প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৩২

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩২
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

রাত প্রায় একটা। এত রাতে একটা মেয়ের আইডি থেকে রিকোয়েস্ট দেখে জিদান কপাল কুঁচকায়। যদিও আইডি দেখে বুঝার উপায় নেই এটা কোনো ছেলের আইডি নাকি মেয়ের। তবে জিদান শতভাগ নিশ্চিত এটা কোনো মেয়ের আইডিই হবে। ব্ল্যাংক প্রোফাইল, আবার নামটাও খানিকটা অদ্ভুত। বায়োটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল- mysterious!

আইডি খুলেছে এক মাসও হয়নি। না কোনো ফ্রেন্ড, ফলোয়ার আছে আর না কোনো পোস্ট। জিদান এমন অদ্ভুত আইডি থেকে রিকোয়েস্ট আসার কারণ খুব একটা ধরতে পারল না। রহস্যময় মানবীকে একটু ভড়কে দেওয়ার জন্য মেসেজ করল,
– শোনো মেয়ে, রাত বিরাতে অপরিচিত ছেলেদের রিকোয়েস্ট দেওয়া মেয়েদের আমি পছন্দ করি না।

মেসেজ সিন হওয়ার পরও‌ কোনো রিপ্লাই না দেখে জিদান হাসল। তার ধারণাই সঠিক তবে। মাথামোটা মেয়ে নিশ্চয় তার এমন মেসেজ দেখে ভড়কে গিয়েছে। কোনো রিপ্লাই আসবে না। তাই আর অপেক্ষা না করে মোবাইল রেখে দিল।
কয়েক জোড়া চোখের মালিক ঝুঁকে মোবাইলে চেয়ে আছে। একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে হতভম্ব হয়ে বলল,
– এটা কী হলো?

কিন্তু মাঝের জন্য নিরুত্তর, প্রতিক্রিয়াহীন। ভাবলেশহীন হয়ে চেয়ে আছে ফোনের দিকে। মিশু কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
– বুশু ছেলেটা বুঝে গেল।

বুশরা কটমট করে চাইল মিশুর দিকে। সব দোষ এই মেয়ের। বিয়ে‌ বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনা সবটাই বলেছিল মেয়েটাকে। সব শুনে জিদানকে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বুশরা রাজি না হলে তাদের কাজিনদের বাড়িয়ে বাড়িয়ে অনেক কথায় বলে মিশু। পুরো প্রসঙ্গই জিদান কেন্দ্রিক। তার কথায় না হয় পাত্তা দিল না। তবে এদের কীভাবে মানা করবে। সব শুনে সকলের জিদানকে দেখার কৌতূহল জাগে। কে এই ছেলে? যে কিনা বুশরার মতো রূপবতীর প্রেমে না পড়ে উল্টো মজা উড়িয়েছে ।

জিদান কেমন ছেলে তারা দেখে নিবে। বিয়ে বাড়িতে সুন্দরী মেয়ে দেখলে ছেলেরা একটু আধটু ভাব নেয়। ছেলেটাও নিশ্চয় তাই করেছে। নয়তো বুশরার মতো মেয়েকে এক নজর অন্য চোখে দেখবে না এমন ছেলে কমই আছে। তাদের কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে নম্র ভদ্র, সুন্দরী মেয়ে বলে কথা। আর তাকে কিনা দেখেও অদেখা করে গেল। একটা ছেলে এত দায়সারা গোছের কেন হবে। সে মেয়ে দেখবে, মেয়ের প্রেমে পড়বে। তা না করে এত অগ্রাহ্য করে চলবে কোন দায়ে।
সকলে জিদানকে জ্বালানোর পরিকল্পনা করে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই ভেস্তে যাবে। বুশরা যেন জানত এমনটাই হবে। ওদের কোনো প্ল্যান সাকসেস হবে না। তবে শুরুতেই যে ফ্লপ হয়ে যাবে তা ভাবেনি।

বুশরার এক কাজিন বলল,
– ব্যাটা বুঝল কি করে এটা যে একটা মেয়ের আইডি। নিশ্চয় আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছে।

মিশু বলল,
– এখন কী করবি? ব্যাটা আমাদের সব চাল ভেস্তে দিল। শালা হারামখোর, সুন্দর ছেলেগুলো বুঝি এমন ধূর্ত হয়।

