প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৩৯

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩৯
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

নাওয়াজ ফোনের ফ্ল্যাশ দিতে আভিরা হালকা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
– কী করছেন?

– হুশ! দেখতে দিন। আপনার শরীর দেখব না।

এমন কথায় আভিরা মুখ থেতিয়ে বসে। এসব বলার কী মানে? সে কী ঐরকম কিছু বলেছে নাকি। জানতে চেয়েছে শুধু। আর লোকটার কথার ধরন দেখো। সবসময় তেরছা জবাব দিবে।

নাওয়াজ কামিজের কাপড় কিছুটা তুলে মেয়েটার পিঠ উন্মুক্ত করে সেখানে মোবাইলের লাইট ধরে। স্পষ্ট চোখে পড়ল পিঠের লাল হয়ে থাকা ছোপ ছোপ দাগ। কিছু জায়গায় কালচে সাদাটে হয়ে রয়েছে সে দাগ।

নাওয়াজ খানিকটা গম্ভীর হয়ে বলল,
– পিঠে গরম পানি পড়েছিল?

– জানি না। জ্বালা অনুভব করিনি তো।

নাওয়াজ হঠাৎ থমকে তাকায়। মেয়েটা সামনে ঘুরে থাকায় চেহারা দেখতে পেল না। তবে এই মেয়ের জবাবে কঠিন পুরুষের জবান বন্ধ হয়ে আসে। নাওয়াজ দেখল যে তিলে সকালে ঠোঁট ছুঁয়েছে সে তিলটাও কেমন দেখতে কালচে লাল হয়ে আছে। পাশে অনেকটা জায়গা ক্ষত পোড়া দগ্ধ হয়ে রয়েছে। কতক্ষণ ঐ তিলে স্থির হয়ে তাকিয়ে নাওয়াজ উঠে গিয়ে রুমের লাইট দিল। সযত্নে আলতো হাতে বার্নার লাগিয়ে দিল লালচে জায়গায়। তখন মেয়েটার পিঠেও গরম পানি পড়েছিল। মেয়েটা একেবারেই বুঝতে পারেনি। অনেক সময় ব্যথা অনুভব হয় না। আর আভিরার তো পিঠে অত বেশি পানি পড়েনি। ব্যথা অনুভব করবে কেমন করে।ভাগ্যিস, নাওয়াজ পিঠে হাত দিতেই বুঝে ছিল। নয়তো এই ক্ষত এমনভাবেই রয়ে যেত।

নাওয়াজ উঠে বাহিরে গেল। নাওয়াজ যেতেই আভিরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এ পুরুষ যতক্ষণ তার ধারে কাছে থাকে তার যেন নিঃশ্বাস আটকে যাওয়ার জো হয়ে দাঁড়ায়।

রাত হয়েছে। কিছু খেতে হবে। মেয়েটা দুপুরেও খুব একটা খায়নি। এভাবে অসুস্থ শরীরে না খেয়ে থাকলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। নাওয়াজ অনেক ভেবেও রাতের জন্য কী নিবে বুঝে উঠতে পারল না। হঠাৎ একটা খাবারের হোটেল চোখে পড়তে সেখানে ঢুকে গেল ছেলেটা। অত না ভেবে কয়েকটা পরোটা, ডিম ভাজি আর সবজি নিয়ে নেয়। রাতের জন্য এ পরোটা, সবজিই ঠিক আছে। তাছাড়া এ মেয়ের তো পরোটা খেতে ভালো লাগে। পরোটা দেখে যদি একটু খায়।

আভিরাকে খাইয়ে পুরুষটা খেল। সারাদিন পর কেবল খেতে বসেছে। সেই সকাল থেকেই তো পেশেন্ট দেখতে হচ্ছে। পেশেন্ট দেখা, মেয়েটাকে দেখা এসব করে আর খাওয়া হয়নি তার। আভিরার খারাপ লাগল। তার জন্য এ লোককে দৌড়ের উপর থাকতে হচ্ছে। সে তো দেখেছে এ লোকের ব্যস্ততা। এও দেখেছে পেশেন্ট দেখে একটু সময় পেলেই তার কাছে কেমন ছুটে এসেছে। পারলে তো এক সেকেন্ডের জন্যও তাকে একা না ছাড়ে। কিন্তু দায়িত্বের কাছে সে অপারগ। যাইহোক না কেন নিজের দায়িত্বে কোনোভাবে হেলাফেলা করতে পারবে না। তবে দায়িত্বের কাছে সে যতটা না অসহায় এই রমণীর কাছে বোধহয় তার থেকেও বেশি অসহায়। তাই তো ব্যস্ততার মাঝেও বারংবার রমণীর কাছে ছুটে আসা। একবার এখানে তো আরেকবার ওখানে করে দু দণ্ড বসার সময় পায়নি।
আভিরা মায়াভরা চোখে চেয়ে রইল। চোখের পলক ফেলে না মেয়েটা। এ পুরুষকে এমন করে সে আগে কেন দেখল না?

