প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_১৪

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_১৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

আশেপাশের লোকজন অবাক নয়নে চেয়ে দেখছে চোখের পলকে সাঁই সাঁই করে ছুটতে থাকা বাইকগুলো। একটা দুটো করে মোট পনেরোটা বাইক। বাইকের পিছনে পাঁচ ছয়টা গাড়ি বাহারি ফুলে সাজানো। ছোটো বাচ্চারা সেই গাড়ির পিছনে ছুট লাগাল ফুল ছিঁড়তে পারবে সেই আশায়। তবে গাড়ির গতির সাথে তারা তাল মিলিয়ে দৌড়ে ধরতে পারলে তো। কিছু দূর ছুটেই হাঁপিয়ে গিয়েছে তারা। আর ছুটতে না পেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল।

সকলে যেন এ প্রথম এমন দৃশ্য দেখল। মোবাইলে দেখেছে শহরে এমন ঘটনা প্রায় হয়। তাই বলে গ্রাম এলাকায় এমনটা হবে। এ যেন বিশাল এক কারবার। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে আবার কেউ বা মোবাইলে তা ধারণ করে নিচ্ছে। অনেকে তো অন্যদের গিয়ে খবর দিচ্ছে এমন দৃশ্য দেখার জন্য। বাইক দেখে এত অবাক হওয়ার কী আছে? নির্বাচন হলে তো এমন অগণিত বাইকের দেখা মিলে।তাহলে তারা অবাক হয়ে কী দেখে চলেছে?

ছোটো মেয়েটা বাবার হাত ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল,
– বাবা দেখো কতগুলো জামাই যাচ্ছে। ওই বুড়ো দাদুটাও কি বিয়ে করবে?

মেয়ের কথায় তার বাবা বোধ হয় বিরক্ত হলো। কী সুন্দর ভিডিও করছিল। মেয়ে তার করতে দিলে তো। কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি মিশিয়ে বলল,
– হ্যাঁ, ওটাই বর। তোকে নিতে এসেছে। যাবি?

– না। আমি ওই বুড়ো দাদুর সাথে যাব না।

বলেই ছুটে পালাল। তাকে আর পায় কে।

গেটের সামনে একদম লাইন করে পনেরোটা বাইক এসে থামে। এক এক করে নেমে এলো ত্রিশ জন জামাই। কনেপক্ষ হা হয়ে তাকিয়ে আছে। কী হচ্ছে এগুলো? এত জামাই এখানে এলো কোথা থেকে? গণ বিবাহ হচ্ছে না কি? অদ্ভুত তো! সকলে বরের পোশাক পরে একদম কনের বাড়ি হাজির। আসল জামাই কে বুঝবে কী করে?
ফুল দিয়ে সাজানো প্রাইভেট কারের পিছনে আরও পাঁচটা হাইস এসে থামল। দেখেই বুঝা যাচ্ছে এটা বরের গাড়ি। বরের গাড়ি দেখে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক এরা তাহলে বর না। বর গাড়িতে আছে। তবে তাদের হতাশ করে গাড়ি থেকে ছেলের মা, বোন মানে বর বাদে বাদবাকি সবাই নেমে এলো। সকলে ভাবনায় পড়ে গেল বর কী বিয়ে করতে আসেনি। তারা কি এখন বাবা, কাকাদের জানাবে যে বর আসেনি। তৃপ্তি, জ্যোতি, ইফা, ফারাবি একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কী করবে তারা? এভাবে ফুলের মালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে? না কি বড়োদের গিয়ে জানাবে? তবে তাদের বাড়ির ভিতরে যেতে হয়নি। খানিক বাদে আরও একটা বাইক এসে থামে। বর বাইক চালিয়ে এসেছে এ যেন চরম আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঠেকল তাদের কাছে। এতক্ষণে সকলে দ্বিধায় থাকলেও এখন তাদের কাছে একদম পরিষ্কার বর কে। ত্রিশ জনের মাঝে যেন বরকে এক দেখায় চেনা যাবে। সকলে লাল খয়েরী শেরওয়ানি পরলেও বরের গায়ে অফ হোয়াইট শেরওয়ানি।

নাওয়াজ আসতে তৃপ্তি হাতে থাকা মালাটা একটু উঁচু করে ধরে, মেয়েটা নাগাল পাচ্ছে না। নাওয়াজ ঝুঁকে এলো অনেকটা। গোলাপ, রজনীগন্ধা দিয়ে বানানো মালাটা নাওয়াজকে পরিয়ে দেয়। নাওয়াজকে মালা পরিয়ে ওকে গেট অবধি নিয়ে নিজেরা ভিতরে ঢুকে গেট আটকে ধরল। টাকা ছাড়া খোলা হবে না। পুরো চল্লিশ হাজার লাগবে তাদের। টাকার কথা শুনে সকলে চোখ কপালে তুলল। কী বিচ্ছু মেয়েগুলো! বিশ হাজারের জায়গায় চল্লিশ হাজার চাইছে ভাবা যায়। পুরো বিশ হাজার বাড়িয়েছে। তাদের এতক্ষণ রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল তাই।