বুশরা রয়েসয়ে বলল,
– তোরা যা চায়ছিস তা মোটেও করতে দেওয়া যাবে না।
আমি এখনই রিকোয়েস্ট ক্যান্সেল করে এ আইডি ডিএক্টিভেট করে দিব।

বর্ষা সহসাই ফোন ছিনিয়ে নেয়।

– কীসের ডিএক্টিভেট? আমাদের প্ল্যান সাকসেস না হওয়া অবধি এ আইডি ডিএক্টিভেট হবে না।

– মাথা খারাপ আপু? দেখলি না এ লোক কেমন বুঝে গেল।

– এতে তো আমাদেরই সুবিধা হয়েছে। যেচে আর নিজের পরিচয় দিতে হবে না।

– মানে?

– আমরা তো আর ছেলে সেজে কথা বলতাম না। কয়েক দিন জ্বালিয়ে ঠিকই সব বলতাম। শুধু নাম পরিচয়টা মিথ্যা থাকত। আর প্ল্যান চেঞ্জ করা হয়েছে। একটু অন্য কায়দায় ব্যাটাকে গোল খাওয়াব।

– তোর না কাল বিয়ে। আর এখন এসব করে বেড়াচ্ছিস?

– আমি তো কিছু করব না। যা করার তুই করবি।

– যা মন চায় কর। কিন্তু আমাকে একদম এসবের মাঝে টানবি না।

– তা বললে তো হবে না বুশু বেবি। ছেলেটাকে যে প্রেমের ফাঁদে তোমাকেই ফেলতে হবে।

_

আজকাল ভার্চুয়াল জগৎ এ কাউকে খুঁজে পাওয়া তেমন একটা কঠিন কাজ না। ব্যক্তির নাম জানা থাকলে বোধ হয় কাজটা আরও সহজ হয়ে যায়। জিদানের নাম লিখে সার্চ দিয়ে প্রথমে না পেলেও পরমুহূর্তে ঠিকই পেয়ে যায়। মিউচুয়াল ফ্রেন্ড এ বর্ণের আইডি শো করছে। তার মানে বর্ণও এড আছে। আইডি লকড। কোনোকিছু না ভেবে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয়।

বর্ষার বিয়ে কাল। আকদ করিয়ে রাখবে। মোবাইলে বিয়ে হবে। ছেলে সিঙ্গাপুর থাকে। দু মাস পর ছেলে এলে অনুষ্ঠান করে বউ উঠিয়ে নিবে। বোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে বুশরা নানা বাড়ি এসেছে। কে জানত এখানে এসে যে এমনভাবে ফেঁসে যাবে। এতদিন এরা এদিনের জন্যই চুপ ছিল। কবে তারা একজোট হবে আর বুশরাকে পাবে। তাকে পেয়ে জিদানকে জ্বালানোর জন্য চমৎকার বুদ্ধি আঁটে।

রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে বুশরার। চোখের সামনে পড়ে থাকা চুলগুলো দু হাতে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণ সব মুখ বুজে দেখে গেলেও এখন আর পারল না। খানিকটা রেগে আঙুল উঁচিয়ে বর্ষাকে বলল,
– তোমার আসলে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। তোমরা মজা নিতে চেয়েছ, তাতে বাধা দেইনি বলে ভেবো না এসব ফালতু আবদার মেনে নেব।

– আরে রেগে যাচ্ছিস কেন? আমরা তো জাস্ট ছেলেটাকে একটু বাজিয়ে দেখতে এমন করছি। আর আজ বাদে কাল তো আমি চলেই যাব। বড়ো বোনের শেষ আবদার রাখবি না।

বোনের এমন কথা শুনে বুশরা কিছুটা নরম হলো। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
– এমন আবদার আমার পক্ষে রাখা সম্ভব না আপু। তুমি প্লিজ রাগ করো না। এসেছি তোমার বিয়েতে। এমন কিছু চেয়ে বসো না যাতে বিয়ের আগেই চলে যেতে হয়।

– এসব কী বলছিস বুশু? আমরা তো জাস্ট মজা করতে বলেছি। তুই নরমাল একটা বিষয়কে এত সিরিয়াসলি কেন নিচ্ছিস?

বুশরা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
– তোমরা যতটা নরমাল ভাবছ বিষয়টা ততটাও নরমাল না।

– মানে?