নাওয়াজ খুব আলতো হাতে মেয়েটাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। মাথাটা বুকের বা পাশে চেপে ধীর স্বরে বলল,
– অসুবিধা হলে বলবেন।

– হু।

– চুলে বিলি কেটে দিচ্ছি, ঘুমান।

আভিরা কতক্ষণ পুরুষটার বুকে লেপ্টে তার স্পন্দন শুনল। তারপর মিনমিন করে ডাকল,
– শুনছেন?

– হুম। কোন অসুবিধা হচ্ছে? আপনি কি বেডে শুবেন?

– না।

– তাহলে?

– ঘুম আসছে না। আজ সারাদিন তো ঘুমিয়ে কাটালাম।

মেয়েটা আজ সারাদিন ঘুমিয়েছে। ঐ খাওয়ার সময়টা বাদে সারাটা সময় ঘুমিয়েই কাটল। নাওয়াজ বুকে লেপ্টে থাকা রমণীকে এক পলক দেখে তাকে নিয়ে বারান্দায় গেল। অথচ তখন তার চোখ জ্বলছিল।

মেয়েটা বুঝল না তার পুরুষের এখন ঘুম দরকার। সারাদিন তো কম ধকল গেল না। সে ঘুমিয়ে কাটালে কী? ঐ পুরুষ তো সারাদিন দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি। এই ভাবনা কেন এ মেয়ের মাথায় এলো না। সে কেন বুঝল না পুরুষটাকে এখন এ কথা বলা মোটেও ঠিক হয়নি। এই আভিরারা যেন একেবারেই বুঝে না।
বুঝে না? না কি তাদের বুঝতে দেওয়া হয় না কে জানে!
পুরুষটা তো পারত মেয়েটাকে এই রাত বিরাতে এমন করায় ধমকে উঠতে। কিংবা বলতে পারত সে এখন ঘুমাবে, তার ঘুম দরকার। তবে কেন বলল না? সবসময় নারীর অবুঝপনা কেন মেনে নিতে হবে।

বারান্দার দরজা খুলে পা ভাঁজ করে ফ্লোরেই বসল পুরুষটা। মেয়েটা তার বুকেই লেপ্টে।
আজ আকাশে চাঁদ নেই, একেবারে অন্ধকার। আশেপাশে থাকা বাড়িগুলোর দুই একটা বাদে সব বাড়ির লাইট বন্ধ।‌ এত রাতে কে জেগে থাকবে, সকলেই ঘুমে। যাদের ঘরের লাইট জ্বলছে তারা হবে বোধহয় চাকরিজীবী। বাসায় ফিরেছে কেবল। নয়তো এখনও খাওয়া হয়নি। খেয়েদেয়ে তারা ঘুমাবে‌। তাদের ব্যস্ত হাতে খাবার বেড়ে দিয়ে কেউ একজন পাশে এসে বসেছে সে খেয়াল অবধি নেই। স্ত্রীর বায়না শোনার সময় কই তাদের। তার উপর সারাদিন বাইরে কাটিয়ে তাদের মেজাজ থাকে তুঙ্গে, রাত জেগে ঘরে পড়ে থাকা রমণীর বকবক শুনতে যাবে কোন দুঃখে।

