#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩৮
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
সকলে দাঁড়িয়ে কঠোর পুরুষের পাগলামি দেখে যাচ্ছে।
পুরুষটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। আভিরাকে কোনো রেসপন্স করতে না দেখে নাওয়াজ উঠে দাঁড়ায়। এখানে এভাবে রাখার কোনো মানে নেই। হসপিটালে নিতে হবে। আরও অপেক্ষা করা মানে শুধু শুধু সময় নষ্ট। নাওয়াজকে উঠতে দেখে বর্ণা বলল,
– আমি আসব সাথে?
– দরকার নেই। মাহাদ গাড়ি বের কর।
বর্ণা আর জোর করল না। সে জানে নাওয়াজ যখন একবার না বলেছে সে এখন হাজার বললেও তাকে সাথে নিবে না। শুধু তাকে কেন? দেখে মনে হচ্ছে মাহাদ ব্যতীত আর কাউকেই নিবে না সঙ্গে। সৌভিক মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে বলল,
– নিজেকে দোষ দিও না। তুমি থাকলেও এমন হতোই।
– তবুও!
– এসব এখন থাক। চলো আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।
বর্ণা হতাশার শ্বাস ফেলে। নাওয়াজ তাকে বলেছিল আভিরার সাথে থাকতে। সে আভিরার সাথেই দাঁড়িয়ে ছিল। মেয়েটা তার তখন কিছু খায়নি। ভাবল বাচ্চাকে একটুখানি খাওয়ানো যাক। অনেকক্ষণ ধরে না খেয়ে আছে। সেজন্য আভিরাকে একা রেখে বাড়ির ভিতরে গিয়েছিল। কিন্তু এর মাঝেই এত সব হয়ে যাবে কে জানত। এমন হবে জানলে সে আভিরাকে একা রেখে যেত না।
জ্বলন্ত কয়েকটা কাঠের খণ্ড পড়ে রয়েছে উঠানের দক্ষিণ দিকটায়। মাটি খুঁড়ে গর্ত করে চারটা করে ইট দেওয়া হয়েছিল তিন পাশে। সেই ইটের উপর পাতিল বসিয়ে শুকনো কাঠ দিয়ে রান্না করা হচ্ছিল। রান্না শেষে ইটগুলোও এক পাশে রেখেছে তারা। যেহেতু রান্নার কাজ শেষ হয়েছে ঘণ্টাখানেকও হয়নি। আবার এত এত পদ রান্না হয়েছে। কাঠের উত্তাপ এত স্বল্প সময়ে কমে যাবে না। কয়লাগুলো এখনও জ্বলজ্বল করছে। পা পড়লে চামড়া খসে যাবে এমন উত্তাপ। মেয়েটা এই জ্বলন্ত কাঠ কয়লার উপরেই পড়েছে। ইটের উপর পড়ে কপাল ফাটিয়েছে অনেকখানি। ডান হাতে পড়েছিল গরম পানি।
যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আভিরা আর্তনাদ করে ওঠে।
তার ঐ চিৎকারে ছুটে এসেছিল নাওয়াজ। ছেলেটা উপরে সামাদের চাচার সাথে কথা বলছিল। নিচে নামতেই দেখল তার প্রাণপাখি গলা কাটা মুরগির ন্যায় তড়পাচ্ছে। নিজের চোখে এমন দৃশ্য দেখে কজন পুরুষ ঠিক থাকে কে জানে। তবে নাওয়াজ ছিল। কিন্তু তার ঠিক থাকা মেয়েটার জ্ঞান হারানোর আগ অবধি। তারপর আর পারল কই। পরক্ষণে তার অস্থিরতা আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সকলে দেখেছে।
_
নাওয়াজ অনুভূতি শূন্য হয়ে তাকিয়ে আছে তার বুকের সাথে মিশে থাকা মেয়েটার দিকে। তখন কী ছটফট করছিল। এখন দেখো কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। তার এই অবস্থা যে কঠিন পুরুষটাকে পীড়া দিচ্ছে এ মেয়ে কী জানে। ক্ষণে ক্ষণে অসহ্য যন্ত্রণায় থেতিয়ে উঠছে নাওয়াজের পুরুষ মন।
মাহাদ মিররে এতক্ষণ নাওয়াজকেই দেখে চলেছিল।
এই ছেলেটাকে এতটা বিচলিত হতে আগে কখনো দেখেনি। দৃঢ় চিত্তের সেই পুরুষের চোখ মুখে স্পষ্ট অসহায়ত্বের ধাঁচ। কঠিন মুখাবয়বও কেমন আতঙ্কগ্রস্ত। নাওয়াজকে আভিরার কপালের সাথে কপাল ঠেকাতে দেখে মাহাদ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ঐদিকে আর নজর না দেওয়ায় শ্রেয়।
_
ডাক্তার বেরিয়ে নাওয়াজের কাছে গেল। মেয়েটাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়নি, নরমাল কেবিনেই রাখা হয়েছে।
হাতের ফাইলটা নার্সের কাছে দিয়ে বললেন,
– কপালে সেলাই লাগেনি। তবে পায়ের ক্ষতটা কিন্তু বেশ গভীর। ব্যথানাশক ট্যাবলেট খাইয়েছিলে তখন?
