প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_১৫

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_১৫
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

প্রথমে ভয়ে কান্না করলেও এখন বুশরার খুব একটা ভয় লাগছে না। ভাইয়ের সাহায্য ছাড়াই অনায়াসে দুই তিনবার এপার থেকে ওপার গিয়ে এসেছে।

বাঁশের সাঁকো এ প্রথম দেখল কিনা। আবার কারো সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে পার হতে পেরে এভারেস্ট জয় করার আনন্দ হচ্ছে তার। প্রথমে শুধু শুধু বোকার মতো ভয় পেয়েছে। শুধু শুধু না, ভয় পাওয়ারই কথা। প্রথমবার দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। গ্রামের অনেক মেয়ে আছে যারা গ্রামে থেকেও সাঁকো দিয়ে পারাপার করে না ভয়ে। দরকার পড়লে অন্য পাড়া দিয়ে ঘুরে যাবে। তবুও সাঁকো পার হতে চায় না। তাদের ভয়ের কারণেই এমনটা হয়। একবার ভয় কেটে গেলে আর কোনো ঝামেলা নেই। এ কথা কে বুঝাবে। তারা বুঝতেই চায় না। যারা বুঝতে চায় না, তাদের শত চেষ্টা করেও বোঝানো যাবে না। তাদের এক কথা সাঁকোতে উঠলে নাকি তারা পড়ে যাবে।

বুশরা সাঁকোর মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে তাকায়। পানি একদম কম। এখানে পড়লে খুব বেশি হলে হাঁটু ভিজবে, ডুবে মরার মতো পানি একেবারে নেই। পুরো খাল কচুরিপানায় ভরা, ফাঁকফোকর নেই। কিছু কিছু কচুরিপানা মরে এক কোণে স্তুপ আকারে জমাট বেঁধে রয়েছে।

বুশরাকে এভাবে ঝুঁকে থাকতে দেখে বর্ণ হাঁক ছাড়ল,
– এভাবে ঝুঁকছিস কেন? পড়ে যাবি তো।

– পড়ব না। দেখি আমার কয়েকটা ছবি তুলে দাও তো। ভালো করে তুলবে কিন্তু।

বর্ণ এবার মহা বিরক্ত হলো, তেতে উঠল। একটু আগে না বোন পড়ে যাবে বলে চিন্তায় ছিল, সাবধান করছিল বোনকে। কই গেল সে চিন্তা?‌ কণ্ঠে তার ঝাঁজ। মুহূর্তেই আগের রূপে ফিরে গেল।

– এই তোকে না ছবি তুলে দিলাম তখন।

– আবার তুলে দাও। তখন তো সাঁকোর কথা জানতাম না।শহরে তো এসব নেই। সবাইকে গিয়ে দেখাতে হবে না।

বুশরা বাঁশ থেকে এক হাত ছাড়িয়ে মুঠোয় থাকা শাড়ির আঁচল ছেড়ে দিল। অন্য হাত অবলম্বন হিসেবে বাঁশ আঁকড়ে। বিভিন্ন পোজে ছবি তুলে মেয়েটা। বর্ণ আর রাগ দেখাল না। বরং আগ্রহের সহিত বোনকে বলে দিচ্ছে এভাবে দাঁড়া, ওভাবে দাঁড়া। এভাবে দাঁড়ালে ছবি ভালো আসছে না।

– ওখানে কী হবে ভাইয়া?

এতক্ষণ বুশরা খেয়াল করেনি। সাঁকোর সামনে অনেকগুলো বাঁশ গাঁথা। আবার দু পাশে অর্ধেক দেয়াল তোলা।

– ব্রিজ করা হবে। তারই কাজ চলছে। যদিও এখন বৃষ্টির কারণে পানি কিছুটা বেড়েছে বিধায় কাজ বন্ধ। তবে কমলে আবার কাজ শুরু করবে।

বর্ণ কিছু বলার আগেই পিছন থেকে জবাব এলো।

– জিদান কই ছিলে এতক্ষণ? আসার আগে তোমায় খুঁজে ছিলাম। দেখলাম না যে?

