প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৪১

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪১
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

প্রত্যুষের মিঠা রোদ আছড়ে পড়ছে বাড়ির আঙিনায় বসে থাকা রমণী আর ঐ পুরুষের উপর। পুরুষটা টাওয়াল খুলে দিতেই পেঁচিয়ে থাকা ভেজা অগোছালো কেশ পিঠ ছাড়িয়ে একেবারে ঘাসে ঠেকে। শিশিরের ফোঁটায় সে ঘাসও‌ খানিক ভিজে রয়েছে। তার মাঝে আবার সূর্যের কিরণ আছড়ে পড়ায় কেমন দীপ্তি ছড়াচ্ছে তা।

আভিরা গুটানো পা রাখল ঐ ভেজা ঘাসে। তার পায়ের পাতা ভিজে ভোরের শিশিরের কণায়। কেমন হাসির ফোয়ারা বয়ে গেল রমণীর মুখ জুড়ে। টোকা দিয়ে ঐ ঘাসের শিশির ফেলে সে। শব্দহীন দাঁত কপাটি বের করে হেসে উঠল। তবুও পিছনে বসে থাকা পুরুষটা যেন স্পষ্ট টের পেল তার রমণী যে নিঃশব্দে কেমন করে হেসে চলেছে।

সময়ে রোদের তপ্ততা খানিকটা বাড়ল বোধহয়। রমণীর চুল শুকিয়ে এসেছে অনেকটা। তবে শীতল বাতাসে তার গায়ে কাঁপন ধরে যাচ্ছে। আভিরা দু হাতের তালু ঘষে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
– এত সকালে কেউ গোসল করে। আল্লাহ আপনি আমাকে এত ঠান্ডায় মেরে ফেলার জন্যই এমন করলেন তাই না।

লোকটা হাসল, প্রাণবন্ত হাসি। খানিকটা রাগ দেখিয়ে বলল,
– বাজে কথা বলবেন না। সকালে গোসল দিলেন বিধায় রোদটুকু ভাগ্যে জুটল আপনার। আর এত সকাল কোথায়? সাতটা বাজতে চলল।

– এই শীতের দিনে সকাল সাতটা মানে ভোর পাঁচটা, বুঝলেন?

– আচ্ছা, বুঝলাম।

সকাল ছয়টাই ডেকে উঠিয়েছে নাওয়াজ আভিরাকে। আভিরা কতক্ষণ নড়েচড়ে ফের চোখ বুজে নেয়।

– আঞ্জুম, উঠুন।

– ঘুমাব আমি। এত সকালে ডেকে কেন চলেছেন?

মেয়েটার কথায় কেমন বিরক্তিভাব। এত সকালে কেউ ডাকে। একটা আরামের ঘুম দিয়েছিল সে। লেপের নিচে গেলে কী আর বের হতে ইচ্ছে করে। আর শীতের সকালে এ সময়টাতেই তো সকলে ঘুমায়। শান্তির ঘুম দেওয়া যায় এ সময়ে। তার তো আর অফিস, আদালত নেই যে সকাল সকাল উঠতে হবে। লোকটা কেন তাকে ডেকে চলেছে কে জানে। মেয়েটা বিরক্তি নিয়ে কোনোরকম চোখ মেলে। লেপ সরিয়ে হালকা মাথা বের করে ঘুমুঘুমু স্বরে বলে উঠল,

– কেন ডাকছেন?

নাওয়াজ এগিয়ে যায়, টেনে তুলে মেয়েটাকে। আভিরা মাথা ঠেকায় ঐ পুরুষের বুকে। ফের চোখ বুজে। নাওয়াজ লেপ সরাতে নিলেই কিছুটা অনুনয় করে বলল,
– আরেকটু ঘুমাই, একটুখানি। আমার এখনও ঘুম হয়নি।

– এখন উঠুন। পরে ঘুমাতে পারবেন।

– পরে আর ঘুম আসবে না তো‌।

– আসবে, কথা শুনুন।

– কী জন্য উঠব সেইটা তো বলেন।

– গোসলের জন্য।

– কী? মাথা খারাপ? এ জন্য সকাল সকাল ডেকে চলেছেন। এত সকালে কে গোসল করে?

