প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_২৯

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২৯
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

– তুমি এমন অবিবেচক এর মতো কাজ কী করে করতে পারলে?

স্ত্রীর কথা বুঝতে না পেরে তোফায়েল আহমেদের কপাল সংকুচিত হলো।

– মানে?

– মানে হলো মেয়ে বিয়ে দিয়ে এ বাড়িতে রেখে দেওয়ার চিন্তা করলে কী করে?

– আশ্চর্য! তুমিও দেখি নাওয়াজের মতো কথা বলছ। সেও আমার কথা শুনে একই কথা বলল, আমি নাকি মেয়ে বিয়ে দিয়ে এখন তার বউ রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি।

– তো ভুল কী বলেছে?

– পুরোটাই ভুল বলেছে। আমি শুধু আমার মনোভাব নাওয়াজকে জানিয়েছি। আপাতত চেয়েছিলাম মেয়েটা কিছুদিন এখানে থেকে পরে না হয় যাবে। তাছাড়া কয়েক দিন পর ভার্সিটিতে ভর্তি হতে হবে। তার জন্য প্রিপারেশন দরকার। ওখানে গেলে সংসারে মনোযোগ দিতে গিয়ে পড়ালেখার কথা ভুলে বসবে। এখানে থাকলে সে সুযোগ পাবে না।

– তাই বলে এখানে থেকে পড়ার কথা বলবে? মেয়েটার সবে বিয়ে হয়েছে। এ সময়ে তাকে এখানে রাখার কথা কী করে বলতে পারলে?

– দেখো বিয়ে কিন্তু চার বছর পর হওয়ার কথা ছিল। সে সুবাদে আমার কাছে মেয়ে রাখার কথা বলতেই পারি।

– না, পারো না। চার বছর পর হওয়ার কথা থাকলেও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাই আর এখন বলে লাভ নেই। দুদিন হয়েছে ও বাড়ি থেকে এসেছে। আর এখনই এসব বলছ। এত চিন্তা থাকলে বিয়ে কেন দিয়েছিলে? না কি নাওয়াজের উপর তুমি ভরসা করতে পারছ না?

– তা কেন পারব না। নয়তো মেয়েকে কী তার হাতে তুলে দেই।

– তাহলে এসব বলার মানে?

– মেয়ে আমার ছোটো, তার ঐরকম বুঝ এখনও হয়নি।

– ভুলে যাবে না আমি কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক না দিয়ে তোমার ঘরে পা দিয়েছিলাম।

– তোমাকে আমি সেভাবে সামলেছি। ডিগ্রি অবধি পড়িয়েছিও, বাধা দেইনি কিন্তু।

– তুমি দিলে কী হবে? তোমার মা কিন্তু দেয়নি। বরং গোটা সংসারের বোঝা তখন আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল। সেদিক দিয়ে ইয়াজমীন আপা মোটেও আমাদের আভিরার সাথে এমন করবে না। আর না নাওয়াজ তোমার মেয়ের পড়া নিয়ে বাধা দিবে। তাহলে এত চিন্তা করার কারণ?

– আমার চিন্তা আপা বা নাওয়াজকে নিয়ে নয়, চিন্তা তোমার মেয়েকে নিয়ে।

– তোমার চিন্তাগুলো অযৌক্তিক।

– মোটেও অযৌক্তিক নয়। তুমি মেয়ের হাবভাব খেয়াল করোনি?

– করেছি। তবে আমার চোখে তেমন কিছু ধরা পড়েনি। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তার মধ্যে পরিবর্তন আসবে তা স্বাভাবিক নয় কি? তুমি কী এ বিষয় নিয়ে অসন্তুষ্ট, মেয়ে সাংসারিক হোক তা কী চাও না?