বিয়ে বাড়ি এসে জিদান ছেলেটার সাথে বর্ণের পরিচয় হয়েছে। আভিরার সেজো মামার ছেলে। দুজনে সেইম ইয়ারের। জিদানও ফার্মেসি বিভাগের ছাত্র। দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে এবার তৃতীয় বর্ষে। ফার্মেসি বিভাগে পড়া যে কত প্যারার এটাই ছিল তাদের আলোচনার মূল। পরিবারের জোরজবরদস্তিতে একপ্রকার বাধ্য হয়ে এই বিষয় নিয়ে পড়ছে। দুজনে যেন দুজনের দুঃখ বুঝল। বুঝবে না কেন? দুজন যে একই পথের পথিক।

জিদান কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
– খোঁজার মতো খুঁজলে পেয়ে যেতে।

বর্ণ শুনল না কিছু। শুনলেও কথার আগা মাথা বুঝল না।
না বুঝতে পেরে জানতে চাইল,
– কিছু বললে?

– না। চলো ঐদিকে সামনে যাই।

– এখানেই থাকি না, ভালো লাগছে। সাঁকোটা কী সুন্দর! এটা ভেঙে ব্রিজ কেন করবে?

বুশরার দু্ঃখী স্বর। পরেরবার এদিকে কখনো আসা হলে হয়তো এই সাঁকোটা আর দেখতে পাবে না সেজন্য।

– কয়েক মাস বাদে বাদে এটা ভেঙে যায়। বর্ষাকালে তো আরও বেশি সমস্যা বাধে বড়ো বড়ো মালবাহী ট্রলারগুলোর জন্য। কত করে নিষেধ করা হয় যাতে ট্রলার নিয়ে এদিকে না আসে, ঘাটের ধারে যেন মালামাল রেখে চলে যায়। তবে তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এদিকেই মালামাল নিয়ে আসে। যার ফলে সাঁকো আরও নড়বড়ে হয়ে যায়। আবার নতুন করে বানানো হয় গ্রামবাসীর টাকায়।‌ এত টাকা খরচ করে বানানোর পরে মাস ছয়েকও টিকে না বুঝলে। কার এত দায় পড়েছে বছর বছর হাজার বিশেক টাকা খরচ করে এটা ঠিক করার।

– তাও ঠিক।

– দু বছর ধরে এলাকায় একটা ব্রিজ করার জন্য সকলে প্রচেষ্টা করেছে। সরকারের লোকের কাছে কতবার দ্বারস্থ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অবশেষে কাজ শুরু হলো। সবাই অপেক্ষায় আছে কবে কাজ শেষ হবে।

– তাহলে সাঁকোটা কী ভেঙে ফেলবে?

– আরে না, ভাঙবে কেন। এটা নষ্ট না হওয়া অবধি সকলে এটা দিয়েই পার হবে। তাছাড়া সবে তো কাজ ধরল। বছরখানেক লাগবে এ ব্রিজ হতে।

এখন কী আর সাঁকোর দেখা মিলে। দেশ এখন উন্নয়নের পথে। যাতায়াতে কত উন্নত ব্যবস্থা। গ্রাম কেন সেদিক দিয়ে পিছিয়ে থাকবে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। আসছে দিন আরও উন্নত হবে।

বর্ণারা পুরান ঢাকার বাসিন্দা। সেই সুবাদে বুশরার কখনো সুযোগ হয়ে উঠেনি গ্রামে আসার। বোনের বিয়ের পর কবার এসেছিল। তবে তখন কোথাও সাঁকো দেখতে পায়নি। এই প্রথম দেখল। আর দেখতে পাবে না ভেবে মেয়েটার খারাপ লাগছে।

নাওয়াজ, মাহাদ যখন মেডিকেলে ভর্তি হয় তখন বর্ণার সাথে তাদের পরিচয়। তখন বললে ভুল হবে, মেডিকেলের এক্সাম দিতে গিয়ে। বর্ণা ম্যাথ নিয়ে পড়ার আগে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। তবে তার নিজের ইচ্ছেতে না মায়ের ইচ্ছায়। বর্ণার মায়ের অনেক ইচ্ছে মেয়েকে ডাক্তার বানাবে।
বর্ণা যদিও জানত সে মেডিকেলে টিকবে না। তবুও মায়ের মন রক্ষার্থে পরীক্ষায় অংশ নেয়। তার অনুমান সঠিক হলো। সে চান্স পায়নি। তাতে তার আফসোস নেই। পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়তে পেরেছে এই অনেক। তাছাড়া মেডিকেলে চান্স না পেলে কী হবে? এ মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে দুজন ভালো বন্ধু পেয়েছে। আবার সময়ের সাপেক্ষে একজন অসাধারণ জীবনসঙ্গী।