– কে করে তা জানা নেই। তবে এখন আপনি করবেন।

– এত সকালেই কেন? সারাদিন তো পড়ে রয়েছে।

– হুম, দিন পড়ে রয়েছে। কিন্তু আমি থাকব না।

– তো?

– তো ম্যাডাম, আমি না থাকলে আপনাকে গোসল কে করিয়ে দিবে।

আভিরা আঁতকে উঠে, সিটকে দূরে সরে গেল। আত্মা ধক করে উঠল তার। এ পাগল লোক কী বলে, গোসল করিয়ে দিবে মানে। ভাবতেই চোখ মুখে অন্ধকার দেখল। মেয়েটার এমন মুখাবয়ব দেখে নাওয়াজ ফিচেল হাসে। আভিরার চোখে ধরা পড়ে না সেই হাসি। মেয়েটার সেদিকে খেয়াল থাকলে ঠিকই দেখা হতো। কিন্তু তার নজর তো লোকটার উপর নেই। ঐ কথা শুনেই তার গলা শুকিয়ে আসে।

– কী সব বলে চলেছেন?

– যা শুনলেন।

– আপনার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে?

– না, তবে এখন না উঠলে আমার হাতেই গোসল করতে হবে।

আভিরা ফোঁস করে দম ফেলে। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
– দুপুরে করে নিব, প্রমিস।

– না। এখনই করতে হবে। আমি থাকতে থাকতেই। আপনি যে শেষ বিকেলে গিয়ে গোসল করেন তা আমার অজানা নয়।

আভিরা অসহায় চোখে তাকায়। মাথা নুইয়ে মিনমিন করে বলল,
– আর অমন করব না।

– অযথা কথা বাড়াবেন না। যত যাই বলেন গোসল এখনই করতে হবে।

আভিরা বুঝল এখন এমন তালবাহানা মোটেও কাজে দিবে না। সময়মতো গোসল সেরে নিলেই তো এত সকালে উঠতে হতো না। আভিরা মুখ ফুলায়। দু তিনদিন ধরে আসরের পরে গিয়ে গোসল করবে সে। তাতেই ঠান্ডা লাগে। মেয়েটার ঠান্ডার ধাঁচ আছে। শীত এলে প্রতি বছর তার এমন হয়। জেনেও দুপুর গড়িয়ে বিকেলে যাবে গোসলে। অথচ এই শীতের দিনে মানুষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গোসল শেষ করার চেষ্টা করে। আর এ মেয়ে করবে পুরো উল্টোটা। যাবে শেষ বিকেলে।

খাবার টেবিলে হঠাৎ মেয়েটা কেশে ওঠে। নাওয়াজ প্রথমে ভেবেছিল হয়তো গলায় খাবার আটকেছে। তবে পরপর কেশে উঠতেই বুঝল এ কাশি খাবার আটকে নয়, মেয়েটা ঠান্ডা বাঁধিয়ে রেখেছে। নাওয়াজ মেয়েটাকে ধরল না অবধি। আভিরার কাশতে কাশতে তখন চোখ মুখ লাল হয়ে আসে। তবুও পুরুষটা চেয়ে দেখল না।

ইয়াজমীন ছেলেকে এমন নির্লিপ্ত হয়ে খেতে দেখে নিজে গিয়ে মেয়েটার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। বেশ বুঝল আভিরার শরীরের এ অবস্থা দেখেই ছেলের এমন রাগ। এখন কাশতে কাশতে মরে গেলেও তার ছেলে মেয়েটার দিকে ফিরে চাইবে না। নাওয়াজ খাওয়া শেষ হতেই উঠে রুমে গেল। মেয়েটার দিকে একবারের জন্যও চাইল না। আভিরা রক্তিম মুখে, জল টইটম্বুর আঁখিতে পুরুষটার যাওয়া দেখছিল তখন। রাতের বেলাও ঐ লোক তার সাথে কথা বলেনি। এমনকি শুয়েছেও বেশ দূরত্ব রেখে। অথচ এ কদিন পুরুষটা গা ঘেঁষে শুতো তার।