মেয়েমানুষ মানেই ভেজাল। এদের কোন কাজ আছে? ঐ তিন বেলার রান্না ছাড়া করেটা কী?
পুরুষের মতো অন্যের ফায় ফরমাশ খাটলে তবে গিয়ে বুঝত। ওরা বুঝে না বলেই পুরুষ লোকের ঘরে ফেরার জন্য হাপিত্যেশ করে। ঘর গোছানো, কাপড় কাচা, রান্না করা, ঐ পুরুষ লোকের বাচ্চা সামলে রাত জেগে ঐ পুরুষেরই ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। কখন লোকটা ফিরবে আর ঐ লোককে গরম গরম ভাত বেড়ে দিবে। গরম ভাত ছাড়া তো খেতে পারে না। তারপর খেয়ে যখন উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়ে, পাশে থাকা রমণীর দিকে ফিরেও চায় না, ভালো মন্দ কিছু বলেও না। তখন সেই রমণী নিজেই নিজেকে বুঝ দেয়। নিশ্চয় আজ অনেক ধকল গিয়েছে, ক্লান্ত বিধায় ঘুমিয়ে গেছে। নয়তো কথা তো বলত। অন্তত সারাদিন অফিসে কী করেছে না করেছে সেই কথা হলেও বলত‌। অথচ ঐ লোক কিছুই বলে না, কোনোকালেই বলে না।

নারীর আড়ালে ফেলা দীর্ঘশ্বাসও বোধ হয় ঘুমে মগ্ন সেই পুরুষের জানা হয় না। পুরুষ লোক জানে না, হয়তো তারা জানার চেষ্টায় করে না। তাদের চেষ্টা করতে মানা। সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে রাতে এসে স্ত্রীর সাথে দু দণ্ড কথা বলতেও মানা তাদের। তারা ভালোবাসবে, কাছে টেনে নিবে তাদের মর্জি মতো। সে নারীর যতই না চাওয়া থাক না কেন। তাতে তাদের যায় আসে না। তাদের জানা, তাদের বলা ঐ রাতের বেলা বিছানায় কাছে টেনে নেওয়ায় বোধ হয়।
নারীর আহ্লাদীপনা শোনার সময় যত তোষামোদ।

নারীর সব অবুঝপনা বোধহয় নাওয়াজের মতো পুরুষই বুঝে, না বলতেও বুঝে ফেলে সে পুরুষ।
মেয়েটা পুরুষটার বুকেই ঘুমিয়ে গেল। নাওয়াজ কতক্ষণ চেয়ে থেকে নিজেও দেয়ালে পিঠ ঠেকায়।

_

আভিরা খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখে সে তাদের রুমে। বাড়িতে কখন এলো জানা নেই তার। ঘুম ভাঙতে লোকটাকে কোথাও দেখেনি। সকালে ইয়াজমীন তাকে খাইয়ে দিয়েছিল। মেয়েটা চেয়েও জিজ্ঞেস করতে পারেনি ঐ লোক কোথায়। তবে সময় গড়াতে যখন দেখল ঐ লোকের দেখা নেই, তখন বুঝে গেল ভদ্রলোক বোধহয় বাড়ি নেই। নয়তো এত বেলা অবধি তার সামনে না এসে থাকে। নিশ্চয় হসপিটালে গিয়েছে।

মাহাদের মা এসেছে আভিরাকে দেখতে। ‌তার সাথে আরও কয়েকজন মহিলাও এসেছে। আশেপাশের বাড়ি থেকেই এসেছে তারা। বিয়ের পর তেমনভাবে তাদের বউ দেখা হয়নি। নাওয়াজের বউ হাত পা পুড়িয়েছে, সেই খবর পেয়েই এসেছে মূলত।
মাহাদের মায়ের সাথে আভিরার আগে কখনো দেখা হয়নি। ওদের বিয়ের দিন তিনি নিজের বাবার বাড়ি গিয়েছিলেন।
এ বাড়ি এসেছে আজ দুদিন। মেয়েটাকে বাড়ি আনা হয়েছে শুনে দেখতে এলো।

– শরীর ঠিক আছে তোমার?

– জি।

চেহারায় বেশ গম্ভীর ভাব এঁটে। সৌভিক মনে হয় তার মায়ের এ গম্ভীর স্বভাবই পেয়েছে। তবে কথা শুনে ভদ্রমহিলাকে মিশুক টাইপ মনে হচ্ছে। গাম্ভীর্যতায় যেন মিশুক ভাবটা আড়ালে পড়ে থাকে। ভদ্রমহিলা নিজ হাতে মেয়েটার জন্য রান্না করে নিয়ে এসেছে। হাঁসের মাংস, সাথে পাবদা মাছের ঝোল।

– খেতে পারবে তো এখন?

