প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৩০

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩০
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

রাতের খাবার খেয়ে সকলে বসার ঘরে আসর জমিয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ, আভিরার দুই মামা, আভিরার বড়ো মামার ছেলে, মেয়ের জামাই।
আভিরার বড়ো মামার ছেলের সাথে একপ্রকার তর্ক লেগে গেল সকলের। ছেলেটা এক ভণ্ড হুজুরের পাল্লায় পড়েছে। শত বুঝিয়েও লাভের লাভ হচ্ছে না। তার বাবাও বেশ মান্য করত ঐ লোককে। ছেলেও সেই পথে হাঁটছে। আভিরার বড়ো মামার বেশ সম্মান ছিল গ্রাম জুড়ে। যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন লোকে তার সুনামে পঞ্চমুখ। সে সুনাম আজ অবধি অক্ষুণ্ন রয়েছে। তবে রেজভীদের সাথে চলাফেরাটা ঠিক কেউ মেনে নিতে পারে না। তারা খাঁটি সুন্নি না হলেও নিজেদের, ইসলামের বিরোধিতাকারীদের কখনো সমর্থন করে না।

ভদ্রলোকের ইন্তেকালের পর তার ছেলের আনাগোনা বেড়েছে সেখানে। গ্রামে এলেই ঐ লোকের কাছে ছুটে যাবে। কী ভং চং বোঝায় কে জানে। তার বদৌলতে দিনকে দিন এত পরিবর্তন। কিন্তু তাই বলে চল্লিশা পালনের কথা অস্বীকার করবে। গ্রামে মৃত ব্যক্তির তিন দিনের খানা, চল্লিশা এগুলো খুব গুরুত্বের সহিত দেখা হয়। সামর্থ্য না থাকলে লোক খাওয়ানোর বদলে এতিমখানার বাচ্চাদের দিয়ে কুরআন খতম দেওয়া হয়। তবে বিত্তবানরা অবশ্য চল্লিশা পালন করতে কোনো তোষামোদ করে না।

এলাকার এক লোকের কাল চল্লিশা। ভদ্রলোক এলাকার বেশ অবস্থাপন্ন ছিলেন। নামডাকের সাথে অঢেল সম্পদের মালিক। ছেলেদেরও টাকা পয়সার অভাব নেই। বাবার চল্লিশায় পুরো গ্রামবাসীসহ আশেপাশের সকলকে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। একটু আগে মসজিদে মাইকিং করা হয়েছে। সকলে যেন কাল ইংরেজ বাড়ির এতিমখানার সামনে অবস্থানরত বড়ো মাঠে চলে আসে। সেখানে খাওয়ানো হবে।
সে নিয়েই তর্ক চলছে। আভিরার বড়ো মামার ছেলের মতে ইসলামি শরিয়তে মৃত মানুষের চল্লিশা পালনের কোনো নিয়ম নেই। তার বাবা মারা গিয়েছে বছরখানেক আগে। গ্রামের সকলের জোরাজুরিতে একপ্রকার বাধ্য হয়ে তিন দিনের অনুষ্ঠান করে তাদের ঢাকায় ফিরতে হয়েছিল। কিন্তু চল্লিশা তারা পালন করেনি। এসব লোক খাওয়ানোর থেকে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া দরুদ পাঠ করলেই হয়। মানুষকে খাইয়ে কোনো পূণ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

