#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
নাওয়াজ একদম গোসল সেরে টেবিলে বসল। পরনে তার টাউজার, টি-শার্ট। হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরে সর্বপ্রথম গোসল সেরে নিবে। ছেলেটার রাত বিরাতে গোসল করার অভ্যাস। ভোর সকাল হোক বা রাত বারোটা, একটা গোসল তাকে করতে হবেই। হাত মুখ ধোয়াতে তার হয় না। কেমন যেন মনে হয় কোথাও ধুলোবালি বা ময়লা লেগে আছে। হসপিটালে থাকে সারাদিন, শরীরে কত রকমের জীবাণু লাগে তার ঠিক নেই। গোসল না করলে হবে। তাছাড়া শরীরটাও যেন কেমন ম্যাজম্যাজ করে। মনে হয় গোসল না করা অবধি শান্তি মিলবে না।
লাবণ্য খেতে খেতে নাওয়াজকে পরিলক্ষিত করল বার কয়েক। এই যে চোখ মুখ কুঁচকে নিচ্ছে, ঠিকমতো খাচ্ছে না। কী কারণে? খাবার ভালো হয়নি না কি? কই না তো।
সে তো খাচ্ছে, ভালোই হয়েছে। আর আজ তো নাওয়াজের পছন্দের সবজি খিচুড়ি করা হয়েছে। তবে এমন করার কারণ কী? লাবণ্যর ব্যাপারটা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগল না। খেতে বসে এমন করাতে লাবণ্য ভেবেছিল হয়তো রান্না খারাপ হয়েছে। কিন্তু ওর আগেই বুঝা উচিত ছিল রান্না খারাপ হলেও এমন করার মানুষ নাওয়াজ না।
মাঝেমধ্যে রান্নায় লবণের পরিমাণ বেশি হয়। আবার কখনো বা দেখা যায় পর্যাপ্ত পরিমাণে লবণ হয়নি। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ঝাল হয়েছে। কখনো আবার খাবার মুখে দেওয়ার মতো হয় না। শত চেষ্টা করেও রান্নায় দোষ ক্রটি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কটাক্ষ করে কথা বলা কিংবা দোষারোপ স্বরূপ আজেবাজে কটূক্তি করা বেমানান। খাবার খারাপ হলেও তা কখনো বলতে নেই। অনেক পুরুষ গলাবাজি করে খাবার খেতে খারাপ হলে তেজ দেখিয়ে উঠে যায় কিংবা তা ছিটকে ফেলে দেয়। এসব নিতান্তই তার নির্বোধতার পরিচয়। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষ কখনোই এমন বিকৃত আচরণ করতে পারে না।
আমাদের প্রিয় নবী করীম (সা.) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) কখনো খাবারের দোষ ক্রটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন আর অপছন্দ হলে খেতেন না।
(বুখারি, হাদিস নং: ৫১৯৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৩৩৮২)
নিজের পছন্দের রান্না হওয়া সত্ত্বেও আজ বেশি খেতে পারল না। অল্প সময়ে খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।
মায়ের আঁচলে মুখ মুছে বলল,
– মা আমি ঘুমাব। দুপুরে ডেকে দিও।
ইয়াজমীন ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
– তোর তো আজ সন্ধ্যার আগে কাজ নেই তাহলে?
– কাজ আছে। তাছাড়া তোফায়েল স্যার অসুস্থ। আমার হসপিটালে ভর্তি। ওনাকে দেখতে যেতে হবে।
– সে কিরে, কবে হলো এসব? আমায় আগে বলিসনি কেন?
– আমি নিজেই তো জানতাম না। সকালে রাউন্ডে বের না হলে মনে হয় জানা হতো না।
নাওয়াজের কণ্ঠে আক্ষেপ। আসলেই কী রাউন্ড এ বের না হলে জানতে পারত না? জানত না কেন? হয়তো জানত তোফায়েল আহমেদ বাড়ি ফেরার পর নয়তো সুস্থ হওয়ার পর তার কানে খবর যেত। তবে একেবারে অজানা থাকত না।
– ভাইজানকে দেখি না কত বছর হলো। হাসপাতালে যেহেতু আছে একবার দেখতে যাওয়া উচিত।
– যাবে?
– অসুস্থ মানুষ, তাও তোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। না গেলে হয়। তাছাড়া এ উসিলায় মানুষগুলোকে চোখের দেখাও হয়ে যাবে। অনেক বছর তো হলো দেখা হয় না।
– আচ্ছা আমি যাওয়ার সময় নিয়ে যাব। তৈরি হয়ে থেকো।
_
– আসব?
– এসো।
– তোমার কফি।
– কফি কেন?
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল নাওয়াজ।
– তোমার বোধহয় মাথা ব্যথা করছে।
– বুঝে গেলে?
লাবণ্য হাসল। এ লোকের মুখ দেখে সে কিছু বুঝবে না তা কী হয়। হঠাৎ অদ্ভুত কথা বলে বসল,
– হ্যাঁ। চুল টেনে দেবো?
লাবণ্যর কথায় ভ্রুকুটি হলো নাওয়াজের। লাবণ্য এমন কথা কখনো বলে না। হুট করে এমন কথা বলাতে বিব্রত বোধ করে নাওয়াজ। তবে তা প্রকাশ করল না। অথচ এমন কথার প্রেক্ষিতে নাওয়াজের নয় বরং লাবণ্যর চেহারায় অস্বস্তি হানা দেওয়ার কথা। কিন্তু মেয়েটার চোখ মুখে তেমন অপ্রস্তুত ভাব নেয়। সে যেন জেনে বুঝে স্বইচ্ছেই এমন একটা কথা বলেছে।
এ মেয়ের হয়তো মাথা ঠিক নেই। নয়তো এমন কথা বলবে কেন? সে তো আর ছোটো নেই যে তার মাথার চুল টেনে দেবে। তাহলে এমন কথা বলার কারণ?