– কিছু না। আমি মায়ের রুমে যাচ্ছি।

বর্ষা তড়িৎ গতিতে বুশরার হাত চেপে বলল,
– ফুফুর কাছে যাবি মানে? আজ আমাদের একসাথে ঘুমানোর কথা ছিল ভুলে গেলি?

বুশরা হাত ছাড়িয়ে অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলল,
– ভুলিনি। তবে যে কাজের জন্য থাকতে চেয়েছিলে তা তো আর হওয়ার নয়। তাই ও ঘরে যাচ্ছি।

_

লাবণ্য বের হতেই দেখল মাহাদ দাঁড়িয়ে, গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে হয়তো। মাহাদ তাকাতে লাবণ্য বলল,
– আজ এত দেরি যে?

মাহাদ একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
– ওই হয়ে গেল।

– নাওয়াজ ভাই তো সেই সকালে বেরিয়েছে।

– ওর কথা আর বলো না। নতুন বিয়ে হয়েছে। আর ও বউকে সময় না দিয়ে রাত দিন হসপিটালে পড়ে থাকে। বললাম আভিরাকে নিয়ে একটু ঘুরে আয়, শুনল না। তার নাকি সময় নেই। কি এমন ব্যস্ততা। ওর ব্যস্ততা দেখে মনে হয় ও যেন একাই কাজ করে। এমন ব্যস্ততা দেখালে বউ থাকবে।

মাহাদ খেয়াল করলে দেখতে পেত আশায় চকচক করা লাবণ্যর চোখ দুটো। ছোটো বাচ্চারা হারানো জিনিস ফিরে পাবে শুনলে তাদের মুখশ্রীতে যেমন খুশির ঝিলিক দেখা যায় লাবণ্যর চোখে মুখেও তা ফুটে উঠেছে।

রিকশা দেখতে মাহাদ সেটাই চড়ে বসে। সামান্য সরে লাবণ্যকে ডেকে বলল,
– উঠে বসো।

লাবণ্য খেয়াল করেনি। মাহাদের ডাকে ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে। মাহাদের সাথে এক রিকশায় যেতে হবে ভেবে অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে। লাবণ্যর অস্বস্তি অনুমান করে মাহাদ বলল,
– তোমার কি আমার সাথে এক রিকশায় যেতে অসুবিধা হবে? হলে তুমি এটাই চলে যাও। আমি অন্য আরেকটাই যাব।

লাবণ্য আশেপাশে পরখ করে দেখল আপাতত আর কোনো রিকশার দেখা নেই। এটাই করে সে চলে গেলে মাহাদকে নিশ্চয় আরেকটা রিকশা না পাওয়া অবধি দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এমনি দেরি করে বের হয়েছে। আরও দেরি হবে। ওর ও আজ ভার্সিটি যাওয়া জরুরি। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। নয়তো সে এখন বাড়ি ফিরে যেত।
লাবণ্যর তেমন ভার্সিটিতে যাওয়া হয় না। মাস্টার্সে ভার্সিটি না গেলেও চলে। মাসে একবার হাজিরা দিলেই হয়। তবে অ্যাসাইনমেন্ট এর বিষয়টা ভিন্ন। আবার কিছু নোটসও কালেক্ট করা বাকি।

এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটা কেমন দেখায়। লোকজন আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে তাদেরকে। পনেরো মিনিটেরই তো ব্যাপার। পনেরো মিনিট বাদেই মাহাদ হসপিটালের সামনে নেমে যাবে। লাবণ্য কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে রিকশায় উঠল। মাহাদের মনে হলো সময়টা এখানেই থেমে যাক। হুট করে ইচ্ছে হলো মেয়েটার হাত ধরতে। কিন্তু সে তা পারবে না। এ মেয়ের হাত ধরার অধিকার নেই তার। মাহাদ দমিয়ে নিল নিজের মনের কোণে জাগা ইচ্ছেকে। কোনো একসময় না হয় এই হাতের ভাঁজে আঙুল গুঁজে পুরো শহর ঘুরে বেড়াবে। একজনের মনে অনুভূতিরা আন্দোলন করে বেড়ালেও অন্যজনের মনের আনাচে কানাচে শুধু অস্বস্তি ঘেরা।

