#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_১৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
সারা বাড়ি লাইটিংয়ের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আহমেদ ভিলা ভবন থেকে শুরু করে উঠানের শেষ মাথা পর্যন্ত কৃত্রিম লাইটে সজ্জিত। সাদা, লাল, নীল হরেক রকম লাইটে ঝিলমিল করছে চারপাশ। সেকেন্ডে সেকেন্ডে নিভছে তো আবার জ্বলে উঠছে। খুদে বাচ্চারা খুব আগ্রহের সহিত তা দেখে চলেছে। আগ্রহের থেকেও যেন তাদের কাছে বেশি আনন্দের। গোল গোল চোখে তাকিয়ে দেখছে চারিদিক। এমন ঝলমলে মরিচা বাতি তারা এই প্রথম দেখছে কিনা।
নতুন নতুন সবকিছু যেন বাচ্চাদের নিকট প্রবল আগ্রহের।
পাখির মতো কিচিরমিচির করেই যাচ্ছে। একে ওকে আঙুল দিয়ে ইশারায় কী যেন দেখাচ্ছে আর পেট চেপে হাসছে। কেউ কেউ স্থির বসে ঝলমলে আলো দেখছে আবার কেউ বা উঠানের এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের যেন আজ আনন্দের শেষ নেই।
মোহনা সেই কখন থেকে মেয়ের পিছনে দৌড়াচ্ছে।
মেয়েটা সেই দুপুরে কী একটু খেয়েছে তারপর আর কিছু মুখে তুলেনি। মেয়েটা তার একেবারে খেতে চায় না। ভাত দেখলে নাক সিঁটকায়। অথচ চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দাও দু মিনিটও লাগবে না শেষ করে ফিরতি আরেকটা ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করবে। হাবিজাবি খেয়ে দিব্যি পুরো দিন কাটিয়ে দিতে পারবে।
তিন বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কতটা ধুরন্ধর হতে পারে তা আইদাহকে না দেখলে বুঝা যাবে না। সেই কখন থেকে মাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে। একবার এদিক ছুটছে তো আরেকবার ওদিক। যা দুষ্টু হয়েছে মেয়েটা। মোহনা ভেবে পায় না এ মেয়েকে সে কি করে সামলাবে। মোহনার হাড় মাস জ্বালিয়ে ছাড়ে।
সারা বছর বাবার বাড়ি পড়ে থাকে। শ্বশুর বাড়ি খুব একটা আসা হয় না তার। ঈদে বা বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে তখন যা একটু আসে। বাবার বাড়ি থাকলে মেয়েটা একটু ঘর বন্দি হয়ে থাকে। সে যা বলে বাধ্য মেয়ের মতো তাই শুনে। শুনতে যে হবে। মা বলেছে সে যদি গুড গার্ল হয়ে থাকে, মায়ের সব কথা শুনে তাহলে তাকে দাদু বাড়ি নিয়ে যাবে। তাই তো সে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো মায়ের সব কথা শুনে চলে। তবে এখানে এলে যেন মেয়েটা তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।
মোহনা হাঁপিয়ে গিয়েছে। এভাবে দৌড়ানো যায়। মাকে জব্দ করতে পেরে আইদাহ যেন দারুণ মজা পেল। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল মেয়েটা। একদম দাঁত কপাটি বের করে হাসছে। ঠোঁট দুটো প্রসারিত হওয়ায় তার পোকা খাওয়া দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা চকলেট খেয়ে খেয়ে দাঁত একেবারে নষ্ট করে ফেলেছে। সামনের তিনটে দাঁত অর্ধ ভাঙা, মাঝেরটা নেই। পোকা খেয়ে ফেলেছে।
বহু কষ্টে মেয়েকে ধরে খাওয়াতে বসেছে। আইদাহর সে কী কান্না, সে খাবে না।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে মেয়েটা। মায়ের কোল থেকে নামার জন্য হাত পা ছোড়াছুড়ি করছে। সে এখন খাবে না, খেলবে সে। রাগে জিদ্দে তাযীমের হাতে কামড় বসিয়ে দিল।
তাযীমের জন্যই সব হয়েছে। সে ই তো ধরিয়ে দিয়েছে।
নয়তো তার মা কি তাকে ধরতে পারে। মোহনা তাড়াতাড়ি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পানি ঢালে। দাঁত বসে অনেকটা ডেবে গেছে। অথচ দেখো ছেলেটা কী শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
_
উঠানের একেবারে শেষ প্রান্তে বিভিন্ন এঙ্গেলে বাঁশ বসিয়ে তার উপর লাল, হলুদ রঙের কাপড় দিয়ে বিশাল আকৃতির এক গেট করা হয়েছে। গেট থেকে কয়েক হাত পিছনে উল্টো ইউ আকৃতির তারে সাদা, কালো বেলুন দিয়ে ভর্তি। উঠানের অর্ধেক পাশ জুড়ে মাঝারি আকারের স্টেজ। সেই স্টেজে পুতুলের মতো সেজেগুজে বসে আছে এক হলুদিয়া পাখি। হলুদিয়া বলছি কেন? সে তো সেজেছে লাল, সবুজ, কমলা মিশেলে, রংধনুর সাত রঙে। তাহলে তাকে কী বলা উচিত?