– এখানে আমার চাওয়া না চাওয়ার কথা আসছে কেন? মেয়ের সাংসারিক হওয়াতে আমি যে অসন্তুষ্ট তা কিন্তু নয়। বরং এমনটা হলে আমি খুশি হব। কিন্তু ভয় হচ্ছে এসবের জন্য মেয়ে আমার নিজের লক্ষ্য না ভুলে বসে। তুমি দেখলে না মেয়ে এখনই কেমন রান্নাবান্নায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। আগে কিন্তু এমন করেনি।

– তা ঠিক। তবে আমার মনে হয় এ আগ্রহটা খুব বেশি দিন থাকবে না। এখন তো পড়ার চাপ নেই। তাই এমন করছে। চাপ পড়লে সে নিজ দায়িত্বে আগের মতো পড়া চালিয়ে যাবে। আর বিয়ে করেছে সংসারের কাজে হাত না দিলে কেমন দেখায়। আমার মেয়ে সে নিজের দায়িত্ব নিজে বুঝে চলবে। একদিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে অন্যদিকে নিশ্চয় গাফিলতি করবে না।

একটু থেমে আবার বলল,
– তবে যাই বলো না কেন, তোমার মোটেও নাওয়াজের সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করা ঠিক হয়নি। যত যাইহোক সে এখন তোমার মেয়ের জামাই। তারা তাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কখন থেকে, কেমন করে কাটাবে তার সিদ্ধান্ত তুমি নিতে পারো না।

– আমি কিন্তু সরাসরি তাকে তেমন কিছু বলিনি।

– তা বলোনি। কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে তাই বুঝিয়েছ। আর নাওয়াজ বিচক্ষণ ছেলে। তোমার কী মনে হয়, তোমার কথার ইঙ্গিত বুঝতে তার অসুবিধা হবে।

তোফায়েল আহমেদ নিশ্চুপ রইলেন। সরাসরি না বললেও কথায় কথায় তিনি অবশ্য নাওয়াজকে বুঝিয়েছেন তারা এখনই যেন স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাকে এত গভীরতায় নিয়ে না যায়। আসলে তিনি ভয়ে আছেন। নয়তো এসব কথা তিনি কখনো বলতেন না। মেয়ে তার পড়ালেখায় অনেক ভালো। এখন যদি সংসারের চাপে পড়ালেখা থেকে মনোযোগ হটে যায়, বিনষ্ট হয় তখন। ওখানে থাকলে ভুলচুক কিছু হয়ে যাবে। তাই তো আভিরাকে এখানে রেখে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নাওয়াজ রাজি হয়নি। তার একটাই কথা আভিরাকে তাদের কাছে রেখে যাবে না। দরকার পড়লে আভিরার থেকে দূরত্ব রেখে চলবে। তবুও না।

_

গায়ের পাঞ্জাবি খুলে আভিরাকে খুঁজল নাওয়াজ। বসার ঘরেও দেখেনি। সকালে সে তাযীমকে নিয়ে বেরিয়ে ছিল।দুজন অনেকক্ষণ ঘুরেছে। ছেলেটা তার সাথে কথা বলছে না। দু একটা কথার জবাব দিলেও আগের মতো অত কথা বলেনি। কী কারণে এমন করছে; ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারল না নাওয়াজ।
মাত্র রুমে এলো। বসার ঘরে আনেসা আর মোহনা টিভিতে কী যেন দেখছে। নাওয়াজের দিকে নজর পড়েনি তাদের। অনেকক্ষণ বসে থেকেও যখন আভিরার দেখা মিলল না, নাওয়াজ না পেরে উঠে দাঁড়ায়। এবার যেন তাদের নজর নাওয়াজের দিকে পড়ল।

আনেসা নাওয়াজকে দেখে বলল,
– কখন এলে?

– মাত্রই এলাম।

– কিছু লাগবে?

– না। ও কোথায়?

– কে আভিরা?

– হ্যাঁ। একটু দরকার ছিল।

– ও তো বাড়ির পিছনে আছে।

– একা?