নাওয়াজ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ইসলাম নিয়ে এসব তর্ক বিতর্ক তার ভালো লাগে না। যেখানে অনন্তকাল থেকে মানুষজন ক্রমাগত ধর্ম নিয়ে তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে আসছে সেখানে এসবে কান না দেওয়ায় শ্রেয় মনে হলো। খোদা তায়ালার কারিমুল কিতাব আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ মেনে চললে এত বিরোধিতা করার প্রশ্নই আসে না। নিশ্চয় তারা কুরআন, সুন্নাহর মতে জীবন পরিচালনা করছে না। তাই তো এত ঠিক বেঠিক নিয়ে তর্কাতর্কি।
নাওয়াজকে উঠে দাঁড়াতে দেখে আভিরার বড়ো মামার মেয়ের জামাইও উঠে দাঁড়াল। সম্বন্ধীর এসব আলাপচারিতা তার মোটেও ভালো লাগে না। ছেলেটা অতিরিক্ত ধর্মভীরু। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে। তবে কিছু বিষয়ে ঘোর বিরোধিতা করে বসে। নানান যুক্তি দাঁড় করায়। অথচ ইসলামে এসব যুক্তি বরাবরই তুচ্ছ। অতিরিক্ত কোনোকিছুই ভালো নয়। এর প্রমাণ তার চোখের সামনে।

নাওয়াজ আর দাঁড়ায় না, বড়ো বড়ো পা ফেলে ঘরের বাইরে চলে গেল। তার পিছনে ফয়সালও বের হলো। ফয়সালকে বেশ লেগেছে নাওয়াজের। খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হলো ছেলেটাকে। এর আগে কখনো দেখা হয়নি। আজ সকালে তাযীমকে নিয়ে যখন বের হয়েছিল তখন কথা হয়েছিল তাদের। এতেই আভিরার বড়ো মামার ছেলের থেকে বেশ ব্যক্তিত্ববান মনে হলো ফয়সালকে।

ফয়সাল একটু হেসে বলল,
– কী ভাবছ?

নাওয়াজ বুঝতে না পেরে পিছন ফিরে তাকায়।
– কোন বিষয়ে?

ফয়সাল ঠোঁট গোল করে ক্ষীণ শ্বাস ফেলে বলল,
– ঐ যে ভিতরে যা নিয়ে কথা হচ্ছে, কে জিতবে?

– জানা নেই। তবে তারা অযথাই তর্ক করছে। ধর্ম নিয়ে এমন মতবিরোধ‌ আমার বরাবরই অপছন্দ।

বলেই নাওয়াজ সিগারেট ধরায়। ফয়সালের দিকে একটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– খাও তো?

ফয়সাল ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। ডাক্তার হয়ে কই এসব খাওয়ার ক্ষতি নিয়ে লেকচার ঝাড়বে, তা না করে নিজে খাচ্ছে আবার তাকেও সাধছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল,
– মাঝেমধ্যে।

নাওয়াজ দু হাত পিছনে নিয়ে আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিমায় বলল,
– ভয় নেই। তোমার বউ দেখবে না, নিশ্চিন্তে টান দিতে পারো।

ফয়সাল কেশে উঠল। কিছুটা অপ্রস্তুতও হলো। একে তো অল্প পরিচয়ে ছেলেটা তার সাথে অনেকটা ফ্রি হয়ে গিয়েছে তার উপর বুঝে গেল সে বউয়ের ভয়ে এদিক ওদিক দেখছে। মেয়েটা তার সিগারেট খাওয়া একদম পছন্দ করে না। যদি দেখে সে সিগারেট মুখে নিয়েছে তাহলে খবর খারাপ করে ছাড়বে। তাই তো অতি সাবধানে আশপাশ পরখ করে নিল।

নাওয়াজ ওর পিঠে হাত রেখে বলল,
– রিল্যাক্স, হাইপার হওয়ার কিছু নেই।

নাওয়াজ তার থেকে বয়সে ছোটো। তবুও কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। ফয়সাল ইতস্তত করে সিগারেটে টান দিল। অর্ধেকটা শেষ করে মাটিতে ফেলে পায়ে মাড়িয়ে জ্বলন্ত সিগারেটের আগুন নেভায়। পকেট হাতড়ে একটা চকলেট পেল। যদিও সে চেইন স্মোকার না। তবে প্রায়শই সিগারেট ছোঁয়া হয়। তার বদৌলতে পকেটে একটা দুটো চকলেট পড়ে থাকে।

নাওয়াজের দিকে বাড়িয়ে বলল,
– একটাই আছে। কী করা যায় বলো তো, ভাগ করে খাব?