আভিরা কিছুটা মিনমিন করে বলল,
– জি, কিছুক্ষণ আগে মা খাইয়ে দিয়ে গেল।

– ওহ্। তাহলে তো এখন আর খাবে না। আচ্ছা সমস্যা নেই।দুপুরে খেও। আমার রান্নার হাত কিন্তু খারাপ না। খেয়ে দেখবে। আবার খারাপ হয়েছে ভেবে না খেয়ে রেখে দিও না।

– এমন করব না আমি। দুপুরে আপনার আনা হাঁসের মাংস দিয়েই খাব।

– শুধু হাঁসের মাংস দিয়েই খাবে, পাবদা মাছের ঝোল কী স্বামীর জন্য রেখে দিবে মেয়ে?

হঠাৎ এমন কথায় আভিরা কিছুটা বিব্রত বোধ করে। সামান্য হাসার চেষ্টা করে বলল,
– জি, আমিই খাব।

– তাহলে স্বামীকে দিবে না বলছ?

আভিরা থতমত খেল। কেমন কথার ছলে তাকে বিপাকে ফেলছে। ওর জবাব না পেয়ে সুরভী কিছুটা উচ্চস্বরে হেসে ওঠে।

– মেয়েটার পিছনে কেন লাগছিস সুরভী?

– আরে ভাবি, তোমার ছেলে কেমন বউ নিয়ে এলো তাই দেখছিলাম। চাচি শাশুড়িদের মান্য টান্য করে কিনা দেখতে হবে না।

– তা কেমন দেখলি, ছেলে আমার লক্ষ্মী বউ নিয়ে এসেছে?

– তাই তো দেখছি। আমার ছেলের জন্য এমন একটা বউ দেখো তো। আচ্ছা মেয়ে তোমার কোন বোন আছে?

– নেই। থাকলেও তার মতো কাউকে পাবেন না। আঞ্জুম অনন্য। যে কেবল এই নাওয়াজ ইয়াজিদের। আজন্মকালের জন্য তার হয়ে গিয়েছে।

নাওয়াজের কথায় আভিরা থমকে চায় ঐ পুরুষের পানে। নাওয়াজ হঠাৎ চোখে হাসে।

_

ডাক শুনে লাবণ্য যতটা না অস্থির হয়ে ছুটে এসেছে।আভিরাকে নাওয়াজের বাহুডোরে আবদ্ধ দেখে তার থেকেও বেশি শান্ত হয়ে যায়।

– ছিলে কোথায়? তোমাকে বলেছিলাম না ওনার সাথেই থাকবে, পড়ে যাচ্ছিলেন। তোমার কোনো ধারণা আছে পড়লে কী হতো।

হঠাৎ ধমকে আভিরা কেঁপে উঠলেও লাবণ্য ঠায় দাঁড়িয়ে।
তার যেন খুব একটা যায় এলো না। আভিরা বলতে চাইল আপু বলেছিল দরকার হলে ডাকতে। কিন্তু কেন জানি মেয়েটার মুখ দিয়ে টু শব্দটিও বের হলো না।

নাওয়াজ কিছুটা রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
– মনে হচ্ছে, আমি না থাকলে ওনাকে দেখার কেউ নেই এ বাড়িতে। তোমাকে তো বলে গিয়েছিলাম। সমস্যা হলে তখন বলতে। আমি থেকে যেতাম বাড়িতে, হসপিটালে যেতাম না।

লাবণ্য এবারও কথা বলল না। এ দুদিন আভিরার যাবতীয় সব কাজ নাওয়াজ করেছে। এক মুহূর্তের জন্যও মেয়েটার কাছ থেকে দূরে থাকেনি। কখন কী লাগে, এ মেয়ে তো উঠে নিজের কাজ করতে পারবে না। সকালেই হসপিটাল থেকে কল এলো। দুদিন বাড়ি থেকেছে আজ যেভাবেই হোক তাকে সেখানে যেতে হবে।
নাওয়াজ বলেছিল আরও দুদিন পরে যাবে। মেয়েটা অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও তো সে ডিউটি করেছে। এখন তো তাকে দুটো দিন সময় দেওয়ায় যায়। কিন্তু তারা শুনেনি। তাকে নাকি আজ হসপিটালে উপস্থিত থাকতেই হবে। বাধ্য হয়েই ছেলেটাকে যেতে হয়। কর্তৃপক্ষের উপরে তো তার কথা চলবে না। যাওয়ার আগে বারবার লাবণ্যকে বলে গিয়েছিল সে যেন মেয়েটার কাছেই থাকে। এখন রুমে আসতেই দেখল আভিরা বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করছে। আর একটু হলেই মুখ থুবড়ে পড়ত ফ্লোরে। আর তারপর কী হতো নাওয়াজ ভাবতেও পারছে না। তার বুকের কাঁপন এখনও কমেনি। সেদিনের পর থেকেই যেন পুরুষটা ভয়ে ভয়ে থাকে। এই মনে হয় তার চোখের আড়াল হলেই কোনো একটা অঘটন ঘটল বলে, মেয়েটার আবার কিছু হয়ে না যায়।