ইয়াজমীনকে জিজ্ঞেস করতেই নাওয়াজ জানল এ মেয়ে যে দিন পেরিয়ে সেই সন্ধ্যায় যায় গোসলে। এই সন্ধ্যায় গোসলে গিয়েই তো ঠান্ডা লাগিয়েছে। এখন সারাক্ষণ কাশবে। কাশতে কাশতে মেয়েটার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, চোখ গলিয়ে পানি পড়ে। এসব জেনেও মেয়েটা হেলায় ফেলায় চলবে। সেজন্য নাওয়াজ সকাল সকাল ঘুম থেকে ডেকে তুলল। এখন থেকে সে হসপিটালে যাওয়ার আগেই এ মেয়ের গোসল সারতে হবে। স্বইচ্ছেই শরীরের প্রতি এমন অবহেলা বের করবে সে। ভালো কথায় শোধরানোর মানুষ এ মেয়ে না।

আভিরা মুখ ভার করে গোসলে যায়। গরম পানি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। এ লোকের সবদিকে খেয়াল থাকে তবে। নিশ্চয় লাবণ্যকে দিয়ে পানি গরম করিয়েছে। নয়তো সে তো ভেবেছিল তাকে না আবার এই সাত সকালে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করতে হয়। তবে গরম পানি দিয়ে গোসল করলেও বের হতেই ঠান্ডায় কাঁপুনি দিয়ে ওঠে।

মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ির উঠানে এসে বসে নাওয়াজ। রোদ লাগলে অতটা ঠান্ডা লাগবে না। তবে এ রোদে বসেও ঠান্ডায় আভিরার শরীর অসাড় হয়ে আসছে। পরপর এই হাতে তো এই বাহুতে হাত ঘষে চলেছে যেন একটু উষ্ণতা অনুভব হয় সেজন্য।

নাওয়াজ চিরুনি চালাতে নিলেই মেয়েটা মৃদু স্বরে বলে উঠল,
– ভেজা চুল আঁচড়াতে নেই।

– আচ্ছা। হালকা তেল দিয়ে দিব চুলে? অনেক দিন ধরে দেওয়া হয় না।

– হু। আপনি পারবেন দিতে?

– বারো হাতের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে দিতে পারলে সামান্য তেলও দিয়ে দিতে পারব। এতে কোনো সন্দেহ নেই। শাড়ির কাছে মাথায় তেল দিয়ে দেওয়া কিছুই না।

আভিরা মুখ ফুলিয়ে বসে। সেই কবে কী করেছে না করেছে ঐ কথা এখন কেন তুলতে হবে। সে তো সেদিন স্বইচ্ছায় অমন করেনি। তার মাথা খারাপ হয়েছিল নেহাত। নয়তো মরে গেলেও তো এ লোকের হাতে শাড়ি পরতে যেত না।
হঠাৎ মেয়েটার নজর তার পায়ে গেল। সাদা পায়েলটা লেপ্টে রয়েছে তার পায়ে। ব্যান্ডেজ খোলার দুদিন পর নাওয়াজ তার পায়ে পায়েল পরিয়ে দেয়। সে তা দেখেছিল সকালে ঘুম থেকে ওঠে। লোকটা বোধ হয় রাতেই তার পায়ে পায়েল পরিয়ে দিয়েছিল। সে ঘুমিয়ে ছিল বিধায় টের পায়নি। আভিরা থুতনি ঠেকায় হাঁটুতে। নজর তার পায়ে। ক্ষত আস্তে ধীরে শুকিয়ে আসছে। শীতকাল বিধায় এত সময় লাগছে। নয়তো এ ক্ষত এতদিনে শুকিয়ে যাওয়ার কথা। ক্ষত শুকালেই কী, গভীর দাগ পড়বে তার পায়ে। এ দাগ কোনোকালে মিলিয়ে যাওয়ার নয়।
আভিরা তপ্ত শ্বাস ফেলে। তবে নজর ফেরায় না পা থেকে। এখনই কেমন কালচে পোড়া দাগ স্পষ্ট। প্রথমে দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। মেয়েটাকে যেন বিষাদ আঁকড়ে ধরে। কেবল শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কোনোকিছুই যেন অনুভব হচ্ছে না।