– তুমি খেয়ে নাও। আমার চকলেট খেয়ে সিগারেটের গন্ধ দূর করার প্রয়োজন নেই। আমার আবার বউয়ের ভয় নেই।

_

নাওয়াজ দরজা আটকে পিছন ঘুরতে হুট করে আভিরাকে দেখে থমকে গেল। ঢুলুঢুলু পায়ে তার কাছে এসে প্রশ্ন ছুঁড়ল মেয়েটা।

– কোথায় ছিলেন?

নাওয়াজ কিছু বলতে চাইল। তবে আভিরার সন্দিহান দৃষ্টি দেখে থেমে যায়।

– আপনি সিগারেট খেয়েছেন?

– ক…কই না তো।

হঠাৎ প্রশ্নে নাওয়াজ থতমত খায়। কেমন একটা বিব্রতভাব তার মুখবিবরে। অপরাধ করে জেরার মুখে পড়লে তাদের চেহারায় যেমন একটা চোরা ভাব দেখা যায় নাওয়াজের মুখাবয়বেও সেই ছাপ। মেয়েটা যে সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারে না এ কথা তার মাথায় ছিল না একেবারে।
নাওয়াজ হুটহাট কারণ ছাড়াই সিগারেট ফুঁকে। যখন তার মনে হবে একটা সিগারেট না ধরালেই নয় তখনই সিগারেট ধরিয়ে টান দিবে। আভিরা আসার পর আজ প্রথম সিগারেট ছোঁয়াল সে। মুখের সামনে হাত নিয়ে ক্ষীণ শ্বাস ফেলে বুঝার চেষ্টা করল সিগারেটের গন্ধ আছে কিনা। তীব্র গন্ধ নাকে ঠেকল। তার উচিত হয়নি সবে সিগারেট খেয়ে রুমে আসা। সে তো একা নেই। ঘরে এখন তার বউ আছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। তখন ফয়সালের থেকে আধ ভাঙা চকলেট খেয়ে নিলেই বোধ হয় ভালো হতো। তাহলে এমন বিপাকে পড়তে হতো না।

আভিরা কেশে উঠল। সিগারেটের গন্ধ সে সহ্য করতে পারে না। এ লোকের সিগারেট খাওয়ার বদ অভ্যাস আছে তা জানা ছিল না। অতিরিক্ত কাশির ফলে মেয়েটার চোখে ধীরে ধীরে পানি জমতে লাগে। নাওয়াজ অসহায় চোখে তাকায়। আভিরার সিগারেটে এত সমস্যা জানলে সিগারেট ছুঁয়ে দেখত না। মেয়েটাকে ধরতে গেলে আভিরা বাধা দিল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
– ফ্রেশ হয়ে আসুন, প্লিজ। সিগারেটের গন্ধে থাকা যাচ্ছে না।

নাওয়াজ তাই করল। দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ভালো মতন ফ্রেশ হয়ে বের হলো। নাওয়াজ ভেবেই নেয় আর কখনো সিগারেট ছুঁবে না সে।

_

অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাহমিদার জোরাজুরিতে নাওয়াজ তার বাড়িতে যেতে রাজি হলো। তার রাজি না হওয়ার একমাত্র কারণ শাওন। তবুও তাহমিদা এত করে বলল নাওয়াজ রাজি না হয়ে পারল না। তাছাড়া আভিরা যেতে চেয়েছে। ফুফুর শ্বশুর বাড়িতে তার কখনো যাওয়া হয়নি। এই প্রথমবার যেতে পারবে ভেবে ভিতরে ভিতরে উত্তেজনার শেষ নেই।‌ তাহমিদা কালকেই চলে এসেছে।‌ আসার আগে বারবার নাওয়াজকে বলে গিয়েছে এক রাতের জন্য হলেও যেন তার বাড়িতে যায়। নাওয়াজ, আভিরা গাড়ি থেকে নামতেই দেখল সকলে তাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