– না। মাথায় আসেনি।
– আচ্ছা সমস্যা নেই। এখন জ্ঞান আসবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। তুমি যাবে ভিতরে?
– না।
হঠাৎ ডাক্তার নাওয়াজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
– রিল্যাক্স। এত অল্পতে এমন দশা হলে চলবে, ইয়াং ম্যান? তোমায় এমন হালে দেখে আমরা অভ্যস্ত নই। দ্রুত নিজের প্রোফেশনাল ফর্মে ফিরে এসো।
নাওয়াজের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এত অল্প? তাদের কাছে অল্প মনে হবেই। তবে নাওয়াজের কাছে মরণ যন্ত্রণা থেকে কম লাগছে না!
নাওয়াজ একটা চেয়ার টেনে বসল। সে এখন ভিতরে যাবে না, ইচ্ছে করছে না। মাহাদ এসে নাওয়াজের পাশে বসে।
– ভিতরে যাবি না?
– না। ইচ্ছে করছে না।
– তেমন কিছু হয়নি তো। ঠিক হয়ে যাবে। এত চিন্তা করছিস কেন?
– যন্ত্রণায় যে ছটফট করল তখন, তা ঠিক হবে কেমন করে?
মাহাদ নিশ্চুপ হয়ে গেল, বলল না কিছু। হঠাৎ করে সে উঠে গেল। এখন তার নাওয়াজকে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত।
_
কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে গেল নাওয়াজ। কটা বাজে আন্দাজেও বলা সম্ভব নয়। তবে গভীর রাত। আভিরাও ঘুমে আচ্ছন্ন। স্যালাইন চলছে তার, প্রায় শেষের দিকে। নাওয়াজ স্যালাইন শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করল। সারা মুখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে তৎপর হয়ে উঠে দাঁড়ায়। আস্তে ধীরে নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দেয় মেয়েটার উপর। বাম হাত মেয়েটার পিঠের নিচে দিয়ে আভিরাকে কিছুটা শূন্যে তুলে রাখে। এই মেয়ের খবর আছে? সে তো জ্ঞান হারিয়ে সেই কখন থেকে পড়ে রয়েছে। নাওয়াজ গলায় মুখ গুঁজল।
হঠাৎ মনে হলো তার চোখ জ্বলছে। ছেলেটা সেই যে মুখ গুঁজেছে আর মুখ তুলেনি। মেয়েটার কাঁধ ভিজতে লাগল পুরুষটার চোখ বেয়ে পড়া উষ্ণ নোনাজলে। মেয়েটা টের পেল না, অনুভব করল না পুরুষটা কী তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে চলেছে!