রংধনু বধূয়া না কি সাত রঙা বধূয়া?
বড়ো বড়ো দুটো সোফার মাঝে একটা সিঙ্গেল সোফা। সেই সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে শাড়ি পরিহিতা রমণী। শাড়ির সাথে ম্যাচিং রঙ বেরঙা বক্স প্রিন্টেড ব্লাউজ। দু হাতে ভরাট করে মেহেদী লেপ্টানো। হাতের তালুতে অল্প জায়গা দখল করে আছে চার অক্ষরের কারো পূর্ণ নাম। অতি সূক্ষ্ম চোখে তাকালে নজরে আসবে তা। কানে, গলায়, হাতে গাঢ় কমলা রঙের গাঁদা ফুলের মালা। যদিও আর্টিফিশিয়াল ফুলের গহনা অর্ডার দিয়ে আনা হয়েছে। তবে আভিরা তা দিয়ে নিজেকে সাজায়নি। আভিরার কাছে নাকি কৃত্রিম কৃত্রিম লাগে। হাতের নাগালে এমন তাজা ফুল থাকতে, সে কেন নিজেকে কৃত্রিমতায় সাজাতে যাবে। গাঢ় কমলা রঙের গাঁদা ফুল আভিরার ভীষণ পছন্দের। অন্যান্য ফুলের তুলনায় এ ফুল অতি সামান্য। খুব একটা নজরকাড়া না। আর না তেমন ঘ্রাণ আছে। তবুও কেন জানি আভিরার অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। মনে হয় যেন এ ফুল হাজার দেখেও আভিরার মন, আত্মা তুষ্ট হবে না। তবে হলুদ রঙা না, গাঢ় কমলা রঙাটা তার নজর কাড়ে। সেই কমলা রঙের গাঁদা ফুলে সাজিয়ে তুলেছে নিজেকে।
আগের দিনে তো গায়ে হলুদে ফুলের কথা উঠতে সকলের মাথায় গাঁদা ফুলের নামটাই প্রথমে আসত। তবে এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় সে ফুল কেউ ছুঁয়ে দেখে না। কৃত্রিম ফুলের গহনায় নিজেদের সাজিয়ে তোলে। শহুরে বিয়ের সবকিছুতে কৃত্রিমতা থাকলেও গ্রামে যেন তার উল্টো চিত্র। যদিও গ্রাম এলাকায়ও এখন ধুমধাম করে শহরের মতো বিয়ে দিচ্ছে। মোটা টাকা খরচ করে গেট, স্টেজ সাজিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। অনেকে তো নামিদামি কমিউনিটি সেন্টারগুলোও ভাড়া করে। সেখানে কনেকে কোনো তাজা ফুলের বাহারে সাজিয়ে তুলে না।
আভিরাকে পুতুল সাজিয়ে সেই কখন থেকে স্টেজে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এভাবে বসে থাকতে আভিরার মোটেও ভালো লাগছে না। ঘণ্টাখানেক হবে তাকে বসিয়ে সকলে যার যার কাজে ব্যস্ত। এভাবে পুতুল হয়ে বসে থাকতে বুঝি ভালো লাগে।
বেশিরভাগ হলুদের অনুষ্ঠানে হলুদ শাড়ি, পাঞ্জাবি পরা হলেও এখানে ভিন্ন চিত্র। সকলে লাল রঙে নিজেদের সাজিয়েছে। মেয়েদের পরনে লাল রঙের তাঁতের শাড়ি আর ছেলেদের পরনে লাল পাঞ্জাবি। সকলে যেন লালে লাল সেজেছে।