মাহাদ দূরত্ব নিয়েই বসেছে। তবুও হালকা স্পর্শ লাগছে। রিকশায় জায়গা একটু কম থাকে। লাবণ্য আরও খানিকটা চেপে বসল। হঠাৎ ঝাঁকিতে পড়ে যেতে নিলে মাহাদ লাবণ্যর বাহু আঁকড়ে ধরে। মুহূর্তে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে বলল,
– এখনই পড়ে যেতে।

এদিকটায় রাস্তা কিছুটা ভাঙা। অটোতে উঠলে তো অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। রিকশায় বসলে ঝাঁকি কম লাগলেও পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর লাবণ্য যেভাবে বসেছে মাহাদ না ধরলে পড়েই যেত।

লাবণ্য খেয়াল করলে বুঝত মাহাদের হাত কাঁপছে। পড়লে খুব বেশি আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও হাত পা ছিলে বাজে একটা অবস্থা হতো। মাহাদের মুখাবয়ব খানিকক্ষণের জন্য রক্ত শূন্য হয়ে গিয়েছিল। আরেকটু হলে মেয়েটা পড়ে যেত। ভাগ্যিস, সে ঠিক সময়ে হাত আঁকড়ে ধরেছে।
যাকে নিয়ে এত চিন্তা, হাত কাঁপছে, হৃৎস্পন্দন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে সে নারীর এসবে খেয়াল থাকলে তো। খেয়াল থাকলে নিশ্চয় এমন শক্ত হয়ে বসে থাকতে পারত না।

হসপিটালের সামনে মাহাদ নেমে গেল। দুজনের ভাড়া মিটিয়ে বলল,
– মামা সাবধানে নিয়ে যাবেন। ভাঙা জায়গাগুলো একটু দেখে চালাবেন।

– আচ্ছা।

মাহাদ নেমে যেতে লাবণ্য রিকশাওয়ালাকে বলল,
– মামা রিকশা ঘুরান।

– আপামণি কলেজ যাইতেন না। ভাইজান যে কয়ল আপনারে কলেজ গেটের সামনে নামাই দিতাম।

– যাব না মামা, যেখান থেকে উঠেছি সেখানে নিয়ে চলুন।

_

ইয়াজমীন লাবণ্যর হাত ধরে বলল,
– তোর হাত এমন লাল হয়ে আছে কেন?

লাবণ্য প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে বলল,
– জানি না খালা কীভাবে হলো। গোসল করতে গিয়ে হাতে জ্বালা অনুভব হতে দেখি এ অবস্থা।

– এতটা আঘাত লাগল আর তুই বলছিস তুই জানিসই না। সত্যি বলছিস তো?

– আমি তোমায় মিথ্যে বলতে যাব কেন?

– খেয়ে মলম লাগিয়ে নিস।

– আচ্ছা।

আভিরা চুপচাপ ওদের কথা শুনে গেল। সকালে লাবণ্য ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হলেও মিনিট বিশেক পরে ফিরে এসেছিল। আভিরা জিজ্ঞেস করতে চেয়েও করল না। সে খেয়াল করেছে লাবণ্য তাকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে চায়। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। সে জিজ্ঞেস করলে যদি না বলে বা তার জানতে চাওয়াটা যদি ভালোভাবে না নেয়। এসব ভেবে আর জিজ্ঞেস করা হয়নি।

লাবণ্যর হাতের দিকে চেয়ে আভিরা কিছুটা অবাক হলো।
দেখে বুঝা যাচ্ছে সুচালো কিছু দিয়ে বার কয়েক একই জায়গায় আঘাত করা হয়েছে। রক্ত বের না হলেও অনেকটা লালচে হয়ে আছে। আভিরার চাহনি লাবণ্যর দৃষ্টিগোচর হলো না। মৃদু হাসে মেয়েটা। এ হাসি তীব্র যন্ত্রণার। মুখাবয়ব কঠিন হয়ে এলো মুহূর্তে।

মাহাদ যদিও তাকে বাঁচানোর জন্য হাত আঁকড়ে ধরে ছিল তবুও লাবণ্য এ স্পর্শ নিতে পারেনি। যার জন্য মনের সব অনুভূতি, তার ছোঁয়া ছাড়া অন্য পুরুষের ছোঁয়া কেমন করে গায়ে রাখে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here