হুট করে মাথায় এলো এ দাগের জন্য কি তাকে বিচ্ছিরি দেখাবে? লোকে নিশ্চয় নাক মুখ কুঁচকে চাইবে। চাইবেই তো। দাগ দেখে কে ই বা মুগ্ধ চোখে তাকায়। তবে ঐ লোকের চোখে যে তার জন্য মুগ্ধতা দেখে সদা। সময়ে এ মুগ্ধতাও কি শেষ হয়ে যাবে? আভিরা ছটফট করতে লাগে। মনে হলো তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এ লোক মুখ ফিরিয়ে নিতে যাবে কোন দুঃখে? দু হাতে শিশির ভেজা ঘাস খামচে ধরে।

নাওয়াজ চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মেয়েটাকে দেখছিল এতক্ষণ। আভিরাকে এমন অস্থির হতে দেখে বুকে টেনে নেয়।

– কী হয়েছে?

মেয়েটা কথা বলে না। মুখ গুঁজে রইল পুরুষটার বুকে। নিমিষেই কেমন শান্ত হয়ে আসে। শরীরের ভার পুরোটা ছেড়ে দিল পুরুষটার উপর। জড়ের ন্যায় ঐ পুরুষের বুকেই লেপ্টে রইল। নাওয়াজ জানতে চায় না আর। মেয়েটার মতো সেও নিশ্চুপ হয়ে রইল। খানিক বাদে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
– আপনি আবার উল্টা পাল্টা কথা ভেবে চলেছেন। একবার নিষেধ করেছিলাম অযথা ভাবনা যেন মাথায় না আসে। কথা শুনেন না কেন? এই শেষ। আর যেন এ বিষয়ে আমার বলতে না হয়। এবার পা দেখান দেখি।

আভিরা মিনমিন করে বলল,
– পায়ে হাত দিবেন না।

– আপনি, আমি এক সত্তার। আলাদা কেউ নই আমরা। নিজের পায়ে হাত দিতে দ্বিধা কীসের? দেখি পা দেখান।

পুরুষটা তীক্ষ্ণ চোখে দেখল রমণীর পা। উল্টে থাকা পায়েলটা ঠিক করে বলল,
– সারাক্ষণ পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। এত দেখতে যাবেন না। দেখার কিছু নেই।

আভিরার এবার স্পষ্ট জবাব।

– নিজের ক্ষত দেখতে হয়। অন্যের বেলায় অদেখা করে চললেও নিজের ক্ষত দেখা উচিত আমাদের।

– বেশি দেখতে গেলে হিতে বিপরীত হয়। যেমনটা হচ্ছে আপনার ক্ষেত্রে। যা দেখে নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগতে হয়, নিজেকে তুচ্ছ মনে হবে। সেসব অদেখা করে চলবেন সর্বদা।

আভিরা এ নিয়ে আর কিছু বলে না। লোকটাকে প্রশ্ন করল,
– যাবেন কখন?

– লেইট হবে।

– এভাবে আর কতদিন?

– যতদিন না পুরোপুরি ঠিক হচ্ছেন।

– আমাকে দেখার লোক আছে বাড়িতে।

– এ অবস্থায় আপাতত মা ছাড়া অন্য কারো ভরসায় রেখে যেতে চাই না।

আভিরা বুঝল ঐদিনের ঘটনা নিয়ে লোকটা এখনও রেগে আছে। সে ঘটনার অনেক দিন তো হলো। এতদিন অবধি এ নিয়ে রাগ করে থাকার মানে কি, তাও এত সামান্য বিষয়ে।
সেদিন যদি সময়মতো নাওয়াজ এসে তাকে না ধরত, যদি আভিরা পড়ে যেত, তখন কী হতো? এই লোক কী করত? কিছু না হতেই যে চোটপাট। ভালো মন্দ কিছু হলে বোধ হয় শেষ রক্ষা হতো না।
নাওয়াজ কী সেসব নিয়েই লাবণ্যর উপর এতটা ক্ষোভ পোষণ করে রেখেছে, না কি অন্য কোন কারণ আছে? আভিরা ঠিক বুঝল না।