আভিরা দেখল লাবণ্যর চোখ ধীরে ধীরে কেমন রক্ত লাল হয়ে এলো। অশ্রুতে টইটম্বুর চোখ দুখানা।
আভিরা হঠাৎ কেন যেন লাবণ্যকে দেখে ভয় পেল। আঁকড়ে ধরল নাওয়াজের শার্ট। নাওয়াজের মেয়েটার ভীতিকর চাহনি নজরে এলো না। আর না দেখল তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনাজল। এ পুরুষ তার নারীকে নিয়ে এতই ব্যস্ত যে কারো চোখের পানি তার নজরে আসে না।

নাওয়াজ খানিকটা গম্ভীর স্বরে বলল,
– মনে তো হয় না ওনার খাওয়া হয়েছে। খাবার নিয়ে এসো।

লাবণ্য খাবার দিয়েই বেরিয়ে গেল। নাওয়াজ ফিরেও চায় না সেদিকে। তার রাগ এখনও কমেনি। লাবণ্য যে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো কাজ করতে পারে নাওয়াজের জানা ছিল না। মেয়েটাকে তো তার দায়িত্বেই রেখে গিয়েছিল। তবে দেখে কেন রাখল না। তার কী উচিত ছিল না নাওয়াজ ফেরা না অবধি আভিরার সাথে থাকা। রুমে আসতেই আভিরাকে অমন পড়তে দেখেই তো সে হিতাহিত জ্ঞান হারায়, মেজাজ বিগড়ায় সাথে সাথেই।

নাওয়াজ ভাত মাখিয়ে মেয়েটার মুখের সামনে ধরে বলল,
– কীসের জন্য খাট থেকে নামার চেষ্টা করছিলেন?

আভিরা মুখে কিছু না বলে ইশারায় বইটা দেখায়। খাটের পাশে থাকা টেবিলের কাছে পড়ে রয়েছে তা।
এভাবে সারাদিন বিছানায় বসে থাকতে কী ভালো লাগে। ইয়াজমীন ছিল অনেকক্ষণ তার সাথে। আভিরা বুঝে ছিল এতক্ষণ বসে থাকতে ওনার খারাপ লাগছে। এ দুপুর সময়টা তো প্রতিদিন ঘুমিয়ে কাটায়। দুইটা বাজতে চলল। এখনও তার কাছেই বসে আছে। আভিরা নিজেই ইয়াজমীনকে বলল, তাকে পড়ার টেবিল থেকে একটা বই বের করে দিয়ে তিনি যেন ঘুমাতে যায়। ইয়াজমীন প্রথমে যেতে চায়নি। মেয়েটা অনেকবার বলার পর বই হাতে দিয়ে নিজের ঘরে গেল। এর মাঝে লাবণ্যও একবার এসে বলে গিয়েছিল কিছু দরকার হলে তাকে যেন ডাকে। খালা এ ঘরে ছিল বিধায় সে আসেনি। আর সে তো আভিরার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টায় করে।

একা ঘরে বই পড়ছিল এতক্ষণ ধরে। হঠাৎ হাত ফসকে বইটা নিচে পড়ে, ঝুঁকে সেটাই তোলার চেষ্টা করছিল মেয়েটা। কিন্তু নাগাল না পেয়ে আরেকটু ঝুঁকতেই পড়তে নিয়েছিল। ঠিক সময়ে নাওয়াজ এসে ধরল। নয়তো এ অসুস্থ শরীরে আবার আঘাত পেত মেয়েটা। ভেবেছিল নিজেই তুলতে পারবে, এ জন্য আর লাবণ্যকে ডাকেনি।
তার জন্য শুধু শুধু লাবণ্যকে এত কথা শুনতে হলো।
আভিরার হঠাৎ চোখ ভিজে আসে, তবে অশ্রু গড়ায় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here