_
আভিরা আস্তে ধীরে চোখ মেলে চায়। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে তার। চোখ মেলতেই যেন বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে তাকে। চোখ খুলতেই লাইটের তীক্ষ্ণ আলো চোখে বিঁধল। মেয়েটা চোখ বুজে বহু কষ্টে বলল,
– লাইটটা কেউ অফ করে দিন।
– ম্যাম উঠে গিয়েছেন, সরি লাইট অফ করে দিচ্ছি।
এবার মেয়েটা চোখ মেলে চাইল। হসপিটালে কর্মরত একজন নার্স দাঁড়িয়ে। আর কেউ নেই এই রুমের মাঝে। আভিরার চোখ বুঝি হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজে বেড়ায়।
আভিরাকে তাকাতে দেখে মেয়েটা একগাল হেসে বলল,
– ব্যাটার ফিল করছেন? সমস্যা হচ্ছে না তো?
– না, ঠিক আছি।
এতটুকু বলতে অনুভব করল তীব্র ব্যথায় তার শরীর ঝাঁকিয়ে উঠেছে। মেয়েটা চোখ বুজে নেয় ফের।
– আমি স্যারকে ডেকে নিয়ে আসছি।
স্যার বলাতে আভিরা ভাবল তাকে যে ডক্টর দেখেছে তার কথা হয়তো বলছে। মেয়েটা আর হ্যাঁ/না কিছু বলেনি। চোখ বুজেই পড়ে রইল।
মুখের উপর কারো তপ্ত নিঃশ্বাস পড়তেই আভিরা ভড়কে গিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে চাইল। তবে নাওয়াজকে দেখে সে দৃষ্টি লুকায়। পুরুষটার পানে আর তাকায় না।
নাওয়াজ চেয়ার টেনে বসল আভিরার সামনে। চামচের টুং টাং শব্দে মেয়েটা মুখ তুলে চায়। চোখ গেল সাদা শার্টে লেগে থাকা রক্তে। যা শুকিয়ে জমাট বেঁধে রয়েছে। লোকটা এ শার্ট কেন পাল্টায়নি। এটা পরেই কী এতক্ষণ পেশেন্ট দেখে বেরিয়েছে। গায়ে এফ্রোন থাকলেও শুকিয়ে থাকা রক্ত চোখে পড়ার মতো।
– আঞ্জুম।
– জি।
– উঠতে হবে একটু।
– কী করে উঠব?
মেয়েটার শরীরে সামান্য জোর থাকলে তো উঠবে সে। যে দুর্বল হয়ে আছে। কারো সাহায্য ছাড়া এক পা ও ফেলতে পারবে না। আর এ লোক কিনা তাকে উঠতে বলছে।
নাওয়াজ মেয়েটাকে আধশোয়া করে বসায়। একটা বালিশ আভিরার পিঠের দিকটায় দিয়ে আরেকটা দিল ডান পায়ের নিচে। এই যে পুরুষটা তার পায়ে হাত দিচ্ছে এতেই মেয়েটার শরীর অসাড় হয়ে আসে।
এ লোক তার পায়ে হাত দিয়েছে। আর সে বলতে পারল না দয়া করে পায়ে হাত দিবেন না। স্বামীদের স্ত্রীর পায়ে হাত দিতে নেই। আভিরার হঠাৎ নিজেকে কেমন অসহায় লাগে, চোখ ভিজে এলো তার।
_
নাওয়াজের হাতে স্যুপ এর বাটি দেখে আভিরা নাক মুখ কুঁচকে নেয়। নাওয়াজ তা দেখেই হেসে ফেলল।
– বেশি খেতে হবে না, অল্প একটু মুখে নিন। খালি পেটে ঔষধ খেতে পারবেন না।
এমনি মেডিসিন এর ঝাঁজালো গন্ধ, তার উপর হঠাৎ আভিরার পেট গুলিয়ে আসে। আভিরা বমি করে পুরো ফ্লোর ভাসাল। নাওয়াজ চোখ মুখ কুঁচকে চায় আভিরার পানে। পেটে কিছু আছে বলে তো মনে হয় না। হঠাৎ বমি করল কেন? উঠে মেয়েটার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় সে। খোলা চুলগুলো ডেস্কে রাখা কাটা দিয়ে সামান্য পেঁচিয়ে বাঁধল।
আভিরা নিস্তেজ শরীরে পুরুষটার কারবার দেখে গেল।
নার্স মেয়েটাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সবটা। সে সবসময় নাওয়াজের সাথেই থাকে। এ লোককে কঠোর, গম্ভীর পুরুষ হিসেবেই জানে সে। কোনো নারীর প্রতি এতটা যত্ন দেখে কিছুটা অবাক হলো। পরমুহূর্তে নিজের অবাকতার লেশ কাটে। এমন কঠিন পুরুষগুলো তার নারীর কাছে পরাস্ত সৈনিকদের ন্যায়। এরা যুদ্ধের ময়দান, সমগ্র ভূতলে রাজ করে বেড়ালেও তাদের হৃদয়ে কর্তৃত্ব ফলায় কেবল তার নারী। আর সেই নারীর প্রতি যত্নবান হবে না তো কার প্রতি হবে।
নাওয়াজ আয়া ডেকে সবটা পরিষ্কার করাল। ভদ্রমহিলা কিছুটা সংকোচ নিয়েই বলল,
– স্যার একটা কথা বলব?