– না জ্যোতি, মীরা ওরাও আছে।

– দাঁড়াও ওকে ডেকে দিচ্ছি।

বলে মোহনা উঠতে নিলে নাওয়াজ থামিয়ে দিয়ে বলল,
– আপনার যেতে হবে না, আমি দেখছি।

নাওয়াজ বাড়ির পিছন দিকে পা বাড়াল। এ বাড়ির আনাচে কানাচে যা আছে সব তার চেনা। তোফায়েল আহমেদের ছাত্র থাকাকালীন এ বাড়িতে এক দু বার আসা হয়েছিল তার। তবে তখনকার আর এখনকার চিত্রে বেশ তফাৎ।
তখন এমন আলিশান বাড়ি ছিল না। পুকুরের পাড় ঘেঁষে কলপাড়, তার সাথে রান্নাঘর। রান্নাঘরের সামন বরাবর দুটো টিনের ঘর। কিন্তু এখন বাড়ির চেহারা পাল্টেছে। সেই টিন ঘর ভেঙে হয়েছে বিশাল দালান। তবুও চিনতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। কলপাড়ের সামনে একটা কড়মচা গাছ ছিল। সেটা এখন আর নেই। হয়তো এ বাড়ি তোলার সময় কেটে ফেলা হয়েছে। চাপকলটাও নেই। উঠানের সামনে এক কোণায় একটা চাপকল বসানো আছে।
কিছু দূর যেতে নাওয়াজের পা থেমে গেল। কানে এলো কিছু রমণীর হাসির শব্দ। একটু এগিয়ে দেখল জ্যোতি ওড়নার একাংশের এ কোণা ও কোণা মেলে ধরে রেখেছে। তাতে পড়ে আছে দশ, বারোটা কাঁচা আম। উপরে তাকাতে হতভম্ব হয়ে গেল।

– আপনি গাছে কী করছেন?

ভরাট কণ্ঠ কানে আসতে আভিরা পড়তে গিয়েও গাছের ডাল ধরে কোনোরকম সামলে নেয়। নাওয়াজের দিকে চোখ পড়তে একপ্রকার লাফিয়ে নেমে এলো সে।

মীরা মজার ছলে বলল,
– বাহ্! আমাদের আভির স্বামী তো দেখি তাকে চোখে হারায়। বউয়ের খুঁজে এখানে চলে এসেছে।

মীরার কথায় আভিরা লজ্জা পেলেও নাওয়াজের কোনো ভাবান্তর হলো না। অন্য সময় হলে এমন রসিকতায় হয়তো সেও একটু মজা উড়াতো বা কথার পিঠে জবাব দিত। কিন্তু এখন এমন কিছুই করল না। বরং জ্যোতিকে পাশ কাটিয়ে আভিরার কাছে চলে আসে। আভিরা একটু হকচকায়। এ লোক কী এখন গাছে উঠাতে কথা শোনাবে।

সে তো গাছে উঠতে চায়নি। জ্যোতি, মীরা আম ভর্তা খেতে চেয়েছে। ওদের মধ্যে একমাত্র আভিরা গাছে উঠতে পারে। তাই সকলে ওকে গাছে উঠতে বলে। আভিরা প্রথমে উঠতে রাজি না হলেও পরে উঠে পড়ে। গাছে উঠার প্রসঙ্গ এলে আভিরা যেন নিজেকে আটকাতে পারে না। দাদি বাড়িতে যখনই আসা হয় সে গাছে উঠবেই। তবে আম গাছে কখনো উঠা হয়নি। ওদের বাড়ির পাশ ঘেঁষে একটা কামরাঙ্গা গাছ আছে। আভিরা প্রতিবার বাড়ি এলে এ গাছটাই উঠবে তো উঠবেই। তবে এবার উঠা হয়নি। সে তো এখন বিয়ের কনে। তার এভাবে গাছে উঠা মানায়। তাই আর উঠতে চায়নি। তবে ওরা জোর করাতে আভিরা যেন না উঠে পারল না।
আভিরার চাচাতো বোনগুলো যদিও গাছে উঠতে পারে তবে আভিরা সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করে না। নাওয়াজ যেহেতু বাড়ি নেই ভাবল ঐ লোক আসার আগেই নেমে যাবে। কিন্তু হায় সে দেখেই নিল।