নাওয়াজ এ নিয়ে খুব একটা ভাবতে গেল না। মা তো প্রায় তার মাথা ব্যথা করলে চুল টেনে দেয়। সে হিসেবে হয়তো এ কথা বলে ফেলেছে। লাবণ্যর অবুঝপনা দেখে নাওয়াজ সামান্য হাসল। অথচ চোখ তুলে তাকালেই বুঝা যেত লাবণ্য মোটেও অবুঝপনা করে এ কথা বলেনি।
লাবণ্যর জায়গায় ছোটো কেউ হলে হয়তো নাওয়াজ মানা করত না। আসলেই তার অনেক মাথা ব্যথা করছে। কেউ চুল টেনে দিলে মন্দ হয় না। কিন্তু তাই বলে লাবণ্য। নাওয়াজ এ কথা ভাবতেও পারে না। হাতে কফির মগ তুলে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় বলল,
– না। কফিতে কাজ হয়ে যাবে।
এমন কথায় লাবণ্য সন্তুষ্ট হলো না। তার খুব করে বলতে ইচ্ছে হলো দেই না। দিলে কী এমন হবে? সবসময় এমন এড়িয়ে কেন চলো? তোমার এমন এড়িয়ে চলা আমার সহ্য হয় না। তবে জরতার কারণে বলে উঠতে পারল না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল,
– আচ্ছা আমি গেলাম। কোনো সমস্যা হলে জানিও।
– ওকে।
_
লাবণ্য গেল না। রুমের দরজা ভিড়িয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
নাওয়াজ কফির মগ সাইড করে কপালে হাত রেখে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। এক পায়ের উপর অন্য পা উঠানো।
লোমশ পায়ের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। লাবণ্যর চোখ জ্বলে উঠল। ছুঁয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগল মনের মাঝে। চকচক চোখে তাকিয়ে রইল।
নাওয়াজ ঘুমিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। লাবণ্য আস্তে ধীরে রুমে পা বাড়ায়। খুব সাবধানে পা ফেলল যাতে কোনো শব্দ না হয়। এতটা ধীর গতিতে কারো কান অবধি পৌঁছাতে ব্যর্থ। আলতো করে কফির মগ হাতে নেয়। পুরোটা শেষ করেনি। অর্ধেকটা পড়ে রয়েছে।
নাওয়াজ যে জায়গায় চুমুক দিয়েছে ঠিক সে জায়গায় ঠোঁট ছোঁয়াল মেয়েটা। মুহূর্তেই পুরো শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে। আবেশে চোখে বুজে নেয় লাবণ্য। যেন কোনো অমৃতের স্বাদ নিচ্ছে। অমৃতই তো। এর কাছে যেন অমৃতও হার মানাবে।
নাওয়াজ কখনো অর্ধেক কফি খায় না। সর্বদা পুরোটা শেষ করে কফির মগ লাবণ্যর হাতে ধরিয়ে দেয়। লাবণ্যর তখন সে কী রাগ হয়! সবটা শেষ কেন করতে হবে? একটু আধটু রেখে দিলে হয় না।
রাগ হলেও সেটা বাইরে প্রকাশ করে না। মেয়েটার যেন রাগ দমনের অদম্য ইচ্ছা শক্তি আছে। যাইহোক না কেন রেগে যায় না সে। ঠান্ডা মাথায় সবটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। নিজের অবস্থা কখনো অন্যকে উপলব্ধি করার সুযোগ দেয় না। এমন মানুষগুলো বড্ড ভয়ঙ্কর হয়।
আজ তার ভাগ্য প্রসন্ন হলো। এ নিয়ে দুইবার এমন কাজ করেছে। শেষবার পাঁচ বছর আগে কলেজে থাকতে এমন করেছিল। তখন সে কী ভয়ে ছিল! যদি কেউ দেখে নেয়।
নাওয়াজের কাছে যদি ধরা পড়ে যায়। অনেকটা সাহস নিয়ে তখন অমন দুঃসাহসিক কাজ করেছিল। তবে তখনকার মতো এখন আর ভয় পায় না সে। দেখলে দেখুক। সামনে যে অনেক ঝড় আসবে। ভয় পেয়ে পিছিয়ে পড়লে মানুষটাকে নিজের করবে কীভাবে?
লাবণ্য কফিটা শেষ করে ঘোর লাগা চোখে নাওয়াজের দিকে তাকায়। পায়ের লোমগুলো তাকে ভীষণভাবে টানছে। সে কী একটু ছুঁয়ে দিবে? তাতে তো আর দুনিয়া অশুদ্ধ হবে না। আর হলেও কী? মানুষটা তো তার। আগে পরে পুরো মানুষটাতে তো সে বিচরণ করবে। এখন একটু ছুঁয়ে দিলে ক্ষতি কী!
লাবণ্য বাড়ানো হাতটা গুটিয়ে নেয়। ইয়াজমীন ডাকছে তাকে। এ সময় কেন ডাকছে অজানা নয় লাবণ্যর। এখন তাকে নিয়ে মাহাদদের বাড়িতে যাবে। সকালে তাকে বলে রেখেছিল। তারই মনে ছিল না।
বাধা পাওয়ায় মেজাজ চটে গেল শান্তশিষ্ট মেয়েটার। মেয়েটা রাগ দমনে দক্ষ। সহজে রাগ করে না। রাগ করলেও চেহারায় কখনো তা ফুটিয়ে তুলে না। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। লাবণ্য দাঁড়ায় না আর, বেরিয়ে গেল।

