়ি বেয়ে দোতলা, তিন তলার সবগুলো রুম চেক করে চতুর্থ তলায় উঠে গেল। ওর সাথে দুজন নার্সও আছে।
৪০৪ নাম্বার রুমে পরিচিত মুখ দেখে অনেকটা অবাক হলো।
খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,
– আন্টি আপনি, স্যারের কী হয়েছে? উনি এখানে মানে কখন কী হলো? কাল রাতেও না ঠিক ছিল।
– আরে নাওয়াজ যে, কী অবস্থা বাবা? কত বছর পর দেখলাম তোমায়।
– জি, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। তবে এখানে এভাবে দেখা হবে ভাবতে পারিনি। কী করে হলো এসব? আমাকে একবার জানাতে পারতেন।
– তোমার কথা একেবারে মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বুঝলে। বাড়ি ফেরার পর থেকে লোকটাকে কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বুঝে ছিলাম হয়তো কিছু হয়েছে। কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে, আমাকে বলো? না তিনি বললেন না।
মাঝরাতে ছটফটানির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। পাশ ফিরে দেখলাম মানুষটা বুকে হাত দিয়ে হাঁসফাঁস করছে। দেখে বুঝা যাচ্ছে বুকের ব্যথাটা বোধহয় বেড়েছে। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভয়ে কী করব না করব ভেবে পাচ্ছিলাম না।মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাযীমের রুমে গিয়ে ওকে ডেকে তুললাম। ছেলেটাও আমার ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ এমন দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। মা ছেলে মিলে বুড়োকে কোনোরকম হাসপাতাল অবধি টেনে নিয়ে এলাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল বুড়োকে হাসপাতালে না এনে বিছানায় পড়ে কাতড়াতে দেই। যাতে পরেরবার থেকে ছোটো বড়ো সব সমস্যার কথা আমায় বলে।
বলেই ভদ্রমহিলা হেসে উঠলেন। নাওয়াজও হাসল।
– সে জানে?
– খবর পেয়েই ছুটে এসেছে।
তখন তাহলে ভুল শুনেনি। মানুষটা সে ই ছিল।
– কোথায় সে?
নাওয়াজ ক্ষীণ স্বরে জানতে চাইল।
– তাযীমের সাথে পাশের রুমে।
– আমি এখন আসি তাহলে। বাকি রুমগুলোতে যাওয়া দরকার।
– আচ্ছা যাও।
– কোনো সমস্যা হলে আমায় জানাতে ভুলবেন না। সময় করে আমি স্যারকে এসে দেখে যাব।
নাওয়াজ বেরিয়ে নার্সদের উদ্দেশ্যে বলল,
– রুম নাম্বার ৪০৬ এ যান, আমি আসছি।
– কিন্তু স্যার আপনি…
– আপনারা যান, আমি আসছি।
– আচ্ছা।
বলে নার্স দুটো চলে যেতে নাওয়াজ ৪০৫ নাম্বার রুমে গিয়ে ভিতর থেকে দরজা আটকে দেয়।