বাম হাতটা উঁচিয়ে দেখল অনেকটা ছিলে গেছে। নাওয়াজ হতাশার শ্বাস ফেলে। তাকে দেখেই কী এত অস্থিরতা! মেয়েটা এত ভয় পায় তাকে। অসাবধানতাবশত নামতে গিয়ে হাত ছিলে ফেলেছে। হঠাৎ হাত ধরাতে আভিরা একটু হকচকালেও নিজেকে সামলে নেয়। নাওয়াজের দিকে তাকাতে দেখল চোখ মুখ শক্ত করে তার হাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ। আভিরা নিজের দৃষ্টি নাওয়াজের ধরে রাখা হাতে দিল। খুব সামান্য ছিলেছে। অতি সূক্ষ্ম চোখে তাকালে বোধহয় তা নজরে পড়বে। তার হাতের চামড়া ছিলে গেছে সে তা বুঝতে পারেনি। অথচ এ লোকের চোখে পড়ে গেল। আভিরা অভিভূত হলো। এ লোকের তার দিকে এত খেয়াল যে তুচ্ছ বিষয়টাও নজর এড়ায়নি।

কারো গলা খাঁকারিতে ওদের ধ্যান ভাঙে। আভিরা ছিটকে দূরে সরে গেল। মীরা বলল,
– কোন সমস্যা?

– না, আমি আসছি।

– আরে যাচ্ছেন কোথায়? এখানে থেকে যান। আপনার বউ আম পেড়েছে, খেয়ে যাবেন না।

নাওয়াজ গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। আভিরার মনে হলো লোকটা বোধহয় রাগ সংবরণের চেষ্টা করছে। আচ্ছা রাগের কারণ কী সে?

_

সবাই আম গাছের নিচে পেতে রাখা মাচায় বসে পড়ল।
এলাকার কয়েকজন ছেলে এ মাচা বানিয়েছে। তাদের আড্ডায় সুবিধা হয়। বিকেলে, রাতে এখানে বসে ওরা আড্ডা দেয়।

আভিরা বোলে থাকা পানিতে আমগুলো ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে গ্রেটারের সাহায্যে কুচি করতে লাগল। সব সরঞ্জাম ওরা আগেই নিয়ে এসেছে। মীরা একটা বাটিতে শুকনো মরিচ ডলে তাতে লবণ, কাসুন্দি দিয়ে আরেকটা বয়াম থেকে শুকনো আমের ফালি দিয়ে দেয়।
প্রতি বছর আনেসা কাঁচা আম ফালি করে রোদে শুকিয়ে তা বয়ামে ভরে রাখে। আভিরা টক পাগল। মাঝেমধ্যে এগুলো বের করে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রেখে নরম হয়ে এলে তাতে লবণ, মরিচ গুঁড়ো, তেঁতুল দিয়ে মাখিয়ে খাবে।
আমের ফালিগুলো আগেই ভিজিয়ে রেখেছিল। সেগুলো দিয়ে ভালোভাবে কচলে নিয়ে কুচি করা আমগুলো দিয়ে মেখে নেয়। জ্যোতি স্লাইস করে কেটে রাখা আমের পিস নিয়ে তাতে লবণ, মরিচ লাগিয়ে মুখে পুরে নিল।

আভিরারা যে বাড়িতে থাকে সে বাড়ির সামনে একটা আম গাছ আছে। সেটাই গুটি কয়েক আম ধরেছে। এত ছোটো, মুখে দেওয়ার মতো হয়নি। বাড়িতে এসে এমন বড়ো বড়ো কাঁচা আম দেখে তারও খেতে ইচ্ছে করছিল। এখন কিনা চোখের সামনে আম রেখে মুখে দিতে পারছে না। আভিরার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এ লোক আসার আর সময় পেল না। নাওয়াজ না থাকলে আভিরা এতক্ষণে জ্যোতির মতো আমে কামড় বসিয়ে দিত। এখন আস্ত আমে লবণ, মরিচ লাগিয়ে কামড় বসালে এ লোক নিশ্চয় তাকে হাভাতে ভাববে। ভাববে আম দেখে খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরেই সে গাছে চড়েছে।

নাওয়াজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জ্যোতি বলল,
– আরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপুর পাশে বসুন।

নাওয়াজ গিয়ে আভিরার পাশে বসল। তবে তার দিকে তাকাল না অবধি।

– নিন ভাইয়া, একটু মুখে দিন।

নাওয়াজ একটু মুখে পুরে চোখ মুখ কেমন কুঁচকে নেয়।নাওয়াজের এমন বিকৃত মুখাবয়ব দেখে আভিরা হেসে ওঠে। নাওয়াজ চোখ পাকিয়ে শাসাল মেয়েটাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here