একটু পরে হলুদ ছোঁয়ানো হবে মেয়েকে। তারই তোড়জোড় চলছে। গ্রামের মা, চাচিরা শিল পাটায় কাঁচা হলুদ পিষতে ব্যস্ত। হলুদের ঘ্রাণ পুরো উঠান জুড়ে। গাঁয়ের বধূরা আঁচল টেনে কলসি কাঁখে দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধভাবে। দুটো সারি হয়েছে। এক সারিতে সব বিবাহিতা নারী আর আরেক সারিতে সব কিশোরী কন্যা।
একে একে সকলে ভিড় জমায় পুকুর ঘাটে। আভিরাদের বাড়ির ঠিক পিছনে পুকুরটা। তবে সমস্যা হলো তাদের ওখানে কোনো ঘাটলা করা হয়নি। নিচে নেমে পুকুর থেকে যে পানি তুলবে তারও কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই সকলকে ঘুরে অন্য বাড়ির ঘাটলা দিয়ে নামতে হয়েছে। অন্ধকারে পুকুর ঘাট অবধি যেতে খুব একটা বেগ পোহাতে হলো না। কারণ উঠানে লাগানো মরিচা বাতির আলোয় সব যেন দিনের আলোর মতো ঝকঝকা, ফকফকা। কলসি ভরে পানি তুলে সকলে বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়িয়েছে। আভিরাকে স্টেজ থেকে নামিয়ে পিঁড়িতে বসানো হয়েছে ইতোমধ্যে।
চারদিকে চারটা কলা গাছ বসিয়ে রঙ বেরঙের সুতা দিয়ে সুন্দর করে ঘের দেওয়া। যদিও এখন কলা গাছ বসিয়ে রঙ বেরঙা সুতা দিয়ে এত সাজিয়ে তোলা হয় না। আগে হতো এসব। সময়ের সাথে সবকিছুতে পরিবর্তন এসেছে। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা করেছে এ কাজ। গ্রাম বাংলার বিয়ের চিত্র বহাল রাখার প্রচেষ্টায়। যদিও এতটা নিখুঁত হয়নি। তারা তাদের অদক্ষ হাতে যতটা পেরেছে করেছে। বড়োরা হাত লাগালে বোধহয় কমতিটুকু পূরণ হয়ে যেত। তবে বড়োদের কি আর অত শত করার সময় আছে। তারা তো দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছে না। বাড়ির বড়ো মেয়ের বিয়ে বলে কথা। কত কাজ তাদের, এসব করার সময় আছে বুঝি।
ছেলের বাড়ি থেকে লোকজন চলে এসেছে। তাদের হাতে হলুদের বাটিসহ আরও অনেক জিনিস। লোকজন দিয়ে সবগুলো জিনিস বাড়ির ভিতরে নিয়ে রাখা হলো। হলুদ দিয়েই তারা চলে গিয়েছে। এতটুকু কাজ ছিল তাদের। ঠিকমতো হলুদের বাটি পৌঁছে দেওয়া। মেয়ের বাড়ির লোকেদের হাতে তা বুঝিয়ে দিয়েই রওনা হয়েছে।
আভিরার ভাবি মীরা প্রথম হলুদ ছোঁয়াল। মা, চাচিরা কেউ এদিকটায় আসবে না। তারা তো এসব অনুষ্ঠান করতে চায়নি। হাতে সময় কম, এসব হলুদের অনুষ্ঠান করার সময় কই তাদের।
আংটি বদলের এক সপ্তাহ পরে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহে কী এত কিছু করা যায়?বিয়ের কেনাকাটা করার জন্য দুদিন তাদের শহরে যেতে হয়েছে। আভিরা একেবারে জার্নি করতে পারে না। মেয়েটার শরীর নেতিয়ে যায়। তাছাড়া বমি করার বদ অভ্যাস আছে।
মাথা যন্ত্রণায় পরের দুদিন বিছানায় পড়ে থাকবে। তাই তাকে আর কেউ সঙ্গে করে নেয়নি।