এদের এমন অযৌক্তিক কথা শুনে বর্ণ রেগে গেল। এ ছেলের অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যায়, হুটহাট রেগে যাওয়ার অভ্যাস রয়েছে।
চল্লিশ হাজার মগের মুল্লুক পেয়েছে নাকি। বললেই হলো। দশ হাজারের বেশি এক টাকাও দিবে না। বর্ণের এমন রাগ দেখে বর্ণা চোখ পাকিয়ে তাকায় ভাইয়ের দিকে। বর্ণ তাতে থামল না। মুহূর্তেই শান্ত পরিবেশটা কেমন গরম হয়ে ওঠে।
চার জন মেয়ের সাথে একা একটা ছেলে কথায় পারবে।
কেউ বর্ণের হয়ে কথা বলছে না। তবুও ছেলেটা থামে না।
এ মেয়েদের সাথে কথায় না পারলে তার মানসম্মান থাকল কই। পুরুষ জাতির নাক কাটবে নাকি।

বর্ণা থামাল সকলকে। ব্যাপারটা যেন অর্ধেকে মিটমাট করে ফেলা হয়। হলোও তাই। বিশ হাজারে মেনে গেল ওরা।
ভাগাভাগিও হয়ে গেল। চার জনে পাঁচ, পাঁচ করে নিবে। ছেলেগুলোকে এক টাকাও ভাগে দিবে না। কী সুন্দর তাদের ঝামেলায় ফেলে নিশ্চিন্তে ঘোরাঘুরি করছে। কষ্ট করে টাকা উসুল করল তারা, ওদের দিতে যাবে কেন।

আয়তাকার চার কোণা টেবিলটা ফল, মিষ্টি, শরবত দিয়ে সাজানো। তর্ক করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়ে বর্ণ এক চুমুক বসাল শরবতের গ্লাসে। মুখের পুরোটা ফেলল বুশরার উপর।
মেয়েটা কটমটিয়ে তাকায়। ধুপধাপ দুটো কিল বসিয়ে দিল বর্ণের পিঠে। কান্না সংবরণ এর চেষ্টা করল মেয়েটা। কত শখ করে এই প্রথম শাড়ি পরেছিল। সকলে ঠিক করেছে সব মেয়েরা শাড়ি পরবে আজ। আর ছেলেরা শেরওয়ানি। সে না পরলে হবে। মা তো শাড়ি পরতে দিবে না তাকে। সে নাকি সামলাতে পারবে না। হোঁচট খেয়ে পড়ে হাত পা ভাঙবে। কত শত কাহিনী করল মাকে রাজি করানোর জন্য। মা রাজি হলো না তো হলোই না। না পেরে বর্ণাকে বলতে শাড়ি পরিয়ে দিল। বোন হিসেবে বর্ণা অনন্য। ভাইবোনের কোনো আবদার অপূর্ণ রাখে না। সর্বদা চেষ্টা করে ছোটো ভাইবোন দুটোর মন রাখার।

মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে রেখেছিল। বর্ণের মুখ জ্বলছে। তৃপ্তি, জ্যোতি, ইফা, ফারাবি মিটিমিটি হাসছে। ওদের হাসি দেখে যেন শরীরও জ্বলে ওঠে। ভিতরের সত্তা বলে উঠল এর শোধ তোকে নিতেই হবে। মনে মনে মেয়ে চারটাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা সেরে পৈশাচিক হাসি দিল। যা জাবারদাস্ত একটা প্ল্যান করেছে না সে। নিজের কাজে নিজেকে বাহবা দিতে মন চাইছে। ঠিক করে নিল এ চারটা মেয়েকে বিয়ে করবে সে। এটাই হবে ওদের চরম শাস্তি। চার সতীন যখন বিয়ের পর চুল ছেড়াছেড়ি করবে সে দেখবে আর কিটকিটিয়ে হাসবে।

আহা, কী শান্তি! ভাবতেই মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। তবে ভাবনায় পড়ে গেল তৃপ্তিকে নিয়ে। বাচ্চা একটা মেয়ে। এটাকে এসবে না জড়ানোই ভালো। তবে বাকি তিনটাকে দেখে নিবে সে।

_

বরকে নিয়ে স্টেজে বসানো হয়। খুব বেশি বড়ো না, ছোটোখাটো একটা স্টেজ করা হয়েছে। পিছন দিকটায় আর্টিফিশিয়াল ফুলে সাজানো। সামনে খাবারের জন্য সাত, আটটা টেবিল বসানো। বর যাত্রী সকলে খেতে বসে পড়েছে ইতোমধ্যে। খিদের ঠেলাই পেটে তাদের ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।