– বলুন।
– ম্যাডামরে ঝাল ঝাল কিছু বানাইয়া দেই।
– আচ্ছা।
দশ মিনিট বাদে একটা বাটি হাতে ফিরে এলেন। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে তার। বেশ কয়েকটা রুম ঝাড়ু দিয়ে মুছে আবার চুলোর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। নাওয়াজ সেই ঘর্মাক্ত মুখ দেখল চেয়ে। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে গুঁজে দিল মহিলার হাতে। তিনি নিতে না চাইলে নাওয়াজ ছোটো করে বলল,
– পারিশ্রমিক নয় সম্মাননা, রেখে দিন।
ভদ্রমহিলা তবুও নেয় না। সামান্য কাজের জন্য তিনি টাকা নেন কেমন করে।
– স্যার আমি নিজ থেকে করে এনেছি। এ সামান্য কাজের জন্য টাকা সাধবেন না।
– বললাম তো খালা, এটা আপনার সম্মাননা।
– মা তোমার স্বামীকে বলো তো ভালোবেসে কেউ কিছু করে নিয়ে এলে তাকে টাকা সাধতে নেই। এতে মানুষটার সেই ভালোবাসার অবমাননা করা হয়।
– উনি কিন্তু মোটেও আপনার ভালোবাসার অবমাননা করছেন না।
– তাহলে তাকে বলো এই টাকা আমি নিতে পারব না। আর যেন জোর না করে।
আভিরা ঝাল ঝাল নুডুলস খেল বেশ আয়েশ করে।
নাওয়াজ তৃপ্তি নিয়ে দেখল সে খাওয়া। এমন ঝালখোড় এ মেয়ে কবে হলো। খুব একটা ঝাল তো খেতে পারে না। তবে?
নাওয়াজ মেয়েটার মুখ মুছিয়ে, পানি খাইয়ে, ঔষধ খাইয়ে বলল,
– আমার এখন কাজ আছে। কোনো সমস্যা হলে ওকে বলবেন। ঠিক আছে?
মেয়েটা মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।
_
আভিরা কিছুটা উশখুশ করছে। কী করে বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে নাওয়াজ আসে। পুরুষটাকে দেখেই মেয়েটার উশখুশ ভাব কমে যায়। তবে নাওয়াজের চোখে পড়েছে সব। নাওয়াজ ইশারা করতেই নার্স মেয়েটা বেরিয়ে গেল।
– কী হয়েছে?
আভিরা হকচকায়।
– কই কিছু হয়নি তো।
– এত ছটফট করার কারণ কী? কোন সমস্যা হচ্ছে?
আভিরা ঢোক গিলে। এ লোকের কোনোকিছু নজর এড়ায় না কেন? সব এত বুঝতে হবে কেন? তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
– একটু নিচে নামিয়ে দিবেন।
নাওয়াজ তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
– নিচে নেমে কী করবেন? হাঁটতে তো পারবেন না।
আভিরা অস্থির হয়ে ওঠে। এ লোককে কেমন করে বলবে। নাওয়াজ খেয়াল করল সবটা। হুট করে বলল,
– এত দ্বিধাবোধ কেন করছেন, কোন কারণে? না বললে বুঝব কেমন করে।
আভিরাকে থম মেরে বসে থাকতে দেখে নাওয়াজ বলল,
– বাই এনি চান্স ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলতে আপনি এত অকওয়ার্ড ফিল করছেন না তো?