যেহেতু সম্বন্ধীর মেয়ের জামাই প্রথমবারের মতো তার বাড়িতে আসতে চলেছে, উচিত ছিল নিজে গিয়ে বাজার করা। অথচ মোর্শেদের এ বিষয়ে কোনো হেলদোল নেই।
তার অনাগ্রহ দেখে বাধ্য হয়ে মোজাম্মেল বাজারে গেল।
আজ হাট বসেছে। সপ্তাহে দুদিন বসে। দেশি মুরগি, হাঁস, কেজি তিনেক গোরুর গোশ, বড়ো বড়ো মাছ, বালতি ভর্তি দুধ, কয়েক হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখতে চান না তিনি। এত সব দেখে শায়লার মাথায় হাত। রীতিমতো ফুঁসে উঠল। মোজাম্মেল আসার পরই একপ্রকার ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। একে তো ঐ মেয়েকে ছেলের বউ করার ইচ্ছে ছিল, সে ছেলের বউ তো হলোই না। তার উপর মেহমান কী তার পক্ষ থেকে এসেছে নাকি। ঐ মেয়ে আর তার জামাই নিয়ে এত আদিখ্যেতার কী আছে। যার বউয়ের বাড়ি থেকে এসেছে তার তো কোনো মাথা ব্যথায় নেই। সব খরচ তার স্বামীর পকেট থেকে হলো। কত টাকার বাজার সদাই নিয়ে এসেছে। বাজারের ব্যাগ থেকে এটা ওটা বের করছে আর রাগে ফুঁসছে।

সকলে উঠানে। আর সে রান্নাঘরে বসে আছে। গরমে ঘেমে গিয়েছে একদম। মানুষ দাওয়াত দিয়ে জামাই বউ সব দায়িত্ব তাদের উপর দিয়ে রেখেছে। নিজেদের মেহমান নিজেরা দেখবে তা না। আভিরাদের বসার ঘরে বসিয়ে তাহমিদা শরবতের গ্লাস হাতে দিল। সাথে করে কিছু নাস্তার ব্যবস্থাও করেছে। ওদেরকে একটা ঘর দেখিয়ে তিনি রান্নার কাজে ছুটলেন। শায়লা কাটাকুটি করে রেখেছে। তাহমিদা গিয়ে রান্না চড়িয়ে দিল।

_

দুপুরের খাবার খেয়ে আভিরা একটু বের হলো, আশপাশটা ঘুরে দেখবে বলে। এখানে আসার পর শুধু বসে বসে সময় কাটাচ্ছে। এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগছে না তার। তার ফুফুর বড়ো মেয়ে তাদের সাথে একবার দেখা করে সেই যে ঘরে গিয়েছে আর খবর নেই। নাওয়াজ তৃপ্তিকে নিয়ে কোথায় যেন বেরিয়েছে জানা নেই। তাহমিদাও কাজে ব্যস্ত। কেউ নেই বিধায় আভিরা একাই বের হলো। বের হতেই দেখা হলো শায়লার সাথে। ভদ্রমহিলা ওকে দেখে মৃদু হাসে।

– কোথাও যাচ্ছ?

– জি একটু আশেপাশে ঘুরে দেখছিলাম।

আভিরার এমন মোলায়েম কণ্ঠ তার গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। মেয়েটার এত নমনীয়তা যেন সহ্য হলো না।

– একটা কাজ করে দিতে পারবে?

– জি বলুন কী করতে হবে?

হাতের গ্লাসটা আভিরাকে দিয়ে বলল,
– শাওনকে একটু দিয়ে আসো তো মা। আমার কাজ আছে। নয়তো আমিই দিয়ে আসতাম। একটু কষ্ট করে দিয়ে এসো কেমন।

– এভাবে বলবেন না আন্টি। আমি দিয়ে আসছি।

– ঐ যে বামের ঘরটা, ঐ ঘরে শাওন আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here