বারোটার দিকে গাড়ি ছাড়লেও মাঝ রাস্তায় ঝামেলার জন্য ঘণ্টাখানেক বসে থাকতে হয়েছে তাদের। কথা ছিল আগে বাইকগুলো যাবে। তারপর বরের গাড়ি, পরে হাইস পাঁচটা।
কিন্তু হাইসের ড্রাইভারগুলো বরের গাড়ি ওভারটেক করে সামনে চলে যায়। ড্রোন দিয়ে ভিডিও করার কথা ছিল। ড্রাইভারদের মাতবরির জন্য সকলের মেজাজ বিগড়ে গেল।
আধ ঘণ্টা গাড়ি থামিয়ে সব গাড়ি সিরিয়াল বাই দাঁড় করিয়ে পুনরায় চলতে শুরু করে। আসতে আসতে দুপুর তিনটে। গেটের ঝামেলা মিটিয়ে কেউ কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা খাবার টেবিলে হামলে পড়েছে।

মাছ ভর্তা, ভাজা মাছের পিস, সবজি, রোস্ট, বিফসহ বেশ কয়েকটা আইটেম করা হয়েছে। সবজি নিত্যদিনের চেয়ে ভিন্ন। মাখো মাখো, তেল মশলা খুব একটা ব্যবহার করা হয়নি। বিয়ে বাড়ির স্পেশাল সবজি যেমনটা হয়। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে যে যার মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। অনেকে আবার ঘরের এক কোণায় বসে আছে। বিয়ে বাড়ি বলে কথা। পা ফেলার জায়গা আছে নাকি। জায়গা থেকে নড়লে পরে এসে আর খালি পাওয়া যায় না। দেখা যাবে অন্য আরেকজন দখল করে নিয়েছে।

আভিরাদের বাড়ির পাশ ঘেঁষে পাকা রাস্তা করা। রাস্তার দু দিকে সুপারি গাছ লাগানো। যদিও গাছে এখন সুপারি নেই। তবে জায়গাটা অসম্ভব সুন্দর। সামনে একটা মাটির ঘরও আছে। আজকাল মাটির ঘর খুব একটা দেখা যায় না। নেই বললেই চলে। কালক্রমে তা বিলীন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সর্বত্র ইটের দালান কোঠা।

বুশরা ভাইয়ের পিছনে ঘুরঘুর করছে তাকে যাতে কয়েকটা ছবি তুলে দেয়। প্রথমবার শাড়ি পরেছে বলে কথা। স্মৃতি রাখতে হবে না। আর এমন একটা সুন্দর জায়গায় ছবি না তুললেই নয়। বোনের জোরাজুরিতে বর্ণ না পারতে কয়েকটা ছবি তুলে দিল। বুশরা গাল ফুলিয়ে রেখেছে। দুই একটা ছাড়া আর একটাও ভালো ছবি আসেনি। তার একটা মোবাইল নেই দেখে এমন করছে। ঠিক করল ঢাকা ফিরে সে আগে একটা মোবাইল কিনবে। বর্ণের মোবাইলের থেকেও বেশি দাম দিয়ে।

_

কোথা থেকে বুশরা শুনল যে বাড়ি থেকে একটু দূরে নাকি বাঁশের সাঁকো আছে। মেয়েটা কখনো সাঁকো দেখেনি। জেদ ধরল সাঁকো দেখবে বলে।
পাশাপাশি দুটো বাঁশ বসিয়ে সাঁকো করা হয়েছে। এমন আরও লম্বা লম্বা তিনটে বাঁশ। মোট হিসেব করলে ছয়টা। খুঁটি হিসেবে বাঁশ গাঁথা। সেটা ধরে পার হতে হবে। এক পা দিয়ে ভয়ে কেঁদে দিল মেয়েটা। মনে হচ্ছে এখনই পড়ে যাবে।

– কাঁদিস না, পড়বি না। আমাকে ধরে রাখ।

বোনকে আশ্বাস দিয়ে বর্ণ বলে। সারাদিন অকারণে বোনের পিছনে লেগে থাকা ভাইয়েরও যেন বোনের এক ফোঁটা চোখের পানি সহ্য হয় না। মেয়েটা ভাইয়ের এমন ভরসাময় কথা শুনলে নিশ্চিত এতক্ষণে কান্না বন্ধ করে দিত। আর কোনোদিন ভাইয়ের নামে মায়ের কানে এটা ওটা লাগাতে যেত না।

বুশরার যেন আত্মা বেরিয়ে যাবে। বাঁশ কেমন নড়ছে।
এখান থেকে পড়লে সোজা খালে। সাঁতার জানে না মেয়েটা।
অথচ খালে পানি নেই খুব একটা। অনেকটা কমে গিয়েছে। আবার বাড়বে বর্ষাকালে।

– কান্না না থামালে আমি তোকে ফেলে দিব। বললাম না আমাকে ধরতে।

বুশরা ভয়ে ভয়ে ভাইয়ের শার্ট খামচে ধরে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নিল এখান থেকে বেঁচে ফিরলে জীবনে ভাইয়ের কথার অবাধ্য হবে না। ভাই যা বলবে তাই শুনবে। বর্ণ উঠার আগে একশবার বলেছিল তুই পারবি না। পড়ে যাবি। মেয়েটা সে কথা শুনলে তো। নাচতে নাচতে এসে উঠেছে। এখন পড়ল তো গেরাকলে। ঢের শিক্ষা হয়েছে তার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here