_

তোফায়েল আহমেদের চাকরির সূত্রে যদিও আভিরাদের গ্রামের বাড়ি থাকা হয় না। কলেজ পাড়ায় ফ্লাট নিয়ে থাকে তারা।
তোফায়েল আহমেদ বিয়ের প্রথম কয়েক বছর দেশের বাইরে থাকলেও পরে আর মন টিকে না, ফিরে এলো দেশে। দেশে এসে শিক্ষকতার পেশা বেছে নেয়। বাড়ি থেকে রোজ যাতায়াত করা অসম্ভব প্রায়। তাছাড়া সংসারের অশান্তি চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারতেন না। তাই পরিবার সমেত দূরে থাকতে লাগল। আভিরার চাচারা সকলে দেশের বাহিরে থাকে। শুধু তোফায়েল আহমেদের পরিবার কেন, চার ভাইয়ের মধ্যে তিন ভাইয়ের বউ বাচ্চা কেউই বাড়িতে থাকে না। এত বিশাল বাড়ি বলতে গেলে খালি পড়ে থাকে।
আভিরার মেজো চাচার পরিবার শুধু থাকে এ বাড়িতে।
আভিরার দাদা নেই, আভিরা ছোটো থাকতে মারা গেছেন তিনি। দাদার চেহারাও মনে নেই আভিরার। আবছাও মনে নেই। মেয়েটা মনে করার চেষ্টা করে। তবে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে না। মায়ের মুখে শুনেছে ছোটো থাকতে দাদা তাকে অনেক আদর করত। কাঁধে চড়িয়ে দোকানে নিয়ে যেত।

আভিরা ছোটো থাকতে দাদার আদর যা একটু পেয়েছে তাও ভুলে বসে আছে। এ নিয়ে মাঝে মাঝে মনঃক্ষুণ্ণ হয় মেয়েটার। ভুলে গেল কেন, কেন মনে নেই তার।‌ দাদি যে খুব একটা দেখতে পারে না তা সে বুঝে। শুধু দাদি কেন দাদার বাড়ির সকলেই কেমন যেন। মনে হয় না পারতে একটু করে। নামমাত্র যাকে বলে। পরিবারের বড়ো ছেলে, তার বংশধর চাইলেও তো আর অস্বীকার করা যায় না।

আভিরাদের বিশাল বাড়ি। আগে এমন ছিল না। ঐ তো দুচালার দুটো টিনের ঘর। এখন সেই টিনের চালা ভেঙে বিশাল এক ইটের দালান করা হয়েছে।
গেট পেরিয়ে দুটো ডাইনিং। মাঝে দেয়াল টেনে দুটো ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। পুরো বাড়িতে ছয়টা শোবার ঘর, দুইটা রান্নাঘর, চারটা বাথরুম। সর্বত্র আধুনিকতার ছোঁয়া।

তোফায়েল আহমেদ প্রথমে ফ্লাট বাসায় থাকলেও, তার পাশে থাকা একতলা একটা বাড়িতে থাকে বর্তমানে। বাড়ির মালিক বউ বাচ্চা সমেত দেশের বাহিরে থাকেন। তোফায়েল আহমেদের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। ভদ্রলোকের বড়ো মেয়ে এককালে তোফায়েল আহমেদের ছাত্রী ছিল। সেই থেকে উঠাবসা। বাহিরে যাওয়ার আগে বাড়ির দায়িত্বে কাদের রেখে যাবেন সে নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলেন। বিশ্বস্ত, ভরসাযোগ্য মানুষ ছাড়া যার তার কাছে তো আর এত বড়ো বাড়ির দায়িত্ব গছিয়ে দেওয়া যায় না। স্ত্রীর পরামর্শে তার চিন্তার অবসান ঘটে। সেই থেকে বাড়ির দায়িত্ব তোফায়েল আহমেদের উপর বর্তায়। প্রস্তাবে তোফায়েল আহমেদ দ্বিমত করেন না। তবে শর্ত জুড়ে দেন প্রতি মাসে তারা বাড়ি ভাড়া দেবেন। নয়তো এ বাড়ির দায়িত্ব তিনি নিবেন না। ভদ্রলোক প্রথমে দেনামোনা করলেও পরে রাজি হয়ে যান। তিনি জানেন তোফায়েল আহমেদ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি। বিনা পয়সায় কখনো এ বাড়িতে থাকার জন্য তাকে রাজি করানো যাবে না।

নিজেদের বাড়ি রেখে মেয়ের বিয়ে তো আর অন্যের বাড়িতে দিলে হবে না। তাই পরিবার সমেত গ্রামে ছুটে আসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here