যদিও বিয়ের কনের সকল জিনিস কেনার দায়িত্ব ছেলের বাড়ির। তবে কনের বাড়িরও তো কম কেনাকাটা করতে হয় না। কনে ছাড়া বাড়ির সকলের জন্য কেনাকাটা করতে হয়েছে। গেল সোমবার সকলে বি-বাড়িয়া থেকে ঢাকা গিয়েছে বিয়ের কেনাকাটা করতে। তারা আসতে সকলে ঘিরে ধরল যাতে হলুদের অনুষ্ঠান করা হয়। প্রথমত কেউ রাজি হয়নি। এত ঝামেলা করার কি দরকার, হাতে সময় কম। এত অল্প সময়ে এসব করার কোনো মানে নেই। সবাই না পেরে তোফায়েল আহমেদকে ধরল। তাদের একটাই কথা বাড়ির বড়ো মেয়ের বিয়ে দিবে অনুষ্ঠান না করলে কেমন দেখায়। তাছাড়া হলুদেই তো যত আনন্দ। এ বাড়ির বড়ো মেয়ের বিয়েতে তারা কি আনন্দ করবে না।
তোফায়েল আহমেদও ভাবলেন অল্প সময়ে যা পারেন করবেন। একেবারে ধুমধাম না হোক হালকা পাতলা অনুষ্ঠান করায় যায়। তবে যা হবে শুধু হলুদের রাতে।বিয়েতে কোনো অনুষ্ঠান করবেন না। একদম ঘরোয়াভাবে কাজি ডেকে বিয়ে পড়িয়ে মেয়ে বিদেয় করবেন। সবাই আর কোনো কথা বলেনি। হলুদে অনুষ্ঠান করতে রাজি হয়েছে এই অনেক। তাদের এতেই চলবে।
মুঠো কয়েক দূর্বা ঘাসের আগায় হলুদ লাগিয়ে তা আভিরার কপাল, গাল, থুতনিতে ছোঁয়াল। আভিরার গায়ে একটা সুতির গামছাও জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কলসি ভর্তি পানি ঢালা হলো মেয়েটার গায়ে। আভিরা কোনোরকমে শ্বাস ফেলছে। কে বলবে কাল তার বিয়ে। মনে হচ্ছে আজ রাতে তাকে পানিতে ডুবিয়ে মেরে ফেলা হবে।
_
ফুল স্পিডে চলতে থাকা ফ্যানের নিচে বসে আছে আভিরা। গায়ে তার সুতির সেলোয়ার কামিজ। ভেজা শাড়ি বদলে কোনোরকম সেলোয়ার কামিজ জড়িয়ে চলন্ত ফ্যানের নিচে বসেছে।
শীতে কাঁপছে মেয়েটা, দাঁতে দাঁত লেগে আসছে। ফ্যান ছাড়তে চায়নি। আনেসা এসে ছেড়ে দিয়ে গেল। ফ্যান না ছাড়লে সারা রাতেও এ চুল শুকাবে না। ভেজা চুলে থাকলে নিশ্চিত জ্বর বাঁধাবে। মেয়েটার একদম ঠান্ডা সহ্য হয় না। শীত এলে হাত পা বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে থাকে। রাত পোহালেই মেয়েটার বিয়ে। এমন সময়ে জ্বর টর বাঁধালে হবে।
বালিশের নিচে পড়ে থাকা ফোনটা সেই কখন থেকে বেজে চলেছে। আভিরা বিরক্তি নিয়ে ফোনটা হাতে নিল। এখন আবার কে কল দিয়েছে। অপরিচিত নাম্বার। মেয়েটা ধরল না। সে অপরিচিত কারো কল কখনো ধরে না। তবে ঐ প্রান্তের ব্যক্তি থেমে থাকলে তো। কল না ধরা অবধি যেন দিয়েই যাবে। অতিষ্ঠ হয়ে আভিরা ফোনটা কানে ধরল।
কড়া গলায় কিছু বলতে যাবে তার আগে কানে এলো কারো রাশভারী কণ্ঠ।
– বারান্দায় আসুন।