নাওয়াজের তীক্ষ্ণ বাণে আভিরার দম আটকে যাওয়ার জো। নাওয়াজ আর অপেক্ষায় না থেকে কোলে তুলে নেয় মেয়েটাকে। গমগমে স্বরে বলল,
– দরজা লাগানোর দরকার নেই। আমি বাহিরে আছি।
_
দুপুর অবধি নাওয়াজ মেয়েটার সাথেই বসে থাকে। তারপর বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে খাবার নিয়ে। মুরগির মাংসের ভুনা এনেছে। বাড়ির কেউ হাসপাতালের ত্রিসীমানায় আসেনি। নাওয়াজের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আজকের রাতটা কাটিয়ে কাল সকাল সকাল বাড়ি ফিরবে মেয়েটাকে নিয়ে। বাড়ি ফিরতে সকলে দেখতে পারবে। তাকে দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে আসার দরকার নেই।
ফিমেল ডক্টর এসেছে আভিরাকে দেখতে। তখন রাতের প্রায় দশটা। মহিলা হাত পা উল্টে পাল্টে দেখল। আভিরার পাশে বসে বলল,
– দেখো তো হাত পা নাড়াতে কোন প্রবলেম হচ্ছে কি না?
হাত স্বাভাবিকভাবে নাড়াতে পারলেও পা নাড়াতে গিয়েই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে মেয়েটা।
– আচ্ছা থাক। আর পা নাড়াতে হবে না। খুব প্রয়োজন ছাড়া পা নাড়াতে যাবে না এখন, ঠিক আছে।
– আচ্ছা।
হঠাৎ আভিরার থেকে চোখ সরিয়ে নাওয়াজের দিকে ফিরে চাইলেন ভদ্রমহিলা। পুরুষটার দৃষ্টি আভিরার মুখপানে। সারাক্ষণ চেয়ে কী দেখে কে জানে।
– মিস্টার নাওয়াজ আপনাকে যে একটু বাহিরে যেতে হবে।
হঠাৎ এমন কথায় নাওয়াজের কপাল কুঁচকে এলো।
– কেন?
– আপনার ওয়াইফের ড্রেস চেঞ্জ করাতে হবে। আপনি বাহিরে গেলে ভালো হতো।
– তার দরকার পড়বে না।
– মানে?
– মানে ড্রেস আমি চেঞ্জ করিয়ে দিতে পারব।
আভিরা এমন কথায় থতমত খায়। কানে তব্দা লেগে গেল যেন, মুখশ্রী হয়ে উঠে রক্ত শূন্য। তখন সে মরে গেল না কেন? তাহলে সকলের সামনে এমন অস্বস্তিতে পড়তে হতো না। ভদ্রমহিলাও যেন এমন সোজাসাপ্টা কথায় কিছুটা বিব্রত বোধ করে। উনি দ্বিধা নিয়েই প্রশ্ন করলেন,
– আর ইউ শিওর?
নাওয়াজের দায়সারা জবাব,
– হ্যাঁ।
উনি বেরিয়ে গেলেন কেবিন থেকে। নাওয়াজ কিছুটা এগিয়ে আসতে আভিরা চিল্লিয়ে উঠে,
– আল্লাহ আপনি এত নির্লজ্জ কবে থেকে হলেন?
– আজ, এই মুহূর্ত থেকে।
নাওয়াজ হাত ধরতে গেলে মেয়েটা ফের চিল্লায়,
– ছিঃ! অসভ্য পুরুষ, ছুঁবেন না আমায়।
– আঞ্জুম আস্তে কথা বলুন। এটা হসপিটাল, ভুলে যাবেন না।
মেয়েটা সে কথা কানেই নিল না। এমন কথা এ লোক কীভাবে বলতে পারে। ভেবেই মাথা খারাপ হচ্ছে আভিরার।
– কাছে আসছেন কেন?
– এই মেয়ে একবার নিষেধ করলাম না, চিৎকার কেন করছেন?