– উঠে দাঁড়ান, ঐদিকে যাব।

নাওয়াজ মেয়েটার হাত নিজের মুঠোয় নেয়। ভেজা ঘাস মাড়িয়ে সামনে এগোয়। কিছু দূর যেতেই নাসারন্ধ্রে ঠেকে লেবুর ঘ্রাণ।‌ আভিরা চেয়ে দেখল আঙিনার শেষ মাথায় লাগানো লেবুর গাছে বেশ কয়েকটা লেবু ধরেছে। আভিরা ভাবল দুপুরের খাবার আগে গাছ থেকে দুটো লেবু পেড়ে নেবে। ভাতের সাথে লেবুর খোসা খেতে দারুণ লাগে। মাকে দেখত ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে লেবুর খোসায় কামড় বসাবে। সেই দেখে তারও এ অভ্যাস হয়েছে।

হাঁটতে মন্দ লাগছে না। লোকটা তার হাত ছুঁয়ে রেখেছে এইটাই যেন ভালো লাগার কারণ। হঠাৎ আভিরা হাত ছাড়িয়ে নাওয়াজকে ঠেলে ফেলে দিল ভেজা ঘাসে। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল মেয়েটা। নাওয়াজ হতভম্ব হয়ে চায় হাসতে থাকা রমণীর দিকে। হঠাৎ কেন তাকে ফেলে দিল বুঝে উঠতে পারল না। মেয়েটার কাজে নাওয়াজ এতটাই স্তম্ভিত হলো যে সেখান থেকে উঠার কথা ভুলে গেল একপ্রকার। মেয়েটার হুটহাট করা কাজ তাকে বিপাকে ফেলে। ঠিক বুঝে উঠতে পারে না এ মেয়ে কখন কী করে, কোন কারণে করে।

খানিক সময় বাদে যেন বুঝে এলো মেয়েটা ইচ্ছে করেই তাকে এভাবে ফেলেছে। রমণীর ঐ হাসিই বলে দিচ্ছে তা।
নাওয়াজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। নাওয়াজকে এমন হাসতে দেখে আভিরার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। লোকটা বুঝে গেল তবে। হঠাৎ করেই মাথায় এলো লোকটাকে এই ঘাসের উপর ফেলে দিলে মন্দ হয় না। এ কথা মাথায় আসতেই ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু এটা তো মাথায় আসেনি এ লোক বুঝে গেলে কী হবে। আভিরার মনে হলো এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। এখানে থাকলে তার রক্ষে নেই।

দৌড়ে পালাতে গেলেই ওড়নায় টান পড়ে। আভিরা চোখ খিঁচিয়ে নেয়। এক কদমও সামনে এগোতে পারল না। হুড়মুড় করে পড়ল ঐ পুরুষের উপর। নাওয়াজ আভিরাকে ভেজা ঘাসের উপর ফেলে নিজের ভর খানিকটা ছেড়ে দেয় মেয়েটার উপর। আভিরার আত্মা শুকিয়ে আসে।

নাওয়াজ নাকে নাক ঘষে বলল,
– এখন কেমন লাগছে?

আভিরা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগে। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে এলো তার। এ লোক এভাবে আবদ্ধ কেন করেছে তাকে। অঙ্গ জুড়ে অদ্ভুত অনুভূতি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, গলা শুকিয়ে খরাপ্রবণ ভূমির ন্যায় চৌচির। নিষ্প্রভ চোখে চাইল নাওয়াজের দিকে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব কণ্ঠে বলল,
– বাড়িতে মা, লাবণ্য আপু আছে। দয়া করে উঠুন।