– আপনি ওসব কথা কেন বললেন?
– কেন সমস্যা কী?
– কোন সমস্যা নেই?
– না, নেই। স্বাভাবিক একটা বিষয়। আপনি এটাকে এত জটিল করে কেন দেখছেন। তাছাড়া আমার সামনে অস্বস্তি ফিল করার কারণ কী? বারবার ভুলে যান আমি আপনার হাজব্যান্ড। আমাদের মাঝে রাখঢাক করে রাখার কিছু নেই।
দুদিন বাদে তো গোটা আপনিটাকে নিজের দখলে নিব। তখন কী করবেন?
আভিরা চোখ খিঁচিয়ে নেয়। এত অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে তাকেই কেন পড়তে হয়। শুধু মিনমিন করে বলল,
– রুমের লাইট…
– অফ করছি। তবুও প্লিজ হেজিটেট ফিল করবেন না। স্বামীর সামনে এমন হেজিটেট ফিল করতে নেই। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাই এমন। এত লজ্জা, সংকোচ, দ্বিধা রাখলে চলবে না। তবে একেবারে লাজহীন হলেও হবে না। লজ্জা নারীর ভূষণ। এটা আবরণের ন্যায় কাজ করে। আপনার লজ্জা আছে মানে পুরুষ দৃষ্টি থেকে হেফাজতে রাখলেন নিজেকে। নির্লজ্জ হওয়া মানে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া। কিন্তু সবসময় লজ্জা পেলে চলবে না। এই যে আপনি এখন সক্ষম নন নিজের কাজ করতে। আমার সাহায্যের প্রয়োজন। এই মুহূর্তে এতটা সংকোচ করলে হবে? নিজের সমস্যার কথাটাও আপনি আমায় মুখ ফুটে বলতে পারেন না। আমাদের সম্পর্কটা কী ঐ পর্যায়ে যায়নি? যেখানে আপনি দ্বিধা ছাড়াই সবকিছু আমাকে বলতে পারবেন। নিজেকে আমার সামনে মেলে ধরতে এত সংকোচ কেন? আমার সামনেই এত কুণ্ঠা বোধ করছেন। আপনি নিশ্চয়ই আমার থেকে নার্সদের হাতে ড্রেস চেঞ্জ করাতে গেলে আরও বেশি অস্বস্তিতে পড়তেন।
এবার আভিরা চুপ মেরে যায়। নাওয়াজের কথায় কোনো ভুল নেই। আসলেই আভিরা তখন আরও অস্বস্তিতে গুটিয়ে থাকত। কিন্তু তাই বলে এই লোকের হাতে। নাওয়াজ সামান্য ঝুঁকে এলো।
– তবে কখন লজ্জা পাবেন জানেন?
আভিরা কথা বলে না। সে যেন মুহূর্তে বাক বনে গেল।
নাওয়াজ ধীর স্বরে বলল,
– এই আপনিটাকে যখন নাওয়াজ ইয়াজিদ সম্পূর্ণ নিজের দখলে নিবে, পা থেকে মাথা অবধি আমার নখদর্পণে থাকবে, যখন শরীরের প্রতিটা শিরা উপশিরা আমার ছোঁয়ায় তরান্বিত হবে তখন। তখন লজ্জায় মরে গেলেও আমার আপত্তি থাকবে না।
_
– আঞ্জুম।
– হু।
– সামনের দিক কোনটা বুঝে উঠতে পারছি না।
– পিছন দিকটা রাউন্ড শেইপ, সামনে ভি শেইপ দেওয়া।
আপনি ধরলেই বুঝতে পারবেন।
নাওয়াজ পিঠ স্পর্শ করতেই আভিরার শরীর শিরশির করে ওঠে। হৃৎস্পন্দন তীব্র বেগে উঠানামা করছে। আভিরা জোরালো নিঃশ্বাস ফেলে। আভিরাকে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে দেখে নাওয়াজ ভারিক্কি স্বরে বলে উঠল,
– এখন তো আপনাকে ছুঁয়ে দেইনি। তবে বেগতিক অবস্থার কারণ কী, এমন বেহাল দশায় বা কেন?