– এখন কেন? তারা যে বাড়িতে আছে এ কথা আগে মাথায় ছিল না।

আভিরার কথা বন্ধ হলো যেন। হাজার খুঁজেও কোনো শব্দ মিলেনি প্রত্যুত্তর করার জন্য। আভিরা অসহায় চোখে তাকায়। কেন যে এ লোককে ফেলতে গেল। তার সামান্য মজা করতে চাওয়াটাই যেন গলার কাঁটা হয়ে বিঁধল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে মেয়েটা। এ লোকের কাছে এলেই যেন তার মন মস্তিষ্ক নিশ্চল প্রায়।

_

ফোন ভাইব্রেট হতেই জিদান অস্থির চিত্তে টেবিল হতে ফোন হাতে নেয়। ছেলেটার এমন কাণ্ডে সকলে হতভম্ব হয়ে তাকায় তার দিকে। সেদিকে জিদান ধ্যান দিল না খুব একটা। তার যত খেয়াল মোবাইলে। ব্যস্ত হাতে ফোনের লক খুলে মেসেজ অপশনে কাঙ্ক্ষিত মেসেজ দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। সাথে ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির দেখা মিলে। সময় ব্যয় না করে টাইপ করল,
– মাথামোটা মেয়ে এতক্ষণ লাগল রিপ্লাই দিতে। সেই সকালে মেসেজ দিয়েছিলাম।

সাথে সাথেই রিপ্লাই এলো।

– ক্লাসে ছিলাম। চিন্তা হচ্ছিল বুঝি?

– হুম, সামান্য।

মিথ্যা বলল এ ছেলে। মেয়েটার কাছে বলতে ইচ্ছে করে না, সামান্য নয় খুব বেশিই চিন্তায় ছিলাম। তার এই চিন্তাকে ভয় বললেও ভুল হবে না।
ছেলেটা তো ভয়েই ছিল। এ কদিনে এমনটা এ প্রথম হলো। মেসেজ দিলে সাথে সাথেই পাওয়া যায়। আজ যখন মেসেজ দিয়ে পেল না, ভাবল হয়তো ব্যস্ত আছে। কিন্তু ঘণ্টা পার হতেই ছেলেটার কেমন মাথা আউলিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল রিপ্লাই না এলে চিন্তায় বোধহয় সে পাগল হয়ে যাবে। আবার কেমন ভয় জেঁকে ধরে, এই ভেবে মেয়েটার কিছু হলো না তো। নয়তো এমনটা তো কখনো করে না। সে জানে তার এসব চিন্তা অবান্তর। তবুও চিন্তায় তার পাগল হওয়ার জো। কিন্তু এ কথা ঐ মেয়েকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। সামান্য স্বীকারোক্তি স্বরূপ তার ভয়ের কথা জানান দিতেও কোথায় যেন বাঁধছে।

– এহেম এহেম! কী মামা প্রেম ট্রেম চলে না কি?

জিদান ফোন থেকে মুখ তুলে চাইল সামনে বসা ছেলেগুলোর দিকে। প্রত্যুত্তর করার যেন কোনো প্রয়োজন মনে করল না। প্রতিক্রিয়াহীন একইভাবে মুখ গুঁজে ফোনে।

– কিরে বললি না তো?

– কী বলব?
তার দায়সারা জবাব।

– যা জিজ্ঞেস করলাম।

– তেমন কিছু না।

– এসে থেকে তো আমরা সকলেই দেখলাম কেমন উদ্বিগ্ন হয়ে ফোনের দিকে চেয়েছিলি। কিছু না হলেই এত অস্থিরতা। এমন অস্থিরতা কখন, কেন হয় তা তো আমরা জানি। বলে ফেল মেয়েটা কে?

গম্ভীর স্বভাবের জিদানকে কেমন অপ্রস্তুত হতে দেখা গেল। জবাব দিতে হিমশিম খাচ্ছে কী?
ছেলেটা পূর্বের ন্যায় দায়সারাভাবে কেন বলতে পারছে না, তোরা যা ভাবছিস তা ভুল। প্রেমের জন্য এমন অস্থিরতা না।
প্রেম তাকে অস্থির করে তুলতে পারে না। প্রেম কেন, ঐ মেয়েও পারে না। তাকে অস্থির করে তোলার সাধ্যি কারো নেই। ঐ মেয়েরও না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here